মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমি একজন মেরুদণ্ডী মানুষের কথা বলছি…

মানুষের শরীরের অনুপাতে কলিজার পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। তবে মিজানুর রহমান নামের এই মানুষটার পুরো শরীরটাই বোধহয় কলিজা দিয়ে গড়া। নইলে কি আর ওয়াসার এমডিকে ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত খাওয়াতে চলে আসেন কারওয়ান বাজারের ওয়াসা ভবনের সামনে? গতকাল সবগুলো মিডিয়ার হট টপিক ছিলেন এই ভদ্রলোক। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষ হলে মেরুদণ্ড থাকাটা খুব জরুরী, নিজের অধিকার ভুলে গিয়ে অমেরুদণ্ডী প্রাণী হয়ে বেঁচে থাকার কোন মানে নেই।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৭ই এপ্রিল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে ওয়াসার দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে জানানো হয়, ঢাকা শহরের শতকরা ৯১ ভাগ মানুষই ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করেন। বেশিরভাগ এলাকার পানিতেই তীব্র দুর্গন্ধ ও ময়লা পাওয়া যায়। প্রতিবছর পানি ফুটিয়ে পান করার পেছনেই ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হয় বলে জানানো হয়েছিল টিআইবির পক্ষ থেকে।

টিআইবি’র এই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান বলেন, ‘ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও বিশুদ্ধ। একে ফুটিয়ে খাওয়ার প্রয়োজন হয় না।’ এ ছাড়া টিআইবির এই প্রতিবেদনকে তিনি নিম্নমানের বলে উল্লেখ করেন।

ওয়াসার এমডির এই বক্তব্যের পর গতকাল জুরাইনের কয়েকজন বাসিন্দা ব্যতিক্রমী এক প্রতিবাদ করতে আসেন কারওয়ান বাজারের ওয়াসা কার্যালয়ের সামনে। তাদের সঙ্গে ছিল কল থেকে সংগ্রহ করা ওয়াসার পানি, চিনি এবং লেবু। ওয়াসার এমডিকে ওয়াসার পানি দিয়ে বানানো শরবত খাওয়াতে এসেছিলেন তারা।

এই কর্মসূচীর নেতৃত্ব দিয়েছেন মিজানুর রহমান নামের জুরাইনের এক বাসিন্দা। সংবাদমাধ্যমের সামনে মিজানুর রহমান জানান, ‘এর আগেও ওয়াসার পানির খাওয়ার উপযোগীতা নিয়ে আমরা অভিযোগ জানিয়েছি, কোন কাজ হয়নি তাতে। এখনও রোজ ময়লা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পানি খাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে মসজিদের টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিংবা মিনারেল ওয়াটার কিনে পান করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ওয়াসার এমডির বক্তব্য আমাদের পীড়া দিয়েছে। তিনি বলেছেন- এই পানি শতভাগ সুপেয়। যদি সুপেয় পানি হয়, তবে তাকে এই পানির শরবত আমাদের সামনে খেতে হবে। আজ আমরা একটা সমাধান নিয়েই এখান থেকে যাব।’

দিনভর এই নিয়ে নাটক চলেছে ওয়াসা ভবনের সামনে। শুরুতে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল সেখান থেকে, তবে সংবাদকর্মীরা হাজির হওয়ায় প্রতিবাদকারীদের ওয়াসা ভবনে ঢুকতে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়াসার কর্মকর্তারা ওয়াসার পানির শরবত খেতে রাজী হননি। ঢাকা ওয়াসার এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, “উনি আজকে আসছেন শরবত খাওয়াতে, আমরাও গ্রহণ করলাম। তবে উনি যে শরবত বানিয়ে এনেছেন ওটা কোন পানি দিয়ে বানিয়ে এনেছেন তা আমি বলতে পারবো না। সমস্যার কথা জানালেন, আমরাও জানলাম। অতি দ্রুত এর সমাধান করার চেষ্টা করবো। সমস্যা সমাধান করে তারপর জুরাইনে গিয়ে শরবত খেয়ে আসবো আমরা।”

চারপাশে প্রতিদিন এত অনিয়ম ঘটে চলেছে, আমরাও সেগুলোকে মেনে নিয়ে বেঁচে আছি, যেন এসব অনিয়মই ভবিতব্য! প্রতিবাদ করার কেউ নেই কোথাও। ঢাকার গণপরিবহনে নারীদের নিপীড়ণ করা হয়, সেসবের প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না কাউকে, উল্টো নিপীড়ককে বাঁচাতে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন অনেকে! ফুটপাথে উঠে যাচ্ছে মোটরসাইকেল, পথচারীদের হাঁটার জায়গাটাও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ফুটপাথ তো মোটরসাইকেল চালানোর জায়গা নয়, কিন্ত কয়জন প্রতিবাদ করছে বলুন তো? ওয়াসার পানির সমস্যাটা তো আজ নতুন নয়, কয়জন রাস্তায় নেমেছিলেন সমাধান চেয়ে?

এরকম উদাহরণ চারপাশে আরও হাজার হাজার দেখা যাবে। আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, যে অনিয়মে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, সেটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ‘ঝামেলায় জড়ানোর’ কথা আমরা কখনোই ভাবি না। কিন্ত মিজানুর রহমান ভেবেছেন, কারণ তার পিঠে শক্ত একটা মেরুদণ্ড আছে, সেই কথাটা তিনি ভুলে যাননি। এর আগেও রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি রাস্তায় নেমেছিলেন, পুলিশের জলকামানের ওপরে দাঁড়ানো তার একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

তবে ব্যতিক্রমী এই প্রতিবাদ করায় ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে মিজানুর রহমানকে। ফেসবুকে মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ‘গতকাল আমরা কর্মসূচি পালন করায় আজ আমার শ্বশুরবাড়িতে ওয়াসার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ নওয়াজ আলী লোকজন নিয়ে গিয়ে হুমকি দেন। তিনি হাজি খোরশেদ আলী সরদার রোডে অবস্থিত আমার শ্বশুর বাড়ির লোকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের পাশাপাশি আমাকে দেখে নেওয়ার কথা বলেন। একজন ওয়াসার কর্মকর্তা কীভাবে এমন মাস্তানের মতো আচরণ করতে পারেন। তারা আমার শ্বশুড় বাড়িতে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে অন্তত একবার কথা বলতে পারতো।’

আমাদের দেশে সিংহভাগ মানুষেরই মেরুদণ্ড নেই। উচিত কথা বলার সামর্থ্য নেই, সাহস নেই। আর মিজানুর রহমানের মতো কেউ যদি সাহস করে প্রতিবাদ করেও বসেন, তাদের দমিয়ে দেয়ার জন্যে অমেরুদণ্ডী প্রাণীরা উঠেপড়ে লাগেন! সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড থাকাটা যে অনেকের জন্যেই হুমকিস্বরূপ! সেজন্যেই তারা মিজানুর রহমানের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার মিশনে নেমেছেন এখন…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button