অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

ফোর্বসে মিশু- বেদনার রঙ মুছে সুখের গল্প সৃষ্টি করা একজন আর্টিস্টম্যান!

বিশ্বখ্যাত প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফোর্বস প্রতিবছর ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’ নামে একটা তালিকা প্রকাশ করে। দশটি ক্যাটাগরিতে তারা বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিভাবান মানুষদের নাম প্রকাশ করে থাকেন, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজ, দেশ, বিশ্ব পরিমন্ডলে প্রভাব রেখেছেন। বৈশ্বিক বিচারে এটা বেশ সম্মানজনক একটা তালিকা, এই তালিকা থেকে আমরা জানতে পারি আগামী দিনে কারা বিশ্বকে তাদের দুর্দান্ত আইডিয়া দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

ফোর্বসের এই তালিকায় বাংলাদেশ থেকে এর আগেও একাধিক তরুণ জায়গা করে নিয়েছেন। এবছরও দুইজন তরুণ এই তালিকায় আছেন। বাংলাদেশকে গর্বিত করা দুই তরুণের একজন পাঠাও রাইড সার্ভিসের সহ উদ্যোক্তা হুসেইন ইলিয়াস। অন্যজন কার্টুনিস্ট মোরশেদ মিশু।

মোরশেদ মিশু

একজন বাংলাদেশি ক্রিয়েটিভ কার্টুনিস্ট হিসেবে মোরশেদ মিশুর এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা বেশ গর্বের ব্যাপার। বিশেষ করে অনেকদিন ধরে মোরশেদ মিশুর কাজ ফলো করে আসার সুবাদে একটা এক্সপেকটেশন তৈরি হয়েছিল যে এই কাজ অনেক বড় কোনো প্ল্যাটফর্ম দ্বারা নিশ্চয়ই স্বীকৃত হবে। তাই মোরশেদ মিশুর ফোর্বসের এই তালিকায় আসাটা চমকপ্রদ মনে হয়নি, বরং ডিজার্বিং মনে হয়ে হয়েছে খুব বেশি। যে কাজের জন্য তিনি এখানে জায়গা করে নিয়েছেন, মোরশেদ মিশুর আঁকা সেই ‘গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ’ ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বের অসংখ্য সংবেদনশীল মানুষের মনস্তত্ত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তার কাজ বিশ্বের বহুল প্রচলিত মিডিয়াগুলোতে প্রচারিত হয়েছে, তার সাক্ষাৎকার একাধিক ভাষার মিডিয়ায় এসেছে।

যুদ্ধ, বিগ্রহ, অশান্তি, আন্দোলনের ভিক্টিমদের তিনি দেখিয়েছেন অন্য এক জগতে। যে জগত সুখীদের জগত। আজকের দিনে একজন পিতার কোলে লাশের ছবি আমাদের যখন কাঁদায়, মোরশেদ মিশুকেও সমভাবে বিব্রত করে। আমরা এসব এড়িয়ে যেতে চাই। আমাদের সুখী জগতে এসব নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না। মোরশেদ মিশু সেই অবচেতন সুখের কল্পনায় এই মানুষগুলোকেও নিয়ে এসেছেন। তিনি বদলে দিয়েছেন দৃশ্যগুলো। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধ বিগ্রহ, অশান্তি, আন্দোলন, কোন্দল না থাকলে দৃশ্যগুলো কেমন হতো। হয়ত বন্ধুরা রক্তাক্ত বন্ধুকে নিয়ে বিচলিত হতো না, তারা থাকত খেলার মাঠে। হয়ত বোমায় বিধ্বস্ত শহরের বদলে থাকত সবুজে ঘেরা সুখী আবাসগুলো..

