রিডিং রুমলেখালেখি

পরকীয়া, একটি রহস্যজনক মৃত্যু, অতঃপর সমাধান…

(১)

ভদ্রমহিলার নাম- নাদিয়া খানম। পুলিশ সুপার হাসান মাহমুদের স্ত্রী। মাস ছয়েক পূর্বে দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ভদ্রমহিলার ছবি বেশ রসালো ভাবে ধারাবাহিক প্রকাশ করা হয়েছে। ছবির নিচে রগরগে পরকীয়া কাহিনী। ঘটনার শুরু হাসান মাহমুদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। তাকে নিজ ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বেডরুমের বিছানায় শুয়ে ছিলেন। বিছানাতেই মৃত্যু। স্বামীর মৃত্যুর সময় নাদিয়া ৯৯৯ তে কল করে পুলিশ ডাকেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই নাদিয়া খানমের পরকীয়া প্রেমিক আতিউল হককে গ্রেফতার করে। পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে গ্রেফতারের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নাদিয়া খানম বর্তমানে উজ্জ্বল জামদানি পরে আমার সামনের চেয়ারে বসে আছেন। প্রাথমিক দর্শনে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছে না। পঁয়ত্রিশ বা চল্লিশের ঘরে হতে পারে। বেশ উঁচু লম্বা। চলাফেরায় একটা মোহনীয়তা আছে। প্রথম দর্শনেই যেকোন পুরুষ আদিম আকর্ষণ বোধ করবে। চর্যাকবিরা হয়তো ভ্রূ কুঁচকে লিখে ফেলত, ‘মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী। তাহার মাথায় ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জামালিকা।’ নাদিয়া খানম কোমল গলায় বললেন,

– ‘আপনার নাম নাজিব?’
– ‘জ্বি।’
– ‘থানা থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, আপনি আসবেন। হাসানের মৃত্যুর ব্যাপারটায় পুলিসের কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। আপনার প্রশ্ন শুরু করতে পারেন।’
– ‘আমার কোন প্রশ্ন নেই।’

নাদিয়া খানম ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন। কুঁচকানো অবস্থায় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি প্রথমবার অনুভব করলাম, ভদ্রমহিলার চোখের গভীরে অপার্থিব কিছুর উপস্থিতি। হালকা আঁচের আগুনে যেমন দীর্ঘক্ষণ হাত রাখা যায় না, হাত পুড়ে যায়, নাদিয়া খানমের চোখে চোখ রাখলে তেমনই কিছু ঘটতে পারে। আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম।

– ‘পুলিশ প্রতিদিনই আসছে। অহেতুক প্রশ্ন করছে। অধিকাংশই সেক্স নিয়ে। কতদিন করেছি। দিনে আসত, নাকি রাতে আসত। মাতাল অবস্থায় মিলিত হয়েছি, নাকি স্বাভাবিক অবস্থায়।’
– ‘আর কী প্রশ্ন করেছে?’
– ‘স্বামীর মৃত্যুর পর স্বাভাবিক কেন? উপস্থিত মানুষজন নাকি আমাকে কাঁদতে দেখেনি। এইসব।’
– ‘আমি এ ধরণের প্রশ্ন করব না।’
– ‘মজার ব্যাপারটা কী ছিল জানেন নাজিব সাহেব?’
– ‘কী?’
– ‘ওসি সাহেব আমার ফোন নাম্বার নিয়েছে। যখন তখন ফোন করছে। আপনি আসার আগে ফোন দিয়েছিল। তার প্রশ্ন হলো- আমি বাইরে খেতে যাব কী না! তার ধারণা স্বামীর মৃতুর পর আমি খুব অসহায়, নিঃসঙ্গ নারী। নিঃসঙ্গ নারীকে অনেককিছুই বলা যায়। নিঃসঙ্গ নারীরা একধরণের প্রকট সুযোগ।’
– ‘আপনি অসহায় নন। আমার ধারণা স্বামীর মৃত্যুর পরও বেশ ভালো আছেন।’

নাদিয়া খানম হেসে ফেললেন।

– ‘মাত্র ছয় মাস হল। ভালো মন্দ এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। পুলিশি ঝামেলাগুলো থামলে হয়তো বুঝতে পারব।’
– ‘পুলিশ আর ঝামেলা করবে না। আমাকে দুইদিন সময় দিয়েছে। কেসটা বেশ জটিল। দুইদিন পার হলে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায়, আর পুলিশ আসবে না।’
– দুইদিনেই রহস্য ধরে ফেলতে পারবেন?’
– ‘নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।’
– ‘আপনাকে কিন্তু আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। ওসি সাহেবের মত আপনার মাঝে চাঞ্চল্য নেই। আপনি আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছেন না।’
– ‘কেন তাকাচ্ছি না, আপনি বোধ হয় বুঝতে পারছেন।’
– ‘বুঝতে পারছি না।’
– ‘না তাকানোর পক্ষে একমাত্র কারণ হলো, পর্যবেক্ষণনির্ভর (ডিডাকটিভ) কৌশলে নির্লিপ্ততা রহস্য সমাধানের প্রধান অস্ত্র। ব্যাপারটা আমি এ-পক্ষও নই, ও-পক্ষও নই টাইপের। এতে সুবিধা হলো- লজিক তখন ঠিকঠাক কাজ করে। আপনি রুপবতী। খানিকটা অস্বাভাবিক রকমের রূপবতী। যে কেউ আপনার দিকে তাকালে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন আকর্ষণ বোধ করবে। তার জন্য লজিক সাজানো মুশকিল হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জটিল হবে।’
– ‘আপনি আকর্ষণ বোধ করছেন?’
– ‘কিছুটা। আমি অন্যান্য পুরুষ মানুষ থেকে আলাদা নই।’

