খেলা ও ধুলা

দিনশেষে অভিমানে ফিরতে হয় ফাহিম স্যারদেরই…

জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি ক্রিকেটকেই দিয়েছেন, পরিবার কিংবা সংসারজীবনের চেয়েও তাকে বেশি টেনেছে বাইশ গজ, বারবার তাই তিনি ছুটে গেছেন মাঠে, শিষ্যদের কাছে। তার শিষ্যরাও সবাই ‘ফাহিম স্যার’ বলতে অজ্ঞান। ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে, ফুটওয়ার্ক নিয়ে কোন সমস্যায় পড়লেই সাকিব-মুশফিক থেকে ইমরুল কিংবা লিটন-সৌম্য, সবাই ছুটে আসেন তার কাছে। মানুষটার নাম নাজমুল আবেদীন ফাহিম, বাংলাদেশের ক্রিকেটের অভিভাবকদের একজন, খানিকটা অভিমান নিয়েই যিনি গত পরশু বিসিবি থেকে বিদায় নিলেন।

বাংলাদেশ নামের এই দেশটার বয়স যতো, তারচেয়েও বেশি সময় ধরে ক্রিকেটের সঙ্গী সম্পর্ক নাজমুল আবেদীনের। তার জন্ম ঢাকায়, বেড়ে ওঠা মতিঝিলের ব্যাংক কলোনীতে। মাঝে কয়েক বছর বাবার চাকুরীর কারণে কাটিয়েছেন করাচীতে। কৈশরে খেলাপাগল মানুষ ছিলেন, ক্রিকেট, ফুটবল, হকি- কোনকিছুই বাদ দেননি। তবে ব্যাট বলের খেলাটার সঙ্গে ঘর বাঁধবেন, এমন কোন পরিকল্পনা তখনও ছিল না।

দেশ স্বাধীন হবার পরে দ্বিতীয় বিভাগের দল একতা ক্লাবে খেলতেন, সেখান থেকে এলেন ওয়ারীতে। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবেও খেলেছেন বছর দুয়েক। সিরিয়াস ক্রিকেট তখনও মাথায় ছিল না, খেলতেন মনের আনন্দে। দারুণ আক্রমণাত্নক ব্যাটসম্যান ছিলেন নাজমুল আবেদীন। তিনি ব্যাটিঙে এলেই প্রতিপক্ষের দুজন ফিল্ডার চলে যেতেন মিড উইকেট আর ফাইন লেগের সীমানায়, কারণ একটু বাড়তি উচ্চতার বল পেলেই তিনি হুক বা পুল করবেন, এটা সবাই জানতো। এই পড়ন্তবেলায় দাঁড়িয়ে নাজমুল আবেদীন একটু আক্ষেপই করেন, সেসময় যদি ভালো কোন কোচের হাতে পড়তেন, তাহলে হয়তো ব্যাটিংটায় দারুণ উন্নতি করতে পারতেন।

ক্যারিয়ারে ভালো কোচ পাননি, তাই ক্রিকেট ছাড়ার পরে নিজেই কোচ হয়ে গেলেন। তবে সেটা একদিনে হয়নি। সিলেটে মোটা অঙ্কের বেতনে এক চা বাগানের ম্যানেজারের পদে যোগ দিয়েছিলেন, চাকরিও করেছিলেন বছর দুয়েক। বন্ধু এবং সাবেক ক্রিকেটার সারোয়ার ইমরানের অনুরোধে সেই চাকরি ছেড়ে চলে এলেন ঢাকার বিকেএসপিতে। তখন ১৯৮৮ সাল।

সিলেটে যেখানে চাকরি করতেন, সেখানে তার হুকুম পালন করার জন্যে সারাক্ষণ নিয়োজিত থাকতো দশ-বারোজন কর্মচারী, ছিল ব্যক্তিগত সহকারীও। বিকেএসপিতে এসে দেখলেন জরাজীর্ন একটা রুমে তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে, সেখানে মোট চারজনের থাকার ব্যবস্থা! বাথরুমের দরজার ছিটকিনি ভাঙা, মাথার ওপরে ফ্যান ঘোরে, কিন্ত সেটার বাতাস গায়ে এসে পৌঁছায় না! অন্য কেউ হলে দু’দিন বাদেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভাগতো, নাজমুল আবেদীন সেটা করলেন না। তিনি ক্রিকেটের সঙ্গে সংসার পাততে এসেছিলেন, তিনি দেশের ক্রিকেটকে অনেককিছু দেয়ার নেশায় দামী চাকরি ছেড়েছিলেন।

কোচিঙের ওপর কোর্স করার জন্যে বিকেএসপি থেকে গেলেন ভারতে, গুজরাটের সেই কোর্সের সেরা পারফর্মার নির্বাচিত হলেন তিনি। পেলেন ভারতের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ স্পোর্টস (NIS) এ চাকুরির অফার, কিন্ত সেটাকে পায়ে ঠেলে তিনি ফিরলেন ঢাকায়, নিজের দেশের তরুণ প্রতিভাদের সঙ্গে কাজ করবেন বলে।