কমিকস, মোরশেদ মিশু, দ্য গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ সিরিজ, উন্মাদ

সিরিজটির শুরু কিভাবে? আইডিয়া এসেছে কোত্থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন একটি সাক্ষাৎকারে। বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আক্রান্ত মানুষের ছবিগুলো ফেসবুকে হঠাৎ বেশি ছড়িয়ে পড়েছিলো। ছবিগুলো এতটাই মর্মান্তিক যে দেখতে পারতাম না, এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু চোখ এড়িয়ে গেলেও, মাথায় থেকে যেতো! এমন ছবি আমি কেন, কেউই দেখতে চায় না! এক রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। মনে হলো কিছু একটা করা দরকার। তখন চিন্তা করলাম, এই ছবি আমি দেখতে চাই না। তাহলে কী দেখতে চাই? দেখতে চাই হাসিমুখ…সেই চিন্তা থেকেই প্রথম ছবিটা আঁকা।”

এই সিরিজের একেকটা ছবি পৃথিবীর প্রতি শান্তির বার্তা। এই বার্তা যুদ্ধবাজদের কাছে, শোষক, শাসকদের কাছে কতটুকু মূল্যায়ন পাবে তা আমরা জানি না। তবে, এই বার্তাগুলো নিঃসন্দেহে শান্তিপ্রিয় মানুষদের পক্ষে শক্তি হয়ে কাজ করবে। এই মেসেজগুলো সংবেদনশীল মানুষদের ভাবনার খোরাক যুগিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তাই মোরশেদ মিশুর এই কাজ ফোর্বসও স্বীকৃতি দিয়েছে। যে স্বপ্নের পৃথিবী আমরা কল্পনা করি, তা কেমন হবে সেটাই অনুবাদ করেছেন মিশু। তাই এই স্বীকৃতির জন্য যোগ্যতম মানুষ হয়েই জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ফোর্বসের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’ তালিকায় ‘মিডিয়া, মার্কেটিং অ্যান্ড অ্যাডভার্টাইজিং’ ক্যাটাগরিতে মোরশেদ মিশু জায়গা পেয়েছেন।

১৯৯১ সালে মানুষটার জন্ম হলেও সার্টিফিকেটে দুই বছর কমিয়ে দেয়া হয়েছে স্কুল থেকে। নোয়াখালী বাড়ি, জন্মেছেন ঢাকায়। মিশুর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। মাকে তিনি বলেন আয়রন লেডি। রাজনৈতিক কারণে পিতাকে যখন জেলে থাকতে হয়েছে, তখন মা সংসার আগলে রেখেছিলেন যতন করে, এখনো রেখে যাচ্ছেন। তিন ভাই এক বোন মিলে সংসার তাদের। মিশু সবার ছোট। তিনি নাকি ছোট থেকে গুলি খেয়ে মারা যেতে চাইতেম, তবে এই গুলি খেতে হবে দেশের জন্য। এই ভাবনা থেকে তার সবসময়ই আগ্রহের জায়গা ছিল ডিফেন্স। দুইবার পরীক্ষা দিয়েও যখন সুযোগ হলো না, তখন ভীষণ হতাশায় দিন কাটছিলো। জীবনে অন্য কোনো কিছুতে তিনি এত সিরিয়াস চেষ্টা করেননি, ডিফেন্সে টেকার জন্য যা করেছিলেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন, তিনি একটু বেশি ইমোশনাল বলেই ডিফেন্সে সুযোগবঞ্চিত হয়েছেন।

আবেগ যে আসলেই তার প্রকট সেটার বড় উদাহরণ বোধহয় গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ। কি মায়াময় এক জগত তিনি তৈরি করেছেন, আবেগ ছাড়া একজন আর্টিস্ট ভালবাসা ছড়িয়ে দেয়ার এমন আইডিয়াকে এগিয়ে নিতে পারেন না কোনোভাবেই। দেশের জন্য মরারও ইচ্ছে ছিল যার, তিনি দেশের জন্যই আসলে কাজ করছেন, ভিন্ন মাধ্যমে, ভিন্ন আঙ্গিকে। এই আঁকাআঁকির কারণে বিশ্ব জেনেছে একজন বাংলাদেশি কার্টুনিস্টকে, যিনি শান্তির বার্তা দেন রঙচিত্রে, যিনি মানচিত্রের বিবেধ, জাগতিক হিংসা ক্রোধের বাইরে গিয়ে একটা সুখী জগতের গল্প বলেন, হাসিমুখের গল্প বলেন।

