ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আমাদের আয়নায় কেবল শকুনেরা ডানা ঝাপটায়…

গত পরশু থেকে যে মানুষটার বিরুদ্ধে অনলাইনের উগ্র ধর্মান্ধরা নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছড়িয়ে গেল, সেই মানুষটাই কাল নিজে গিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন সন্দেহভাজন আচরণে আটক হওয়া সেই তরুণকে। ছাড়া পেয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেছেন, ‘জাফর স্যারের কক্ষে একটা ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছিল। আমি স্যারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ভুলটা আমারই ছিল। স্যার অনেক বড় মাপের মানুষ, আমি ঘটনার জন্য স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। স্যার যেন আমার জন্য দোয়া করেন। উনি ভালো থাকুন, এটাই আমার চাওয়া। উনাদের মতো মানুষ দেশের দরকার।’ রাকিব আরও বলেন, ‘স্যার নিজে থানায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। পরে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

এরপর গতকাল রাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্ত্তী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে পুরো ঘটনাটা বিস্তারিত জানান। পাঠকদের জন্য তার সেই লেখাটি তুলে ধরা হলোঃ

আমি ভেবেছিলাম এই বিষয়ে কিছু লিখব না কিন্তু অনেকটা বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। গতকাল (৭ই মে) দুপুর ২টা বাজার কিছুক্ষণ আগে জাফর স্যারের রুমে একটি ছেলে আসে গল্প করতে, কথা বলতে বলতে এক সময় ছেলেটা স্যারের কাছে জানতে চায় যে স্যার নামাজ পড়েন কিনা বা কেন নামাজ পড়েন না । ২টার সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মডারেশন থাকায় এবং ছেলেটার তর্কে কিছুটা বিরক্ত হয়ে স্যার পুলিশকে বলেন ছেলেটিকে রুম থেকে বের করে দিতে, এরপর স্যার মডারেশন বোর্ডে চলে যান ।

পুলিশের কাছে ছেলেটির আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়, তারা ছেলেটিকে জালালাবাদ থানায় নিয়ে যায় । স্যার ব্যাপারটা জানার পর পুলিশকে বেশ কয়েকবার কল করে ছেলেটিকে ছেড়ে দিতে বলেন । আজ (৮ মে) সকালে স্যার যখন জানতে পারেন ছেলেটিকে এখনও ছাড়া হয়নি তখন স্যার নিজেই থানায় যান এবং ছেলেটিকে বেলা ১১টার দিকে ছাড়ায় নিয়ে আসেন ।

জাফর ইকবাল, মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার জীবনী, জাফর ইকবাল হামলা, জাফর ইকবাল নাস্তিক

পুরো ঘটনাটা তাহলে কি দাঁড়াল? জাফর ইকবাল স্যারের সাথে কথা বলতে এসে তাকে বিরক্ত করছিল এই ছেলেটা এবং এক পর্যায়ে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং উদ্ভট এক প্রশ্ন করে বসে সে। এদিকে স্যারের মডারেশন বোর্ডে যাওয়ার তাড়া থাকায় তিনি পুলিশকে বলেন ছেলেটিকে রুম থেকে বের করে দিতে। তিনি কিন্তু একবারও পুলিশকে বলেননি যে ছেলেটাকে গ্রেফতার করতে হবে। তার আচরণে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং সে যে তার পরিচয় গোপন করে স্যারের রুমে ঢুকেছিল, এটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তার আচরণ ও কথাবার্তা অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয় তার সত্যিকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য।

খুব ঠাণ্ডা মাথায় খেয়াল করুন, এই পুরো সময়টায় কিন্তু স্যার একবারও এই ছেলেটার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনেননি, বরং যখন শুনলেন, পুলিশ ছেলেটাকে জালালাবাদ থানায় নিয়ে গেছে, সাথে সাথে তিনি থানায় ফোন করে ছেলেটাকে ছেড়ে দিতে বলেছেন। একবার না, বেশ কয়েকবার! কারণ, তিনি তো তখনো জানেন না যে ছেলেটা তার ভুয়া পরিচয়ে তার রুমে ঢুকেছিল, ব্যস্ততা থাকায় আর ছেলেটার উদ্ভট ও আপত্তিকর প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি ঠিকই, কিন্তু সেটা ভুলে গেছেন একটু পরেই! বরং ছেলেটার জন্য দুশ্চিন্তা করছিলেন জাফর ইকবাল স্যার, তাই গতকাল ৮ই মে সকালে যখন জানতে পারলেন যে ছেলেটাকে এখনো ছাড়া হয়নি, সাথে সাথে নিজেই গেলেন থানায় এবং ১১টা নাগাদ ছেলেটাকে ছাড়িয়ে আনলেন।

অথচ এই পুরো ঘটনাটা যুগান্তর পত্রিকা কি শিরোনামে এবং কি ভাষায় ছেপেছিল, মনে আছে? তারা শিরোনাম করেছিল, “জাফর ইকবালকে নামাজের কথা বলায় যুবক আটক”! খবরটা তারা সাজিয়েছিল এভাবে যে ছেলেটা নাকি ঘরে ঢুকেই জাফর ইকবাল স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, স্যার আপনি কি নামাজ পড়েন? এটা শুনেই নাকি জাফর ইকবাল স্যার ওই তরুণকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। কি, শুনতে খুব অদ্ভুত লাগছে না?

