মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমি আর আঁকবো না…

Morshed Mishu:

অবশেষে আমি আজ একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি আর আঁকবো না। এই মুহূর্তে যে কয়টা প্রজেক্ট হাতে আছে, সেগুলো মার্চের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।  মার্চের পর আমি আর কোন এজেন্সি, কর্পোরেট, এনজিও কিংবা ক্লায়েন্টের জন্য আঁকবো না।

এতে কারো কোন ক্ষতি নাই। বাজারে এখন প্রচুর কার্টুনিস্ট/আর্টিস্ট। একটা দুইটা মোরশেদ মিশু না আঁকলে কারো কিছু যাবে-আসবে না, কারো কাজও থেমে থাকবে না। হুজুগে নেইনি সিদ্ধান্ত, গত তিন-চার মাসের ভয়ংকর পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছি। (অভিজ্ঞতা কাদের মাধ্যমে হলো, তাদের নাম না বলি। তাদের আবার অর্গানাইজেশনের রেপুটেশন নামক একটা ব্যাপার আছে। কখনো যদি আত্মজীবনী লেখার মত বিখ্যাত হই, আলাদা একটা চ্যাপ্টার তেনাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে কথা দিলাম!

অন্য কারো জন্য আঁকবো না, এর মূল কারণ একটাই। ‘সিস্টেম অফ পেমেন্ট’। আমরা যারা আর্টিস্ট, আমরা পেমেন্ট চাই একটা প্রজেক্ট বা কাজ নামিয়ে দেবার জন্য। প্রজেক্ট নামিয়ে শেষ করে আমরা অপেক্ষায় থাকি কবে ‘সিস্টেম অফ পেমেন্ট’ এর সাইকেল, অর্থাৎ ৩০/৬০/৭০/৯০ দিন শেষ হবে! সাইকেলটা শেষ মানেই পেমেন্ট হয়ে গেলো, তা কিন্তু না। আসল খেলা আসলে শুরু হয় তখন। আপনার বিলটা এপ্রুভালের জন্য দৌড়-ঝাপ ও বাস্কেটবল খেলা শুরু হবে উপর্যুক্ত কোনো একটি দিনের সাইকেল শেষ হবার পর। বিল যাবে এক কোট থেকে অন্য কোটে। কখনো একাউন্টস কোট তো কখনো ফিন্যান্স কোট কিংবা কখনো বসের চেক সাইন হওয়া বাকি কোট। এসব কোটে খেলা চলাকালীন আপনি হঠাৎ একদিন ফুররররর করে শুনবেন বাঁশির আওয়াজ…

– “আররে মিশু ভাই, আপনার দাদার বাপের ঢেউটিন সার্টিফিকেটটা তো দিলেন না…”
– “দাদার বাপ তো অনেক আগেই গন ভাই…”
– “আররে মিশু ভাই, তারে কবর থেকে তোলেন… সব রেডি… এই পেপার দিলেই চেক পেয়ে যাবেন…”

এই সাইকেলের মধ্যে বিলের আপডেট জানতে, কবে পাবো জানতে আর নিজের ন্যায্য কাজের পেমেন্ট হাতে পাইতে, ভয়ংকর ছোটলোক লাগে। উহু, তেনাদের ছোটলোক লাগে না। বিশ্বাস করেন নিজেরে ছোটলোক লাগে, ভয়ংকর ছোটলোক লাগে। এক পর্যায়ে মনে হয়, টাকাটা আমার ন্যায্য না। আমি আসলে ধার চাইতে গেছি। এরপর, ‘আগামী রবিবার পাবেন’ গান তো আছেই। এর মাঝে কত রবিবার পার হয়ে যাবে, ‘আগামী রবিবার’ আর আসবে না।

অথচ আমরা যারা আর্টিস্ট, আমরাই নাকি প্রজেক্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা নামিয়ে দেই, যেটা দেখে সবাই আহা উহু করে। ক্যাম্পেইন প্ল্যানড, স্ট্র্যাটেজি রেডি, আইডিয়া, বাজেট ও আনুষঙ্গিক সকল কিছু লকড… কিন্তু ক্রিয়েটিভ কার্টুন/ইলাস্ট্রেশন/লেআউট/ডিজাইন রেডি নাই, তো সবাইরে কী দেখাবেন? ঘোড়ার বিচি? ক্যাম্পেইন, স্ট্র্যাটেজি, আইডিয়া, বাজেট ও আনুষঙ্গিক সকল কিছু লক করা পিপলগণ পরের মাসে সময়মত বেতন পেয়ে যাবেন। কিন্তু যে আর্টিস্ট বান্দা বা বান্দিকে ভাড়া/হায়ার/খ্যাপ টা দেওয়া হলো, সে ঝটপট কাজ নামাইয়া সেটার ন্যায্য পেমেন্ট পাবে ৬০-৯০ দিন পর। আর্টিস্টদের জন্য আসমান থেকে মান্না-সালওয়া আসে তো, তাই না! আমরা তো আটিস, আমরা টাকা দিয়া কী করবো, রাইট? শালার তাই যদি হয়, করলাম না আর কারো কাজ (এই লেখা পড়ার পর এমনিতেও কেউ আর দিবে না। আফটার অল উচিত কথা বলে ফেলেছি)

“হায় হায় মিশু! তুই তাইলে করবি কী? তোর চলবো ক্যামনে?”

যদি মনে এই প্রশ্ন এসে থাকে, তাহলে বলে রাখি, “ভাই, আঁকতে যখন পারি, চলতেও পারবো ইনশাআল্লাহ। চলতে ফিরতে কম আইডিয়া তো আর দেই নাই, নিজের জন্যও বের করে ফেলবো কোনো না কোনো আইডিয়া, ইনশাআল্লাহ।” আর যদি দেখতে চান কী করবো, তাহলে, “ভাই, দেখতে থাকেন কী করি…”

ফিআমানিল্লাহ…
জী ধন্যবাদ…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button