খেলা ও ধুলা

ক্রিকেটার মোশাররফ রুবেলের পাশে দাঁড়ান, প্লিজ…

বাইশ গজ একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে প্রিয় লড়াইক্ষেত্র। ছোটখাটো ইনজুরি যা-ই থাকুক, ক্রিকেটাররা বাইশ গজের মায়া থেকে বের হতে পারেন না। বার বার ফিরে আসতে চান সবুজ গালিচার মায়াময় জগতে। কিন্তু, কারো কারো জন্য লড়াইটা একটু বেশি পরীক্ষা নেয়। ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের এক্স ফ্যাক্টর যুবরাজ সিংয়ের জীবন যেমন। হুট করেই একদিন জানতে পারলেন শরীরে বাসা বেঁধেছে ভয়ংকর এক ব্যাধি ক্যান্সার। যুবরাজ অবশ্য ক্যান্সারকেও হার মানিয়েছেন। ফিরেছিলেন আবার মাঠে, বাইশ গজে।

এই সময়গুলো জীবনে অনেক পরীক্ষা নিয়ে আসে। অনেক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কারো কারো ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকে। লড়াইয়ে তারা পাশে পান অনেককেই৷ যুবরাজ যেমন পেয়েছিলেন, সেই বাজে সময়ে তাকে সমর্থন দিতে এগিয়ে এসেছিলেন অনেকেই। আমাদের মোশাররফ রুবেলের ভাগ্যে কি সেই সমর্থন জুটবে? বিশ্বাস রাখি, আমাদের মোশাররফ রুবেলও তার জীবনের এই দোদুল্যমান সময়টায় সমর্থন পাবেন, আর্থিক – মানসিক সবরকমেই।

মোশাররফ রুবেলের কথা একটু বলি।
তিনি জাতীয় দলে এসেছিলেন বেশ সম্ভাবনা নিয়েই, যদিও স্বপ্নের পাখা ওড়েনি, তাই ক্ষণস্থায়ী সময়ের জন্য আসা জাতীয় দলকে দীর্ঘমেয়াদি সার্ভিস দিতে পারেননি। বাঁহাতি এই স্পিনার জাতীয় দলের হয়ে পাঁচটি ওয়ানডে খেলেছেন। তবে তার ফার্স্ট ক্লাস রেকর্ড বেশ ভাল। ১১২ ম্যাচে উইকেটেত সংখ্যা চারশ ছুঁই ছুঁই, ৩৯২ উইকেটের মালিক তিনি ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে। ব্যাটিংটাও চলনসই, আছে দুইটি সেঞ্চুরি, ১৬টি হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড। বিপিএলেও খারাপ করেননি। স্বীকৃত টি টুয়েন্টি ক্রিকেটে ৫৬ ম্যাচ খেলে ৬০ উইকেট নিয়েছেন, ৬.৩৮ ইকোনমিতে।

মোশাররফ রুবেল

ক্রিকেটটাই তার একমাত্র আয়ের উৎস, ঘরোয়া লীগ খেলে যা আয় তা দিয়েই হয়ত মানুষটাকে চলতে হয়। জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটাররা যে সুযোগ সুবিধাগুলো পান, দেশের ঘরোয়া লীগ খেলা শত শত ক্রিকেটারদের কাছে সেসব হয়ত স্বপ্নই। তবুও, মোশাররফ রুবেল নিশ্চয়ই গর্বিত দেশের হয়ে তিনি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অথচ, এই মানুষটার যে এখন দুর্দিন যাচ্ছে তা সম্পর্কে আমরা কজনই বা জানি?