নাদিয়া খানম ঠোঁট বাঁকা করে চোখ নিচু করলেন। তার মাথায় একই সাথে অনেক কিছু খেলা করছে। সমস্যা হল তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু ধরা যাচ্ছে না। জটিল চিন্তাভাবনার মানুষের চোখ জটিলতায় ভরা। সেখানে রহস্য থাকে, কিন্তু সেই রহস্য অগোছালো। মস্তিষ্কের অগোছালো চিন্তার সাথে চোখের ভাষাও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। একটা সময় হয়তো চোখের ভাষা ধরে ফেলা যাবে। আমাকে সেই মুহুর্তের অপেক্ষা করতে হবে। পর্যবেক্ষণনির্ভর রহস্য সমাধানের বেসিক সূত্র হলো- বাঘের মত হতে হয়। তাড়াহুড়ো করা যাবে না। শিকার ধরার আগে নিঃশব্দে দুই পা পিছিয়ে যেতে হয়। এতে লম্বা লাফ দেওয়া যায়। আকস্মিক আক্রমণে শিকার নিজেও খানিকটা ভড়কে যায়। ভড়কালে তার চিন্তাভাবনার বিশৃংখলা কেটে যাবে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য সরলরেখায় চিন্তা করবে। নাদিয়া খানমকে দেখে স্বাভাবিক মানুষের মত মনে হচ্ছে না। রূপবতী, রহস্যময়, সাথে কিছুটা কৌশলী। বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে কারো চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করবার একটা স্বভাব আছে। রহস্যময় চরিত্র শিকার করতে আমার তাড়াহুড়ো নেই। সময় নিতে হবে। দুই পা পেছাতে হবে। এতে শিকার তার কমফোর্ট জোন থেকে এক সময় বেরিয়ে আসবে। আমার কাজ হল একটা কমফোর্ট জোন তৈরি করা। নাদিয়া খানম মৃদু স্বরে বললেন,

– ‘আপনি কিছু জানতে চাইলে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।’
– ‘আপনার বেডরুমে একবার ঘুরে আসব।’

নাদিয়া খানম মৃদু হাসলেন। তার চোখেমুখে কোন পরিবর্তন নেই। তিনি সম্ভবত ধারণা করেই রেখেছেন আমি তার বেডরুমে যেতে চাইব। শাড়ির কোমরের অংশটা চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে প্রবল আত্মবিশ্বাসী মানুষের প্রতিচ্ছবি। বেডরুম আয়তনে বিশাল। এলইডি বাল্বের আলোয় দেয়ালের রঙ চকচক করছে। ঘরের মাঝখানে বিশাল খাট পেতে রাখা। ধবধবে চাঁদর বিছানো। এই বিছানায় নাদিয়া খানমের স্বামী পুলিশ সুপার হাসান মাহমুদকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘ভিকটিম লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে ছিল। মাথার নিচে বালিশ ছিল না। একটা বালিশ খাটের নিচে পড়ে ছিল। বিছানার চাদর এলোমেলো। কিন্তু ধ্বস্তাধস্তির প্রমাণ নেই।’ হাসান মাহমুদ একজন স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী মানুষ। নাদিয়া খানমের পক্ষ্যে তাকে খুন করা, বালিশ চেপে মেরে ফেলা সম্ভব নয়। এই যুক্তিতে তার পরকীয়া প্রেমিককে দায়ী করা যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হবার সময় খুনির হাতে বালিশ ছিল। হাতে বালিশ থাকলেই কেউ খুনি প্রমাণিত হয় না। কিন্তু নাদিয়া খানম কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, আতিউল হক তার স্বামীকে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে। পুলিশ আমলে নিয়েছে। খাটের পাশেই হাঁটু সমান উঁচু বেডসাইড। বেডসাইডে নাদিয়া খানমের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। কিছু ঔষুধ দেখা যাচ্ছে। আমি একটা সিডাটিভের পাতা হাতে নিলাম।

– ‘আপনার ইনসমনিয়া আছে?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘কতদিনের?’
– ‘খুব বেশি না। মাস ছয়েকের মত।’
– ‘আগে ছিল?’
– ‘না।’
– ‘আগে থাকতেন কোথায়?’
– ‘আমার হাজবেন্ডের পোস্টিং ছিল নওগাঁয়। পুলিশ সুপারদের জন্য আলাদা কোয়ার্টার থাকে। সেখানে থাকতাম।’
– ‘এখানে সরকারি কোয়ার্টারে থাকছেন না কেন?’
– ‘কোয়ার্টারে থাকার ব্যাপারটা আমার জন্য জেলখানার মত অভিজ্ঞতা। বন্দী মনে হয়। কাছের মানুষজন আসতে পারে না। চাইলেও বাইরে যাওয়া যায় না। বিশাল বাড়ি কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।’
– ‘দেয়ালের ছবিটা কতদিন আগে তোলা?’
– ‘বছর দশেক। বিয়ের পর।’
– ‘পাশের ছবিটা?’
– ‘এটা সাম্প্রতিক। ছয় মাস হবে।’

