সিনেমা হলের গলি

দ্য পানিশার- তোমার বুকে যুদ্ধ আছে!

* দ্য পানিশার সিরিজের অনেক স্পয়লার আছে লেখাটিতে

সুপারহিরোর সংজ্ঞা কী? কাকে আমরা বলতে পারি সুপারহিরো? কমিকবুকে যারা অসাধ্য সাধন করে আসছে তারাই শুধু সুপারহিরো? অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করছে তারাই কেবল সুপারহিরো? আমি যদি মনের সাথে লড়াই করা যোদ্ধাদের সুপারহিরো বলি, খুব কি ভুল হবে? দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ, মেরিন কর্পের এক সৈনিক; যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছে যে জীবনের পরোয়া না করেই। সেই মানুষটি যখন পরিবারের কাছে ফিরে এসে অবসরকে ভালোবাসতে যায় ঠিক তখনই হুড়মুড় করে তার ঘরে ও জীবনে ঢুকে পড়ে কিছু মুখোশধারী আততায়ী। যাদের মুহুর্মুহু গুলিতে চোখের সামনে লুটিয়ে পড়ে প্রিয় মুখগুলো রক্তাক্ত হয়ে। সে মানুষটির কথা বলবো আজ, এক সুপারহিরোর কথা। ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলের কথা, দ্য পানিশারের কথা।

সিরিজে পানিশারের শুরুটা হয় তার মৃত্যু দিয়ে, সবাই জানে ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেল মৃত। ফ্র্যাঙ্কও তাই চায়, সেজন্যই পিটি ক্যাস্টিলিওনি নামে শুরু করে তার নতুন জীবন। হেলস কিচেনে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কাঁপিয়ে দেয়া পানিশার এখন থিতু হয়েছে কন্সট্রাকশনের কাজে। কিন্তু এখনো যে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় মৃত পরিবারের কান্না। প্রতি সকালে ঘুম ভাঙ্গে তার মৃত স্ত্রীর মৃত্যু দেখে। হাতুড়ি নিয়ে ফ্র্যাঙ্ক দেয়াল ভাঙ্গে না সজোরে যেন বুকের পাথর ভাঙ্গে। এরপর ঘটনা পরিক্রমায় সে জানতে পারে যে তাকে এখনো দেখছে কেউ, অনুসরণ করছে। ওদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অফিসার হয়ে আসে দিনাহ মাদানি, যে শুরু থেকেই আহমেদ জুবায়ের নামক এক আফগান যুবকের কান্দাহারে মৃত্যু নিয়ে অনুসন্ধান করছে। যার টর্চারের ভিডিও তাকে পাঠিয়েছে অজানা কেউ একজন। কান্দাহারে হওয়া ইউএস আর্মির এক সিক্রেট অপারেশন, অপারেশন সেরেবারাস নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই অপারেশনেরই অংশ ছিলেন ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেল। সে উৎস থেকেই তাকে অনুসরণ করা শুরু করে পৃথিবীর চোখে মৃত এক এনএসআই এনালিস্ট, কোডনেইম- মাইক্রোচিপ। কী চায় সে? আহমেদ জুবায়েরের মৃত্যু আর অপারেশন সেরেবারাসের মাঝে কানেকশন কী? এই অপারেশনের সাথে ক্যাসেলের পরিবারের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই তো? মাইক্রোচিপই বা কী চায় ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলের কাছে? ফ্র্যাঙ্ক কী আবার দেখা দেবে পানিশারের রুপে? পানিশার কী বদলা নেবে তার পরিবারের মৃত্যুর?

