টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

সিনেমা বানাবেন? ক্যামেরা নেই? মোবাইল তো আছে!

সিনেমা, চলচ্চিত্র অথবা ফিল্ম যে নামেই ডাকুন, সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ আমি চিনি না। আমার বাবা যদিও মাঝে মাঝে বলেন সিনেমা দেখা, সময় নষ্ট, তবে সুযোগ পেলে তিনিও সিনেমা দেখেন। তাঁর প্রিয় সিনেমা ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’। আর আমি এক প্রকার সিনেমাখোর। অনেকের কাছে শুনি, যারা খেতে পছন্দ করে; তাঁরা মন ভালো হলে খায়, মন খারাপ হলে খায়, ঘুমের জন্য খায়, না ঘুমানোর জন্য খায়। আর আমার বেলায় মন খারাপে, মন ভালোতে সিনেমা হলো সবকিছুর একমাত্র সলিউশন। না, তার মানে এই নয় যে, আমি অনেক অনেক সিনেমা দেখে ফেলেছি। আমার জীবনের অন্যতম হতাশা হলো- এক জীবনে সিনেবিশ্বের অর্ধেক সিনেমাও দেখে যেতে পারবো না। যতোই দেখি, তারো বেশি আসলে দেখি নাই। এই বিশ্ব পাড়ি দিতে হলে দরকার কয়েক জন্ম।

আমি আসলে এতক্ষণ ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাইলাম। সিনেমা কে দেখে কয়টা দেখে, আমি সিনেমার কি বুঝি, কতোটা বুঝি, সেসব নিয়ে একদমই লিখতে বসিনি। সিনেমা নিয়ে পড়তে পড়তে এবং সিনেমা দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন আগে মোবাইল ফোন দিয়ে নির্মিত কয়েকটা সিনেমা নিয়ে বেশকিছু লেখা পড়লাম। একটা সিনেমাও দেখে ফেললাম। তখনই মনে হলো, এই নিয়ে একটা কিছু লিখি। আর সেই ভাবনা থেকেই লিখতে বসা।

আমাদের দেশে অনেকেই এখন চলচ্চিত্র নির্মানের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। বলা যায় গত কয়েক বছরে সিনেমা বিষয়ক একটা রিভল্যুশন ঘটে গেছে এ দেশে। মাঝে যেসব কাটপিস আর সেমিন্যুড ঘরানার সিনেমা নির্মিত হচ্ছিলো, সেসব বন্ধ হয়েছে। ভালো গল্পের, ভালো সিনেমাটোগ্রাফির, ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা দর্শক হলে ফিরছেন। যখন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন সিনেমাহলগুলো, ঠিক সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, বেশকিছু সিনেপ্লেক্স নির্মাণের কথা ভাবছেন বাংলা সিনেমার পৃষ্ঠপোষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা; যদিও সেগুলো ঢাকা বেসড তবুও এই ঘুরে দাঁড়াবার সময়ে তাই বা কম কি! পাশাপাশি এখন ছেলে-মেয়েরা বড়ো হয়ে যেমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, তেমন পরিচালকও হতে চায়। তাও আবার সিরিয়াল, টিভিসি, টিভিস্পট, ডকুমেন্টারির পরিচালক নয়; পূর্নদৈর্ঘ্য ছায়াছবির পরিচালক হতে চায়। এই পরিবর্তনগুলো কিন্তু খুবই আশা-জাগানিয়া।