দেয়ালে পরপর দুটো ছবির ফ্রেম ঝুলছে। সবচেয়ে বড় ছবিটা স্টুডিওর ভেতরে তোলা। দশবছর আগে স্টুডিওতে ছবি তোলার চলন ছিল। সেখানে বসার জন্য চেয়ার থাকে। দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য ডামি সিঁড়ি থাকে। নাদিয়া খানমের স্বামী পুলিশ সুপার হাসান মাহমুদ সাহেব একটা লোহার চেয়ারে বসে আছেন। চমৎকার সুদর্শন যুবক। বড়বড় চোখ। খাড়া নাক। সীনা টানটান করে বসে আছেন। চেয়ারের পাশে তার নববিবাহিতা স্ত্রী, শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছেন। সাম্প্রতিক ছবিটায় দুজনই দাঁড়ানো। হাসান মাহমুদের পরণে লাল টাই আর কালো কোর্ট। পাশে বর্তমান বয়সের নাদিয়া খানম। ছবিটার মাঝে একটা অসামঞ্জস্যতা আছে। সেটা কী ধরণের বোঝা যাচ্ছে না।

– ‘আপনার দেখা শেষ?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘এভাবে আপনি রহস্য উদঘাটন করেন?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘খুব সহজ ধরণের মনে হচ্ছে।’
– ‘অবশ্যই সহজ।’
– ‘কী রহস্য পেলেন?’
– ‘একটা দম্পতি সুখী, না অসুখী সেটা ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়। বেডরুমে কী ঘটেছিল জানতে বেড না দেখে দেয়ালে তাকাতে হয়। যে ঘরে মানুষ বসবাস করে সেই ঘরের দেয়াল কথা বলে।’
– ‘আপনি দেয়ালের কথা শুনতে পান?’
– ‘পাই।’
– ‘কী শুনতে পাচ্ছেন?’
– ‘দেয়ালের গা ঘেষে দাঁড়ান। একটা গাল লাগান।’
নাদিয়া খানম অপ্রস্তুত হয়ে দেয়ালের সাথে গাল চেপে ধরলেন।
– ‘এবার দেয়ালের রঙ দেখুন। দেয়ালে আলো পড়ছে। কোথাও ব্যাপ্ত প্রতিফলন নেই।’
– ‘বুঝলাম না।’
– ‘যদি এই ঘরের বাসিন্দারা অসুখী হয়, মাঝেমাঝে তারা বিরক্ত হবে। দেয়ালে এটা সেটা ছুড়েও মারতে পারে। ফলে কোথাও কোথায় রঙ উঠে যাবে বা দাগ পড়বে। খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে তখন দেয়ালের ছুড়ে মারা দাগগুলো দেখা যাবে। তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন?’
– ‘না।’
– ‘না পাবার কারণ আপনারা সুখী ছিলেন।’
– ‘অসুখীও থাকতে পারি।’
– ‘অবশ্যই পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বেশ উঁচু পর্যায়ের। ব্যক্তিগত রাগ প্রকাশ করবার মত কাজটা আপনারা করেননি।’

নাদিয়া খানমের মুখে অবজ্ঞার হাসি। আমি এই হাসির অপেক্ষায় ছিলাম। মাঝেমাঝে মুখের হাসি, চোখের তাকানোর ভঙ্গিমা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করে। আত্মনিয়ন্ত্রণ শব্দ ব্যবহার করায় নাদিয়া খানম অবজ্ঞা করেছেন। এর অর্থ হতে পারে- তারা আসলেই সুখী ছিল।

– ‘আপনি কিছু ভাবছেন?’
– ‘হ্যাঁ, নোট করছি।’
– ‘হাতে তো খাতা কলম নেই।’
– ‘মাথায় করছি।’
– ‘কী নোট করলেন, বলা যাবে?’
– ‘হ্যাঁ, আপনারা সুখী ছিলেন। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হচ্ছে। আতিউল হক আপনার স্বামীকে খুন করতে পারে। তার দিকে পাল্লা ভারী হচ্ছে।’

নাদিয়া খানম কিছু বললেন না। পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে পরবর্তী লক্ষ্য নাদিয়া খানমের রান্নাঘর। রান্নাঘরে তেমন কিছু পাওয়া গেল না। চমৎকার পরিপাটি করে সাজানো। বেলকনিতে কিছু নেই। একটা চেয়ার পাতা। পাশে উঁচু টুল। টুলে কফিমগ রাখা হয়। মগ না থাকলেও মগের তলার মত বৃত্তাকারে কফির শুকনো দাগ আছে।

(২)

নাদিয়া খানমের বাসা থেকে বের হবার সময় ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। কিছুক্ষণ পরপর দমকা হাওয়া উঠছে, আবার থেমে যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলছে। সেই আলোয় এলাকাজুড়ে অধিভৌতিক পরিবেশ। নাদিয়া খানম গেট পর্যন্ত এগিয়ে আসল ছাতা হাতে। ছাতা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

– ‘ভিজবেন না। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। জ্বর চলে আসবে।’
– ‘ধন্যবাদ।’
আমি ছাতা টিপ দিয়ে খুলে ফেললাম। নাদিয়া খানম বলল,
– ‘আপনি কী আতিউল হকের বাসায় যাচ্ছেন?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘কিছু পাবেন বলে মনে হয় না।’
– ‘সবসময় পাবার জন্যই যেতে হবে তা নয়। মানুষের সাথে কথা বললেও অনেক কিছু জানা যায়।’
– ‘গুড লাক প্রফেসর।’

