মতামত

একটি ‘নগদ’ লজ্জা!

ধুঁকতে থাকা ডাক বিভাগ যেন নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে ডিজিটাল ফিনানশিয়াল সার্ভিস চালুর মাধ্যমে। ডাক বিভাগের এই সার্ভিসটির নাম ‘নগদ’। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েভ টেকনোলজির মাধ্যমে ডাক বিভাগ এই নতুন সেবাটি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে এই সেবাটি আলোচিত, কারণ এর ইউনিক কিছু ফিচার আছে। এই সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেকোনো নাম্বারেই টাকা পাঠানো যাবে। যাকে পাঠাচ্ছেন তার একাউন্ট না থাকলেও, টাকা পাঠানো যাবে। তবে ১৫ দিনের মধ্যে একাউন্ট খুলে টাকা উত্তোলন করা যাবে। একাউন্ট খোলাও সহজ, ফোনেই একাউন্ট রেজিষ্ট্রেশন করে ফেলা যায়৷ অন্যান্য মোবাইল ফিনান্স ট্রানজেকশনে লিমিটেশন থাকলেও নগদে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন করারও স্বাধীনতা আছে।

এতসব সুবিধা নিয়ে যে সার্ভিসটি শুরু হয়েছে, সরকারের সাপোর্ট, ডাক বিভাগের অধীনে যে সেবাটি শুরু হলো এটার প্রচারণাও দুর্দান্ত হওয়া উচিত। নিশ্চয়ই এই জায়গাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের বিশেষ পরিকল্পনা আছে। তবে, এখন পর্যন্ত যে বিজ্ঞাপনটি অনলাইনে ধারাবাহিকভাবে গল্প আকারে প্রকাশের পর, ভিডিও আকারে প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নগদের ফেসবুক পেজে তারা তাদের ধারাবাহিক বিজ্ঞাপনের শেষের গল্পের ভিডিও প্রকাশ করেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, একজন মেয়ের তার বাবার প্রতি ভীষণ ক্ষোভ। বাবা ব্যর্থ তার কাছে। মেয়ে সংগ্রাম করছে অথচ বাবার সাপোর্ট নেই।

image source- nagad

মেয়ের পড়ালেখার খরচ বাবা সময় মতো দিতে পারে না বলে মেয়ের রাগ। এমনই একটি থিম দেখা যায় ভিডিওতে, যেখানে শেষ দৃশ্যের আগে প্রতিটি দৃশ্যেই বাবার ব্যর্থতায় মেয়ের বিতৃষ্ণা ফুটে উঠেছে। এই ভিডিওতে যেহেতু গল্পটি মেয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হচ্ছিলো, তাই মেয়ের একপেশে অনুভূতি যেন বাবাকে ভিলেন চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিলো। প্রতি মুহুর্তে মেয়ের বক্তব্যে ফুটে উঠছিলো, বাবা কিছু পারে না, বাবা ব্যর্থ।

বাবাদেরকে এভাবে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভিডিওর শুরুতেই দেখা যায়, মেয়েটির মা মারা যাওয়ার পর বাবা দায়িত্ব নেয়ার চেষ্টা করছে। ভাত রান্না করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, জুতার ফিতাটা বাঁধার নিয়মটাও জানে না বাবা। মেয়েটা বলছে, বাবার উপর কখনো ভরসা করা যেত না। মেয়েটা স্কুল ছুটির পর অপেক্ষা করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজলেও বাবার খেয়াল থাকে না। মেয়েটি তাই নিজের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নিয়েছে। বাবার দেখাশোনাও করে সে। শহরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে মেয়েটি। পড়ার খরচ যোগানোর জন্য টিউশনও করে। কিন্তু, এক্সিডেন্ট করে একমাস বসে থাকায় টিউশনে যেতে পারে না, এখন সেমিস্টার ফি দেয়ার জন্যে টাকার দরকার, বাবার সেটাও খেয়াল নেই। বাবা ফোন করলে মেয়েটা তার ক্ষোভ কিংবা অভিমান প্রকাশ করে ফেলে। বাবা তখন নগদ একাউন্টে ৫০ হাজার টাকা পাঠায়, মেয়েও খুশি। সুখী গল্প।

