এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

মনের জেলখানা থেকে মুক্তি ও আবারও নাস ডেইলির ফিরে আসা!

জানুয়ারি মাসের পাঁচ তারিখ। সেদিন নাস ডেইলি তার এক মিনিট ভিডিও সিরিজের একহাজারতম এপিসোড প্রকাশ করেন। টানা এক হাজার দিন, একদিনও মিস না দিয়ে তিনি ভিডিও প্রকাশ করে গেছেন। সেই যাত্রাটা শেষ হয়েছিল সেদিন। যারা নাস ডেইলিকে ফলো করেন, তাদের জন্য সেদিনটা ছিল মন খারাপ দিবস। কারণ, সে এনার্জি নিয়ে নাস ভিডিও করতেন, এই হিংসা-অশ্লীলতা-অস্থিরতার সময়ে তিনি যে ইতিবাচক মন নিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে সৌন্দর্য, অনুপ্রেরণার কন্টেন্ট করতেন সেটার অবসান স্বাভাবিকভাবেই অবসাদে আমাদের মন বিষাদগ্রস্ত করে।

কিন্তু, যারা টুকটাক ভিডিও বানান কিংবা অন্য যেকোনো কাজ করেন তারা একটু হলেও জানেন কাজ যত সহজই হোক, টানা এক হাজার দিন সেটার পুনরাবৃত্তি করা কত কঠিন। এই ধৈর্য ধরে রাখা, নিজের ব্যক্তিগত সমস্যাকে দূরে রেখে, অসুস্থতা, ক্লান্তিকে জয় করে এভাবে কাজ করে যাওয়া অনেক কঠিন, অনেক অনেক কঠিন একটি কাজ। নাস ডেইলি সেটা করেছেন। তাই সাময়িক একটা বিরতি তারও দরকার ছিল। ভিডিও ছাড়াও তার নিজেকে নিয়ে আরো অন্যান্য পরিকল্পনাও ছিল। সেগুলোকেও গুছানোর জন্য সময়ের প্রয়োজন।

নাস ডেইলি

কিন্তু, সুখবর হলো নাস ডেইলি হারিয়ে যাননি। গতকাল তিনি তার ফেসবুকে সাত মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এবং অনুমান করুন তিনি কি ঘোষণা দিয়েছেন! ইয়েস! হি ইজ ব্যাক। নাস ডেইলি আবার ফিরে আসছেন। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে একটা করে ভিডিও প্রকাশ করবেন তিনি। যার দৈর্ঘ্য হবে ৩-৫ মিনিট। আপাতত ১০০ সপ্তাহের সিরিজ এটি। মানে দুই বছরের মামলা। এই পুরোটা সময় তিনি যে কি দারুণ দারুণ ভিডিও নিয়ে হাজির হবে সেটা ভাবতেই এক্সাইটেড লাগছে!

গতকালের ভিডিওতে নাস ডেইলি তার জীবনের একটা বিশেষ অধ্যায়ের কথা বলেছেন। যে কথাগুলো অনেকের কাজে লাগতে পারে, অনেকের উপকারে আসতে পারে যারা অন্তত এটা বিশ্বাস করেই জীবন শেষ করে ফেলছেন- তাদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। নাস ডেইলি ভিডিওতে কারো উদাহরণ টানেননি, নিজের কথাই বলেছেন। তিনি নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড বর্ণনা করেছেন, নিজের মানসিক বাধার কথা বলেছেন এবং কিভাবে নিজেকে মুক্ত করেছেন মনের জেলখানা থেকে সেটাই বলেছেন।

ইসরায়েলের এক গ্রামে জন্ম নাস ডেইলির। জন্মেছিলেন একজন মুসলিম হিসেবে। নিজের চেহারা নিয়ে তার ভীষণ হীনমন্যতা ছিল। নিজেকে তিনি এভারেজ মানুষদের মতোই ভাবতেন। যে গ্রাম থেকে তার বেড়ে উঠা সেখানকার চিন্তাভাবনায় কখনো কেউ কল্পনা করে না, একজন মানু্ষ দুনিয়া বদলে দিতে পারে। ফলে নিজের প্রতি ধারণাটাও তাই খানিকটা ওরকম হয়ে যায় তার। ২০০১ সালে যখন টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা হলো, তখন জীবন আরো কঠিন হয়ে গেল। মুসলিম পরিচয়ে ভাল কিছু করাটা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন হয়ে দাঁড়াল। বিশেষ করে, পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো তখন। এমনই একটা অবস্থায় নাস ডেইলির হীনমন্যতা যেন আরো বাড়তে থাকলো। নিজেকে তিনি এক্সপ্রেস করতে চাইতেন না বলে পর্দার পেছনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে কেউ দেখবে না, জানবে না। তিনি কম্পিউটারে বসে কাজ করবেন এরকম। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইতেন তিনি। কিন্তু, ভেতরে ভেতরে নিজের হীনমন্যতা হয়ত তাকে কষ্ট দিচ্ছিলো।

