সিনেমা হলের গলি

এক ‘আন্ডাররেটেড প্লেব্যাক সিঙ্গার’-এর গল্প!

২০০৯ সাল, এ আর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনায় দিল্লি সিক্স সিনেমার গান ‘মাসাক্কালি’ গানটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। অনেক হিট গানকে ছাপিয়ে ফ্লপ সিনেমার এই গানটি হয়েছিল বছরের শীর্ষ জনপ্রিয় গান, বাংলাদেশে তো এই নামে পোশাকও বেরিয়েছিল। যারা গান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখেন, তারা একমত হবেন গানটি খুবই কঠিন, আর এই গানকে সহজাত প্রতিভায় কণ্ঠে ধারণ করে শ্রোতাদের মোহিত করেছিলেন হিমাচল প্রদেশের এক গায়ক। কাজের দ্যুতির মত তাঁর নামেই রয়েছে মুগ্ধতার ছাপ। নাম তাহার ‘মৌহিত চৌহান’।

‘গায়ক না হলে হয়তো রাখাল হয়ে হিমাচলের পাহাড়ে ভেড়ার পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম’, এমনটাই বলেছিলেন তিনি। নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। পড়াশুনা শেষ করার পর বন্ধুর অফার দেয়া চাকরিকে পেছনে ফেলে বেছে নিয়েছিলেন সংগীতকে। পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থেকেও শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে গানের ভুবনকে আপন করে নিয়েছিলেন মৌহিত। মুম্বাইয়ে এসে গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ‘সিল্ক রুট’, প্রথম এলব্যামের ‘ডুবা ডুবা’ গানটি জনপ্রিয়তা পায়, পুরষ্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর সেভাবে পাওয়া যায় নি, একটা সময় পর ব্যান্ড দলটা ভেঙ্গেই যায়।

প্রীতমের সুরে ‘জাব উই মেট’ এর এলব্যাম সুপারহিট হয়েছিল, এই সিনেমার ‘তুম সে হি’ গানটাও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। প্লেব্যাকে এই গান দিয়েই পরিচিতি পেতে থাকেন মৌহিত, তবে তার আগে ‘রং দে বাসন্তী’ তে গান গেয়েছেন, প্রথম প্লেব্যাক বেশ কয়েক বছর আগে ‘রোড’ ছবিতে। তুম সে হি র গানের পর নিয়মিত প্লেব্যাক করতে থাকেন। তবে রীতিমতো তুমুল আলোচনায় চলে আসেন দিল্লি সিক্স সিনেমা ‘মাসাক্কালি’ গানের দারুণ জনপ্রিয়তার পর, সঙ্গীতপ্রেমীদের মাঝে প্রিয় গায়ক হিসেবে স্থান করে নেন। প্রায় একই সময়ে কামিনে সিনেমায় ‘পেহেলি বার মহাব্বত’, লাভ আজকালের ‘ইয়ে দুরিয়ান’, ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাইর ‘পি লু’, আনজানা আনজানির ‘তুঝে ভুলা দিয়া’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

২০১১ সালে এ আর রহমানের সুরে ইমতিয়াজ আলীর ‘রকস্টার’ সিনেমায় গান করে নিজেকে আরো অনন্য করে তোলেন। নিঃসন্দেহে এটি এই দশকের অন্যতম সেরা অ্যালবাম, সঙ্গীতপিপাসুরা তাঁর কন্ঠে ‘জো ভি হো, শহর মেঁ, হাওয়া হাওয়া, তুম হো পাস, নাদান পারিন্দে’ গানগুলো শুনে বিমুগ্ধ হয়েছিল। অভিনেতা রনবীর কাপুরের দুর্দান্তে অভিনয়ের সাথে তাঁর কন্ঠের দ্যুতি পুরো একাত্ব হয়ে উঠেছিল। এখনো এই অ্যালবাম সমানভাবে সমাদৃত।

রকস্টারের পর অনেকেই ভেবেছিলেন মৌহিত চৌহান বলিউডে রাজত্ব করবেন। তবে সেভাবে আর সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেনি, অবশ্য ততদিনে তিনি তারুণ্যের বয়স ছাড়িয়ে গেছেন। এর মাঝে বারফি সিনেমার ‘আলা বারফি’, এক থা টাইগারের ‘সাঁইয়ারা’, হিরোপান্তির ‘রাব্বা’ গানসহ বেশকিছু গান শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। এখনো প্লেব্যাক করেন তবে আগের মত জনপ্রিয়তা পায় না। গত বছর প্যাডম্যান, লায়লা মজনু ছবিগুলোতেও গান করেছেন। এই বছর মুক্তি প্রতিক্ষীত কলঙ্ক, হাম চার, সুপার ৩০ ছবিতেও প্লেব্যাক করেছেন, প্রত্যাশা করি দ্যূতি ছড়াবেন আপন মহিমায় মৌহিত চৌহান।

মাসাক্কালি বা রকস্টারের গানগুলোর জন্যই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে পারতেন, কিন্তু বিধিবাম পান নি। তবে দুটোর জন্যই ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তিনি কতটুকু এগিয়ে থাকবেন জানি না, তবে কন্ঠের দ্যূতিতে যে অনেক এগিয়ে থাকবেন সেটা নিশ্চিত। আর সেই কন্ঠের দ্যুতি সুদূর ভবিষ্যতে হলেও ছড়াবে, এই প্রত্যাশা করি।

১৯৬৬ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করা এই জনপ্রিয় গায়ক আজ পেরোচ্ছেন জীবনের ৫৩তম জন্মদিন, শুভকামনা রইলো।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button