কিন্তু, সিনেমা নির্মাণ তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! একটা ভালো গল্পের সাথে সাথে টেকনিক্যাল অনেক বিষয় আছে যা সিনেমা তৈরির সাথে সম্পর্কিত। তাই, আমি একটা সিনেমা বানাবো’র স্বপ্ন অনেকের কাছেই পরিপূর্নতা পাবার আগেই হতাশায় রূপ নেয়। অনেকে বলেই বসে- এই দেশে কিচ্ছু হবে না রে ভাই! ভালো কাজের কদর নাই এখানে। বাজেট নাই, কিচ্ছু নাই। কিচ্ছু হবে না। আমার পরিচিত অনেকে ভাই-বোন-বন্ধু আছেন, যারা শুধুমাত্র বাজেটের অভাবে, সিনেমা বানাতে পারছেন না। অনেকে বলতেই পারেন, আরে বাজেট কোন ব্যাপার নাকি! গল্প ভালো হলে উপায় একটা বের হয়েই যায়। আমি সে কথা পুরোপুরি মানতে রাজি নই। যে কোন প্রোডাকশনে বাজেট একটা বিগ-ফ্যাক্টর। তবে হ্যাঁ, চাইলেই বাজেটকে নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব। পুরো ক্যামেরা সেটআপটাকে যদি আপনি মিনি সাইজ করে ফেলতে পারেন তাহলে কেমন হয়? একই সাথে ক্যামেরা কস্ট এবং লোকবল দুটোই কমে যাবে ম্যাজিকের মতো।

সিনেমা নির্মাণে সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদ্বীপ হলো- ক্যামেরা। বর্তমানে সিনে-ক্যামেরা হিসেবে আরি, রেড, জেনেসিস, সনি সিনেআল্টা ইত্যাদি সুপরিচিত। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সিনে-ক্যামেরা হলো, রেড। উন্নত প্রযুক্তি আর তুলনামূলক অন্যান্য ক্যামেরার চেয়ে দাম কম হওয়ায়, শুটিং এর জন্য এই ক্যামেরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে যে ক্যামেরাই কিনুন, একটা ভালো মানের ক্যামেরার জন্য আপনাকে বেশ কিছু টাকা গুণতে হবে। কারণ, ক্যামেরা মানে, শুধু ক্যামেরার বডি নয়। এর সাথে আরো অনেক ধরনের এক্সেসরিস আছে। যেমনঃ মেমরি কার্ড, লেন্স, পাওয়ার বক্স, এসবও কিনতে হয় ক্যামেরার সাথে। আর এসব কিনতে গেলে আপনার বাজেটের অনেকটা অংশই চলে যাবে ক্যামেরার পেছনে। এ কারনে, প্রায় সময়ই শুটিং এর জন্য লোকে ক্যামেরা ভাড়া করে। ভাড়া করা সেসব ক্যামেরার প্রতিদিনের ভাড়াও কিন্তু কম নয়। যেমন, ন্যাচার ডকুমেন্টারি আর থ্রিডি সিনেমা নির্মাণের বস হিসেবে পরিচিত আইম্যাক্স ক্যামেরা। এই ক্যামেরা ভাড়া নেয়ার জন্য রীতিমতো কাড়াকাড়ি পরে যায়, বিখ্যাত বিখ্যাত পরিচালকদের মধ্যে। যার ভাড়া, সপ্তাহ প্রতি এক কোটি টাকারও বেশি। এটা শুধুই একটা উদাহরণ। ভয় পাবার কিছু নেই। আপনাকে এসব ক্যামেরা দিয়েই সিনেমা বানাতে হবে, একথা কেউ বলেনি। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশের কারনে এখন অনেক ক্যামেরাতেই হাই রেজ্যুলেশন ভিডিও শ্যুট করা যায়। ডিএসএলআর মুভিকিট দিয়ে শুট করা সিনেমাও অস্কার পাচ্ছে।

আর এসবের বাইরে যদি কেউ ভাবেন বাজেট নাই, ক্যামেরা নাই, কিন্তু সিনেমা বানাবো। তাদের জন্য আছে, জাদুর বাক্স। স্মার্টফোন, সেলফোন বা মোবাইল ফোন। মোবাইল দিয়ে যে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়, এই খবর বেশ পুরনো। এক্ষেত্রে পাইওনিয়ার বলা হয়, পরিচালক সেলি পটারকে। ২০০৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘রেইজ’ নামের একটি সিনেমা। এটিকেই মোবাইল ফোনে নির্মিত প্রথম ফিচার ফিল্ম বলা হয়ে থাকে। বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটির প্রিমিয়ার শো’ও হয় মোবাইল ফোনে। সিনেমাটি গোল্ডেন বার্লিন বিয়ার পুরস্কারের জন্য নমিনেশনও পায়। এছাড়া মোবাইল ফোনে নির্মিত সিনেমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘স্লো স্টিম আয়রন’, ‘ট্যানজেরিন’, ‘আই প্লে উইথ দ্য ফ্রেইজ ইচ আদার’, ‘নাইট ফিশিং’, ইত্যাদি।