আমি পথে নামলাম। ঝড়ের সময় রিক্সাওয়ালারা রিক্সার হুড তুলে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। আমার উদ্দেশ্য রিক্সা নেওয়া নয়। গন্তব্য রাস্তার উল্টদিকে সাদা রঙের বাড়ি। বাড়ির মালিক আতিউল হক। হাসান মাহমুদের মৃত্যুর প্রধান আসামী। আকস্মিক কারেন্ট চলে গেল। কারেন্ট না থাকায় কলিং বেল বন্ধ। আমি দরজায় ধুপধাপ করে অনেকবার ধাক্কালাম। কেউ দরজা খুলছে না। দরজায় পিপহোল। পিপহোল থেকে উজ্জ্বল আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে। সম্ভবত আইপিএসে ভেতরে আলো জ্বলছে। দশমিনিট পর পিপহোলের আলো বন্ধ হয়ে গেল। কেউ একজন ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। খট করে শব্দ হল। আতিউল হক দাঁড়িয়ে আছেন। ঝড়বৃষ্টির সময় অপরিচিত অতিথি দেখে অবাক হয়েছেন। আমাকে দেখে ভ্রূ কুঁচকে বললেন,

– ‘আপনি কে?’
– ‘আমি পুলিশের লোক। দরজা থেকে সরুন।’
– ‘আপনার আইডি আছে?’ (তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে দরজা থেকে সরে গেলেন)
– ‘না।’
– ‘পুলিশের লোক বললেন।’
– ‘পুলিশ নই, পুলিশের সাথে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছি।’

আতিউল হক খানিকটা বিরক্ত হলেন। আমাকে বসতে বলে কোথায় যেন চলে গেলেন। বাসা ফাঁকা। একজন কাজের মহিলাকে দেখা গেল হাতে বিশাল সাইজের কয়েকটা থালাবাটি নিয়ে একটা ঘরে চলে গেলেন। মার্জিত চেহারা। চমৎকার পারফিউম শরীরে। চলে গেছে কিন্তু পারফিউমের গন্ধ যায়নি। মহিলার চলাফেরায় খানিকটা অস্থিরতা। আমার দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। আতিউল হক দশ মিনিট পর ফিরে এসে বললেন,

– ‘আপনার জন্য রান্না করতে বলা হয়েছে। আপনি ডিনার করবেন।’
– ‘ডিনার করা হবে না। আপনার স্ত্রী কোথায় গেছেন?’
– ‘বাসাতে আছে। ঘুমুচ্ছে।’
– ‘মিথ্যা বলার দরকার নেই। আপনার স্ত্রী কতদিন থেকে বাসায় নেই?’

আতিউল হকের চোখ বড় হয়ে গেল। আমি বললাম,

– ‘আপনার স্ত্রী নেই ব্যাপারটা ধরা খুব সহজ। আমি সোফার কুশনগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। সোফার পাশের অ্যাশট্রে। অ্যাশট্রে থেকে সিগারেটের ছাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।’
– ‘এটা দেখে ধরে ফেললেন?’
– ‘ব্যাপারটা তেমনই। যে বাড়িতে স্ত্রী থাকে সেখানকার বসার ঘরের কুশন এলোমেলো থাকবে না। চাইলে একজন স্বামী সিগারেট খেতে পারবে কিন্তু সিগারেটের অ্যাশট্রে থেকে বাইরে ছাই ফেলতে সে সচেতন থাকবে। আপনি সেটা করেননি। কয়েকটা সিগারেটের ফিল্টার মেঝেতে পড়ে আছে। একবার সিগারেট নেভাতে সোফার কাঠের হাতলে সিগারেটের আগুন পিষে নিভিয়েছেন। স্ত্রী থাকলে এই কাজটা করতেন না। যদি স্ত্রী অল্প সময়ের জন্য বাইরে যেত, তবুও করতেন না। সম্ভবত আপনার স্ত্রী রাগ করে একেবারেই চলে গেছে কিংবা আপনি মোটামুটি নিশ্চিত সে ফিরবে না।’

আতিউল হকের চোখ বড় থেকে ধীরেধীরে ছোট হয়ে গেল। সোফায় গা এলিয়ে দিলেন।

– ‘কেসটার পর সব বদলে গেছে। আমার স্ত্রীর ধারণা আমার সাথে ভদ্রমহিলার পরকীয়া চলছে।’
– ‘ব্যাপারটা কী মিথ্যা?’
– ‘সত্য-মিথ্যা মুখে বললে আপনারা গুরুত্ব দেন না। আপনারা প্রমাণ চান। আমি দুঃখিত! কোন প্রমাণ দিতে পারব না।’
– ‘আপনি আমাকে প্রথম থেকে ব্যাপারটা খুলে বলুন তো।’
– ‘অনেকবার বলেছি, আর বলতে চাই না। আপনি পুলিশের কনসালটেন্ট হলে আপনার কাছে মামলার কপি থাকার কথা। সেখানে সব আছে।’
– ‘তবুও বলুন। মামলায় সব উল্লেখ থাকে না। আপনি খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো বলবেন। কী করেছেন, কী করেননি সেগুলো মুখ্য নয়।’

আতিউল হক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আরেকবার উঠে গেলেন। ঘর থেকে চাঁদর পরে বাইরে আসলেন। ঝড়ের জন্য শীতশীত আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। তিনি বলতে শুরু করলেন,

