তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

মোবাইলে হাত না রেখে, ভালোবাসার হাতটা ধরুন!

ভালবাসা দিবস নিয়ে কত আয়োজন চারদিকে। এখনকার ভালবাসায় যতটা নৈকট্য আমরা দেখি, ভেতরে ভেতরে কি ততটুকু দূরত্ব বয়ে বেড়াই না আমরা? আমাদের হাতে প্রযুক্তি আছে, স্মার্টফোন আছে। কিন্তু মানুষগুলোর অবচেতন মনে আমরা কতটুকু স্পর্শ করে যাই নাকি ভাসা ভাসা ভালবাসা প্রকাশেই আমাদের যত সুখ? কথাগুলো বেশি করে মাথায় আসছে একটা ভিডিও দেখবার। ভালবাসা দিবস উপলক্ষ্যে অনেক ভিডিও প্রকাশিত হয়, কিন্তু এই ভিডিওটি সবচাইতে ব্যতিক্রম লেগেছে এবার। মনে দাগ কেটে যাওয়া এই ভিডিওটি মেরিলের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে।

চোখের সামনে সম্পর্কগুলো কিভাবে ঘটে যায়, কিভাবে বদলে যায়! এই সময়ে এসে মানুষ মোবাইল ফোন দিয়েই যেন সব কিছু প্রকাশ করতে শিখে গেছে। কাউকে অবহেলা করা দরকার, কথা বলতে ইচ্ছে হয় না, তাকে দেখে মোবাইলটা কানে নিয়ে ব্যস্ত থাকার ভান করে আমরা সটকে পড়ি। মোবাইল ফোন আমাদের অজুহাত বানানো শিখিয়েছে খুব বেশি। মিরপুরে থাকলে আমরা অবলীলায় বলে ফেলি, গাজীপুর আছি। মোবাইল ফোনের ভেতরে এই যে আরেকটা জীবনের উত্থান ঘটে গেছে, যার প্রভাব আমাদের সম্পর্কের ভেতরেও কি পড়ছে না?

আমাদের আজকাল বড্ড তাড়াহুড়ো। ভালবাসার শুরু হয় ফোনে। দুইদিন ইনবক্সে কথা বলতে বলতে দেখা সাক্ষাৎ। তারপর দেখা হলেও তাকে আসলে সত্যিকার দেখা বলা যায় না। কারণ, কয়েকটা সেলফি তুলে নেই আমরা মোবাইল ফোনের জীবনটার জন্য, তারপর যে যার মতো বসে বসে ফোন, নেট ব্রাউজ করে সময় কাটাই। বাসায় এসে স্ট্যাটাস দিয়ে বলি, ‘স্পেন্ট কোয়ালিটি টাইম উইথ হিম/হার’! আসলেই কতটুকু কোয়ালিটি সময় আমরা কাটাই?

রেস্টুরেন্ট কিংবা শপিং মল অথবা কোনো আড্ডা সর্বত্রই দুইজন মানুষ একসাথে থাকলে মাথা নিচু করে স্মার্টফোনের জীবনে ডুবে থাকে। নিজের মতো হাসে, নিজের মতো করে স্পর্শবিহীন জগতে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে থাকে। অথচ, দুইজন মানুষ ভুলেই যায়, এই হাসিটুকু সামনের মানুষটার সাথেও বিনিময় করা যায়। কিছুক্ষণ ফোনটা দূরে রেখে নিজের মনের কথা সামনের মানুষটার সাথেও শেয়ার করা যায়। পাশের মানুষটার হাত স্পর্শ করে বলা যায় ভালবাসি। চেকইন, সেলফি আর লাভ ইমোকটিকন ছাড়া মুখে ‘ভালবাসি’ বলা যেন আমরা ভুলেই যাচ্ছি।

একসময় চিরকুটের প্রচলন ছিল। কত মায়া নিয়ে একেকটা মানুষ চিঠি লিখত প্রিয় মানুষটার জন্য। আজকাল কিবোর্ডেই শুধু আবেগের ঝড় ওঠে। হাতে কলমে দিল্লী বহুদূর, ভালবাসাও। এই স্মার্টফোনে প্রতিদিন হাজারো মানুষের লাইফস্টাইল দেখে অভ্যস্থ হয়ে যাই আমরা। একেকজনের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ একেকরকম। অন্যের জীবন দেখে নিজের সাথে তুলনা দিয়ে হতাশায় ভুগার ঘটনাও কম নেই। অথচ, নিজের মানুষটাকে সামনে রেখেও কখনো আবিষ্কারই করা হয় না, তাকে আপনি কতটুকু ভালবাসেন, সে কতটুকু! সবাই যেন বাস্তবে ভালবাসা দেখানোর চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালবাসা দেখানোটাকে বেশি গুরত্ব দেয়৷

