খেলা ও ধুলা

আমার চোখে মেসি, বাবার চোখে মেসি

গোটজের শটে বলটা জালে জড়িয়ে সেরে উঠলো না ঠিকঠাক, ঠেকানোর উপায়টা জানাও ছিল না সার্জিও রোমেরোর। জার্মান বিগ্রেড ছুটলো বুনো মোষের বেগে। মারিও গোটজে কিংবা সুপার মারিও, যাই বলি না কেন; দুই যুগ পরে জার্মানীকে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা উপহার দিলেন অতিরিক্ত সময়ের দারুণ এক গোলে। শেষ বাঁশি বাজালেন রেফারি, মারকানায় তখন অদ্ভুত এক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। একপাশে জার্মানদের শিরোপাজয়ের উল্লাস, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ভাঙা হাটের বিষণ্ণতা। গোটজে-লাম-শোনস্টেইগারদের প্রেমিকা কিংবা স্ত্রীরা নেমে এসেছেন মাঠে, আর নীল জার্সিতে মাচেরানো-হিগুয়েনরা যেন বিষাদের বাতাবরণে ঢাকা।

ভোররাত পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশে। রোজার মাস, সেহেরী নামছে না গলা দিয়ে। টিভিপর্দায় চোখ রাখতেও ইচ্ছে করছে না। সেখানে তো শুধু কষ্টের চাষবাস। প্রিয় দল ব্রাজিল ক’দিন আগে ৭-১ এ হেরেছে জার্মানদের কাছে। ব্রাজিল সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনার হারে কষ্ট পাবার মানে নেই কোন। অথচ আমার কষ্ট হচ্ছে, একটা চাপা ব্যথা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে যেন। ফেসবুকের নিউজফিডে স্ক্রল করি, সেখানে একদলের আনন্দ উল্লাস, অন্যপাশে পরাজিতদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। হুটহাট কিছু ছবি চলে আসে চোখের সামনে, তাকিয়ে থাকাটা কষ্টকর। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে অযথাই। কিছু করার নেই, বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলেও ঘুম আসবে না আজ। টিভি পর্দাতেই চোখ রাখি আবার।

সোনালী ট্রফিটার ঠিক সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কারটা নিতে মঞ্চে উঠলেন একজন। নীল পোষাকে ধবধবে সাদা এক প্রতিমূর্তি, ফুটবল মাঠে ঈশ্বরের প্রতিমা যেন। হাতছোঁয়া দূরত্বে থাকা শিরোপাটার দিকে ফিরেও তাকালেন না ‘লিওনেল আন্দ্রেস লিও মেসি’। তিনি জানেন, এই শিরোপা তাঁর নয়। স্বর্নের প্রলেপে মোড়ানো শিরোপাটাও জানে, সে মেসির নয়। ফুটবল রোমান্টিকদের চোখে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেদনাবিধুর দৃশ্যগুলোর একটি, মেসি হেঁটে যাচ্ছেন জুলেরিমে কাপটাকে পেছনে ফেলে, শূন্য চোখে মেসি তাকিয়ে দেখছেন জার্মানদের উল্লাস। উল্লাসে মাতার কথা ছিল তাঁর, ট্রফিটা দুই হাতে তুলে ধরে চুমু খাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্ত সব গল্পের সমাপ্তিতে তো ‘হ্যাপি এন্ডিং ঘটে না। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শিরোপাযুদ্ধের গল্পটাও এমন হতাশায় মোড়ানো।

পরের বছর আরেক রোজা। এরপরের বছরও রমজান মাস। পরপর দুটো কোপা আমেরিকা, বৈশ্বিক শিরোপার সামনে থেকে ফিরে আসেন লিওনেল মেসি। দু’বারই পেনাল্টি শুটআউটে শিরোপা হাতছাড়া, শেষবার তো প্রথম শটে নিজেই উড়িয়ে মেরেছেন বাইরে। ক্লদিও ব্রাভো, ক্লাব সতীর্থ তাঁর, হাতের তালুর মতো চেনেন ওকে, ব্রাভোর মুভমেন্ট মেসির চাইতে ভালো কারো জানার কথা নয়, সেই ব্রাভোর মাথার অনেকটা ওপর দিয়ে চলে যায় চর্মগোলক, সেই সঙ্গে আর্জেন্টিনার শিরোপাস্বপ্নটাও। মেসি এসে বসেন ডাগআউটে, চেহারায় তাঁর মৃত্যুর শীতলতা। সময়তা যেন থমকে গেছে, চারিদিকে এতো কোলাহল, মেসির সামনের পৃথিবীতে সেই শব্দের তীব্রতা প্রবেশ করতে পারে না, নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নেমে আসে শ্মশানের নীরবতা! আগের বছর সান্তিয়াগোর এস্তোদিও ন্যাশিওনাল কি এতটা নীরব ছিল? মনে হয় না, স্বাগতিকদের শিরোপা উৎসবে সেবার ঢাকা পড়ে গিয়েছিল মেসির কষ্ট, নিউজার্সি সেটা করেনি।