– ‘আমি হাসান মাহমুদ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ভদ্রলোককে খুব যে চিনি, তাও না। আমার গেটের মুখোমুখি গেট, মাঝেমাঝে দেখা হত। উনি গাড়িতে থাকতেন। তাই কথা হয় না। একদিন হুট করে তার ঘর থেকে কান্নার শব্দ শুনলাম। মানুষ এত ভয়ানকভাবে কাঁদতে পারে, আমি কখনো বুঝতে পারিনি। ভদ্রমহিলাকে পাগলের মতো লাগছিল। আমি বেলকনি থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, তার চোখ বিস্ফোরিত। কিছু দেখে ভয় পেয়েছে। আমার ধারণা ভয়ংকর কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। তখন রাত তিনটা বাজে। আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। ঘরে আমার স্ত্রী ঘুমুচ্ছেন। ভদ্রমহিলার কান্না দেখে আমি ছুটে নেমে সেখানে যাই। শোবার ঘরের ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরে ছিলাম। তার দরজায় নক করতেই দরজা খুলে গেল। আমি যাবার সাথে সাথেই উনি আমার হাত চেপে ধরলেন। টেনে নিয়ে গেলেন শোবার ঘরে। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। ভদ্রমহিলার স্বামী বিছানায় শুয়ে আছেন। একদম শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছেন না। আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একবার এক রিলিফের কাজে আমাকে কিছু বেসিক মেডিকেল ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। কীভাবে CPR দিতে হয়ে শিখেছি। আমি মাথার নিচ থেকে বালিশটা সরালাম। যেন ব্রেইনে ব্লাড সাপ্লাই বেড়ে যায়। CPR দিতে শুরু করব ঘটনা ঘটল তখনই। দরজা খুলে কিছু পুলিশ চলে আসল। ভদ্রমহিলা আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উনি আমার স্বামীকে খুন করেছে। পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। হাজতে তিনদিন থাকলাম। এরপর জেলে। অনেক ঝামেলা করে ছয়মাস পর আজ গত সপ্তাহে জামিন পেয়েছি।’
– ‘আপনি খুন করেননি?’
– ‘না।’
– ‘আপনি খুন করেননি?’
– ‘বললাম তো না।’
– ‘আপনি খুন করেছেন।’

আতিউল হক রেগে গেলেন। চোখমুখ লাল হয়ে গেল। কপালের শিরা দপদপ করছে। মানুষ রেগে গেলে এত ভয়ংকরদর্শন হতে পারে, আমি খুব কম দেখেছি। আতিউল হকের রাগ কমে গেল। খানিকটা বিরক্ত হয়ে তাকালেন। সিগারেট ধরালেন। তার হাত কাঁপছে। বেলকনি থেকে মৃদু বাতাস আসছে। বাতাসে ছাই উড়ে যাচ্ছে।

– ‘আমার প্রশ্ন শেষ।
– ‘কী পেলেন?’
– ‘আপনার খুনি হবার সম্ভাবনা বেশি। আমার কাজ সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করা। আপনি মিথ্যা বলেন।’

আতিউল হক কী বুঝলেন ধরা গেল না। আমার দিকে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন। আমি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম, ‘আপনার স্ত্রীর ছবিটা দেখান তো।’ আতিউল হক বিরক্ত হয়ে শোবার ঘরে গেলেন। অনিচ্ছাবশত একটা অ্যালবাম এনে আমার হাতে দিলেন। এ যুগে ছবির অ্যালবাম খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু আতিউল হকের অ্যালবাম দেখেই মনে হলো তাদের ছবি সংগ্রহ করে রাখবার বাতিক আছে। অ্যালবামের কাভার কাঠের তৈরি। ভেতরে প্রত্যেক পাতায় নানা ধরণের সৌখিন কারুকার্য করা। ময়ুরের পাখা থেকে শুরু করে হাতির দাঁতের সুক্ষ্ম জিনিস দিয়ে পাতাগুলো সাজানো। আতিউল হকের ছবিতে প্রথম যে ব্যাপারটা বিচিত্র সেটা হলো তিনি অত্যন্ত সুদর্শন। তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়। গায়ের বঙ শ্যামলা। আকর্ষন করবার মত তেমন কিছু নেই। কিন্তু কোথাও একটা সুক্ষ্ম ব্যাপার আছে যেটা দেখলেই মনে হয় তিনি স্ত্রীকে অসম্ভব পরিমাণ ভালোবাসেন। সব ছবিতেই তাদের দন্তবিকশিত হাসি। যেকোন মানুষ দেখলেই প্রথম দর্শনেই দু’জনকেই ভালোবেসে ফেলবে।

– ‘আপনার বেলকনিটা কোথায়?’
– ‘কোন বেলকনি? বাসায় তিনদিকেই তিনটা বেলকনি আছে।’
– ‘যেখান থেকে নাদিয়া খানমের বাসা দেখা যায়।’
আতিউল হক বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি পিছুপিছু তার বেলকনিতে গেলাম। বেলকনিতে মুখোমুখি দুটো ইজিচেয়ার। দেয়ালের প্রান্ত ধরে ভর্তি অর্কিডের টব। গ্রীলে দুষ্প্রাপ্য লতানো গাছের সমাহার। এ বাড়িতে একজন মায়াবতী থাকতেন সেটার উপস্থিতি সহজেই ধরা যায়।
– ‘আপনারা স্বামী স্তী এখানে বসতেন?’
– ‘হ্যাঁ। প্রায় বিকেলে আমরা রিক্সায় উঠে ঘুরতে বের হতাম। বাসায় ফিরে ডিনার করে এখানে বসতাম।’

বেলকনি থেকে নাদিয়া খানমের বেডরুমের পাশের বেলকনি দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার বেলকনি। বেলকনিতে একটা কাচ দিয়ে বেডরুম আলাদা করা। বেডরুমের ভেতর থেকে আলো আসছে।