তবে স্মার্টফোনে সিনেমা নির্মাণ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। যখন কান চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এবং অস্কার নমিনেটেড হাই-প্রোফাইল পরিচালক, স্টিভেন সডারবার্গ, স্মার্টফোন দিয়ে নির্মিত তাঁর সিনেমা- ‘আনসেন’ মুক্তি দেন। এই সিনেমাটিরও প্রিমিয়ার হয় বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। সাইকোলজিক্যাল হরর জেনরের সিনেমাটির গল্প এক মহিলাকে নিয়ে। সয়ের ভ্যালেন্তিনি নামের সেই মহিলা এক স্টকারের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়ান। ওই লোকের কাছ থেকে মেসেজের পর মেসেজ পেতে পেতে নায়িকার অবস্থা পাগলপ্রায়, অথচ সে তার সমস্যার কথা যখন কাউকে বলেন তখন কেউ তার কথা বিশ্বাস করে না, আর এই নিয়েই সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়।

দ্য নিউ ইয়র্কারের মতে সডারবার্গের সেরা সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘আনসেন’ একটি। সে যাইহোক, ৫৮ মিনিটের চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১.৫ মিলিয়ন ডলার। যা আয় করে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইফোন সেভেনপ্লাস দিয়ে ‘ফোরকে’ ফর্মেটে, মাত্র ১০দিনে সিনেমাটি শ্যুট করেন পরিচালক। সাথে ছিলো ‘ফিল্মিক প্রো’ নামের একটি অ্যাপ।

শুধু হলিউডেই নয়, ভারতেও বেশকিছু শর্টফিল্ম ও মিউজিক ভিডিওর শুটিং করা হয়েছে মোবাইল ফোনে। সম্প্রতি ভারতে নির্মিত ভ্যানডানা ক্যাটারিয়ের মিউজিক ভিডিওটি নিয়ে বেশ আলোচনা হয় দর্শক মহলে। ভিডিওটি নির্মিত হয়েছে আইফোন সিক্সএস দিয়ে। এছাড়া, পরিচালক স্লোক শর্মা যিনি ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ সিনেমার সহকারী পরিচালক ছিলেন, তিনি তার পরবর্তী ফিচার ফিল্ম, মোবাইল ক্যামেরায় ধারন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশেও বেশকিছু শর্টফিল্ম তৈরির পাশাপাশি অনেকেই মিউজিক ভিডিওর কাজ করছেন মোবাইল ফোন দিয়ে। আর ইউটিউবাররা তো আছেনই, যারা হাতের ফোনটি দিয়েই যখন-তখন তৈরি করছেন ভিডিও। তবে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে, ভালো একটি দৃশ্য ধারন করতে হলে লাইট, সাউন্ড, ফ্রেম অনেক কিছু মাথায় রাখতে হয়। আর সেসব মাথায় রাখলে বিখ্যাত পরিচালকদের মতো আপনিও বলতে বাধ্য হবেন, সিনেমা নির্মাণে স্মার্টফোনে একটি সুপার টুল।