ভোরবেলায় টিভির স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ আসে, লিওনেল মেসি অবসর নিয়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। আর্জেন্টিনা ভক্ত নই, তবুও শরীরে কাঁপন ধরে এই খবরে। একদিন মেসি ফুটবল খেলবেন না, বার্সেলোনার জার্সিতে জাদুকরকে আর দেখা যাবে না, এসবই ধ্রুব সত্য। কিন্ত মন তো মানবে না সত্যিটা। শেষের শুরুটা কি এখানেই হয়ে গেল? সংবাদমাধ্যম মেসির বক্তব্য প্রচার করে, স্প্যানিশ বা অজানা কোন ভাষায়, বোঝা যায় না কথাগুলো। বাংলাতে তর্জমা চলে আসে। মেসি চেষ্টা করেছিলেন, নিজের সবটুকু দিয়ে, সবটা সামর্থ্য বাজী রেখে। হয়নি, শিরোপাটা আসেনি ঘরে। মেসির চেষ্টা আমরা দেখেছি, নিজেকে কতটা উজাড় করে দিয়েছেন মাঠে, ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হয়ে দলকে টেনে তুলেছেন শিরোপার মঞ্চে। আর্জেন্টিনার রোড টু দ্যা ফাইনাল মানেই তো লিওনেল মেসির একক শো!

অথচ জুরিখের রাতগুলো কি আলো ঝলমলে ছিল! সেই ২০০৯ থেকে শুরু। এক-দুই-তিন করে টানা চারবার বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় তিনি, প্রথমবার কেউ এই কীর্তি গড়লো। ২০১৫ তে আবারও রোনালদোকে হটিয়ে পেয়েছেন পঞ্চম ব্যালন ডি অর। এখনও যেটা সর্বোচ্চ। সোনালী রঙের বলগুলো নিয়ে মেসির নিষ্পাপ হাসিটা তো ফুটবল ইতিহাসেই বাঁধিয়ে রাখার মতো ছবি। পেপ গার্দিওলার সঙ্গে তাঁর জুটিটা ছিল সম্ভবত কোচ-খেলোয়াড় জুটির সেরা উদাহরন। মধ্যমাঠের দুই কাণ্ডারী জাভি-ইনিয়েস্তার সঙ্গে মেসির বোঝাপড়ার কোন জবাব জানা ছিল না প্রতিপক্ষ কোচ-ডিফেন্ডারের। এক মৌসুমে ছয় শিরোপা, ৯১ গোলের মাইলফলক, দ্বিতীয়বারের মতো ট্রেবল জয়- কোন কীর্তিটা গড়েননি মেসি!

হ্যাঁ, একটা কীর্তি গড়া বাদ রয়ে গেছে এখনও, দেশের হয়ে একটা শিরোপা জেতা। হরমোন সমস্যায় আক্রান্ত ফুটবলপাগল ছেলেটা আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন শুধু বার্সেলোনা তাঁর চিকিৎসার খরচাটা দেবে বলে! প্রস্তাব এসেছিল স্পেনের হয়ে খেলার, মেসি নাকচ করে দিয়েছেন সেটা। স্পেন তাঁকে অন্ন দিয়েছে, পরিচিতি দিয়েছে, চিকিৎসা করিয়েছে, স্পেন থেকেই টাকাপয়সা আয় করেছেন, ফুটবলের জাদুতে আজকের মেসি হয়েছেন। কিন্ত জন্মভূমি, মাতৃভূমি শব্দগুলো উঠলেই তো মেসির মনে পড়ে যায় আর্জেন্টিনার কথা, রজারিওর রাস্তায় ফুটবল খেলে বেড়ানোর সোনালী দিনগুলো। ‘লা মাসিয়া’র দিনগুলো ছাপিয়ে মেসির মন পরে রয় নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজ ক্লাবের ছোট্ট চৌহদ্দিতে। দেশ মানে তো মেসি আর্জেন্টিনাকেই বোঝেন। একটা বৈশ্বিক শিরোপার জন্যে লিওনেল মেসি দিয়ে দিতে চান পাঁচটি ব্যালন ডি অরের ট্রফি- আর্জেন্টিনার শত্রু হয়েও আমি বুঝি আকাশী-নীল জার্সি গায়ে সফলতার জন্যে মেসির আকুতিটা।