সারা গল্পে বাবাকে দায়িত্বজ্ঞ্যানহীনভাবে উপস্থাপন করে শেষে এসে টাকা পাঠানোর কারণে বাবা ভাল মানুষ, পিতা কন্যার সম্পর্কগুলো কি আসলে এই রকমই? কে জানে! এই ভিডিও থেকেই তো বাবারা কেমন হতে পারে তার একটা চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে। যিনি কখনো ভাত রাঁধেননি, তিনি ভাত রান্না করছেন। জুতার ফিতা বেঁধে দিচ্ছেন মেয়ের, যদিও বাঁধাটা একেবারেই সুন্দর হয়না। মেয়ের স্কুলে একটু দেরিতে পৌঁছলেও ঠিকই উদ্বিগ্ন চোখ মুখ নিয়ে ছাতা নিয়ে হাজির হচ্ছেন এই বাবা। মেয়ে শহর যাবে বলে ট্রেনের জানলায় এসে খাবারের প্যাকেট দিয়ে যাচ্ছেন। সন্তান পড়ালেখার খরচ চাইলে একজন বাবা পকেটে টাকা রেখে কখনো কি বলেন, দুইদিন পর টাকা দিব?

    image source- nagad fb page

এই বাবার কাছে কেন টাকা নেই সেটাও হয়ত একটা গল্প। যে গল্প দেখানো হয়নি, অথচ বাবাকে পুরো ভিডিওতে দায়িত্বজ্ঞানহীন, অদক্ষ একজন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু, এই ইমোশনটাও হয়ত আসতে পারত, সন্তানের জন্য বাবা সেই কাজটা করতেও নারাজি হন না, যা আগে কখনো তিনি করেননি। বাবারা মায়ের অভাব পূরণ করতে হয়ত পারেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য এমন কিছু নেই যা তিনি চেষ্টা করেন না। মা ছাড়া মেয়েকে বড় করার দায়িত্ব নেয়াটা কি দায়িত্ব না? বাবা ভাতের মাড় ফেলতে গিয়ে ভাতের হাড়ি ফেলে দিলে সে কাজটা ভালমতো পারে না? তার হাত পুড়লো কি না এটা দেখাটাই কি তখন জরুরি ছিল না? তার জুতার ফিতা বাঁধায় ভুল হতে পারে, কিন্তু বাবা তো তবুও চেষ্টা করছেন। তারপরেও বাবা ভিলেন৷ এই বাবাকে এক চুটকিতে নগদ হিরো বানানো হলো, এক ফোনে ৫০ হাজার টাকা তিনি পাঠানোর পর! বিজ্ঞাপন দেখতে সুন্দর হয়েছে, মেয়েটির রোল প্লেও চমৎকার, কিন্তু কানেক্টিং মনে হয়নি পুরোপুরি, একপেশে দৃষ্টিকোণ দেখানো কারণে।

image source- nagad facebook page

নগদের ফেসবুক পেজে গেলে অবশ্য এই বিজ্ঞাপনের ধারাবাহিক গল্প পড়া যাবে। যেখানে গল্পের মাধ্যমে বাবা মেয়ের বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছিলো। ইন্টেরেস্টিং হলো, ধারাবাহিক বিজ্ঞাপন গল্পে কিন্তু বাবার পার্স্পেক্টিভটাও দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যা ভিডিওতে অনুপস্থিত ছিল একেবারেই। ভিডিওটা অধিকতর মানুষের কাছে যেহেতু পৌঁছেছে, তাই এখানে বাবাদের এভাবে উপস্থাপন করাটাকে অনেকে অপমানজনক মনে করছেন। কোনো বাবা যদি আঘাত পান কিংবা স্রেফ লজ্জাও পান এই ভিডিও দেখে এবং ভাবেন, নিরন্তর চেষ্টা করবার পরেও সন্তানরা তাদের ব্যর্থ ভাবতে পারে, এই মানসিক দ্বন্দ্বটা তাদের কি কষ্ট দেবে না? হুমায়ূন আহমেদ সম্ভবত এরকম বলেছিলেন, পৃথিবীতে অনেক খারাপ পুরুষ থাকতে পারে, একটাও খারাপ বাবা নেই। কথাটা কতটুকু সত্য তা জানি না তবে বাবারা অন্তত ওমন দায়িত্বজ্ঞ্যানহীন না, যতটা নগদের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে। যাইহোক, নগদ জনপ্রিয় হোক, তবে বিজ্ঞাপনের ভাষা হোক ভালবাসার, যে ভালবাসা শুধু নগদ টাকা নির্ভর না..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button