নাস ডেইলি

এভাবে অনেকদিন চললো। কিন্তু এতে তার ক্লান্তি চলে আসলো। তাই জীবনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তটা নিলেন তিনি। আর লুকিয়ে থাকবেন না। যা কিছুতে তার ভয়, সব জয় করবেন। তিনি ক্যামেরা কিনলেন এবং নিজেকে বললেন, তিনি তার বাদামি রঙয়ের চেহারা নিয়ে ভাববেন না, পেছনে কি আছে তা দেখার দরকার নেই, তিনি শুধু ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে সেটাই অনেক জোরে জোরে বলবেন, যা তার ভাল লাগে। তারপর কি হলো, আমরা জানি। নাস ডেইলি এক ইতিহাস রচনা করলেন।

এই সময়ে এসে ফেসবুকে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে সেরা কন্টেন্ট নির্মাতা হয়েছেন, টানা এক হাজার দিন ভিডিও তৈরি করেচ গেছেন। নিজের হীনমন্যতা জয় করার উদ্দেশ্য নিয়ে যা শুরু করেছেন, একসময় খেয়াল করলেন, তার মধ্যে আর সেই ভয়টা নেই। নিজের চেহারা নিয়ে আর কোনো কষ্ট নেই। প্রত্যেকদিন পজিটিভ কথা বলতে বলতে, দুনিয়ার বিচিত্রতা দেখতে দেখতে তার মধ্যেও অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস জন্মালো। তিনি খেয়াল করলেন, মানুষ আসলে দিনশেষে তার চেহারা নিয়ে কথা বলছে না, তার ধর্ম নিয়ে কথা বলছে না, তারা সবাই কথা বলছে তার কন্টেন্ট নিয়ে। তার কন্টেন্ট দুনিয়ার লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। তিনি নিজে বোধহয় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন আসলে৷

নাস ডেইলির জীবন নিয়ে এগিয়ে-চলোতে এর আগে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তাকে দেখানো হয়েছে, তিনি আপাতদৃষ্টিতে সফল একজন মানুষ। কারণ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন, বছরে লক্ষাধিক ডলারের বেতনে চাকরি করতেন। কিন্তু, তবুও জীবনকে দেখবার আশায় তিনি সিকিউরড চাকরি ছেড়ে ভিডিও বানাতে নেমে পড়লেন। কিন্তু, কেন এই কাজটা এত ডেস্পারেটলি করলেন তিনি তার পেছনের গল্প জানা ছিল না। নাস ডেইলিও কখনো বলেননি। সেই কথাগুলোই গতকাল বললেন ভিডিওতে। এখন তিনি সফল, তাই হয়ত সব কিছু সহজ মনে হতেই পারে সবার কাছে। কিন্তু, একবার নাস ডেইলির জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখি আমরা। খেয়াল করলে দেখব, আমাদের মধ্যেও বিবিধ হীনমন্যতার বসবাস। অভাববোধ। এগুলো ঝেড়ে ফেলে সাহস নিয়ে কয়জন নিজের জীবনটাকে এভাবে দেখার সাহস করি? নাস ডেইলি সবাই হবে না, কিন্তু, আমরা যা সেটা তো হতে পারি নিজ নিজ জায়গায়, তাই না?

অধীর আগ্রহে পরের সপ্তাহে কি ভিডিও নিয়ে আসছেন নাস, তার অপেক্ষা বসে থাকব। কিন্তু তার আগে তিনি সাত মিনিটের ছোট ভিডিওতে যেই ভাবনার খোরাক রেখে গেছেন, তাতে একটু হলেও মনে ধাক্কা লেগেছে, সত্যি। মনের জেলখানা থেকে বের হতে পারলে কত বিস্ময়কর উপহার যে জীবন আমাদের জন্য নিয়ে বসে থাকে, তার প্রমাণ নাস ডেইলি! আবার ফিরে আসবার জন্য ধন্যবাদ নাস, মনের অন্দরমহল নাড়িয়ে দেয়া কথা শুনবার জন্য আপনার অপেক্ষায় থাকবে প্রতিটি শুক্রবার!

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button