আসুন এবার আরো অসাধারণ আরেকটা ভার্সন শোনাই এই গল্পের। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র যুগান্তরের জাফর ইকবাল স্যারকে সরাসরি ব্লেইম করে যখন এমন জঘন্য নির্লজ্জ হলদে সংবাদ ছাপলো, তারপর এর দেখাদেখি বাংলা রিপোর্ট, টেলিগ্রাফসহ কয়েকটা আরো অসংখ্য ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টাল স্রেফ কিছু ক্লিকবেইটের লোভে এই সংবাদই কপি পেস্ট করে ছড়িয়ে দিতে লাগলো।

আর এতে নতুন মাত্রা যোগ হলো  রাজাকার আলবদরদের মুখপাত্র বাঁশেরকেল্লাসহ উগ্র ধর্মান্ধ পেইজগুলো যখন এই সংবাদটা নিয়ে মিথ্যাচারে নামলো তখন। এই উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী চক্র পরিকল্পিতভাবে যে মিথ্যাচারটা ছড়ালো , সেটা হচ্ছে ওই তরুণ নাকি জাফর ইকবাল স্যারের রুমে যাওয়ার পর আজান হয়, সেই আজান শোনার পর নাকি ওই তরুণ একজন মুসলমান হিসেবে জাফর ইকবাল স্যারকে প্রশ্ন করে, তিনি নামাজ পড়েন কিনা। আর জাফর ইকবাল স্যার নাকি এই প্রশ্ন শুনে ওই তরুণকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। কি সুক্ষ পাকা হাতের মিথ্যাচার, খেয়াল করেছেন? প্রথমে মিডিয়া অ্যাসাসিনেশনে তাকে দিয়ে ছেলেটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তারপর সেই মিথ্যাচারটাকেই আরেকটু রং-চং ছড়িয়ে পরিবেশন করা হলো এভাবে যে আজান শুনে নামাজের কথা জিজ্ঞেস করায় পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে জাফর ইকবাল। ব্যাস, আর কি লাগে? কোপা এইবার শালা নাস্তিকরে, কত বড় সাহস নামাজের কথা বললে পুলিশে ধরায়ে দেয়!

আচ্ছা, গতকাল থেকে এই যে এরা জাফর ইকবাল স্যারের উপর আবার হামলা চালানোর এমন ভয়ংকর সব উসকানি দিয়ে গেল, এদের উসকানিতে কমেন্টবক্সে অসংখ্য পটেনশিয়াল জঙ্গী স্যারকে কুপিয়ে মারা ওয়াজিব বলে যে নির্লজ্জ ফতোয়াবাজি করে গেল, হুমকি দিয়ে গেল, এরা কি চোখে দেখে না? একদিকে জাফর ইকবাল স্যার ছেলেটাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে ছুটছেন, ঠিক সেই মুহুর্তে  বাঁশেরকেল্লার মত উগ্র ধর্মান্ধ পেইজ থেকে স্যারের উপর হামলা করবার উসকানি দিয়ে ভয়াবহ মিথ্যাচার ছড়ানো হচ্ছে! অথচ এরা কেউ ওই ছেলেটা নিজের মুখে পুরো ঘটনাটা বলার পরেও এই ডাহা মিথ্যাচার ছড়ানোর জন্য অনুতপ্ত হবে না, অন্তত একটাবারের জন্য হলেও সঠিক সত্যটা লিখবে না। কারণ তাতে তাদের ওয়াল জুড়ে উগ্র জঙ্গীবাদের যে চাষাবাদ হয়, সেটা ব্যাহত হবে। শত হলেও স্বাধীনতাবিরোধী এই বেঈমান মুনাফেকগুলো সত্যটা একেবারেই সহ্য করতে পারে না।

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, জাফর ইকবাল হত্যাচেষ্টা

আচ্ছা, ওদের কথা বাদ দিলাম, এই যে দেশের প্রথম সারির পত্রিকা যুগান্তর থেকে শুরু অজস্র অনলাইন পোর্টালগুলো, যারা গতকাল আসল সত্যটা জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই স্রেফ কিছু ক্লিকবেইট আর শেয়ারের লোভে এই বানোয়াট গল্প শেয়ার দিয়ে উগ্র ধর্মান্ধদের হাতে জাফর ইকবাল স্যারকে হুমকি দেওয়া আর গালাগালির সুযোগ সৃষ্টি করলো, আমাদের সবাইকে বিভ্রান্ত করে অন্ধকারে রেখে দিল, এই নির্লজ্জ ভয়ংকর অপরাধের জন্য কতজন ক্ষমা চেয়েছে? আদৌ কি কেউ চেয়েছে? এ কেমন সাংবাদিকতা? এ কেমন নির্লজ্জতা? মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো একজন মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে কোন ধরণের সাংবাদিকতা?

জাতি হিসেবে আর কত নীচে নামব আমরা? সংবাদপত্র নাকি একটা জাতির আয়না! হায়, আমাদের আয়নায় কেবল শকুনেরা ডানা ঝাপটায়!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button