মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

সবাইকে মাতিয়ে রাখা মীরও যখন চারবার সুইসাইড করতে যান!

মীরাক্কেল খ্যাত জনপ্রিয় উপস্থাপক মীর চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন! কতদিন আমার রাত কেটেছে ইউটিউবে মীরাক্কেলের পুরানো এপিসোড দেখে। প্রতিযোগী আসে, প্রতিযোগী যায়- মীর ধ্রুবক হয়ে মাতিয়ে রাখেন মীরাক্কেল। এই মানের সেন্স অফ হিউমার, ইন্সট্যান্ট কিছু একটা বলে ইমোশনকে ডাইভার্ট করে দেয়ার ক্ষমতা – খুব কম মানুষের মধ্যেই আছে।

মানুষকে হাসানো তো বড় সহজ কর্ম নয়, অথচ, এই লোকটা দিনের পর দিন মানুষকে হাসিয়ে গেছেন। সুন্দর কিছু মুহুর্ত তৈরি করেছেন৷ কিন্তু, তার নিজেরও একটা জগত আছে। যে জগতের জাজমেন্ট আসলে বাইরে দুনিয়ায় তিনি কি করছেন সেসব দিয়ে বিচার করার কারো সাধ্য নেই। আমরা আসলে কখনোই জানতে পারি না, একটা মানুষ কতটা তীব্র অনুভূতিপ্রবণ ভেতরে।

যে মানুষটা বাইরে কঠিন খোলসে নিজেকে আড়াল করে, তারও একটা ভঙ্গুর মন আছে। সেখানটা কতবার ভাঙ্গে, কতবার এলোমেলো হয় তা কেউ জানে না। কারণ, জগত দূর্বলতমদের জন্যে নয়। দূর্বলতা প্রকাশকে মানুষ তীর্যকচোখে বিচার করে। যতই একজন আরেকজনকে বোঝার ভান করুক, একটা পর্দা আসলে কোথাও না কোথাও থেকেই যায়। কথার শেষেও কথা থাকে। কিছু কথা, কিছু ব্যাথা, কিছু আঘাত, কিছু দীর্ঘশ্বাস মানুষের একান্তই নিজস্ব। তাকে বোঝার যেমন কেউ, বোঝানোরও উপায় খুব কম।

মীরাক্কেল, মীর আফসার আলী

২০১৭ সাল থেকে এই ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর এই সময়টার মধ্যে মীর আফসার আলী চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর রেডিও মির্চিতে কিছু কথা বলেছিলেন মীর। তিনি বলেন,

“আয়নাটা এখানে কাচের নয়, আয়নাটা এখানে রক্তমাংসের। এবং সেই আয়নার সামনে ‘সকালম্যান’ মীর দাঁড়াতে ভয় পায় না।

এটা বলতে আমার কোনও কুণ্ঠা নেই, কোনও লজ্জা নেই যে বিটুইন দ্য টোয়েন্টি-ফিফথ অফ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ অ্যান্ড দ্য টেন্থ অফ সেপ্টেম্বর ২০১৯, আই, মীর আফসার আলি হ্যাভ অ্যাটেম্পটেড সুইসাইড ফোর টাইমস।

আমি এই কথাগুলো শেয়ার করছি আপনার সঙ্গে বিকজ ইউ বিলং টু মাই এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি। এবং আমার এই আশ্বাসটা রয়েছে, এই বিশ্বাসটা রয়েছে দ্যাট ইউ উইল নট জাজ মি। ইউ উইল নট আস্ক মি কোয়েশ্চেন্স যে কেন ‘সকালম্যান’, তোমার লাইফে তো সব কিছু রয়েছে, ইউ আর ব্লেস্‌ড উইথ এভরিথিং, তাহলে কেন?

আই উইল স্পেয়ার ইউ দ্য ডিটেলস। অত গভীরে ঢুকতে চাই না। তাহলে ক্ষতগুলো আরও তাজা হয়ে যাবে। হ্যাঁ সব কিছু রয়েছে আমার। আল্লা তালা সব কিছু দিয়েছেন। আমি যা যা কিছু স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি সে সব কিছু আমার দখলে রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু একটার পেছনে ছুটতে থাকা, কিছু একটা তাগিদ, কোনও একটা জেদের বশে, করেছি এই কাজ। একবার নয়, দু’বার নয়, চার-চারবার।”

