ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

মৌসুমী, কারে ভালোবাসো তুমি?

রাজনীতি আজকাল শখের কাজ হয়ে গেছে মনে হয়। যখন যার মন চাইবে, একটু এসে রাজনীতিতে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করে যাবে। সবার আজকাল জনগণের প্রতি এত দরদ উথলে উঠছে দেখে একটু অবাকই লাগে। সবাই নাকি জনগণের সেবা করতে চায়।  দেখতে ভালই লাগে। বিশেষ করে যখন দেখি, আমাদের মিডিয়া জগতের একটা বৃহৎ অংশ এখন ঝাঁপিয়ে পড়ে জনগণের সেবায় নামতে চায়। শিল্পীদের রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ থাকা ভাল, কিন্তু ক্ষমতার লোভ ভাল নয়।

ক্ষমতার লোভ বলাটা খুব বেশি সরাসরি বলা হয়ে যাচ্ছে, তবে অবস্থার প্রেক্ষিতে এটুকু বলতেই হয়। আমরা দেখেছি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অসংখ্য মিডিয়ার পরিচিত মুখ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। অধিকাংশ শিল্পীই এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগকেই পছন্দ করেছেন মনোনয়ন সংগ্রহের ক্ষেত্রে। নির্বাচনে অবশ্য খুব বেশি কেউ রাজনীতির টিকেট পাননি। আওয়ামীলীগ থেকে এবার প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন চিত্রনায়ক ফারুক। তবে, ফারুক মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্য, তার পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু, আরো অনেকেই ছিলেন, যারা শুধু শখের বশে রাজনীতির টিকেটপ্রত্যাশী ছিলেন।

সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়েও যে তোলপাড় শুরু হবে, সেটা খুব সারপ্রাইজিং না। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন এসেছে। এখন আগের চেয়ে অধিকসংখ্যক নারীরা রাজনীতিতে আসতে চাইবেন, সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে চাইবেন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এমনকি তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরাও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবার ইচ্ছা পোষণ করে ফরম তুলেছেন। কিন্তু, অবাক করছে এবারও মিডিয়ার শিল্পীদের দৌড়ঝাঁপ। তারা যেন এমপি না হয়ে ছাড়বেনই না এমন একটা মনোভাব। যারা হুট করে এখন আওয়ামীলীগের ফরম তুলছেন, এমপি হতে চাইছেন তাদের নিয়ে আলোচনা তো এমনিতেই হচ্ছে চারদিকে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমী।

মৌসুমীর একটি পুরানো ছবি ফেসবুকের নিউজফিডে ভাসছে কয়েকদিন ধরে। সেখানে দেখা যায়, তিনি বিএনপি সরকারের আমলে জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা) একটি অনুষ্ঠানের উদ্ভোধন করছেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত তারেক রহমানও সস্ত্রীক উপস্থিত ছিল। সেই একই মৌসুমীকে এখন দেখা যাচ্ছে আওয়ামীলীগের পক্ষে সংরক্ষিত নারী আসনের ফরম তুলতে। ফলে, স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে মৌসুমী আসলে কোন দলকে ভালবাসেন সত্যিকারের অর্থে, কোন আদর্শে বিশ্বাস করেন?

যদিও এই ছবির ব্যাখ্যায় অভিনেত্রীসুলভ উত্তরই দিয়েছেন তিনি। তার যুক্তি হলো, অভিনেত্রী হিসেবে তাকে অনেক জায়গায় যেতে হয়। তাই ছবি থাকতেই পারে। তিনি আবার এটাও বলেছেন, ছবিটা তো তিনি তুলেননি। এরকম হাস্যকর যুক্তি কিভাবে দেন তিনি? ছবি তাকে তুলতে হবে কেন? যে প্রোগ্রামে তারেক আছে, যে প্রোগ্রামে মৌসুমী হাসিমুখে, খুশিতে বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করছে সেই ছবির ছবি অনেকেই তুলবে, সেখানে সংবাদমাধ্যম থাকবে, ভক্তরা থাকবে, তারেকের সমর্থকরা থাকবে। এমন প্রোগ্রামের ছবি তিনি নিজে তুলেননি বলে কি বোঝাতে চাইলেন? তিনি অনিচ্ছুক হয়ে গিয়েছিলেন প্রোগ্রামে? এখন তিনি বলছেন, এসব নাকি তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার!