– ‘আপনি বললেন, ঘটনার দিন তাকে এখান থেকে দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’
– ‘উনি বেলকনিতে এসেছিলেন।’
– ‘স্বামীর মৃত্যুর পর কেউ বেলকনিতে আসবে না। দরজা খুলে সবাইকে ডাকবে।’
আতিউল হক কিছু বললেন না। তাকে বিব্রত মনে হচ্ছে।
আতিউল হকের বাসা ছাড়ার সময় রাত দশটা বাজে। তিনি দরজা পর্যন্ত অনিচ্ছা স্বত্বে এগিয়ে আসলেন। হাতে সিগারেট। আঙুল এখনো কাঁপছে।
– ‘কিছু পেলেন?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘কী পেলেন?’
– ‘আপনি আপনার স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসেন। কিন্তু তার সাথে প্রতারণা করছেন।’
আতিকুল হকের হাত থেকে সিগারেট পড়ে গেল। পাপোশের উপর থেকে জুতোর তলা দিয়ে নিভিয়ে বললেন,
– ‘মানে?’
– ‘কাজের মহিলার সাথে আপনার শারিরীক সম্পর্কের ব্যাপারটা জানলে আপনার স্ত্রী কষ্ট পাবে।’
আতিউল হকের চোখ বিস্ফোরিত হবে হবে অবস্থা। কোনোমতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললেন,
– ‘কীভাবে বুঝলেন?’
– ‘আপনার কাজের মহিলা যখন বসার ঘর দিয়ে রান্নাঘরে যায় তখন তার চুল থেকে একটা সুগন্ধ আসছিল। আপনার বাথরুমে রাখা শ্যাম্পুর গন্ধ। তার মানে তিনি সেই শ্যাম্পু মাথায় ব্যবহার করেছেন।’
– ‘সে নিজের বাসাতেও তো সেটা ব্যবহার করতে পারে।’
– ‘তবে এত তীব্র গন্ধ থাকবে না। আপনি কয়েকদিন গোসল করেননি। আপনার ঠোঁটের কিনারা ঘেষে নিকোটিনের সোনালি রস ভরে আছে। কিন্তু আপনার বেডরুমের গোসলখানার আয়নায় কুয়াশার মত পানি জমে আছে। কিছুক্ষণ আগেও কেউ একজন সেই বাথরুমে গোসল করেছে। আপনি চাইলে আমি প্রমাণ করে দিতে পারি।’
– ‘কীভাবে?’
– ‘আপনার গোসলখানায় গেলে ফ্লোরে কিছু চুল পাওয়া যাবে। যেগুলো আপনার স্ত্রীর নয়। মহিলামানুষ গোসল করলে টাইলসে সবসময় দুয়েকটা চুল পড়ে থাকে।’

আতিউল হক কথা বললেন না। আমি তাকে পেছনে রেখে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলাম।

(৩)

দরজায় নক করতে হল না। দাঁড়ানোর সাথে সাথে আলিবাবার দরজার মত খুলে গেল। নাদিয়া খানম দরজা খুলে বললেন,
– ‘আপনি তো ভিজে গেছেন।’
– ‘হ্যাঁ, দয়া করে একটা তোয়ালে দিতে পারবেন?’
– ‘আপনি বসুন। দিচ্ছি।’
– ‘না, আমি গোসল করব। আপনার স্বামীর গায়ের মাপের সাথে আমার মিল আছে। একটা পাঞ্জাবী বের করুন। গোসলের পর পরব। আপনার বেডরুমের গোসলখানাটা ব্যবহার করা যাবে?’

নাদিয়া খানম হাসলেন। এত চমৎকার হাসি দেখার সৌভাগ্য খুব বেশি হয় না। সাদা পাঞ্জাবী পরে সোফায় আরাম করে বসে আছি। নাদিয়া খানম কফি বানিয়ে এনেছেন। তার হাতে সিগারেটের প্যাকেট। তিনি বললেন, ‘হাসান সিগারেট খেত। আপনি চাইলে নিতে পারেন।’ আমি সিগারেট ধরালাম। দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লাম। আমি বললাম,

