মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

একদিন হয়তো আমি আমার মায়ের ‘বাবা’ হয়ে যাব

প্রথমবার যেদিন মা আমাকে ‘তুই’ বলা বাদ দিল, সেদিন আমি হোস্টেল থেকে বাড়িতে এসেছি মাত্র দুইদিনের জন্য। প্রথমবার বাড়ির বাইরে থাকা শুরু করেছি। মাত্র একটা মাস থেকে আসলাম। এক মাসেই তার সাথে আমার দূরত্ব বেড়ে গেল এক কোটি মাইল। তুই-টা কীভাবে কীভাবে যেন ‘তুমি’ হয়ে গেল।

একটা সময় মা রেগে গেলে ভাতের চামচ, ভাতের প্লেট দিয়ে মারত। রুটি বানানোর বেলনও ছুড়ে মারত। সেই মানুষটা এখন এখন আর রাগ করে না। কেমন যেন কথাবার্তায় বিনীত থাকার চেষ্টা করে। খানিকটা ভীতও মনে হয়। যে মা মুরগী বিক্রি করে জমিয়ে জমিয়ে পাঁচশ টাকা দিয়ে শার্ট কিনে দিত, সেই মা এখন আর শার্ট কিনে দেয় না। অপরাধীর মতো মাঝে মাঝে বলে, ‘তোমার কাছে ট্যাকা আছে বাবা?’ আগে অনেক প্রশ্ন করতাম, ‘কী করবেন মা?’ মা বলে, ‘তোর নানীক একটা শাড়ি কিনে দিমো। আমার কাছে ট্যাকা নাই।’

এমন মুহুর্তে সবকিছু হুড়মুড় করে আমার মাথার উপরে ভেঙ্গে পড়ে। প্রচন্ড অভিমান হয় নিজের উপর। এখন আর জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাই না। যদি এমন কিছু বলে, তখন? আমার অভিমানের কারণ তার টাকা চাওয়া নয়, তার কাছে টাকা নেই সেটা নয়। অভিমানের কারণ- যে মানুষটা ভরাট গলায় কথা বলত, ঝাড়ি দিত, লাঠি তুলত, সেই মানুষটা কেন এমন হয়ে গেল? কেন সে আমাকে ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’ বানিয়ে ফেলল? গলা মোটা করেও তো বলতে পারে, টাকা পাঠাবি আজ পাঁচটার আগেই। সেখানে নির্দেশ থাকবে, আদেশ থাকবে।

মধ্য বয়স হল রাত বারোটার মতো। এরপর রাত আর গভীর হয় না। ভোর হতে শুরু করে। মানুষের রাত বারোটা হলো তার মধ্যবয়স। এরপর শরীরের বয়স বাড়লে মানুষের মনের বয়স কমে। আচরণে ছেলেমানুষী চলে আসে।

এখন কী করি? ধীরে ধীরে একজন খুকি-খুকি মায়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আলাপ করি বিস্তর বিস্তর। যখন আমি গম্ভীর হয়ে অতি সাধারণ কথাও বলি, সেই খুকি মেয়েটা সবকিছুই মুগ্ধ হয়ে শোনে। নানাজান নেই বহুকাল।

এখন আমি আমার মায়ের বাবা হবার চেষ্টা করছি। এই বাবাকে তার মেয়ে যেন যখন তখন ফোন দিয়ে বিরক্ত করে। তার মধ্যে আবদার করবার স্বভাব তৈরি করবার চেষ্টা করছি। যেন যখন তখন ফোন দিয়ে বলে- বাবা, আমার ঐটা চাইনা, এটা দাও। ওটা না দিলে, কথা নাই।

প্রজেক্ট যে খুব কাজ করছে তাও না। একদিন হয়তো সফল হব। একদিন হয়তো আমি আমার মায়ের ‘বাবা’ হয়ে যাব।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button