অবশ্য কোনো কিছু নিজের মতের বাইরে থাকলে সেটাকে গুজব, অপপ্রচার বলতেই পারেন তিনি। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি, নিজের বিবাহবার্ষিকীর সময়ে তিনি তার রাজনীতিতে আসার গুঞ্জনকে প্রত্যাখান করে বলেছিলেন এসব গুজব। রাজনীতিতে নিয়ে আপাতত তার কোনো পরিকল্পনা নেই। সময় খুব বেশি গড়ায়নি। এখন মৌসুমী বলছেন, রাজনীতিকে তিনি কখনোই আলাদা ভাবেননি। তিনি বলেন, “আমাদের চলচ্চিত্রের শিল্পীদের লাইফস্টাইল আর রাজনীতিবিদদের লাইফস্টাইল একইরকম। শিল্পীদের জনগণ ও দর্শকদের পালস বুঝে চলতে হয়, জীবনযাপন করতে হয়।”

অথচ, বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে শোবিজ অঙ্গণের অনেকেই প্রচারণা চালালেও মৌসুমী মোটামুটি এসব থেকে দূরেই ছিলেন, তাকে কোথাও দেখা যায়নি। আওয়ামীলীগও টানা তিনবার ক্ষমতায় আসলো, বিরোধীপক্ষদেরও অবস্থা সুবিধার নয়, রাজনীতির মাঠে আওয়ামীলীগ এখন সুসংগঠিত অবস্থায় আছে- এমন সময়ে কেউ যদি উড়ে এসে হুট করে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য হতে চায় তখন সন্দেহ হওয়াটা অমূলক নয়। রাজনীতির দুঃসময়ে, দলের দুঃসময়ে অনেকে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেও কিছুই পাওয়ার আশা করেন না, আবার অনেকেই রাজনীতির সুসময়ের মৌমাছি হতে উড়ে আসেন!

মৌসুমী যেমন জাসাসের সাথে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেন, একই সাথে তিনি এটাও স্বীকার করেননি যে কখনো তিনি আওয়ামী লীগ করতেন। তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কখনো পরিষ্কার করেননি। অনেকের মতে, এটা সুযোগসন্ধানীদের কাজ। যারা আশায় থাকে, সুবিধামতো নিজের একটা গতি করা যায় কিনা। মৌসুমী নিজেও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমি তো কাউকে কখনো বলিনি আমি কোন দল পছন্দ করি, কোন নেতাকে পছন্দ করি। কোন দলের হয়ে কাজ করতে চাই। আমি কখনোই এ বিষয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশ করিনি। তাহলে এ প্রশ্ন কেন আসছে? আমি কোন দল করেছি, কোন দল করছি, কোন দল করব না। এটা তো আমার সিদ্ধান্ত।”

মৌসুমীর সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার যেমন আছে, তেমনি আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে দলটার পক্ষে যেসব নারী কাজ করে গেছে, দলকে শক্তিশালী করতে যেসব নারী নিজের সময় দিয়ে গেছে তাদেরও অধিকার আছে দলের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবার। ছাত্রলীগের সাবেক নারী নেতৃত্ব কিংবা আওয়ামীলীগের নারী অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া, শুধু আওয়ামীলীগ সমর্থন করবার কারণে যেসব নারী অত্যাচারিত হয়েছেন, তারাও অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবিদার। এক্ষেত্রে আমরা পূর্ণিমা রানী শীলের কথা বলতে পারি। সব ত্যাগী, নির্যাতিত, সত্যিকার রাজনীতি করে আসা নারীদের সুযোগ দেয়ার পর আসবে বাদবাকিদের কথা। রাজপথে যারা শ্রম দিয়েছে, যারা নির্যাতিত হয়েছে তাদের মুখে জনগণের সেবা করার কথা মানায়, নির্যাতিতদের পক্ষে থাকবার কথা তাদের মুখেই মানায়। কিন্তু, যে হারে সবাই জনগণের সেবা করার জন্য পাগল, তাতে জনগণও দিশেহারা, এত সিজনাল সেবকদের সেবা লইয়া তারা কি করিবে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button