মীরাক্কেল, মীর আফসার আলী

উল্লেখ্য, ১০ সেপ্টেম্বর ছিল সুইসাইড প্রিভেনশন ডে। সেদিন নিজের অব্যক্ত কিছু কথা এভাবেই রেডিওতে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন তিনি। যেন মানুষ বোঝে, আপাতদৃষ্টিতে যাকে খুব সফল মনে হয়, সুখী মনে হয়, যে সারাক্ষণ লোক হাসিয়ে বেড়ায়, মানুষকে এন্টারটেইন করে- তার জীবনেও হতাশা আছে। তাকেও কোনোদিন কঠিন কিছু ভাবতে হয়। তার জীবনের পথটাও মসৃণ নয়। কোথাও বুকের মধ্যে সেও ক্ষত লালন করে। সে যে কারনেই হোক না কেন, জাজমেন্টাল না হয়ে মানুষ যেন এটাই ভাবে যে, কারো জীবনেই চিরায়ত সুখ বলে কিছু নেই। হতাশা, ক্ষত, দুঃখবোধও জীবনের একটা অংশ। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া সে মানুষটার পক্ষেও মাঝে মাঝে মুশকিল হয়, যাকে দেখে লোকের হিংসা হয় এবং ভাবে তার মতো যদি হতাম তবে বোধহয় ভাল থাকতাম…

মীর যে চারবার সুইসাইড এটেম্পট নিয়েছিলেন, তার মধ্যে তিনবার তাকে হসপিটালাইজড করতে হয়েছিল। একবার এমন ঘটেছিল যে, তিনি তার ব্যান্ড ‘ব্যান্ডেজ’ নিয়ে দুইঘন্টা স্টেজে পারফর্ম করেন। মানুষ খুব হাসে সেদিন। কিন্তু হুট করেই তার ইমোশনাল ব্রেকডাউন হয়। শো শেষে যখন উপরে যান, খুব ডিপ্রেসড লাগছিল তার এবং তখনই নিজের জীবনের ইতি ঘটাতে চেয়েছিলেন। মীরের জীবনে এমন দিনও এসেছে, যেদিন তিনি গ্রীনরুমে বসে হাউ মাউ করে কেঁদেছেন।

কেমন লাগে ওই সময়ে? মীর কলকাতার সংবাদপ্রতিদিনে ইন্দ্রনীল রায়ের কাছে গল্পগুলো করেছিলেন। সেই প্রতিবেদনেই জানা যায় অনেকটা। মীর বলেন এভাবে, “সেই সময় নিজেকে অসহ্য লাগে জানেন। ইউ ফিল ওয়ার্থলেস। সঙ্গে কাজ করে একটা সাংঘাতিক প্রেশার। এই যে এত লোককে এন্টারটেন করার দায়িত্ব, এত দর্শককে খুশি করার প্রেশার, এত শ্রোতার সামনে নিজের বেস্টটা দেওয়া- এটা একজন পারফর্মারের কাছে সাংঘাতিক স্ট্রেসফুল। এটা জীবনের সব ক্ষেত্রে হতে পারে।”

আসলে কিছু সময় আসে, যখন সব পিছুটানের বাঁধনকেও আলগা মনে হয়। আমি দেখেছি, কেউ আত্মহত্যা করলে অনলাইনে খুব জাজমেন্টাল মন্তব্য করে মানুষ। বলে, শালা ইহজীবন হারাইলো, পরকাল হারাইলো। মা বাবার কথাও ভাবলো না। কুলাঙ্গার ইডিওট ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে মানুষ যখন ডেস্ট্রাকটিভ ভাবনা ভাবে, সেটাকে এতো সরলীকরণ করে জাজমেন্ট করা খুব ভুল কাজ। আমরা মানুষকে বুঝতে কম চাই, সবসময় বিচার করতে থাকি বলে একজন মানুষের মনের অবস্থাকে কখনো বোঝা হয় না আমাদের। একটা মানুষকে তার অবস্থায় বুঝতে না চেয়ে আমরা আরো মানসিক অত্যাচার করি এই বলে, মা বাবার কথা ভাবো, ধর্মীয় কথা ভাবো ইত্যাদি ইত্যাদি সলুশন দিয়ে বেড়াই। এগুলো খুব কাজে লাগে না আসলে।

মীরাক্কেল, মীর আফসার আলী

মীরের ক্ষেত্রেও অনেকটাই এমন হয়েছে। যখন আত্মহত্যার কথা মাথায় আসে তখন তিনি কি ভাবতেন? কোনো পিছুটান কি অনুভব করতেন? মীর ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, “ওই মুহূর্তটায় একটা অদ্ভুত ডিসকানেক্ট কাজ করে। তখন আর কারও কথা মনে হয় না। শুধু মনে হয় এই জীবনটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আর কোনও মানে নেই। (গলা ধরে আসে) লাস্ট বার ওয়েন আই অ্যাটেম্পটেড সুইসাইড, আমি ৮৭টা স্লিপিং পিল খেয়ে ফেলেছিলাম। একটাও স্লিপিং পিল মুখে দেওয়ার সময় আমার কারও কথা মনে হয়নি। একবারও মনে হয়নি আমি কোনও ভুল কাজ করেছি।”

