অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

জঙ্গি মাসুদ আজহার বনাম ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’!

কয়েকদিন আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী দাবী করেছিল, পাকিস্তানের বালাকোটে ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের চালানো বিমান হামলায় নিহত হয়েছে জঙ্গী সংগঠন জইশ-ই মোহাম্মদের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং প্রশিক্ষক ইউসুফ আজহার। পাকিস্তানের শীর্ষ জঙ্গীদের একজন, ভারতের মাথাব্যাথার একটা বড় কারণ, ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স এবং ইন্টারপোলের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ লিস্টে একদম ওপরের দিকে যার নামটা ঝুলছিল, সেই ইউসুফ আজহারকে এত সহজে মেরে ফেলা যাবে, সেটা হয়তো ভারতীয়রাও ভাবেনি। তবে ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের সেই হামলার সত্যতা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক প্রশ্নই উঠে গেছে, হামলায় জইশ-ই মোহাম্মদের কোন জঙ্গি নিহত হয়নি বলেও জানা গেছে।

যাই হোক, সত্যি-মিথ্যার ক্যাচালে না যাই, আমরা বরং ইউসুফ আজহারকে নিয়ে একটু কথা বলি। এই লোকটা ভারতকে একটা বড়সড় লজ্জা দিয়েছিল বছর বিশেক আগে। ইউসুফ আজহারের জন্যেই তো মাসুদ আজহারের মতো শীর্ষ জঙ্গী নেতাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল ভারত, অনেকটা নাকে খত দেয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তাদের!

ইউসুফ আজহারকে জানতে হলে আগে মাসুদ আজহারকে চিনতে হবে। পাকিস্তানের শীর্ষ জঙ্গীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় হলো এই মাসুদ আজহার। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় যে জঙ্গী হামলাটা হলো সপ্তাহ দুয়েক আগে, সেটার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গী সংগঠন ‘জয়েশ-ই মোহাম্মদ। আর মাসুদ আজহার হচ্ছে এই জয়েশের প্রতিষ্ঠাতা, সর্বময় কর্তা। পুলওয়ামার হামলা মাসুদ আজহারের নির্দেশেই ঘটেছে, সেই বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই ভারতের। আর গতকাল নিহত হওয়া জঙ্গী ইউসুফ আজহার ছিল মাসুদ আজহারের শ্যালক।

ইউসুফ আজহার

১৯৯৪ সাল, ক’দিন আগেই ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে গেছে, আহত-নিহত হয়েছে হাজারো মানুষ। ভারতে যেহেতু মুসলিমরা মাইনরিটি, তাই হতাহতের সংখ্যাও মুসলমানদেরই বেশি। সেই সময়ে ভুয়া পরিচয়পত্র দিয়ে ভারতে ঢুকেছিল মাসুদ আজহার, এই লোক তখন করাচীর একটা পত্রিকার সাংবাদিক, আর তলে তলে জঙ্গী সংগঠনের হয়ে কাজ করছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কৌশলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেয়ার লক্ষ্য নিয়েই ভারতে পা রেখেছিল মাসুদ আজহার।

তবে ভারতীয় গোয়েন্দাদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি মাসুদ, টানা কয়েকদিন তার গতিবিধির ওপরে নজর রাখা হয়, তারপর মোক্ষম সময় বুঝে কাশ্মীর থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা। গ্রেফতারের পরে কথা আদায়ের জন্যে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্টারোগেশন সেলে। সেখানে জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে মাসুদ আজহার, সঙ্গে গোয়েন্দাদের এটাও জানিয়ে দেয়, তাকে আটকে রাখার সামর্থ্য ভারতের নেই। আজ হোক কাল হোক, তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে ভারত! গোয়েন্দারা তখন মাসুদের এসব কথাবার্তাকে পাগলের প্রলাপ বলেই ভেবে নিয়েছিলেন।