প্রশ্ন অনেক, উত্তর মিলবে ‘মার্ভেলস দ্য পানিশার’ সিরিজে। পানিশারের শুরুটা খুবই ধীর, খুব ধীরে ধীরে গল্প ডেভলপ হতে থাকে। একটা বেইজ তৈরি হয় প্রথমে, যেটি ডেয়ারডেভিলে তৈরি হবার সুযোগ পায় নি। পানিশারের পরিবার মারা গেছে, সো স্যাড! কিন্তু কেন? কেন আমরা পানিশারের প্রতি সিম্প্যাথাইজ হবো? একটা সলিড ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে যতই ব্যাডঅ্যাসভাবে মারামারি করুক না কেন সাময়িক এড্রেনালিন রাশ ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার থাকবে না। সেই কারণেই শুরুটা একটু ধীর মেনে নেয়া যায়। দর্শক একে একে জানতে থাকে অপারেশন সেরেবারাস সম্পর্কে, কান্দাহার সম্পর্কে, আহমেদ জুবায়েরের টর্চার আর ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলের পরিবারের মৃত্যু সম্পর্কে, দেশের সুরক্ষার দায় যাদের হাতে তাদের হাতে কতো নিরীহ মানুষের রক্ত লেগে থাকে সে সম্পর্কেও। আমরা ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলকে আরও আপক্লোজভাবে জানতে থাকি। তার নাইটমেয়ার, অযাচিত রাগ, নার্ভাস ব্রেকডাউন সবকিছুই খুব স্বাভাবিক মনে হয়। নিজের সাথেই যেন যুদ্ধ করে যায় ফ্র্যাঙ্ক, তার বুকে অবারিত যুদ্ধ বয়ে চলে। সেই ফ্র্যাঙ্ক একে একে জানতে পারে কারা ছিল তার পরিবারের হত্যার পেছনে, কারা একটি ইলিগ্যাল অপারেশন পরিচালনা করে দেশপ্রেমিক সৈনিকদের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আর তাই একে একে তার প্রতিশোধ নেয়া শুরু হতে থাকে। আমরা ফ্র্যাঙ্কের পক্ষে চলে যাই, অপেক্ষা করি তার জয়ের। সে জেতে কিন্তু সহজলব্ধ জয় হয়না কোনটাই। রক্ত, ঘাম, আঘাত সহ্য করে তবেই সে এক পা এক পা করে এগুতে পারে। ব্রাদার ইন আর্মস, সৈনিক জীবনের বন্ধু, ভাই বিলি রুসোকে পেয়ে আমরাও যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। ফ্র্যাঙ্কের জীবনে এইটুকু ব্রিদিং স্পেস তো দরকার, তাকে কেউ বোঝে এরকম কাউকে দরকার। কিন্তু বিলি রুসো, এক মাস্টারমাইন্ড। পানিশারের আল্টিমেট এনেমি হওয়া জিগ স’ সে। বন্ধুর ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যায় তার টাকার প্রতি থাকা ভালোবাসার কাছে। বিট্রে হওয়া ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলের আর ফ্র্যাঙ্ক হিসেবে ফেরার কোন উপায় থাকে না। ওদিকে শহরে এক তরুণ সৈনিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে এই বলে যে সে স্বাধীনতা চায়, এই ভঙ্গুর সিস্টেমের দেশ থেকে স্বাধীনতা চায় সে। ঠিক সে মুহূর্তে পানিশার আসে; তার পরিবারের সাথে, দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা প্রতিটি মানুষকে পানিশ করার জন্য। বুলেটপ্রুফ ভেস্টে স্কেলেটন আঁকে সে, পানিশারের সিজিল, বুকের যুদ্ধ যে কঙ্কালসার রূপ নিয়েছে তখন। এখন আসল যুদ্ধের সময়…

