অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

১ টাকায় বিদেশি ভাষা শেখার ক্লাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যতিক্রমী এক পাঠশালা!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণ কিংবা কর্মকাণ্ডের কথা আপনি হয়ত শুনে থাকবেন। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন স্রোতের বিপরীতে কিছু শিক্ষার্থী, যারা প্রগতির ধারক, সংস্কৃতির বাহক, ভিন্ন ভাবনায় স্বকীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলা হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুম থেকেও বেশি শেখা যায় এই গোটা ক্যাম্পাসে আড্ডা দিলে, হাঁটলে। কথাটা এক দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক। সেটা টের পাবেন, এখানে কোনো আড্ডায় অংশ নিলে। আড্ডারও অনেক রকমফের আছে। এই যেমন আপনি যদি শুক্র বা সোমবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের ওদিকটায় যান, দেখবেন একদল শিক্ষার্থী সমবেত হয়েছে।

কেন? তারা একত্রিত হয়েছেন ভাষা শিক্ষার জন্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে চালু হয়েছে প্রায় বিনামূল্যে বিদেশী ভাষা শিখানো কার্যক্রম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টার নামক সংগঠনটি ইংরেজি সহ ৮টি বিদেশী ভাষা ছাত্রছাত্রীদের শেখাচ্ছে!

ছয়মাসের একেকটা কোর্স। ৩০টা ক্লাস হবে। কোর্সে নিবন্ধন ফি মাত্র ৩০ টাকা মানে প্রতি ক্লাসের ফি ১ টাকা! ছয়মাস পর উর্ত্তীণ হলে বিনামূল্যে আরো ৬ মাসের কোর্সে যুক্ত হওয়া যাবে।

সংগঠনের উদ্যোক্তা ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তার বয়সী অন্যান্য ছাত্ররা যখন ভাবছে নিশ্চিত কোনো চাকুরিজীবনের কথা, তিনি স্বপ্ন দেখছেন একটু স্বতন্ত্র রকমে বাঁচার। ফেসবুকে পোস্ট করলেন, কারা ভিনদেশী ভাষা শিখতে চায়, শেখাতে চায়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন আগ্রহী মানুষ সীমাহীন। সেই পোস্টে কমেন্ট এসেছে দেড়হাজারেরও অধিক।

ইসমাইল হোসেন সিরাজী উদ্যম নিয়ে শুরু করলেন এই উদ্যোগ। তার ইচ্ছে যা শিখেছেন, তা ছড়িয়ে দিবেন সবার মধ্যে। এই যে ৩০ টাকা নামমাত্র নিবন্ধন ফি এটাও ব্যয় হয় মূলত বোর্ড, মার্কারের পেছনে। তিনি ভাষা শিক্ষার এই কার্যক্রমকে বাণিজ্যিক করতে চান না। অথচ, হাজারের মতো শিক্ষার্থী এখন যুক্ত হয়েছে মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারের সাথে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শিক্ষা

ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সাথে মহৎপ্রাণ আরো ন-দশজন একত্রিত হয়েছেন। তারাও ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় দক্ষ, এবং তাদের অর্জিত জ্ঞানকে তারা বিলিয়ে দিতে চান সবার মধ্যে। এই সময়ে এসে একটি বাড়তি ভাষা জানাটাকে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

বাড়তি ভাষা জানাটা নিজের জন্যে তো বটেই, চাকরির বাজারেও একটু আলাদা ভাবে দৃষ্টি কাড়তে সাহায্য করে। দোভাষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভলান্টিয়ার হিসেবে, প্রতিনিধি হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে এডভান্টেজ পাওয়া যায়। এরকম বাস্তবতায় মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারকে অসামান্য উদ্যোগ বলতেই হয়।

অনেকেই জানেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউট আছে। চীনা ভাষার জন্যে আছে কনফুসিয়াস সেন্টার। সেখানে অবশ্যই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করে এবং আসন খালি থাকা সাপেক্ষে ভর্তি হওয়ার সু্যোগ থাকে। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারে কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়া সবাই যুক্ত হতে পারেন। ভাষা শেখার যাত্রায় শামিল হতে পারেন। এক্ষেত্রে তারা যে পড়াশুনার ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেন সেসবের উৎস কি?

চীনা ভাষার ইনস্ট্রাক্টর সুমন। তিনি কনফুসিয়াস সেন্টার থেকে চীনা ভাষার প্রাথমিক অংশ শিখেছেন। সেই ম্যাটেরিয়াল কাজে লাগিয়ে এখন তিনি পড়াচ্ছেন আগ্রহীদের। এক্ষেত্রে কনফুসিয়াস সেন্টার থেকে তিনি অনুমতি নিয়েছেন এবং সেন্টারের পরিচালক খুব সানন্দেই রাজি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারে, ১ টাকায় ভাষা, বিদেশী ভাষা

অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের বই, নিজেদের নোট করা হাতে লেখা ভাষা শেখার ম্যাটেরিয়াল তারা ব্যবহার করে থাকেন মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টারে। তাদের জনপ্রিয়তা বোঝা যায়, তাদের সাথে যুক্ত হওয়া ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা দেখে। সিনেট ভবনের ওদিকটায় যেদিন ক্লাস হয়, সেদিন যেন একটা মোটামুটি মহাসভাই ঘটে যায়। হাজারো শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছে ভাষা শিক্ষার প্রয়াসে।

খোলা আকাশের নিচে আড্ডা দিতে দিতে, ভাই ব্রাদার বোন বন্ধু সবাই মিলে একটা ভাষা শিখে ফেলছে- এই দৃশ্য আবারো প্রমাণ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আড্ডা দিলেও শেখা যায় অনেক কিছু!

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button