এই বছরটা যে তার একটুও ভাল কাটছে না। বছরের শুরু থেকেই তিনি অসুস্থ। মস্তিষ্কের একটি টিউমার তার জীবনে এসেছে বিরাট ধাক্কা হয়ে। চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। গত বিপিএল চলাকালীন সময়েই তিনি টের পেয়েছিলেন, সামথিং ইজ রং। শরীরটা ঠিকঠাক চলছে না।

“বিপিএল চলাকালে ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি হয়েছিল অনেক। আমি কিছুই বলতে পারি না। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে যাই। এক মাস পর বাসায় আবার খিঁচুনি হয়। কাঁধ বেঁকে যায়। যার কারণে প্রিমিয়ার লিগের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট খেলতে পারিনি। তখন ডাক্তারকে দেখাই। ডাক্তারও ধরতে পারেনি কী হয়েছে। মনোবিদও দেখিয়েছি। মনোবিদ বললেন আবার নিউরোলোজিস্ট দেখান। আবার নিউরোলোজিস্ট দেখানোর পর ডাক্তার এমআরআই করতে বললেন। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলল লো গ্রেড গ্লাইয়োমা। তারপর তো যেটা হওয়ার সেটাই আরকি।”

সামনে প্রিমিয়ার লীগের খেলা ছিল। মাঠে তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল তার দল। কিন্তু, এখনো যে তিনি চিকিৎসাই নিয়ে যাচ্ছেন। সামনে তাকে নিতে হবে ক্যামোথ্যারাপিও। যখন তিনি অসুস্থ হন, তখন জাতীয় দল থেকে সতীর্থদের অনেকেই তার খোঁজ নিয়েছেন। মাশরাফি, সাকিব, রিয়াদ, তামিম সবাই সাহস জুগিয়েছেন মোশাররফ রুবেলকে। তখন বলা হচ্ছিলো, বিসিবি থেকেও তিনি আর্থিক সহযোগিতা পাবেন।

মোশাররফ রুবেল

কতটুকু কি পেয়েছেন তা আমরা জানি না। তবে, সাহায্য যে পর্যাপ্ত নয়, সেটা বোঝা যাচ্ছে। রুবেল ফেসবুকে সর্বশেষ যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেটি পড়ে মন খারাপ হয়েছে খুব। জাতীয় দলে খেলা একজন ক্রিকেটার, যিনি নিয়মিত ঘরোয়া লীগ খেলেন তার আর্থিক নিরাপত্তা কতটুকু তা যেন সামনে চলে আসলো আবারো। মোশাররফ রুবেল ইতিমধ্যে ১ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছেন চিকিৎসার জন্য। সামনে তার আরো ছয়টা ক্যামোথ্যারাপি নিতে হবে। প্রয়োজন আরো ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু, এই মুহুর্তে তিনি বেশ সংকটে আছেন। তার সাড়ে পনেরোশো স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিতে চাইছেন। এখন তিনি আগ্রহী ক্রেতা খুঁজছেন যেন ফ্ল্যাট বিক্রি করে ফেলতে পারেন দ্রুত, যেন তার চিকিৎসার খরচ যোগাড় হয়ে যায়!

মানুষটার বয়স এখন ৩৭। ক্রিকেট তাকে যা দিয়েছে সব পুঁজি এখানেই যদি শেষ হয়ে যায়, মানুষটার ভবিষ্যৎ কি? তাকে তো চলতে হবে, পরিবারকে চালাতে হবে। ফ্ল্যাট বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় হয়ত মিটে যাবে, কিন্তু তারপর? জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের এই খারাপ সময়টায় আমরা কি কোনোভাবে পাশে দাঁড়াতে পারি না?

বিসিবি’র পক্ষ থেকে কি চিকিৎসা ব্যয়ের বাকি প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয়া যায় না? মোশাররফ রুবেল এই ব্যাধির সাথে লড়াই করবেন, কিন্তু এই লড়াইয়ে কি তিনি জনমানুষের সমর্থন ডিজার্ব করেন না? মাঠে একটা উইকেট পেলে যেমন আমরা সবাই আন্দোলিত হই, তেমনি ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও আমাদের কৌতুহলের সীমা থাকে না। কিন্তু, প্রসঙ্গ যখন ব্যয়বহুল চিকিৎসা, প্রসঙ্গ যখন আর্থিক — তখন আমরা যেন এড়িয়ে না যাই। অন্তত তার কথা সবার কাছে ছড়িয়ে দেই। অন্তত মানুষটাকে এই বার্তা দেই, আপনি একা নন, আমরা সবাই আপনার পাশে আছি।

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button