‘বেলাশেষে’ সিনেমাটি কেউ দেখে থাকলে মনে থাকার কথা একটি দৃশ্যের। শেষের দিকে এক দম্পতির উপলব্ধি হয়। তারা যতটুকু সোশ্যাল নেটওয়ার্কে থাকে, নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক যেন ততটাই দূরে সরে যায়। ভালবাসার প্রয়োজনে কাছে আসলেও, দিনশেষে আবার তারা একাকীত্বে ভুগে। বর্তমান সময়ের নিদারুণ বাস্তবতাই যেন এটি। আমাদের প্রত্যেক ঘরে ঘরে সবার হাতে এখন স্মার্টফোন। একটা ঘরে, একটা ছাদের নিচে সবাই যেন আলাদা এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে আমরা বসবাস করি। কালেভদ্রে সবার মন খুলে কথা বলার সুযোগ ঘটে। তারচেয়ে নিজেদের বানানো কাল্পনিক অলীক ভার্চুয়াল জগতেই আমরা সুখ খুঁজে নিতে ব্যস্ত।

প্রত্যেকটা সম্পর্কে আমরা বেশি কানেক্টেড রাখতে গিয়ে এমন হয়ে যাচ্ছে যে, কারো সাথেই আর ঠিকঠাক আমরা যোগাযোগ রাখতে পারি না। সেই গানের লাইনের মতো, “দূরত্ব বাড়ে, যোগাযোগ নিভে যায়..”। এই দূরত্ব মনের দূরত্ব। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই আমাদের কাছেই থাকে, কিন্তু এই কাছে থাকা আসলে কতটা দূরে থাকা? আমরা এই মুহুর্তে খুব বিভ্রান্তকর একটা সময়ে বসবাস করছি। না পারছি দূরের মানুষকে কাছে রাখতে, না পারছি কাছের মানুষকে কাছে রাখতে।

আমাদের জীবন ঘটনাবহুল হয়েছে। অনেক সেলফি তোলা হচ্ছে। এডিট করে নিজের সুন্দর ছবিগুলো প্রকাশ করে মানুষকে বুঝাচ্ছি, খুব ভাল সময় কাটিয়েছি। চেকইন দিয়ে বুঝাচ্ছি, আমরা খুব ভ্রমণ করছি। কিন্তু, এগুলো কতটা ফাঁকাবুলি আমরা নিজেরাই ভাল জানি। আমরা যতটা না আমাদের জীবনকে যাপন করছি, তারচেয়ে বেশি যেন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট মেকার হয়ে গেছি। নিজের জীবনকে ডিসপ্লে করে বেড়াচ্ছি, কন্টেন্ট দিয়ে আপডেট দিচ্ছি, অনেক লাইক-রিয়েকশন আসছে, একটা অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই মেকি অনুভূতির আড়ালে নিজের আকুলতা, ভালবাসার হাপিত্যেশ কি লুকিয়ে রাখা যায়?

আমাদের কন্টেন্ট, বিজ্ঞাপন, নাটকেও এই স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া বেশ ভাল জায়গা নিয়েছে। ভালবাসার গল্প মানেই যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত হতে হবে, তারপর দেখা, তারপর প্রেম, একটুখানি ঝগড়া ব্যাস। ঘুরেফিরে এসবই। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলে না, ওই স্পর্শবিহীন জগতের বাইরেও প্রেম আছে। কথা আছে। ভালবাসা আছে। ভালবাসা দিবস উপলক্ষ্যে গত কয়েকবছরের কন্টেন্ট যেন একই গল্পের বিভিন্ন উপস্থাপনের পুনরাবৃত্তি।

কিন্তু, এবার প্রথম একটা কন্টেন্টে চোখ আটকে গেল। যার কথা শুরুতেই বলেছিলাম। মেরিলের পক্ষ থেকে বানানো সর্বসাকুল্যে একমিনিটের এই ভিডিওর মেসেজ আসলে অনেক বিশাল। ‘লাইক, শেয়ার, লাভ’ নামক এই ভিডিওতে দেখা যায় শুরুতেই একজন তরুণীর ঘুম ভাঙ্গলো প্রিয় মানুষটার মেসেজে। সে তাকে মিস করছে। দেখা করতে চায়। তারা ফোনেই পরিকল্পনা করলেন। দেখাও হলো। কিন্তু ফরমাল সেলফি তুলে ফোনের মধ্যে বুঁদ হয়ে রইলেন দুইজনই। এত আকুলতা, আকাঙখা ছিল দেখা করবার অভিপ্রায়ে কিন্তু বাস্তবে কি তাদের মাঝখানে প্রযুক্তি দূরত্বই তৈরি করে রাখলো?

একটু ফ্রেশ চিন্তা করলেই ভালবাসার ভেতরকার এই দূরত্বটা কি ঘুচে যেত না? মেরিল তাই বলছে, মোবাইলে হাত না রেখে, ভালবেসে ভালবাসার হাতটা ধরুন। একটু ফ্রেশ স্পর্শ ছড়িয়ে দিন। ভালবাসার অনুভূতি ভাগাভাগি করুন, ভার্চুয়াল জগতে নয়, বাস্তবেই। ফ্রেশ চিন্তা করুন। কারণ, ফ্রেশ মানেই সুন্দর!

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Back to top button