বুক রিভিউরিডিং রুম

টনি মরিসনের পিকোলা ও আমাদের ধর্ষিত শিশুরা!

সাহিত্যে নোবেলজয়ী আমেরিকান উপন্যাসিক টনি মরিসনের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’। ফাইনাল ইয়ারে পাঠ্যবই হওয়ার সুবাদে পড়েছিলাম। মোটামুটি সেকেন্ড ইয়ার থেকেই জানতাম ফোর্থ ইয়ারে এমন একটা উপন্যাস পড়বো যেটাতে বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করে। ভয়, ঘৃণা, কৌতুহল সবই কাজ করত উপন্যাসটা ঘিরে। আমি অবশ্য কিছুটা নিস্পৃহ ছিলাম। এর কারণ হতে পারে ছোটবেলা থেকে বইপড়ার অভ্যাস। কাজেই বই পড়লে হয় কি, নানারকম ঘটনা এবং চরিত্র সম্পর্কে জানা থাকে। তাই বাস্তবজীবনে যত কিছুই ঘটুক, ধাক্কা লাগে না অতটা।

ক্লাস নাইনে থাকতেই অরুন্ধতীর গড অব স্মল থিংস পড়েছিলাম। সেখানে একটা ইনসেস্টের ঘটনা আছে যারা পড়েছেন তারা জানেন। পুরো উপন্যাসটাই এমন বিষাদ ঘেরা যে জমজ ভাই-বোন এসথা আর রাহেল যখন চরম মানসিক বিপর্যয়ের সময় লাভ মেক করে তখন অস্বাভাবিক লাগেনি। মনে হয়েছে এমন পরিস্থিতিতে মানুষ এমন অস্বাভাবিক কাজও করে ফেলে। তার উপর এসথা আর রাহেল ছোটবেলা থেকেই আলাদা আলাদা শহরে বড় হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে দেখা জমজ ভাই-বোনের।

এই বইটা পড়া থাকার কারণেই হয়ত দ্য ব্লুয়েস্ট আই নিয়ে তেমন ধাক্কা খাইনি। বইটা পড়ার সময় শুধু মাতাল বাবার মেয়েকে ধর্ষণ করাই বড় হয়ে ধরা দেয়না। আমেরিকার দারিদ্রপীড়িত কালোদের অসহনীয় জীবন বারবার ধাক্কা দিয়ে যাবে। যারা রুশ বিপ্লবের উপর লেখা নানা বই পড়েছেন তারা কিছুটা অনুভব করতে পারবেন। এসব বইয়ের একটা নির্দিষ্ট সিচুয়েশন আপনাকে চিন্তায় ফেলবে না। বরং সেই সময়ের সমাজব্যবস্থা, একটা সামাজিক/অর্থনৈতিক বিপ্লব মানুষের সামগ্রিক জীবনে কিরকম প্রভাব ফেলেছিল সেটা বেশি নাড়া দেয়। মানুষ কি খায়, কি পরে, কিরকম ঘরে থাকে, কি কাজ করে প্রতিটা বিষয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ফুটে ওঠে।

দ্য ব্লুয়েস্ট আইও এমন একটা বই। টনি মরিসন সত্তুর সালে লিখলেও বইটা ১৯৩০ এর দশক থেকে শুরু হয়ে ষাট সাল পর্যন্ত চলস ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’র প্রেক্ষাপটে লেখা। গ্রেট ডিপ্রেশন হল অর্থনৈতিক মহামন্দা। এর প্রভাব ধনী ও দরিদ্র উভয়রকম দেশেই পড়েছিল। সারাবিশ্বেই মানুষের ব্যক্তিগত আয়, কর, মুনাফা জিনিসপত্রের মূল্যমানের ভয়ানক পতন ঘটে। শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার বেড়ে যায় ২৫%।

এরকম অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। আমেরিকাতেও তাই হয়েছিল। তবে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমেরিকার আফ্রিকান-আমেরিকানরা। দ্য ব্লুয়েস্ট আই ১৯৪১ সালের প্রেক্ষাপটে লেখা। একজন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক হিসেবে টনি মরিসন তার দরদ ঢেলে দেওয়ার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন সেসময়ে কালোদের মানবেতর জীবন। ইনসেস্টের মত এতো জটিল বিষয় নিয়ে এতো নিরাবেগ লেখা পড়ে লেখিকার প্রতি সমীহ জাগে। বইয়ের কোথাও কোন চরিত্রের প্রতি কোন জাজমেন্ট নাই। ঘটনার নির্মোহ বর্ণনা আছে শুধু।

