খেলা ও ধুলা

এতটা অকৃতজ্ঞ বোধহয় আমরা না হলেও পারতাম!

মাশরাফি বিন মুর্তজা নামের মানুষটার জীবনে সবচেয়ে কষ্টের দিন ছিলো ২০১১ সালের ১৯শে জানুয়ারী। আজকের এপ্রিলের চার তারিখ কি ছাপিয়ে যাবে বছর ছয়েক আগের সেই দিনটাকে? মাশরাফি বিন মর্তুজা আজ অবসর নিয়েছেন টি-২০ ক্রিকেট থেকে। নাকি নিতে বাধ্য করা হয়েছে?

খালি চোখে দেখলে ঘটনাক্রম অনেকটা এমনই- শুরুটা দুপুর থেকেই হয়েছিলো। ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের মাশরাফি জানিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সিদ্ধান্ত, তারপর দলের সাথে থাকা কর্মকর্তাদের। সেখান থেকে কলম্বোয় অবস্থানরত বাংলাদেশী সাংবাদিকদের কানে এই খবর পৌঁছুতে বেশী সময় নেয় নি। চাপা গুঞ্জনটা ডালপালা বেড়ে মহীরূহ হয়ে উঠছিলো খুব দ্রুত, আর মাশরাফির ঘোষনায় তো ভক্তদের দুঃস্বপ্নটা বাস্তবই হয়ে গেলো। তারও মিনিট পনেরো আগে ফেসবুকে ভ্যারিফাইড পেজ থেকে অবসরের ঘোষণা লেখা বাংলা এবং ইংরেজী বার্তা চলে এসেছে, যাতে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে বিসিবি এবং সমর্থকদের।

কিন্তু আদতে কি তাই?

যে মানুষটা সপ্তাহ দুয়েক আগেও নিজের দলটা নিয়ে হাজারটা পরিকল্পনার ছক কষছিলেন, সেই একই মানুষ কিভাবে হুট করে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? শ্রীলঙ্কা সফরের বিমানে ওঠার আগে সাক্ষাৎকারে বিডিনিউজ২৪-কে মাশরাফি জানিয়েছিলেন ওয়ানডে এবং টি-২০ নিয়ে নিজের কিছু পরিকল্পনার কথা, বলেছিলেন বাংলাদেশকে পরিণত করতে চান সমীহজাগানো এক দলে। তাহলে কেন এমন সিদ্ধান্ত?

নাটকের প্রথম কিস্তিটা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে ওয়ানডে দল থেকে বাদ দেয়ার মাধ্যমেই হয়েছিলো। মাশরাফি বিদ্রোহ করেছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর দলের জন্যে ভালো হবে না, এটা মুখের ওপর বলে দেয়ার সামর্থ্যটা তাঁর আছে। কেউ একজন চান বাংলাদেশ দলটার ড্রেসিং রুমের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে, মাশরাফি নামের কাঁটাটাকে সেক্ষেত্রে উপড়ে ফেলতে হবে। সত্যিই, মাশরাফি বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্যে দেবদূত, ক্ষমতালোভীদের কাছে তো কাঁটাই হবেন! যে মাশরাফি দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ না খেলতে পারার আক্ষেপ থেকেও অবসর নেননি, ফিরে এসেছিলেন বীরের বেশে, সেই মাশরাফি আবেগে পড়ে, অভিমান করে অবসর নিয়ে নিচ্ছেন, এটা কতটা যুক্তিযুক্ত? কে মানবে? 