মাসুদ আজহার

তবে মাসুদের হুমকি মিথ্যে ছিল না। ভারতীয় এজেন্টদের হাতে তার গ্রেফতার হবার পরের বছরই কাশ্মীরে বেড়াতে আসা ছয় বিদেশী পর্যটককে অপহরণ করে জঙ্গীরা, জিম্মিদের বিনিময়ে তারা মাসুদ আজহারের মুক্তি দাবী করে। দুইপক্ষের মধ্যে যখন কথা চালাচালি চলছিল, তখন এক জিম্মি জঙ্গীদের হাত থেকে পালিয়ে চলে আসে। সময়ক্ষেপণ করায় আরেক জিম্মিকে গলা কেটে হত্যা করে জঙ্গীরা। সেই হত্যাকাণ্ডের পরে ভারত মাসুদ আজহারের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বাকী চারজন বিদেশী নাগরিকের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি কখনও, এমনকি তাদের মৃতদেহও খুঁজে পায়নি কেউ; এতটাই বেপরোয়া ছিল জঙ্গীরা! এই অপহরণের ঘটনার পরে এফবিআই ভারতে এসে মাসুদ আজহারকে একাধিকবার জেরা করেছে, কিন্ত কোন তথ্য বের করতে পারেনি।

কেটে গেল আরও চারটে বছর, ১৯৯৯ সাল তখন। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ, শীতল এক সকালে নেপালের কাটমান্ডু থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আইসি-৮১৪। কেউ ভাবতেও পারেনি কি ঘটতে চলেছে সামনে। প্রায় দেড়শো জন যাত্রী এবং ক্রু সহ ভারতের আকাশসীমা থেকেই ছিনতাই হলো বিমানটি, কয়েকটা দেশের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে শেষমেশ আফগানিস্তানের কান্দাহারে ল্যান্ড করতে বাধ্য করা হলো বিমানের পাইলটকে। জঙ্গীরা জানিয়ে দিলো তাদের চাহিদা- বিমানের দেড়শো যাত্রীর জীবনের মূল্য হিসেবে তারা মাসুদ আজহার সহ ভারতে আটক মোট তিন জঙ্গীর মুক্তি চায়!

সেই বিমান হাইজ্যাকে নেতৃত্ব দিয়েছিল মাসুদ আজহারের ছোট ভাই ইব্রাহিম আজহার এবং শ্যালক ইউসুফ আজহার। সাড়া পড়ে গেল চারদিকে। আফগানিস্তান তখন তালেবানদের অধীনে, তারা পাকিস্তান আর আইএসআইয়ের মিত্র, কাজেই আফগান সরকারের তরফ থেকে সাহায্য পাবার আশা বাদ দিতে হলো ভারতকে। সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল চব্বিশ ঘন্টা। স্রোতের মতো পেরিয়ে যাচ্ছে সেই সময়, কিন্ত উপায় মিলছে না কোন। অভিযান চালাতে গেলে প্রাণহানির শঙ্কা আছে, চার বছর আগের ঘটনাতেই প্রমাণীত হয়েছে, জঙ্গীরা প্রচণ্ড বেপরোয়া।

অটল বিহারী বাজপেয়ীর বিজেপি সরকার তখন ক্ষমতায়। নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত জানালেন প্রধানমন্ত্রী, জঙ্গীদের চাহিদামতো মাসুদ আজহারকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা! ক্ষোভে ফেটে পড়লো ভারতের মানুষ, কিন্ত দেড়শো জিম্মির জীবন বাঁচাতে চাইলে এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না সেই মূহুর্তে। ১৯৯৯ সালের এই ঘটনাটাকে বলা হয় ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিপ্লোমেটিক ফেইলিওর। সিনেমার চেয়েও সিনেম্যাটিক এই ঘটনাটা হয়তো অনেকেই জানেন না এখনও।

বিশ বছর আগে মাসুদ আজহারকে মুক্তি দেয়ার মাশুল ভারতকে আজও দিতে হচ্ছে, পুলওয়ামায় পঞ্চাশজন সেনা, বা তারও আগে পরে আরও অনেক নিরীহ নাগরিকের রক্তস্রোতের কারণ ছিল এই মাসুদ আজহারই। ক’দিন আগেও ভারতের দাবীর বিপরীতে ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে মাসুদ জানান দিয়েছে, বহাল তবিয়তেই বেঁচে আছে সে। এই নরপশুর কারণে আর কত নিরীহ প্রাণের বলিদান হবে, সেটা কেউই জানে না আপাতত…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button