খেলা ও ধুলা

মোহাম্মদ রফিক: সাধারণে অসাধারণ এক ক্রিকেট তারকা

মামুন রণবীর

ছোটবেলায় যার বোলিং দেখে মুগ্ধ হতাম, তিনি মোহাম্মদ রফিক। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই স্ট্রাগলিং সময়ে রফিক ছিলেন এক পরম ভরসার নাম। তিনি বোলিংয়ে আসা মানে প্রতিপক্ষের উইকেট পড়বে। অন্তত আশার সঞ্চার হতো। সেই আশার প্রতি আস্থা রেখে তুলে নিতেন উইকেট। মুহূর্তেই গ্যালারী ভাসতো এক অসাধারণ উচ্ছাসে।

তার বোলিংয়ে ভর করে অনেক ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। সেই সময়ে টাইগাররা খুব একটা ম্যাচ জিততো না। জয়ের দেখা পাওয়া যেতো অনেক ম্যাচ পর। এমন অনেকবার হয়েছে যে নিজে ভালো করেছেন, কিন্তু দল হেরে গেছে। এ নিয়ে কষ্ট থাকলেও তিনি চেষ্টা করে গেছেন বছরের পর বছর। কখনো কখনো সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে। রফিকদের জয়ের দিন হেসেছে পুরো বাংলাদেশ।

সেই স্ট্রাগলের সময়ে রফিকরা ক্রিকেট খেলেছেন স্বপ্নের উপর ভর করে। তাতে জ্বালানী জুগিয়েছে অদম্য চেষ্টা, পরিশ্রম, মনোবল। দিনের পর দিন হেরেছেন কিন্তু হাল ছাড়েননি। প্রতিপক্ষের খেলোয়াররা স্লেজিং করেছে, কিন্তু রফিকরা উত্তর দিয়েছেন হাসিমুখে। রফিক এবং তার সতীর্থদের অদম্য সংগ্রামের ফলেই টাইগার ক্রিকেট আজ এই পর্যায়ে এসেছে।

ব্যক্তি রফিকের জীবনের গল্পটা অনেক কিছুর মিশেলে গড়া। ছোটবেলা থেকেই তার জীবনটা সংগ্রামের। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় লেখাপড়ায় তেমন করতে পারেননি। কিন্তু নিজের উপর ছিল প্রবল বিশ্বাস৷ ভালোবাসতেন ক্রিকেট। তাই নিয়ে পড়ে থাকতেন। কেরানিগঞ্জের আমবাগিচা মাঠে দিনের পর দিন খেলেছেন। নিজেকে শাণিত করেছেন। এভাবে ক্রিকেটই হয়ে উঠলো তার ধ্যানজ্ঞান। খেলতে খেলতে একটা সময় পর পেশাদার ক্রিকেটার হলেন। বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে ভালো খেলতে থাকলেন। একসময় জাতীয় দলে খেলা শুরু করলেন, তারকা ক্রিকেটার হলেন। যে জীবন সংগ্রামের, সে জীবনে তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে থাকলেন৷ বোলিংয়ে বাংলাদেশের অনেক প্রথমই তার হাত ধরে এসেছে। যখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতি টানলেন, তখন নামের পাশে ১২৫ ওয়ানডে উইকেট এবং ১০০ টেস্ট উইকেট। দুই ফরম্যাটেই আছে এক হাজারের উপর রান।

যে মানুষটির শৈশব, কৈশোর কেটেছে প্রবল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, পরবর্তীতে তিনিই হলেন ইতিহাস। তিনিই হলেন অনেকের মধ্যে একজন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে তারাটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে থাকবে বহুকাল।

রফিকের জীবনের আরেকটি গল্প বেশ পরিচিত। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশের সকল খেলোয়াড়কে সরকারি অনুদানে জমি আর গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। মোহাম্মাদ রফিক সে টুর্নামেন্টে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন, নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট, ফাইনালে করেছিলেন ম্যাচজয়ী ২৫ রান। তিনি সে জমি দান করেছিলেন এলাকায় একটি স্কুল করার জন্য। এরপর গাড়ি বিক্রি করে করলেন স্কুলের বিল্ডিং। সেই সময়ে সাংবাদিকদের অনেকে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে রফিক বলেছিলেন, “আমরা তো লেখাপড়া করতে পারি নাই। পোলাপাইনগুলা যেন পারে।”

এইতো রফিক, যিনি তারকা হয়েও দিনশেষে খুব সাধারণ। যার এতটুকু অহংকার নেই। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এই অসাধারণ স্পিনারের অবদান বাংলাদেশ মনে রাখবে বহুকাল৷ আজ এই কিংবদন্তির জন্মদিন। তাকে অনেক শুভেচ্ছা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button