নিউজিল্যান্ড সফর থেকেই বিপত্তির শুরু, টেস্ট-ওয়ানডে-টি২০ মিলিয়ে সবগুলো ম্যাচ হারের পরেও সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা একজনের খেয়াল চাপলো টি-২০ টিমকে ঢেলে সাজাবেন। অস্ট্রেলিয়ার মতো একেবারে তরুণ আলাদা একটা দল থাকবে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত এই ফরম্যাটের জন্যে। তবে সেবার হালে পানি পায়নি সেই প্রস্তাবনা।

Photo by Martin Hunter/Getty Images

এবার শ্রীলংকা সফরে ওয়ানডে সিরিজ ড্র করলো লাল সবুজের ঝাণ্ডাধারীরা। কলম্বোয় প্রথম টি-২০ তে সেই মাশরাফি যখন টসে জিতে ব্যাটিং নিলেন, ডিন জোন্স জিজ্ঞেস করলেন তাঁর অবসরের গুজব নিয়ে। তা অবসর নামের শব্দটাকে তো কতবারই কতজন বসিয়ে দিতে চেয়েছেন মাশরাফির নামের পাশে, ২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপের পরেও গুঞ্জন উঠেছিলো শর্টার ভার্সনের ক্রিকেট থেকে ম্যাশের অবসরের, নিউজিল্যান্ড সফর শেষেও বিসিবি বস নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন মাশরাফি আর বিশ ওভারের ম্যাচ খেলবেন না, পরে আবার নিজের কথাই গিলে নিয়েছেন। সেই মাশরাফি মেঘলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে ডিন জোন্সের বাড়িয়ে ধরা মাইক্রোফোনে স্বীকার করে নিলেন, হ্যাঁ, ক্রিকেটের ঝলমলে এই সংস্করনে এটাই তাঁর শেষ সিরিজ!

তিনজন সিনিয়র খেলোয়াড়কে টি-২০ তে বসিয়ে দেয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিলো, এঁদের একজন যে মাশরাফি তাতে কোন সন্দেহ নেই। খানিক আগেই বিডিনিউজ২৪ মাশরাফির বিদায় সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লিখেছে– 

ওয়ানডে সিরিজ শেষে কোচ আবারও বিসিবি কর্তাদের বলেন, টি-টোয়েন্টি নিয়ে মাশরাফির সঙ্গে কথা বলতে। বিসিবির একাধিক সূত্র বিডিনিউজকে নিশ্চিত করেছে, সোমবার রাতে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান দলের সিনিয়র চার ক্রিকেটারকে ডেকে কথা বলেন। জানিয়ে দেন, তিন সংস্করণে তিন অধিনায়ক চায় বিসিবি। এরপরই ভবিষ্যতের ছবিটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে মাশরাফির সামনে। ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটাও তখনই মরে যায়। কোচের ভাবনার সঙ্গে লড়াই করা যায়, কিন্তু নিজেদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তো লড়াই চলে না!

গত দুই বছরে বাংলাদেশ দলের টি-২০ ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশী সাতাশ উইকেট পাওয়া আল আমিন তো নির্বাচকদের চোখে বোধহয় মরেই গেছেন। মুস্তাফিজ আর সাকিবের পরে চতুর্থ সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক মাশরাফি। আর বায়ান্নো ম্যাচের ক্যারিয়ারে মাশরাফির ঝুলিতে উইকেট আছে উনচল্লিশটি, আজকের ম্যাচেই নিয়েছেন দুটি উইকেট। ব্যাটসম্যানদের মধ্যেও গত দুই বছরে সপ্তম সর্বোচ্চ রান তাঁর, দলের প্রয়োজনে ছোট ছোট কিছু ইনিংস ব্যবধান গড়ে দিয়েছে বেশ কয়েকবার। পারফরম্যান্সের কাঁটায় মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ছুঁড়ে ফেলার কোন সুযোগই নেই। তারপরও সিনিয়র হঠাও নামক কোচের ড্রেসিংরুমের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার খেলায় বলি হলেন মাশরাফি। আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য অধ্যাটার শেষের শুরু হয়ে গেলো সিংহল সাগরের পাড়ে।