পানিশারের স্লো পেস পিক আপ করে মধ্যভাগে এসে আর শেষের ৩ এপিসোডে যা চূড়ান্তরুপে চলে যায়। জন ব্রেন্থালকে যতো প্রশংসা করা হবে কম হয়ে যাবে। পানিশারের সৃষ্টি হয়েছিলই হয়তো তিনি অভিনয় করবেন বলে। অন্য কাউকে পানিশার হিসেবে কল্পনাও করা সম্ভব না জনের জায়গায়। হি ইজ জাস্ট ঠু গুড। চোখে মেলানকোলিক বিষণ্ণতা, বুকে ইস্পাত-কঠিন সাহস। হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটে দুর্দান্ত, রক্তাক্ত হয়েও রাগকে শক্তিতে রূপান্তর। জন ব্রেন্থাল শুড গেট এন এমি ফর দিস। বিলি রুসোর চরিত্রে বেন বার্নস একটা রেভ্যুলুশন। হি ইজ দ্য পারফেক্ট অপোজিট অফ দ্য পানিশার, হি ইজ দ্য পারফেক্ট এনিমি। চকলেট বয় লুক, এনডেয়ারিং স্ক্রিন প্রেজেন্স সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায় তার ভিলেনিয়াস অভিনয়ের কাছে। কল্পনাই করা যায় না যে এই ছেলে এতোটা ভালো অভিনয় করবে। দিনাহ মাদানির চরিত্রে এম্বার রোজ ও মাইক্রোচিপ হিসেবে এবন মস দুর্দান্ত ছিল। কার্টিস আর লুইস এই দুই চরিত্রও মনে দাগ কেটে যাবে।

দ্য পানিশারের একটা সমস্যা স্লো পেস আর লেন্থি স্ক্রিনপ্লে। ডায়লগ নির্ভর অনেক বেশি। যারা ডায়লগবেইজ স্টোরিটেলিং পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগলেও যারা একশন (কাজ) বেইজ স্টোরিটেলিং পছন্দ করেন তাদের বোর করবে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর অসাধারণ। প্রোডাকশন ডিজাইন স্মার্টলি হ্যান্ডেল করা হয়েছে কারণ বেশিরভাগ একশন পিস সীমাবদ্ধ জায়গায়, বাজেট যার কারণে অন্যান্য জায়গায় ইউজ করা গেছে। একশন পিসগুলো খুবই খুবই ওয়েল কোরিওগ্রাফড। হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট, গান সিকোয়েন্স, শ্যুটিং এন্ড বম্বিং সবকিছুই মোর দ্যান পারফেক্ট ছিল। প্রচুর এবং প্রচুর পরিমাণ গোর এন্ড ভায়োলেন্স আছে। এতটা ভায়োলেন্স অনেকের সহ্য নাও হতে পারে। তবে এই ভায়োলেন্সই পানিশারকে ডিফাইন করে, তার কষ্টকে ডিফাইন করে। স্টোরি টেলিং এর দিক দিয়ে এপিসোড টেন আলাদা ছিল, কারণ নানা টাইমলাইনে ভাগ করে স্ক্রিনপ্লে সাজানো হয়েছে। যার কারণে ওই দিনের পুরো ঘটনাটা আবিষ্কার করতে গিয়ে দর্শক আনন্দ পেয়েছে। আর এপিসোড ১২- হোম এ পানিশারের ভঙ্গুরতা কষ্ট দিলেও, সে কীভাবে বাউন্স ব্যাক করে প্রতিশোধ নেয় সেটা দেখা ভায়োলেন্ট কিন্তু অনেক কম্ফোরটিং ছিল।

সব মিলিয়ে মার্ভেলের দ্য পানিশার তৃপ্ত করেছে অনেক দিক দিয়ে। ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেলের চরিত্রটির সাথে যতটা মিশে যাওয়া যায় ততটা মিশে মনে হয় না মার্ভেল সিরিজের আর কোন চরিত্রের সাথে যাওয়া গেছে। ডেয়ারডেভিলকেই বলা যায় সেকেন্ড ক্লোজ। এর মূল কারণ হয়তো ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেল আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। তার শক্তি বলতে তার মনের সাথে করা যুদ্ধকেই বলা যায়। সে যুদ্ধই তাকে যোদ্ধা বানিয়েছে, বানিয়েছে দ্য পানিশার। একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক, একজন স্নেহময় বাবা ও একজন ভালোবাসাময় স্বামী সব হারিয়ে জন্ম নিয়েছে পানিশার হয়ে। দ্য পানিশার…তোমার বুকে যুদ্ধ আছে…

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button