এতে ভিডিও করার বেশকিছু সুবিধা আছে যার মধ্যে দুটি বিষয় মোটা দাগে উল্লেখ করা যায়। এক, মোবাইল দিয়ে বাড়ির বাইরে শুটিং করা খুবই সুবিধাজনক। শুটিং এর সময় ভীড় এড়ানো যায়, অভিনেতারা কমফোর্ট ফিল করে এবং অনেকক্ষেত্রে কারো কাছে অনুমোদন নেয়ার দরকার হয় না। এমনকি অ্যাসিস্ট করার লোকজনও কম লাগে। ‘হাই ফ্যান্টাসি’ সিনেমার পরিচালক জেনা বাস এক ইন্টার্ভিউ এ বলেই ফেলেন, ‘মোবাইল ফোনে হাই ফ্যান্টাসির শুটিং শেষ করার পর আমার মনে হলো, আরে এটা তো একেবারে ফ্রি বানিয়ে ফেললাম’। দুই নাম্বার যে সুবিধাটি পাওয়া যায় তাহলো, এর আকার। স্মার্টফোন আকারে ছোট হওয়ায় তা বহন করা বেশ সুবিধাজনক। এছাড়া মোবাইলের সাথে ব্যবহৃত ফ্ল্যাশ, ট্রাইপড, ক্ল্যাম্পস, স্লাইডার ইত্যাদি জিনিসগুলোও বেশ হাল্কা হয়ে থাকে। এর বাইরে, উপরি পাওনা হিসেবে আছে এডিটিংয়ের সুযোগ, যদিও খুব অল্প পরিসরে এডিটিং হয়, তবুও তাৎক্ষনিক এডিটিংয়ে এটা বেশ কার্যকর। অনেক সুবিধার কথা বলা হলো, তবে এখানে একটা কিন্তু, আছে। শুধু হাতের সেলুলার ফোনটি হলেই সিনেমার শুটিং হবেনা। এর সাথে আনুষাঙ্গিক আরো কিছু জিনিসিপত্র লাগবে সিনেমা তৈরির জন্য।

প্রথমত, মোবাইলের ক্যামেরাটা হতে হবে বেশ ভালো রেজুলেশনের। এক্ষেত্রে, আইফোন সেভেন প্লাসকে বলা হয়ে থাকে- বেস্ট মোবাইল ফোন ফর ফিল্ম মেকিং। এটা কিছুটা এক্সপেন্সিভ, তবে ডুয়েল ক্যামেরা, ডিসপ্লে, ব্যাটারি সব মিলিয়ে পয়সা উসুল টেকনোলজি। এই ফোনের অ্যাপারেচার রেশিও, এফ/১.৮, যা গ্যালাক্সি এসসেভেনের চেয়ে কম কিন্তু, দৃশ্যের আসল কালর টোনটা তুলে ধরতে এর জুড়ি নেই। এর পরেই যে ফোনটির নাম আসে সেটি হলো- গুগল পিক্সেল এক্সএল। এটা আইফোন সেভেন এর মতো অতো জোস না, কিন্তু দাম বিবেচনায় এবং ডে-লাইট ক্যাপচারের জন্য এটা আপনার প্রথম পছন্দ হতেই পারে। এফ/২ অ্যাপারেচারের ক্যামেরা সাথে শেক-ফ্রি হ্যান্ডহেল্ড রেকর্ডিং সিস্টেম এই ফোনের ভিডিও রেকর্ডিংকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা। ভিডিওগ্রাফির জন্য এটাকে মোস্ট প্রমিসিং স্মার্টফোন বলা হয়ে থাকে। এছাড়া, আইফোনের পরবর্তি আপগ্রেডেড ফোনগুলোর ক্যামেরা কোয়ালিটি আরো ভালো।

এরপর যার নাম নেয়া যেতে পারে সেটা হলো, স্যামসাং গ্যালাক্সি এসএইট। ফিল্মমেকিং এ নতুন কিছু সম্ভাবনা তৈরি করার জন্যই স্যামসাং, ১২এমপি ডুয়েল সেনসর সাথে এফ/১.৭ অ্যাপারেচারের এই ফোন বাজারে এনেছে। এছাড়া এলজি জিসিক্স, ওয়ানপ্লাস থ্রিটি, গ্যালাক্সি নোটফাইভ, সাওমি মিফাইভ ইত্যাদি আছে ফিল্ম মেকিং স্মার্টফোনের তালিকায়। যেগুলোর দামও সবার হাতের নাগালে। আমি এখানে ফোনের দাম উল্লেখ করলাম না, কারন বর্তমানে সব স্মার্ট ফোনেরই ক্যামেরা কোয়ালিটির দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। তাই বলা যায়, কমবেশি সবার হাতেই ভালো মানের মোবাইল ফোন আছে। প্রয়োজনে সেটাকেই শুটিং ক্যামেরা বানিয়ে ফেলতে পারেন যেকোন সময়।