২০১১ বিশ্বকাপে মাশরাফির কান্নার সেই ছবি আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার বদৌলতে কাঁদিয়েছে ভক্তদেরও; চোখের জলে না পাওয়ার বেদনা ধুয়ে যায় না, ২০১১ বিশ্বকাপ মাশরাফির জীবনে এখনও এক বড় অপ্রাপ্তির নাম। বয়েসটা ছিল ত্রিশের দোরগোড়ায়, ইনজুরিজর্জর শরীর নিয়ে তখনই বিদায় বলে দিতে পারতেন অভিমানে। কিন্ত এই মানুষটা শরীর আর মনের চেয়ে মাথাটাই বেশী ব্যবহার করেন, তিনি ফিরলেন বীরের বেশে। চার বছর পরে তাসমান সাগরপাড়ে বাংলাদেশ দলটা লাল সবুজের জার্সিতে মাঠে নামলো এই মাশরাফিরই নেতৃত্বে। অ্যাডিলেডে লেখা হলো রূপকথা, জয় অব্যহত থাকলো ঘরের মাঠে, পতন হলো পাকিস্তান, ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার। টি-২০ ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের ফাইনালেও তুললেন দলকে। পুরো ড্রেসিং রুমেই কেমন একটা শান্তির আবহ ছিল, দলটা যে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান ক্রিকেটারের সুশীতল ছায়াতলে। সাদা জার্সিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই, টি-২০তেও এভাবে অভিমানে সরে গেলেন। দলের ড্রেসিংরুমের সেই পরিবেশ থাকবে কি? 

মাইনাস থ্রি ফর্মূলা কতটা কাজে দেবে সেটা নেপথ্যের খলনায়কেরা জানেন। আমি শুধু ভয় পাই, বাংলাদেশ ক্রিকেট না আবার সেই ২০০১-২০০৫ এর অন্ধকার যুগটায় প্রবেশ করে! আশি-নব্বইয়ের দশকে ফুটবল ক্রেজের কথা শুনেছি, নিজের চোখে দেখেছি শুধু কঙ্কালটুকু। বাফুফে নামের অথর্ব প্রতিষ্ঠানের কবলে পড়ে নির্মম মৃত্যু হয়েছে ফুটবলের; প্রিয় বিসিবি, দয়া করে বাফুফে হবেন না। মাশরাফি টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন চার ঘন্টার বেশী হয়ে গেছে, এখনও বিসিবির তরফ থেকে কোন কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ বা এই সংক্রান্ত বাণী আসেনি, না ফেসবুকে, না মিডিয়ায়। বিসিবি কর্মকর্তারা এই ধরাধামে আছেন তো? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে কৌতুক হয়ে যাবার হাত থেকে ২০১৫ বিশ্বকাপে যে লোকটা প্রায় একাই রক্ষা করেছিলেন, ঘরের মাঠে দলকে অসুর বানিয়ে যে মানুষটা বিসিবির সম্মান আর কোষাগার সমৃদ্ধ করতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই মাশরাফিকেই প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারলো না বিসিবি। এর আগে যেটা পাননি মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিকরা- দলকে শূন্য থেকে শিখরে তোলার পুরষ্কারই হয়তো পেলেন নড়াইলের ছেলেটা!

আজ কলম্বোয় জাতীয় সঙ্গীতের সময়টায় সাকিবদের চেহারা দেখেই যেন বোঝা যাচ্ছিল, আকাশের চেয়ে বড় ঝড় চলছে মনের ভেতর। পুরো দলেই তো কেমন ছন্নছাড়া সুর, বাতাসে বিদায়ের করুণ রাগিণী। চলে তো একদিন যেতেই হতো, বিদায় বলাটা আরো সুন্দর হতে পারতো, দেশের মাটিতে ঘরের মাঠে স্টেডিয়ামভর্তি দর্শকের সামনে বিদায় বলার সুযোগটা মাশরাফি পেতে পারতেন নিশ্চয়ই! এতটা অকৃতজ্ঞ বোধহয় আমরা না হলেও পারতাম। 

ছবি- আরিফুল ইসলাম রনি

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button