মীর বলছেন তিনি লজ্জিত। এই কাজটা চারবার করতে গেছেন কিন্তু এটাকে ঠিক কাজ মনে হয়না তার। তাই কেউ যদি আত্মহত্যা করতে চায় তার কি করনীয়, সেটা নিয়ে মীর বলছেন এরকম –

“প্রথমেই বলি, এরকম সুইসাইডের চিন্তা সত্যি কখনও মাথায় আসে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কাছের কোনও মানুষকে সেটা জানান। পাশে কেউ না থাকলে তাকে ফোন করে কথাটা বলুন। সেই মানুষটির সঙ্গেই কথা বলবেন যিনি আপনাকে জাজ করবেন না, যিনি আপনাকে রিবিউক বা অপমান করবেন না।

দ্বিতীয়ত, নিজের মনের ভিতর যদি ঝড় শুরু হয়, সেটাকে দয়া করে আটকাবেন না। ইংলিশে যাকে বলে, ডোন্ট বট্‌ল ইট আপ। আপনি যত ভেতরের ঝড় আটকে রাখবেন নিজের ভেতরে, মনে রাখবেন সেই ঝড় কিন্তু বিস্ফোরণের মতো ফাটবে একদিন। তাই কিছুতেই সেই স্টেজ অবধি নিজেকে নিয়ে যাবেন না।

আর ফাইনালি, যদি কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যান, প্রথম দিন থেকে তাঁকে সবটা বলুন। আমি প্রথম প্রথম অনেক কিছু বলতাম না। পরে বুঝেছি আমি কত বড় ভুল করেছি। তাই যাঁরা ডাক্তার বা মনোবিদের সাহায্য নিচ্ছেন, তাঁদের পায়ে পড়ে বলছি, কিছু লুকোবেন না ডাক্তারের কাছে।”

মীরাক্কেল, মীর আফসার আলী

জানি না আসলে মীরের বলা কথাগুলো কারো কাজে আসবে কিনা। কিংবা মীর চারবার আত্মহত্যা করতে গেছেন দেখে কেউ বলবে কিনা “সুখে থাকলে ভূতে কিলায়।” আমি শুধু জানি, এই স্টেজটা খুব অসহ্য। অদ্ভুত এক লড়াই, মনোযুদ্ধ। সব কিছুর সাথে ডিটাচ ফিল করা, শুণ্যতা, ভেতরে ভেতরে একদম মরে যাওয়া, অনেকদিনের ডিপ্রেশন – এসব খুব অসহ্য। কারো সাথে একাত্ম না হতে পারা, চেনা মানুষকেও অচেনা লাগা, একটা অসাড়তা, প্রগাড় নিস্তব্ধতাকে ভালবেসে ফেলা, হাঁটতে হাঁটতে অন্যমনস্ক হয়ে চেনা রাস্তাটাও ভুল করা ফেলা, একটা গুমোট ভাব, মনের ভেতর ঝড়, নিজেকে হারিয়ে ফেলা, অনেক মানুষের মধ্যেও নির্জনতা খুঁজে নেয়া।

এসময়গুলো যেকারো জীবনে আসতে পারে৷ মীর যেদিন রেডিওতে আত্মহত্যা নিয়ে বলছিলেন, সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। খুব মন খারাপ ছিল সেদিন, আরো একটা বছর চলে গেল জীবন থেকে। খেই হারিয়ে ফেলি মাঝেমধ্যে। সেদিনও ইউটিউবে হাসার জন্যে মীরাক্কেল দেখলাম, ফান ভিডিও দেখলাম।

একটু হাসির জন্যে এতো স্ট্রাগল করতে হয় মাঝে মধ্যে যে, বিতৃষ্ণা লাগে। আর যে মানুষটা সারাক্ষণই হাসি মুখে থাকে, মানুষকে হাসায় ডিপ্রেশন হলে তার কেমন লাগে! অনেক ভয়াবহ লাগার কথা। কিন্তু সেও ওভারকাম করে এরকম সময়, আবার হাসায় মানুষকে, নিজে হাসে। তাই জীবনে একটু থামা দরকার, কঠিন সময়ে একটু ধীরে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। হয়ত,দুঃসময়গুলোও ওভারকাম করা সম্ভব। ভালো দিন আসার জন্যে যে নিকষ আঁধারে হারিয়ে যাওয়ার আগে আরেকটা দিন বাঁচার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়….

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button