ফোন তো হলো, এবার আসা যাক ফিল্ম শুট এ ফোনের সাথে আর কি কি টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট দরকার হবে, সে বিষয়ে। অনেক কিছুই হয়তো দরকার হবে প্রয়োজন ও ক্ষেত্র অনুযায়ী, কিন্তু যেগুলো একেবারেই না হলে নয় আমি সেসবের কথাই লিখছি এখানে। যারা মোবাইলে ভিডিও করেছেন তারা জানেন যে, ফোন শুটের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো শেক, জার্ক ছাড়া ভিডিও করা বা প্যান করা। এটা খালি হাতে প্রায় অসম্ভব। আর সেই অসম্ভবকে সম্ভাব্যতা দিতেই আপনার দরকার হবে একটা স্টাবলাইজারের। যাকে গিম্বল নামেও ডাকা হয়। এটা সেলফি স্টিকের মতো একটা ডিভাইস, যা ব্লু-টুথের মাধ্যমে কাজ করে। বাজারে বিভিন্ন দামের স্টাবলাইজার আছে যেগুলোর দাম শুরু হয়, ১৫ হাজার টাকা থেকে। বাজারে এখন মোবাইল ভিডিওর জন্য এসেছে স্টেডিক্যাম স্মুদি, চাইলে সেটাও কিনতে পারেন। আর ক্যামেরা যদি খুব বেশি মুভ করতে নাহয়, সেক্ষেত্রে ব্লুটুথসহ বা ছাড়া ট্রাইপড কিনতে পারেন। দুই হাজার টাকার মধ্যেই বেশ ভালো ট্রাইপড পাওয়া যায়।

মোবাইলে শুট করতে গেলে আরেকটা জিনিস অবশ্যই লাগবে, সেটা হলো লেন্স। মনে মনে ভাবছেন, ওরে বাবা! সেই তো ঘুরে ফিরে একই অংক! ব্যাপারটা মোটেও সেরকম না। ভয় পাবার কিছু নাই, স্মার্টফোনের ভিডিও কোয়ালিটি আরো ভালো করার জন্য বাজারে কিছু পোর্টেবল লেন্স পাওয়া যায়। এগুলো ক্যামেরার লেন্সের মতো নয়, খুবই ছোট, দামও কম। ম্যাক্রো, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, ফিশ লেন্স আছে মোবাইল ক্যামেরার জন্য। এর বাজেটও দুই হাজার টাকা হলেই হবে।

সেলফি টাইপের ভিডিও করতে চাইলে দরকার হবে একটা সেলফি স্টিকের। তবে এসবের বাইরে মোবাইলে শুট করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো, লাইট ম্যানেজমেন্ট। যদি ইনডোর শুট হয় তাহলে অবশ্যই লাইট ব্যবহার করতে হবে। এজন্য আছে এলইডি ফ্ল্যাশ লাইট। এগুলো চার্জ দেয়া যায় এবং ফোন কানেক্টর দিয়ে কানেক্ট করলেই আলো দেয়। এই লাইটের দাম শুরু হয় ৩০০ টাকা থেকে। এছাড়া, ক্যামেরায় ভিডিও করার সময় যেমন নেয়া হয়, তেমন বড়ো লাইট সেটআপও নিতে পারেন প্রয়োজন অনুযায়ী। আরেকটা গুরুত্বপূর্ন জিনিস হলো মাইক্রোফোন। যদি পরিস্কার সাউন্ড পেতে চান তাহলে, ফোনের বিল্টইন মাইক্রোফোন দিয়ে খুব একটা উপকার পাবেন না। দরকার হবে, আলাদা মাইক্রোফোন। সেক্ষেত্রে আপনি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রোফোন কিনে নিতে পারেন।

