এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মমতা ব্যানার্জি: ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী?

কলকাতার ধর্মতলায় খুব পরিচিত একটা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এখন। ২০০৬ সালে বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে এই জায়গাটাতে ধর্ণায় বসেছিলেন তৃণমূলের সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জী। সেই প্রতিবাদটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিল পুরোপুরি, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বাম দূর্গের পতন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন একজন মমতা বন্দোপাধ্যায়ই। তেরো বছর বাদে পশ্চিমবঙ্গের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী আবারও ধর্মতলার সেই মেট্রো চ্যানেলেই খুঁটি গেঁড়েছেন, এবার তার প্রতিবাদটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে, সরাসরি বললে বিজেপির বিরুদ্ধে, নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ’র জুটির বিরুদ্ধে। ভারতে বিজেপি বিরোধী রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিজের অবস্থানটা ক্রমশই শক্ত করে তুলছেন মমতা, আর সেটা এমনই যে, অনেকে তো তাকে ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রীর আসনেও দেখতে পাচ্ছেন!

ঘটনার শুরুটা একটা খোলাসা করা যাক। কলকাতা পুলিশের প্রধান রাজীব কুমার, তৃণমূলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই পরিচিত। চিটফান্ড কেলেঙ্কারীর সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছে, এবং সিবিআই থেকে সেই কেলেঙ্কারীর ব্যাপারে তদন্তও করা হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জী বরাবরই অভিযোগ করে এসেছেন যে, রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগটা তোলা হয়েছে নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে। মমতাকে শায়েস্তা করার জন্যেই তার কাছের মানুষগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যে অভিযোগ এনে সিবিআই লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে, এমনটাই তার অভিযোগ।

মোদি আর মমতার সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায়, কিংবা সাপ আর নেউলের চাইতেও ভয়ঙ্কর। মমতা তো সুযোগ পেলেই বিজেপি আর মোদিকে ধুয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। মোদিও ছেড়ে কথা বলেন না। পিএম বনাম সিএম এর এই লড়াইটা মিডিয়ার কাছেও যথেষ্ট উপভোগ্য। সে যাই হোক, সিবিআইয়ের একটা বিশেষ দল কলকাতার পুলিশ প্রধানের বাড়িতে গিয়েছিল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। কিন্ত অনুমতিপত্র না থাকায় উল্টো তাদেরকেই গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ, পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়া হয় সবাইকে। এই ঘটনাটাই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে, ক্ষোভে উত্তপ্ত মমতা ব্যানার্জী নেমে এসেছেন রাজপথে, বসেছেন ধর্নায়। বিজেপি এখন ভাবছে, মমতাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে উল্টো খাল কেটে কুমিরই আনা হলো কিনা!

ভারতে এখন বিজেপি বিরোধী জোট ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। প্রাদেশীক নির্বাচনগুলোতে সেসবের ফল দেখাও গেছে। কর্ণাটকের নির্বাচনেই যেমন দশে মিলে করি কাজের মতো করে বিজেপিকে রুখে দিয়েছিল কংগ্রেস আর সমাজবাদী দল! উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদব-মায়াবতীরা যেমন উঠতে বসতে মোদিকে শূলে চড়াচ্ছেন, পশ্চিমে তেমনই মমতা আছেন। এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা এখন কংগ্রেসের নেই, তাই ভোটের আগে জোট তাদের গড়তেই হবে। আর জোট গড়া হলে শরীকরা যে ভাগাভাগির বেলায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না, সেটাও কর্ণাটকে দেখা হয়ে গেছে।

জোট হলে নির্বাচনে বেশ জমজমাট একটা লড়াই হবে। এবং সেই লড়াইতে বিজেপির হারের সম্ভাবনাটাই এখন বেশি। বিরোধী জোট ভোটে জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? রাহুল গান্ধীকে শরীকদের কেউই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাইবেন না, এটা নিশ্চিত। এরপরেই আসবে অখিলেশ যাদব, মায়াবতী আর মমতা ব্যানার্জীর কথা।

এদের মধ্যে মমতার দলের হাতেই আসন সংখ্যা সবচেয়ে কম থাকার কথা, কিন্ত বিজেপি বিরোধী রাজনীতির ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিজেকে ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে ফেলেছেন মমতা, আর তাই ভারতের প্রথম বাঙালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে দেখতে পাবার সম্ভাবনাটাও একদম উড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নয়।

যাই হোক, সেগুলো এখনও গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল টাইপের কথাবার্তা। তবে ক্ষমতার পালাবদল হলে প্রধানমন্ত্রী পদে মমতার চেয়ে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না সম্ভবত। পশ্চিমবঙ্গে তো নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করেছেন তিনি, বামফ্রন্টকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন এই রাজ্য থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, ভারতীয় রেলের আজকের এই আধুনিকায়ন আর উন্নতির একটা বড় কৃতিত্ব কিন্ত তারও!

সারাজীবন মাঠের রাজনীতি করে যাওয়া মমতা ব্যানার্জী কম সংগ্রাম করেননি, কম অত্যাচার করা হয়নি তার আর তার দলের ওপরে। জঙ্গলমহলের ওদিকটায় একটা সময়ে নিয়মিতই তৃণমূল কর্মীদের লাশ পাওয়া যেতো। জেল-জুলুম তো ছিলই, মমতা নিজেও তো জেল খেটেছেন, মিছিল বের করায় রাস্তায় তাকে পিটিয়েছিল বাম কর্মীরা। সেই বামফ্রন্টের নাম-নিশাণাও এখন আর পশ্চিমবঙ্গে নেই, এই অসম্ভবটা সম্ভব করে ফেলেছেন মমতা। রাজ্যে বিজেপির সাম্প্রতিক উত্থান ঠেকানোর জন্যে অনুব্রত মণ্ডলের মতো কট্টরপন্থী নেতাদের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন। মমতা বোঝেন, কাকে দুধ কলা দিয়ে পুষতে হবে, আর কাকে বিষ খাইয়ে মারতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী হিসেবেও এখনও পর্যন্ত তিনি সফল। সময় নিয়ে তিনি মানুষের কথা শোনেন, স্কুলে কেন বেশি ফি নেয়া হচ্ছে, পুলিশ কেন আসামী ধরতে পারছে না, পৌরসভার কর্মীরা কেন ঠিকঠাক সেবা দিতে পারছেন না, এসবের খোঁজখবর তিনি নিয়মিতই রাখেন, এবং মুখের ওপর প্রশ্ন করে জবাব চান। সেগুলো আবার সর্বসাধারণের জন্যে লাইভ টেলিকাস্টও হয়। আমরা যতোই অপছন্দ করি না কেন, মমতা তিস্তার পানি দেন না বলে নাক সিঁটকাই, তাতে আসলে মমতা ব্যানার্জীর কিছু আসে যায় না। তিনি তার রাজ্যের মানুষের স্বার্থটা সবার আগে দেখেন, আর এজন্যেই হয়তো পশ্চিমবঙ্গে ‘দিদি’ বলতে সবাই শুধু তাকেই বোঝে! পশ্চিমবঙ্গের দিদি এখন পুরো দেশের দিদি হয়ে উঠবেন কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button