ইনসাইড বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, বন্ধুত্ব, ট্যাংক আর চা-পাতার গল্প!

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫, রাত শেষ হয়ে আসছে প্রায়। ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে ঢোকার রাস্তাটার মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটা ট্যাংক। যদিও গোলাবারুদ নেই সেটায়, তবে এই গোপন তথ্য দুই-তিনজন মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার রাতে পুরো ঢাকা শহরে দানবের মতো পায়চারি করে বেড়িতেছিল যন্ত্রদানবগুলো, ঘড়ঘড় শব্দে কাঁপন তুলেছিল রাজধানীর রাজপথে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত পাঠিয়েছিলেন ট্যাংকগুলো, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে। সেই ট্যাংক বহর ব্যবহার করেই তার বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। আর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ট্যাংকের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে আরেকটা জিনিসের নামও, সেটা চা-পাতা।

শুরু থেকেই শুরু করা যাক। বাংলাদেশ চা উৎপাদন আর রপ্তানী করছে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই, তখনও এদেশে চা-বোর্ড ছিল। স্বাধীনতার পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন সেই বোর্ডের সভাপতি। তখনও এই দেশে তৈরি হওয়া চা-পাতা রপ্তানি করা হতো বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে, পরিমাণটা এখনকার মতো এত বৃহৎ ছিল না, এই আরকি।

১৯৭৩ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধ শুরু হলো, মুসলিম দেশগুলো নিজেদের সাধ্যমতো সেই যুদ্ধে সাহায্য করেছিল মিশরকে। বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশ, বিদ্ধ্বস্ত অবস্থা থেকে পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রাণপন। মিশরকে সাহায্য করাটা বাংলাদেশের জন্যে তখন বিলাসিতার শামিল, তাছাড়া আফ্রিকান এই দেশটাকে কিভাবে সাহায্য করা যায়? তখন তো আমাদের নিজেদেরই চরম অভাব!

তবে বঙ্গবন্ধু ভাবলেন, আমাদের যা আছে সেটা দিয়েই তাদের সাহায্য করা যাক। আর তাই বাংলাদেশ থেকে উন্নত মানের এক লক্ষ পাউন্ড চা-পাতা পাঠানো হলো মিশরের সেনাদের জন্যে। যুদ্ধক্ষেত্রে কখনও কখনও চা আর সিগারেটের চাহিদা ভাত-রুটির চেয়েও ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায়। মিশরীয় সৈন্যদের সেই চাহিদাটা পূরণ করেছিল বাংলাদেশ থেকে পাঠানো চা-পাতা। ‘ব্যাটেল অফ সিনাই’ নামে পরিচিত সেই যুদ্ধে ইজরাইলের কাছে হেরে গিয়েছিল মিশর, কিন্ত বাংলাদেশের এই বন্ধুবাৎসল্যের কথাটা ভোলেননি মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত।

কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মিশরের পক্ষ থেক্র বাংলাদেশকে উপহার দেয়া হয়েছিল বত্রিশটা টি-৫৪ ট্যাংক। চা-পাতার বদলে ট্যাংক দেয়াটা একটু বেশি আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ছিল হয়তো। তবে এই ট্যাংকগুলো দিয়ে বাংলাদেশ কি করবে, সেটা নিয়েও তখন প্রশ্ন উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী তাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের কি সত্যি কোনো ট্যাংকের দরকার আছে? এসব ট্যাংক দিয়ে মিলিটারি ক্যু ছাড়া আর কিছু হয় না- এরকম কথাও বলেছিলেন কেউ কেউ। কে জানতো, তাদের কথাটাই সত্যি হয়ে যাবে!

বঙ্গবন্ধু কিন্ত কারো কথায় পাত্তা দেননি তখন, বাঙালীদের ওপর ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। বাকীদের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এখন ওসব কথা রাখো। আনোয়ার সাদাত ট্যাংক অফার করেছেন, আমি তার অফার গ্রহণ করেছি। এখন সেগুলো নিতে অস্বীকার করা মানে তাকে অপমান করা। সেটা সম্ভব নয়।’

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর পর মিসরে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সে দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করতে গেলে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার প্রিয়বন্ধুকে হত্যা করলে! তাও আবার আমারই দেয়া ট্যাংক ব্যবহার করে! আমি নিজেকে এখন অভিশাপ দেই, কেন আমি তোমাদের ট্যাংক দিয়েছিলাম?’ ওই মূহুর্তে সেখানে উপস্থিত এক বাংলাদেশী কূটনীতিক তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘মিশরের প্রেসিডেন্টের কথা শুনে সেদিন লজ্জায় সবার মাথা কাটা যাচ্ছিল।’ কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, আনোয়ার সাদাতও হঠাৎ এক সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছিলেন!

গোলাবিহীন কয়েকটা ট্যাংক রাজপথে নামিয়েই তাণ্ডব চালিয়েছিল জানোয়ারের দল, আর তাদের ভয়ে রাষ্ট্রপিতাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি দুই-একজন সাহসী সন্তান ছাড়া আর কেউই। কে জানে, সেই চা-পাতার চালানটা মিশরে পাঠানো না হলে আনোয়ার সাদাত উপহার হিসেবে ট্যাংকগুলো পাঠাতেন না, আর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করাটাও ঘাতকদের জন্যে এমন ‘ইজি টাস্ক’- এ পরিণত হতো না…

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- কিশোর পাশা ইমন

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button