– ‘আপনি কীভাবে জানতেন আমি আবার আসব? দরজায় নক করতে হয়নি। আপনি দরজা খুলে অপেক্ষা করছিলেন।’
– ‘আপনি শুরুতেই আমাকে বোকা বলে ধরে নিয়েছেন। এটা আপনার দোষ না। অধিকাংশদের ধারণা রূপবতীরা একটু বোকাসোকা হয়।’
– ‘আমার তেমন ধারণা নেই। কীভাবে বুঝলেন?’
– ‘ছাতা দেবার সময় আপনি স্বেচ্ছায় নিলেন। না করলেন না। তার মানে আপনি দ্রুত এই বাসাতে ফিরবেন। তখন ছাতা ফেরত দিবেন।’
– ‘অন্য কোনো কৌশল আছে?’
– ‘না।’
– ‘আমার ধারণা আপনি অন্ধকার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে ফিরতে দেখে দরজা খুলে অপেক্ষা করছিলেন। রাস্তার ওপাশের বেলকনি আপনার এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি কি প্রতি রাতেই বেলকনিতে নজর রাখেন?’
– ‘না।’
– ‘আপনার তো ইনসমনিয়া আছে। ইনসমনিয়ার সময় আপনি কফিমগ হাতে নিয়ে বেলকনিতে বসে থাকেন। চেয়ারের পাশের টেবিলে কফির দাগ আছে। কিন্তু কোন বই নেই। সময় কাটানোর জন্য আশেপাশে তাকানো খুব অস্বাভাবিক নয়।’
– ‘আপনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাপারে বলতে চাচ্ছেন?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘কী সেটা?’
– ‘এটার উত্তর আপনার বেডরুমের দেয়ালের ছবি দুটোতেই আছে।’
– ‘কী উত্তর?’
– ‘প্রথম ছবিতে আপনারা পাশাপাশি দাঁড়ানো। একজন সুখী দম্পতির প্রতিচ্ছবি। পাশের ছবিটায় আপনি তার দিকে খানিকটা হেলে আছেন। এর অর্থ আপনি আপনার স্বামীকে ভালোবাসেন। আপনার স্বামী কিন্তু সীনা টান করে দাঁড়ানো। তিনি চাইলেই আপনার দিকে খানিকটা বাঁকা হয়ে দাঁড়াতে পারত। সেটা করেনি। একটা হাত বাড়িয়ে আপনাকে ধরতে পারত। তাও করেনি। তার এক হাত পকেটে। আরেক হাত কোর্টের বোতামের উপর। এমন রূপবতী স্ত্রীর প্রতি তার ভ্রুক্ষেপ নেই। কেন? হতে পারে তিনি আপনার প্রতি ততটা প্রকাশ্য টান অনুভব করেন না কিংবা নার্সিসিস্ট। নার্সিসিস্টরা নিজেকে কতটা সুন্দর দেখানো যায় সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পাশেরজনকে নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা থাকে না।’
– ‘হাসান নার্সিসিট ছিল?’
– ‘ছবি তাই বলছে। তবে আরেকটা ব্যাপার আছে।’
– ‘কী?’
– ‘তিনি পুলিশের উঁচুপদের লোক। খুব বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। পুলিশের স্ত্রীদের একটা দুর্ভাগ্য হলো তারা স্বামীদের সাথে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারে না। আপনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আপনি তার অপেক্ষায় থাকেন। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হন। তিনি দেরি করে ফেরেন। আপনি অপেক্ষা করেন। ফলে একটা সময় অভ্যাস হতে হতে আপনার মাঝে ইনসমনিয়া ভর করল। আপনি অপেক্ষায় অপেক্ষায় রাত জেগে থাকেন। বেলকনিতে বসে অন্য বেলকনির দিকে খেয়াল করেন। শুরুতে হয়তো অনিচ্ছাকৃত ছিল। কিন্তু পরে অভ্যাস হয়ে যায়।’

নাদিয়া খানম তীক্ষ্ম চোখে তাকালেন। বিরক্তির স্বরে বললেন,
– ‘কেন তাকিয়ে থাকব?’
– ‘কারণ অন্য বেলকনিতে একজন মানুষ বসে থাকেন। তার স্ত্রী তার সাথে গভীররাত পর্যন্ত গল্পগুজব করে।’
– ‘কেউ গভীররাত পর্যন্ত গল্পগুজব করলে আমার কী?’
– ‘আপনার কিছু নয়। সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারটা এখানে এসেই জটিলতা ধারণ করে। আপনি খেয়াল করলেন, অন্য বেলকনিতে বসে থাকা নারীটি আপনার মত রূপবতী নয়। আকর্ষনীয় নয়। কিন্তু একজন সুদর্শন মানুষ সেই আকর্ষণহীন, খানিকটা কম রূপবতী নারীকে নিয়েও চমৎকার সময় কাটাচ্ছে। বিকেলে রিক্সায় উঠে ঘুরতে যাচ্ছে। ফলে আপনার মধ্যে একটা তীব্র অভাববোধ তৈরি হয়।’
– ‘আমার স্বামীও তো সুদর্শন। অভাববোধ হবে কেন?’
– ‘এই অভাববোধ শারীরিক নয়, মানসিক। আপনারও ইচ্ছা করে চমৎকার সময় কাটাতে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। হাসান সাহেব ব্যস্ত। এতটাই ব্যস্ত আপনাকে সময়ই দিতে পারছে না। এসময় দুটো ঘটনা ঘটতে পারে।’
– ‘কী ঘটনা?’
– ‘আপনার মধ্যে অন্য বেলকনির মানুষদের জন্য তীব্র পরশ্রীকাতরতা তৈরি হয়। আতিউল হক মানুষটাকে আপনি ঘৃনা করতে শুরু করেন। একই সাথে আপনার স্বামীর প্রতি তীব্র অভিমান কাজ করতে শুরু করে।’
– ‘এগুলো কি আপনার মনগড়া যুক্তি?’
– ‘যুক্তি কখনো মনগড়া হয় না। যুক্তি হয় সত্যের চেয়েও শক্ত।’
– ‘শক্ত যুক্তিটা কী?’
– ‘মানবজাতির বড় দুর্বলতা হলো তারা প্রতিশোধপরায়ণ। অভিমান আর তীব্র অভাববোধ থেকে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতিশোধ নিবেন। অবহেলা আর পাশের বেলকনির দম্পতির প্রতি তীব্র ঘৃণা একইসাথে শেষ করবেন। ফলে আপনার ক্লান্ত স্বামী ঘরে ফেরার পর আপনি তাকে খাবারের সাথে ঘুমের ঔষুধ দিলেন। যেহেতু আপনার ঘরেই ঘুমের ঔষুধ আছে তাই ব্যাপারটা খুব কঠিন ছিল না।’
– ‘ঘুমের ঔষুধে আমার তো ঘুমই আসে না। তাকে খেতে দিলে লাভ কী?’
– ‘আমি আপনার ঔষুধের নাম দেখেছি। মিডাজোলাম। মিডাজোলামের ইফেক্ট খুবই শক্তিশালী। চারপাঁচটা একসাথে খেলে যেকোন শক্তসামর্থ্যবান পুরুষ মানুষও মরার মতো ঘুমুবে। আপনি এই সুযোগে প্রবল অভিমান নিয়ে স্বামীর মুখে বালিশ চেপে ধরেন। একজন ক্লান্ত এবং মিডাজোলাম ইনডিউসড ব্যক্তি চাইলেও আপনার শক্তির সাথে পেরে উঠবে না। একসময় সে মারা যায়।’