পলিন আর কোল যখন তরুণ তখন সাদাদের এংলো-স্যাক্সন প্রোটেস্টেন্ট সমাজে টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। ফলাফল হয়েছে কোলের মাতাল হয়ে যাওয়া আর একমাত্র মেয়ে পিকোলা আর স্বামীর মুখের খাবার জোগাড় করতে পলিনের উদয়াস্ত পরিশ্রম করা।

দশ বছরের পিকোলা একদিন থালাবাসন মাজার সময় তার মাতাল বাবা কোলের দ্বারা ধর্ষিত হয়। এই প্রথম বাবার ভালোবাসা পেল মেয়েটি। কনফিউজিং সেন্সের মধ্যে পিকোলার মাতাল বাবা সেসময়ে নিজের মধ্যে মেয়ের প্রতি একইসাথে ঘৃণা এবং ভালোবাসা বোধ করছিল। দ্বিতীয়বারের মতো মেয়েকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায় কোল। পিকোলা হয়ে যায় গর্ভবতী।

কি করবে সমাজ পিকোলার। পুড়িয়ে ফেলবে? নাকি ঘৃণায় থুথু ছুড়বে? দশবছরের পিকোলা। আজন্ম শুনে আসছে সে ‘আগলি’। বাড়ি, স্কুল, পাড়ার লোক সবাই ঘৃণা করে তার কুতসিত চেহারার জন্য। মেয়েটা স্বপ্ন দেখে একদিন তার একজোড়া নীল চোখ হবে আর সেও সুন্দর হবে। যে আমেরিকায় মানুষ চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থায় আছে সেখানে নীল চোখ, ব্লন্ড চুলকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

নিজের জন্মের উপর হাত না থাকা শিশু পিকোলারও তাই জীবনের একমাত্র স্বপ্ন একজোড়া নীল চোখের অধিকারী হওয়া। শুধুমাত্র চেহারা খারাপ হওয়ার জন্য আজন্ম ঘৃণা কুড়োনো পিকোলা একসময় ভাবতে থাকে তার চোখদুটো নীল হয়ে গেছে। তাই হয়ত সমাজের লোকজন তার সাথে অন্যরকম আচরণ করছে। তার শিশুমনে একবারও আসে না বাবার দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়াতেই তার প্রতি ভিন্নরকম আচরণের কারণ।

আমার এই লেখার কারণ ইনসেস্টের প্রতি ইতিবাচকতা নয়। একটা সমাজে নানা কারণে ইনসেস্ট, চাইল্ড রেপ, রেপ ঘটে। আমরা প্রতিটা ঘটনাতেই হইচই করি। কিন্তু পচনের ক্ষত সমাজের কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে তা নিয়ে ভাবছিনা। সমাজ ঠিক কোন অবস্থানে গেলে মসজিদের ইমাম ইয়াবা বেঁচে, বাবা শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে, মাদ্রাসার শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে ভাবার দরকার আছে। ইমাম বা মাদ্রাসার শিক্ষকের কথা এলো কারণ এই দুজনের সাথে ধর্মবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। তাদের তো গভীরভাবে বিশ্বাসী হওয়ার কথা ছিল। তারাও কেন প্রবৃত্তির চাপ সামলাতে পারছে না?

দোষারোপ, ঘৃণা আর আমি সব বুঝি মনোভাব ত্যাগ করে প্রয়োজন গভীর ভাবে চিন্তা করার। কে কোন পরিস্থিতিতে যেয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয় তা ভাবা দরকার। সমাজের এই পতন রোধে এন্টিবায়োটিকের মাত্রা নির্ধারণ খুবই জরুরি। নাহয় একের পর এক চাইল্ড রেপ ঘটতে থাকবে আমরা দুইদিন রাগ, ঘৃণা দেখিয়ে তৃতীয় দিনের দিন নতুন মডেলের মোবাইলে উন্নতমানের সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে যাবো। এভাবে হবেনা। সমাজ বদলাতে হলে হুটহাট করে মন্তব্য এবং মতামত না দিয়ে চিন্তা করা দরকার গভীরভাবে।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button