এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

‘সংখ্যালঘু’ হওয়ার মতো অপরাধ এই পৃথিবীতে আর নেই!

আরও একবার দ্রোহের আগুনে পুড়লো মানবতা। আরও একবার ধর্মের নামে চালানো হলো অত্যাচার, করা হলো বর্বর নিকৃষ্ট আচরণ। পৃথিবীতে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু হওয়াটা যে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, এটা যে পাপের সর্বোচ্চ স্তর- সেই প্রমাণটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো আরেকবার। ভারতের উত্তরপ্রদেশে পনেরো বছরের এক মুসলিম কিশোরের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী একটা সংগঠনের কয়েক কর্মী। কিশোরের অপরাধ ছিল, যুবকদের দাবী অনুযায়ী সে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে রাজী হয়নি!

শরীরের ষাটভাগে পোড়া ক্ষত নিয়ে আহত সেই কিশোর এখন কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বেডে। নিজের মুখে সে গণমাধ্যম আর পুলিশের কাছে বলেছে তার ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা, কিভাবে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মারধর করে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়ার জন্যে জোর করা হয়েছে তাকে, রাজী না হওয়ায় কেরোসিন ঢেলে তার গায়ে আগুন দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে সে।

অথচ উত্তরপ্রদেশের চান্দাউলি (যেখানে ঘটনাটা ঘটেছে) জেলার পুলিশ সুপার বলছেন, আহত কিশোর নাকি নাটক করছেন, ঘটনাটা সাজানো, সে নাকি নিজেই নিজের গায়ে আগুন দিয়েছে! পুলিশের ভাষ্যমতে, সেই মুসলিম কিশোর গণমাধ্যমে একরকম বয়ান দিয়েছে, আবার পুলিশকে নাকি ভিন্ন কথা বলেছে।

পুলিশের দাবী, সেই কিশোরের ওপর অত্যাচার চালানোর সিসিটিভি ফুটেজ তাদের কাছে আছে, কিন্ত গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার কোন ফুটেজ তারা পায়নি, আর সেকারণেই তাদের ধারণা, আহত কিশোর নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে সাম্প্রদায়িক একটা রূপ দিতে চাইছে।

ভারতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের গত কয়েকটা ঘটনা যদি আপনি একটু গভীরভাবে অনুসরণ করে থাকেন, তাহলেই বুঝে যাওয়ার কথা, সবকিছুই চিত্রনাট্য অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগেও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়ার জন্যে বাধ্য করা হয়েছে মুসলমানদের, এদের মধ্যে কেউকে পিটিয়ে মেরেও ফেলা হয়েছে। পুলিশ অপরাধীকে ধরার পরিবর্তে উল্টো ভিক্টিমের গায়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন কয়েকবারই।

তাবরেজ আনসারী নামের এক মুসলিম যুবককে ঝাড়খন্ডে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল এবছরের জুন মাসে। বৈদ্যুতিক পিলারের সঙ্গে বেঁধে মোটরসাইকেল চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়েছিল তাকে, বলা হয়েছিল- ‘জয় শ্রীরাম বোল!’ মারের হাত থেকে বাঁচার আশায় সেটা বলেওছিল তাবরেজ, কিন্ত প্রাণটা বাঁচেনি তার। অথচ পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে এসেছে, তাবরেজ নাকি হার্ট এটাকে মারা গেছে, তার খুনীদের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ!

মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে গো-রক্ষার নামে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। জায়গায় জায়গায় জন্ম নিয়েছে বিভিন্ন গো-রক্ষক সংস্থা, আর বজরং দল বা এরকম কট্টরপন্থী নানা সংগঠন তো আগে থেকেই ছিল। উত্তরপ্রদেশে এসবের প্রকোপটা তুলনামূলকভাবে বেশিই, যোগী আদিত্যনাথ সেখানে রামরাজ্য নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন। হিন্দু ধর্মের প্রভু রামের নাম নিয়ে তারা সংখ্যালঘুদের ওপর চালাচ্ছে নির্যাতন, এরচেয়ে বড় কৌতুক আর কি হতে পারে?

তাবরেজ আনসারীই বলুন, কিংবা জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে রাজী না হওয়ায় আগুনে পুড়ে যাওয়া এই কিশোর- ওরা কখনও বিচার পাবে না। সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অপরাধ, কখনও কখনও এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় নিজের জীবন দিয়ে। তাবরেজ আনসারী যেমন করেছেন, ভুক্তভোগী কিশোরকে যেমন অগ্নিদগ্ধ হতে হয়েছে।

পুলিশের এফআইআরে তাবরেজের পরিচয় লেখা থাকবে গণপিটুনির শিকার হয়ে হৃদরোগে মারা যাওয়া এক মোটরসাইকেল চোর হিসেবে, এই কিশোরকে দায়ী করা হবে মিথ্যে অভিযোগকারী হিসেবে। কোথাও লেখা থাকবে না, এই ঘটনাগুলো ছিল সংখ্যালঘু একটা সম্প্রদায়কে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মান্ধদের অত্যাচারের বিশাল উপন্যাসের ছোট্ট কয়েকটা অনুচ্ছেদ মাত্র…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button