সিনেমা হলের গলি

“আমার পুরষ্কার লাগবে না… আমাকে খেতে দিন”

১৯৭০ সালে ২০ বছর বয়সেই নকশাল আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে যায় মিঠুন। নকশালের মাত্রা চরম আকার ধারন করলে তার বাবা মা তাকে বোম্বে পাঠিয়ে দেয় কাকার বাড়ী! কিন্তু কয়েকদিন থাকার পর কাকা তাকে বাড়ীতে রাখতে চায়নি, কারন তার কাকা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে সে নকশালবাদী। ব্যাস, শুরু হলো সংগ্রামী জীবন। একবেলা খেতে পায় তো তিনবেলা না খেয়ে থাকা লাগে। কখনো গাড়ীর গ্যারেজে ঘুমানো, কখনো এপার্টমেন্টের লবিতে তো কখনো ফেরী করে দিনানিপাত। “দুঃখ দিয়ে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কিসের?” এই উক্তিটি মিঠুন চক্রবর্তীর সাথে অনায়াসে যায়!

মাথায় চিন্তা আসলো “পুনে ফিল্ম ইন্সটিউট” থেকে ফিল্মের উপর অনার্স কমপ্লিট করবে। যথারীতি তা-ই হলো! ৪ বছরের কোর্স শেষ করে প্রথম বিভাগে উর্ত্তীন। সেখানে আরও ছিলেন শক্তি কাপুর, গুলশান গ্রোভার এবং নামকরা অনেক অভিনেতা/অভিনেত্রীরা। সবাই প্রতিষ্ঠিত, অথচ সার্টিফিকেট নিয়ে মিঠুন এই দরজায় তো ওই দরজায়। সামান্য দারোয়ানের ধাক্কাও খেতে হয়েছিলো তাঁকে। কারণ একটাই, সে বাঙালি! কিছু দিন পর বিষন্ন মন আর হতাশা নিয়ে মিঠুন কলকাতায় চলে আসে।

১৯৭৬ এর দিকে বিখ্যাত পরিচালক মৃনাল সেনের মাথায় একটি মুভি করার চিন্ত আসে। মুভির পটভুমি হলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাওতালদের প্রতিবাদ! অর্থ্যাৎ ব্রিটিশদের শাসনামলের পটভূমি। মুভির টাইটেল দিলেন মৃগয়া (রাজকীয় শিকারী)! কিন্তু মুভির জন্য এমন এক অভিনেতা দরকার যার গায়ের রঙ হবে একটু কালো, লম্বা, বলিষ্ঠ গঠন, মানে আদিবাসীদের মত দেখতে প্রায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাওকেই পাওয়া যাচ্ছে না। তখন মৃনাল সেনের মিঠুনের কথা মনে পড়ে গেলো। ১৯৭৪ সালে পুনে ফিল্ম ইনস্টিউটে একটি নাটকের প্রতিযোগীতায় মৃনাল সেন প্রধান বিচারক হিসেবে আসেন। সেই নাটকে মিঠুনের অসাধারন অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার পুরষ্কার পান, এবং মৃনাল সেন অত্যন্ত মুগ্ধ হোন। কিন্তু মৃনাল সেনের মিঠুনের নামটি মনে পড়ছে না, শুধু মাত্র মনে আছে নামটি “ম” দিয়ে! পরে পুনে ফিল্ম ইনস্টিউটে গিয়ে মিঠুনের নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার যোগাড় করেন।

মৃনাল সেনের সহকারী ওই নাম্বারে কল দিয়ে মিঠুনকে বলে যে, মৃনাল সেন আপনাকে দিয়ে একটা বই বানাতে চায়। আপনি কালকে শুধু আপনার পোট্রেইট একটা ছবি উইথ আউট মেকাপ, এই ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। মিঠুন সাথে সাথে মৃনাল সেনের ঠিকানা নিয়ে নেয় এবং ছবি না পাঠিয়ে পর দিন তিনি নিজেই চলে যায় মৃনাল সেনের বাসায়। অনেক কথাবার্তা বলার পর মিঠুনকে এবার মুভির স্ক্রিপ্ট শোনায় মৃনাল সেন।

“মৃগয়া” একটি আর্ট ফিল্ম! মুল কাহিনী ১৯৩০ সালের। ব্রিটিশদের ভারতের সাওতাল পরিবাকে শাষনের। আর ঘিনুয়া (মিঠুন) নামে যে ছেলেটি, তাকে ব্রিটিশদের জমিদার খুব ভালোবাসে কারন সে খুবই ভালো শিকার করতে পারে। জমিদার তাকে প্রতিদিন শিকার করে আনতে বলে। ঘিনুয়াও খুব উৎসাহ পায়। ব্রিটিশরা এত অত্যাচার না করলেও ব্রিটিশদের যারা পা চাটতো মানে সাওতালদেরই কয়েকজন, তাদের অত্যাচার ছিলো বেশী। সিনেমায় ঘিনুয়া তাদের একজনকে মেরে ফেলে, শেষে তাঁর ফাঁসি হয়। একটা আর্ট ফিল্ম যেমন হয়, হালকা প্রেম, ভালোবাসা, প্রতিবাদ এসব আরকি…