নাদিয়া খানম রেগে বললেন,
– ‘লজিক ভুলভাল হচ্ছে না?’
– ‘না। লজিক ঠিক পথেই আছে। সমস্যা হল লজিক্যাল ব্যাপার সত্য হলেও আমি প্রমাণ করতে পারব না। আপনি পার পেয়ে যেতে পারেন। আতিউল হকের মতো মানুষ পার পায় না।’
– ‘আতিউল হক পার পাবে কেন? তাকে আপনার নিষ্পাপ মনে হচ্ছে?’
– ‘নিষ্পাপ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই। নিষ্পাপ টুনটুনি পাখিও ঘরে ঢুকে খাবার চুরি করে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আতিউল হকের কোন দোষ নেই।’
– ‘কেন?’
‘কারণ আপনি তাকে আপনার বাসায় আনতে প্রলুব্ধ করেছেন। সম্ভবত আতিউল হক সে রাতে বেলকনিতে বসে ছিল। একা। তার স্ত্রী ঘরে ঘুমুচ্ছিল। আপনি যখন বেলকনিতে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন, কাঁদছিলেন, সেটা তিনি দেখে ফেলেন। তার ধারণা আপনি বিপদে পড়েছেন। সে দ্রুত চলে আসে। যেহেতু তার স্ত্রী ঘুমন্ত ছিল, তাই আপনার ব্যাপারটা তাকে বিস্তারিত না জানিয়েই চলে আসে। রাতের পোশাক আর আপনার মত রূপবতী মানুষের মুখের কথা যেকোন নারীকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে। এ কারণে ঘটনার পর তার স্ত্রী চলে যায়। আতিউল হক ঘরে এসে দেখে আপনার স্বামী মৃত। আপনি যে বালিশ তার মাথার নিচে দিয়েছিলেন সে সেটা সরিয়ে হাতে নেয়। কারণ CPR দিতে হলে মাথার নিচে বালিশ রাখা যাবে না। পাকেচক্রে পুলিশ তখনই চলে আসে। তার হাতে বালিশ অবস্থায় গ্রেফতার করে। আপনার কান্না আর স্বাক্ষ্য খুব সহজেই পুলিশকে প্রভাবিত করে।’

নাদিয়া খানম নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি প্রথমবার সময় নিয়ে তার চোখের দিকে তাকালাম। ব্যাখ্যাতীত সুন্দর চোখ। কিন্তু চোখের গভীরতাটা এখন নেই। আমি উঠে দাঁড়ালাম। নাদিয়া খানম ধরা গলায় বললেন,

– ‘চলে যাবেন?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘আরেকটু বসুন।’
– ‘বসার মত সময় হাতে নেই। অনেক রাত হয়েছে।’
– ‘ঝড় এখনো থামেনি।’
– ‘তবুও যেতে হবে।’

নাদিয়া খানম মাথা নিচু করে মুখ চেপে ধরলেন। তার শরীর কাঁপছে। একটা ভয়ংকর কান্না চেপে রাখা ছিল। অপরাধবোধের কান্না।

পরিশিষ্টঃ প্রবল ঝড় মাথায় নিয়ে প্রফেসর নাজিব পথে নামলেন। নাদিয়া খানম নিঃশব্দে পাশাপাশি হেঁটে আসলেন গেট পর্যন্ত। ছাতা বাড়িয়ে বললেন,

– ‘নিয়ে যান।’
প্রফেসর খানিকটা লজ্জা পেলেন।
– ‘ফেরত দেবার সুযোগ হবে না।’
– ‘দিতে হবে না। রেখে দিন।’
– ‘তা অবশ্য করা যায়। আপনার স্বামীর পাঞ্জাবী পাজামাও পরে আছি। এটাও নিয়ে যেতে হবে।’

নাদিয়া খানম জবাব দিলেন না। প্রফেসর পথে নামলেন। রাস্তা ফাঁকা। রিক্সাওয়ালারা ঘরে ফিরে গেছে। ঝড়ের বেগ বেড়েছে। ছাতা কোনোভাবেই ধরে রাখা যাচ্ছে না। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এখনো জ্বলছে। প্রবল ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একজন মানুষ রাজপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন। দূরে পেছনে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে একজন অস্বাভাবিক রূপবতী নারী তাকিয়ে আছেন। তার চোখভরা জল। জলের কারণে সবকিছু ঝাপসা দেখাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে- রাজপথ ধরে হাসান মাহমুদ নামক একজন মানুষ পাঞ্জাবী পাজামা পরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে করছে হাসান বলে ডাক দিতে। কিন্তু দিতে পারলেন না। কারণ তিনি জানেন, হাসান নামক মানুষটি আর ঘরে ফিরবে না। ঘরে ফিরবার সকল গল্প সাঙ্গ হয়েছে।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button