ট্যাক্স ফাঁকির মামলায় রায় তাঁর বিপক্ষে গেলেও তিনি থাকেন নির্বিকার, দুটো ম্যাচে গোল না পেলে ত্রিশে পা দেয়া মেসি ফুরিয়ে গেছে বলে রব ওঠে, সমালোচনার কষাঘাতে বিদ্ধ হতে হয় তাঁকে। সমালোচকেরাও আর কি করবেন! অর্ধেক ক্যারিয়ারেই গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন মেসি, বার্সেলোনার হয়ে, লা লীগার হয়েই সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন আরো চার মৌসুম আগে। নিন্দুকেরা দুয়েকটা ম্যাচে কথাবার্তা বলার সুযোগ পান, হপ্তাখানেই পরেই আবার বামপায়ের জাদুতে কথা বন্ধ হয়ে যায় ওদের। মেসি এখন আগের সেই ভালো ছেলে ইমেজ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন খানিকটা, রূপকথার এক জয়ের পর মাঠের পাশে বিজ্ঞাপনী বোর্ডের ওপর দাঁড়িয়ে বুকে চাপড় মারেন তিনি, সমর্থকদের জানিয়ে দেন- “বিশ্বাস রাখো আমাদের ওপর!” এল ক্লাসিকোতে দারুণ এক গোলে দলের জয় নিশ্চিত করে তিনি ছুটে যান কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছে, জার্সি খুলে দেখিয়ে দেন, “নামটা মনে রেখো- লিওনেল মেসি!”

আব্বু আর্জেন্টিনার ভক্ত, আমি ব্রাজিলের; দুজনের জমজমাট তর্ক হয়। আব্বু ম্যারাডোনার খেলা দেখার স্মৃতিচারণ করেন আমার সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, ম্যারাডোনার সঙ্গেই সুন্দর ফুটবলটা বিদায় নিয়েছে। ঢাকা থেকে বাসায় ফেরার সময় ইউটিউব ঘেঁটে কিছু ভিডিও ক্লিপস নিয়ে আসি আমি ল্যাপটপে। আব্বুকে ডেকে দেখতে দেই। ল্যাপটপের মনিটরের সঙ্গে তাঁর দুচোখ সেঁটে যায় আঠার মতোন। আম্মু চায়ের কাপ রেখে যান সামনে, সেই চা ফ্যানের বাতাসে জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়। আব্বু চিনতে পারেন পর্দার মানুষটাকে, বলে ওঠেন- “এটা মেসি না!” আমি মাথা ঝাঁকাই, সেটা তাঁর নজরে পড়ে না! তাঁর চোখের সামনে লিওনেল মেসি নামের ছোটখাটো গড়নের একটা মানুষ ফুটবলের কারিকুরিতে ভরিয়ে তুলছে পুরো মাঠ, গোল চর্মগোলক তাঁর কথায় উঠছে, বসছে, নেচে চলেছে সমানে; তাঁর জাদুকরীতে মাঠেই বসেছে সৌন্দর্য্যের পসরা! মেসি হুল ফোটান প্রতিপক্ষের রক্ষণে, ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন জমাট ডিফেন্স, বিপক্ষকে বোকা বানিয়ে ঢুকে পড়েন ডিবক্সে, আলতো চীপে বল তুলে দেন গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে। ছয় খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোল দেয়া, কিংবা ডিবক্সের বাইরে থেকে জমাট দেয়াল ভেদ করে সামান্য ফাঁকটুকু খুঁজে নিয়ে বলটা জালে জড়ানো- আব্বু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেসির দিকে। আর আমি চোখে গর্ব নিয়ে তাকাই আব্বুর দিকে। 

টানা পাঁচ-ছয়টা ভিডিও দেখার পরে ঘোর ভাঙ্গলো। আব্বুকে জিজ্ঞেস করি, কে ভালো? মেসি না ম্যারাডোনা? আব্বু বলেন, দুজনেই সমান! আব্বু ফুটবলবোদ্ধা নন, তাঁর চোখে মেসির অর্জন অপ্রাপ্তি ধরা পড়ে না, তিনি শুধু দেখেন, যে ম্যারাডোনাকে দেখে ফুটবলটাকে ভালোবেসেছিলেন, সেই ম্যারাডোনার দেশের একটা ছেলে ম্যারাডোনারই মতো বাম পায়ে জাদুকরী ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন সবুজ মাঠের বুকে। মেসি হয়তো বিশ্বসেরা নন, হয়তো সর্বকালের সেরাও নন, মেসির সময়ের সেরা তকমা নিয়েও আছে বিতর্ক। তবে আব্বুর চোখে মেসি ম্যারাডোনার সমান! আর কি চাই? 

এই মানুষটাকে ভালোবাসতে কোন কারণ লাগে না। মাঠে তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন, মাঠের বাইরে বিনয়ের অবতার। লিওনেল মেসির পায়ের কারুকাজে ঘোর লাগা কিছু সময় পার হয় আমাদের, তাঁর দুর্দান্ত ড্রিবলিং আর নিখুঁত নিশানাভেদে মুখ হা হয়ে যায় বিস্ময়ে! আর্জেন্টিনার মতো একটা তারকায় ঠাসা দল কিছু করার না পেলে বল ঠেলে দেয় মেসির দিকে, ওরা বিশ্বাস করে, মেসি কিছু করতে পারবেন! ইরানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেই গোলটার কথা মনে পরে আমার। মেসি প্রতিদিন দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন, এমন কোন নিয়ম তৈরী হয়ে যায়নি, কিন্ত যেদিন তিনি পারেন, সেদিনটার কথা লেখা হয়ে যায় ফুটবল ইতিহাসে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button