দেশে ফিরে আসার এই সিদ্ধান্তের পেছনে নাজমুল আবেদীনের চমৎকার একটা ব্যাখ্যা আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল খুবই কম, যুদ্ধের ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখলেও, দেশের জন্যে কিছু করার মতো অবস্থা তখন তার ছিল না। এই বাংলাদেশে তিনি জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, সেই দেশটার প্রতি তার অজস্র ঋণ জমেছে। সেই ঋণের কিছুটা ফিরিয়ে দেয়ার বাসনাতেই গুজরাটে কোর্স শেষ হবার পরে তিনি উঠে বসেছিলেন দেশের বিমানে। এরপরেও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের হয়ে দেশের বাইরে কাজ করার সুযোগ এসেছিল, মায়ানমারে একটা প্রোজেক্ট দিয়ে তাকে পাঠানোও হয়েছিল। চড়া বেতনের সেই চাকরিটাও চারমাস করে আবার দেশে চলে এসেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারই সরাসরি নাজমুল আবেদীন ফাহিমের শিষ্য। সাকিব-তামিম-মুশফিকদের ব্যাচটাকে তো তিনিই কোচিং করিয়ে তৈরি করেছেন, নাইমুর রহমান দুর্জয় থেকে হালের লিটন দাস- সবাই কোন না কোনভাবে তার ছাত্র। এত এত তারকা ক্রিকেটারকে নিজের হাতে গড়েছেন নাজমুক আবেদীন, অথচ কথাটা তার সামনে বলে দেখুন, হেসেই উড়িয়ে দেবেন তিনি। তার কথা হচ্ছে, ‘খেলোয়াড় তার নিজের মেধা দিয়ে বড় হয়। কোচ শুধু তাকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু সেই পথ ধরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যেতে পারার কৃতিত্ব শুধুই খেলোয়াড়ের।’

১৯৮৮ থেকে ২০০৫- বিকেএসপিতে ১৭ বছর কাজ করা নাজমুল আবেদীন বিসিবিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৫ সালে। লম্বা সময় কাজ করেছেন গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগে। গত এক যুগে জাতীয় দলের পাইপলাইন সমৃদ্ধকরণে তার অবদানকে বিশাল বললেও কম বলা হবে। অথচ গত দুই বছরে তার কাজের পরিধি ক্রমেই ছোট করে ফেলা হয়েছিল। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শুধু নারী বিভাগের। সেখানেও তিনি সাফল্য পেয়েছেন। গত বছর মেয়েদের এশিয়া কাপ জয়ে তার ভূমিকা অসামান্য।

সেই মানুষটা বিসিবি ছাড়লেন গত পরশু। শেষদিনের মতো অফিস করলেন, তাকে বিদায়ী সংবর্ধনাও দিলো বিসিবি। একমাস আগেই অবশ্য নাজমুল আবেদীন জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আর থাকছেন না। বিসিবির পক্ষ থেকেও তাকে ধরে রাখার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিসিবির চাকরিটা আর উপভোগ করছিলেন না নাজমুল আবেদীন, এর বাইরেও তার সঙ্গে বোর্ডের সঙ্গে শীর্ষ কর্তাদের কেউ কেউ এমন আচরণ করেছেন, যেটি তাকে বিসিবি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

নাজমুল আবেদীন ফাহিমের ক্রিকেট ভাবনা বরাবরই আর দশজনের চেয়ে আলাদাই ছিল। বিসিবিতে যুক্ত থেকেও দেশের ক্রিকেটের এই সংস্থার নানা অসংগতি, ভুলত্রুটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে কখনোই পিছপা ছিলেন না। আর বিসিবির সঙ্গে যুক্ত থাকায় গত পনেরো বছরে তিনি কোন ক্লাব বা বিপিএল ফ্র‍্যাঞ্চাইজিকে কোচিং করাননি, ব্যাপারটা ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ তৈরি করতে পারে এই কারণে। অথচ সাবেক কোন কোন খেলোয়াড়কে লোককে বিসিবির আট-দশটা পদ আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি ঢাকা লিগ আর বিপিএল মিলিয়ে দুই-তিনটা ক্লাবের কোচিংও করাতে দেখছি আমরা। মানুষে মানুষে কত পার্থক্য যে হয়!

দিনশেষে নাজমুল আবেদীনরা পেছনে পড়ে যান, একঘরে হয়ে থাকেন। তারা নোংরা স্রোতে গা ভাসান না, তারা ক্রিকেট বলতে মাঠের ক্রিকেটটাকেই বোঝেন, রাজনীতিতে জড়ানোর আগ্রহ তাদের থাকে না। তাই একটা সময়ের পরে মনে ব্যাথা নিয়েই তাদের বিদায় নিতে হয়। লোভী আর স্বার্থপরেরা টিকে থাকে এই জঙ্গলমহলে, ফাহিম স্যারেরা সেখানে টিকতে পারেন না, কারণ তারা ভদ্রলোক।

নাজমুল আবেদীন বিসিবি ছেড়েছেন, তবে ক্রিকেট ছাড়েননি। তরুণ প্রতিভা তুলে আনার কাজটা নিশ্চয়ই করবেন তিনি, কোচিং ক্যারিয়ারে ফিরবেন আবারও। সাকিব-তামিম-মুশফিকদের মতো নতুন আরও প্রতিভা তুলে আনার জন্যে একজন ফাহিম স্যারের বিকল্প কেউ তো বাংলাদেশে নেই। আফসোস শুধু এটাই, বিসিবি একটা রত্নকে হারালো অযথাই, তারা নাজমুল আবেদীনের মতো মানুষকে ব্যবহার করতে পারলো না। অবশ্য, অযোগ্যরা যেখানে ভুরি ভুরি পদ দখল করে বসে থাকে, সেই সংস্থার কাছে এরচেয়ে বেশি আর কীইবা প্রত্যাশা করা যায়?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button