স্ক্রিপ্ট পরে মিঠুনের মন খারাপ হয়ে যায়। কোথায় একটু একশন থাকবে, নাচ গান থাকবে, সেখানে কি না এরকম সাইলেন্ট টাইপ মুভি! মিঠুনের মন খারাপ দেখে মৃনাল সেন বলেন, ‘তুই চিন্তা করিস না, আমি যা বলছি তা কর। দেখবি, লোকে তোকে আলাদাভাবে চিনবে’। মৃনাল সেনের এই একটা কথার উপর ভরসা করেই শুরু হলো মিঠুনের সর্বপ্রথম মুভির কাজ, নাম “মৃগয়া”।

কত দিন সাওতালদের সাথে গিয়ে বসে বসে থাকতো, কীভাবে তাদের জীবন যাপন তা জানার জন্য। সারাদিন অভিনয় প্র্যাকটিস করতো, এটা ঠিকঠাক হয়ে গেলো, আরেকটা অভিনয় প্র্যাকটিস করতো। নাওয়া খাওয়া ভুলে শুধু অভিনয় নিয়ে মেতে থাকতো মিঠুন। মুভিটির নায়িকা মমতাশঙ্কর মিঠুনকে বলতো তুই তো পাগল হয়ে যাবি। মিঠুন হাসতো। অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে পুরো ইউনিটকে মাতিয়ে রাখতো তার অসাধারন বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি নাচের মাধ্যমে এবং অবশ্যই তা মৃনাল সেনের অনুপস্থিতিতে। কারণ, সে মৃনাল সেনকে খুবই ভয় পেতো। পা থেকে কোমড় পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় নাচতে পারতো মিঠুন।

মুভিটির মুল গল্প হলো উড়িষ্যা লেখক ভগবতী চরন পানিগ্রাহী এর ছোট গল্প “শিকার”। এটি ১৯৩০-এর দৃশ্যপট নিয়ে সাজানো। ব্রিটিশদের অত্যাচার, তার বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিবাদ নিয়ে ছোট গল্পটি লেখক লিখেছিলেন। তবে লেখক এখানে উপজাতীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচারকে ফুটিয়ে তুলেছেন বেশী। মুভিটির সংগীত পরিচালক ছিলেন “সলিল চৌধুরী”। মুভিটিতে গান আছে দুইটি “Gaye Garua Se Bharti Hai” এবং  “Suhag Reek Atauri Chetna Ko”। গান দুইটিতেই কন্ঠ দিয়েছেন মোহাম্মদ রফি এবং পঙ্কজ মিত্র।

অবশেষে ৬ ই জুন ১৯৭৬। ২৬ বছর থেকে ১০ দিন কম বয়সে মুক্তি পায় মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত প্রথম মুভি “মৃগয়া”। এই মুভিটির IMDB রেটিং ৭.৯! সে বছর মুভিটি বেস্ট ফিচার ফিল্মের জন্য প্রোডিউসার রাজেশ্ব রাও এবং পরিচালক মৃনাল সেন জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার অর্জন করেন। ফিল্ম ফেয়ারের ক্রিটিক্স এওয়ার্ড জিতে নেন প্রোডিউসার রাজেস্বরাও। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য ভারত সরকার সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরষ্কারটি মিঠুনকে দিতে কার্পন্য করেনি, সেই সাথে ভারতের প্রথম অভিনেতা হিসেবে নাম লেখান যিনি কিনা প্রথম মুভিতেই জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করেন যা এখনও টিকে আছে। ১০ম মস্কো পিল্ম ফেস্টিবালে “গোল্ডেন সেইন্ট জর্জ” ক্যাটাগরিতে বেস্ট ডিরেক্টর হিসেবে মৃনাল সেন এওয়ার্ড জিতেন। বক্স অফিসে মুভিটির ভার্ডিক্ট এভারেজ ছিল অবশ্য।

পুরো সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তীর অভিনয় ছিলো দেখার মতো। মজার ব্যাপার মিঠুনের নাম “ম” দিয়ে শুরু, মিঠুনের প্রথম পরিচালকের নামও “ম” দিয়ে শুরু। মিঠুনের প্রথম নায়িকার নাম ও ছিলো “ম” দিয়ে শুরু এবং মিঠুনের প্রথম মুভিও “ম” দিয়ে শুরু! সেই সাথে মিঠুনের প্রথম মিউজিক এলবাম ও “ম” দিয়ে শুরু (মিলে সুর)! কী অদ্ভুত মিল না?

যেই মানুষটি একটি মুভির আশায় পরিচালকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতো, সেই রত্ন চিনতে মৃনাল সেন মোটেও ভুল করেননি। মৃনাল সেনের হাত ধরেই মুভি জগতে প্রবেশ মিঠুন চক্রবর্তীর। এরপরেও অনেক সার্ভাইভ করতে হয়েছিলো তাঁকে, কিন্তু যা করেছেন তা ইতিহাস হয়ে আছে গোটা বলিউড জগতেই! প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করা অভিনেতা এমন কমই আছে এবং ছিল!

অন্যরকম এক ঘটনা বলে লেখাটি শেষ করা যাক। সাংবাদিকরা যখন তার বাড়ীতে যান ইন্টারভিউ নিতে, তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেন- “আমার পুরষ্কার লাগবে না, আমার খাবার নেই, আমাকে খেতে দিন!”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button