আর সব শেষে যেটা দরকার এবং খুব জরুরি সেটা হলো বিশেষ কিছু অ্যাপ। ফিল্মমেকিং এ শট কম্পোজিশন অনেক বড়ো একটা বিষয়। শুটিং এর অনেক স্থির চিত্রতে দেখবেন সিনেমাটোগ্রাফার আর পরিচালক একসাথে বসে আঙ্গুল দিয়ে ফ্রেম দেখাচ্ছে, অথবা ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে দেখেন যে শটটা কেমন হতে পারে। মোবাইলে শুট করার সময় আপনিও সেরকম কিছু একটা দেখতে চাইবেন নিশ্চই, যে ফ্রেমটা আসলে কেমন হচ্ছে! আর এর জন্য দরকার মোবাইল বেসড ভিউ ফাইন্ডার অ্যাপস ‘আর্টেমিস’। যার আছে মাল্টিপল ক্যামেরা ফরম্যাটস। আর এটার উপকারিতা হলো প্রয়োজন মতো ছবি সেভ করে রাখা যায়, যা দেখে পরে শট কন্ট্রাস্ট মিলিয়ে নিতে পারবেন সুবিধা মতো। অ্যাপটি খুব একটা কাজের কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে আপনাকে জানিয়ে রাখি, বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার রজার ডিকিন্স আর্টেমিস ব্যবহার করেন।

প্রায় সব স্মার্টফোনেরই বেসিক একটা সেটিংস থাকে যা সিনেমা শুট করার বিষয়টাকে লিমিটেশন দিয়ে দেয়। আর এজন্যই আছে ‘ফিল্মিক প্রো’। এই অ্যাপটি আপনার মোবাইলকে প্রোফেশন্যাল লেভেলের এইচডি ক্যামেরায় রূপান্তরিত করবে, প্রয়োজনীয় ফুটেজ পেতে যা দরকার সে সব অপশনসহ। যেমনঃ ফ্রেমরেট, ফোকাস এক্সপোজার, কালার ইত্যাদি। এরকমই আরেকটি অ্যাপ আছে, ‘সিনেমা এফভি-৫’। মোবাইল ফোনকে পাওয়ারহাউজ ভিডিও ক্যামেরা বানাতে এর তুলনা নেই।

এছাড়া, আপনি যদি একটা অ্যাপ দিয়েই শুট আর এডিট করতে চান তাহলে ‘কিনোমেটিক’ এর নাম আপনাকে মনে রাখতেই হবে। অডিও-ভিডিও ফ্রেম রেট, এক্সপোজার, ফোকাস সবকিছু ঠিক রাখতে কাজ করে কিনোমেটিক। এডিটিং এর বেলায় ট্রিম, ক্লিপ, মিউজিক ইমপ্লিমেন্টেশন ছাড়াও সব ধরনের সুবিধা দিবে আর এডিটিং হয়ে যাবে সহজ একটি কাজ। এছাড়া স্বতন্ত্র এডিটিং এর জন্য আছে ভিডিওশপ যা অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য ফ্রি।

সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সময় আর কনসেন্ট্রেশন লাগে এডিটিং এ। আর সেজন্য সবার সুবিধার্থে আরো কিছু অ্যাপের কথা বলে রাখি; ছোটখাটো ভিডিও এডিটিং এর জন্য আছে ‘অ্যাডোবি’ প্রিমিয়ার ক্লিপ’। গুগল ড্রাইভ থেকেও সরাসরি এই অ্যাপ দিয়ে এডিট করা যায়। প্লে স্টোর থেকে বিনামূল্যে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারবেন। অপরদিকে, মজার কোন ইফেক্ট দিয়ে ভিডিও আপ করতে চাইলে আছে, ‘ফানিম্যাট ভিডিও এডিটর’। এর মাধ্যমে ভিডিওতে সুন্দর সুন্দর কিছু ইফেক্ট আর টেক্সট অ্যাড করা যায়। পাশাপাশি এতে আছে বিল্ট ইন মিউজিক, চাইলে সেগুলোও ব্যবহার করতে পারবেন ইউজাররা। তবে এক্ষেত্রে ইউজারের মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকাতে হবে। অ্যাপের সাথেই এর ব্যবহারিক টিউটোরিয়াল দেয়া আছে। এগুলোর বাইরে ‘এলাইভ মুভি মেকার’ বিনামূল্যে ডাউনলোড করে, ভিডিও সম্পাদনার কাজ করতে পারেন ইচ্ছামতো।