আঁকাআঁকির প্রথম গুরু হিসেবে মোরশেদ মিশু বলেন তার মেঝ ভাইয়ের কথা। যিনি মাদ্রাসায় পড়তেন, ভাবনায় ছিলেন সৃজনশীল, মেধায় ছিলেন তুখোড়। ডিফেন্সে যখন হলো না সুযোগ, মিশু ডিপ্রেশন কাটাতে অনেক কিছু চেষ্টা করেছেন। ফটোগ্রাফির জন্য ইন্সটলমেন্টে ক্যামেরা কিনার তিনমাস চুরি হয়ে যায় ক্যামেরা, শেষ হয় ছবি তুলার অধ্যায়ও। এরপর সিনেম্যাটোগ্রাফি, গল্প লেখা, কবিতা লেখা এমন অনেক মাধ্যমে নিজেকে এক্সপ্লোর করার চেষ্টা চালিয়েছেন। সেই সময়েই আবার শুরু করলেন আঁকাআঁকি। এই কাজটা তো আগে থেকেই টুকটাক পারতেন।

নিজের আঁকা ছবি নিয়ে একদিন গেলেন উন্মাদে, বাংলাদেশের লিজেন্ডারি স্যাটায়ার ম্যাগাজিন যেখান থেকে বলতে গেলে প্রায় সব কার্টুনিস্টদের জন্ম। কিংবদন্তি কার্টুনিস্ট, লেখক আহসান হাবীব মিশুর আঁকা ছবি দেখে বললেন, ছেপে দিব। ছাপা হয়নি তিনমাসেও। মিশু হাল ছাড়েননি, উন্মাদে ছাপা হবে এটা অনেক বিরাট ব্যাপার। আর এখানে আড্ডার সুযোগ, ব্রিলিয়ান্ট সব মানুষদের সান্নিধ্য পাওয়াও তার জন্যে তখন নিজেকে ফিরে পাওয়ার একটা পথ। একদিন আহসান হাবীব বললেন, সামনে এক্সিবিশন আছে সেখানে ছবি দাও।

মিশু আঁকলেন, কিন্তু আইডিয়া নিয়ে আলোচনা করতে করতে সাজেশন আসলো এটায় চেঞ্জ আনতে হবে। তারপর সেই একই ছবি পাঁচবার আঁকলেন তিনি। আহসান হাবীব মিশুর এই আগ্রহ, লেগে থাকবার স্পৃহা পছন্দ করলেন, প্রশংসাও করলেন। সেই থেকে মিশু উন্মাদে। ২০১২ সালের কথা। এখন তিনি উন্মাদের সহ-সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তার এই গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জ পুরষ্কার পেয়েছে উন্মাদ থেকেও। উন্মাদের ৪০ বছর পূর্তিতে কার্টুন প্রদর্শনীতে মিশুর এই সিরিজ প্রথম পুরষ্কার অর্জন করে।

তিনি এখন বহুল পরিচিত মুখ, পরিচিত তার গ্লোবাল হ্যাপিনেস চ্যালেঞ্জও। অথচ, বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো কিন্তু তাকে নিয়ে শুরুতে তেমন কাজ করেনি। তিনি বৈশ্বিক মিডিয়ায় ফিচার্ড হওয়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনার শুরু হয় দেশেও। সিএনএন, আল জাজিরা, বোরডপান্ডা সহ প্রায় শতাধিক মিডিয়া তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে।

বাংলাদেশে বোধহয় সৃজনশীল মানুষদের সম্মান দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যরা একটু বেশি কৃপণ। মোরশেদ মিশু কিছুদিন আগে অভিমান করে তো আঁকাআঁকি ছেড়ে দেয়ারই ঘোষণা দিয়েছিলেন। কাজ করে যথাসময়ে পেমেন্ট পান না, তারউপর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যেন টাকাটা প্রাপ্য না, ধার চাইতে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেই তিনি বলেছিলেন, মার্চের পর আর কোনো ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করবেন না তিনি৷ অথচ, এই মোরশেদ মিশুই বাংলাদেশের হয়ে সুনাম বয়ে আনছেন, ফোর্বসে জায়গা করে নিচ্ছেন। সামনে হয়ত আরো কোনো এওয়ার্ড, সম্মান দেওয়ার জন্য তাকে ভীনদেশিরাই হারিকেন দিয়ে খুঁজবে।

মোরশেদ মিশুকে অভিনন্দন, দেশের জন্য মারা যাওয়ার অভিলাষ ছিল আপনার, সেই আপনি বেঁচে থাকার গল্প তৈরি করে দেশকে সম্মানিত করছেন! আপনি বেঁচে থাকুন, বেঁচে থাকার গল্পে, সুখী হাসিমুখের গল্পে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button