তবে হ্যাঁ, সিনেমা বানাতে গেলে বাজেট অবশ্যই একটা ইস্যু। যারা কম বাজেটে সিনেমা নির্মাণ করতে চান, তারা শুধু বাজেটের কথা ভেবে মোবাইল ফোন দিয়ে সিনেমা নির্মাণ না করে, গল্পের সাথে মোবাইল ফোনে শুট কতোটা রিলিভেন্ট হবে সেই বিষয়টিও খেয়াল রাখবেন। আর মোবাইল ফোনে কাজ করার সময়, এটা বিশ্বাস রাখুন যে আপনার অ্যক্টররাও সিনেমাটোগ্রাফার; কারণ প্রায় সময়ই ক্যারেক্টারদের হাতে ক্যামেরা দিতে হতে পারে, তাই তাদের উপর বিশ্বাস রাখাটা জরুরি। আর সঠিক টুল ব্যবহার করার ব্যাপারে আপনাকেও থাকতে হবে সচেতন। যেমন পর্যাপ্ত আলো পেতে বা আলো নিয়ে খেলা করতে চাইলে কখন ফ্ল্যাশলাইট, কখন ডে লাইট, আগুন, টর্চ আর মোমবাতি ব্যবহার করতে হবে সেটা ব্যবহার করুন প্রয়োজন অনুসারে।

মনে রাখতে হবে, কখনো কখনো মোবাইলে ধারণকৃত ফুটেজে কাঙ্ক্ষিত ‘ডেপথ অব ফিল্ড’ নাও পেতে পারেন। এই বিষয়ে একটু সচেতন থাকতে হবে, তবে দিন শেষে এটা ভেবে ভালো লাগবে যে- মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে যতো সহজে শুট করতে পারছেন, অন্য ক্যমেরা দিয়ে সেটা কখনোই পারতেন না। এসব বিবেচনা করে, বর্তমানে হলিউডের পরিচালকরাও মোবাইল ফোন দিয়ে সিনামা নির্মানের দিকে ঝুঁকছেন। আর এটা আমাদের জন্য একটা ভালো দিক। হলিউড পরিচালকরা এই ফরম্যাট যতো বেশি ফিচার ফিল্মে ব্যবহার করবে, এই বিষয় নিয়ে সবার ততো বেশি অ্যাটেনশন বাড়বে। আর নিত্য-নতুন আপডেটেড অ্যাক্সেসরিজ আসবে বাজারে।

ভাবুন, ‘ট্যানজেরিয়ান’ ও ‘আনসেন’, ডিফল্ট ক্যামেরা দিয়ে শুট করা হয়নি বরং এই সিনেমাগুলো নির্মাণে এমন একটা টুল ব্যবহার করা হয়েছে যা চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্মে এনেছে ফ্লেক্সিবিলিটি। মোবাইল ফোনে শুটের ফলে মানুষের একান্ত এমন কিছু গল্প উঠে আসছে ফ্রেমে ফ্রেমে, যা হয়তো লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন থিওরির রমরমে মুভি সেট থেকে আসতো না। বলা যায়, যখন কেউ একটা আইফোন কিংবা স্মার্ট-ফোন ডিভাইস নিয়ে ঘুরছে, আদতে সে একটা পোর্টেবল স্টুডিও পকেটে করে নিয়েই ঘুরছে। সুতরাং কি হচ্ছে, কি হবে, কিভাবে হবে? সেসব ভেবে-ভেবে সময় নষ্ট না করে, হাতের ফোনটিকে বানান প্রিয় স্টোরিটেলার; আর আপনার গল্পগুলো শেয়ার করুন সবার সাথে। সিনেমাবিশ্ব আর কোটি কোটি দর্শক অপেক্ষা করছে, বিগস্ক্রিনে আপনার গল্প দেখার জন্য।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button