খেলা ও ধুলা

‘প্রেডিক্টেবল’ বিশ্বকাপের টার্নিং পয়েন্ট যে পারফর্মেন্স!

শ্রীলঙ্কার এই দলটা নিজেরাও জানে তাদের সামর্থ্যের কথা। তারা প্রতিটি ম্যাচ আন্ডারডগ হিসেবেই খেলতে নামে। বিশ্বকাপে তাদের বড় কোনো লক্ষ্য নেই হয়ত, কিন্তু হাল ছেড়ে দিতে কে চায় একেবারে! শ্রীলঙ্কাও চায়না। বিশেষ করে বললে একজন মানুষের নাম নিতে হবে। তিনি লাসিথ মালিঙ্গা।

আগে এই দলটাকেই হট ফেবারিট হিসেবে কেউ ধরত কি না ধরত, অন্তত তাদের শক্তিমত্তার কথা আলোচনা হতো। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেশ চমৎকার এক দল ছিল একটা সময়ে। যে সময়টা জয়সুরিয়া, আতাপাত্তু, চামিন্দা ভাসদের, যে সময়টায় খেলতেন মুরালিধরন, সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, দিলশানরা। সোনালী প্রজন্ম হারিয়ে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটও যেন টালমাটাল। আজ তাই শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপে এসেছে স্বপ্নের লাগাম টেনে ধরেই, যারা বড় দলকে হারিয়ে দিলে সেটা আবার কোনো কোনো গণমাধ্যমের কাছে আপসেট কিংবা অঘটনও হিসেবে বিবেচিত হয়। মডার্ন ক্রিকেটে প্রথম সারির দলগুলো নিজেদের যে জায়গায় নিয়ে গেছে স্কিল, পাওয়ার ক্রিকেট, এটাক সব দিক দিয়ে সে তুলনায় শ্রীলঙ্কা সময়ের চেয়ে কেবল পিছিয়েই গেছে।

অথচ এই দলটাই কিনা এই বিশ্বকাপে একাধিক স্মরণীয় দুরন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ উপহার দিয়েছে। বিশেষ করে, স্বাগতিক এবং সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট বলে যাদের ধরা হচ্ছে সেই ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচটি ২০১৯ বিশ্বকাপের টার্নিং পয়েন্ট বললেও অত্যুক্তি হবে না নিশ্চয়ই৷

যখনই বিশ্বকাপটা অনুমিত হয়ে যাচ্ছিলো, সবাই সম্ভাব্য চারটি দলকে নিয়ে সেমিফাইনালের লাইনআপ ভেবে ফেলছিল- ঠিক তখন শ্রীলঙ্কা এমন এক ম্যাচ উপহার দিলো, যা ম্যাড়মেড়ে বিশ্বকাপকে গরম করে তুলেছে কি অপূর্ব রকমে!

শ্রীলঙ্কার এই দলে বড় তারকার ভীষণ অভাব, তবুও সবচেয়ে বড় তারকা যিনি সেই মালিঙ্গাকে নিয়ে কম তুচ্ছতাচ্ছিল্য হয়নি। তার ফিটনেস নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হাসাহাসিও হয়েছে। ড্রেসিং রুমে মালিঙ্গার খালি গায়ে বিকট ভুড়িসমেত এক ছবি ভাইরাল হয়। সেই ছবি দেখিয়ে অনেকে বলতে চেয়েছে, এরকম ফিটনেস নিয়ে মালিঙ্গা কিভাবে ক্রিকেট খেলে!

সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা মালিঙ্গা শুনেছেন কিনা কে জানে। কিন্তু, মালিঙ্গা তার ক্লাস চেনানোর জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন একটি অসাধারণ দিন। দিনটি ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল ইংল্যান্ড। তাদের সাথে খেলতে নেমে শ্রীলঙ্কা টসে জিতে আগে ব্যাটিংয়ে গেল। ইংল্যান্ডের সাথে কত রান ঠিক নিরাপদ তা কে বলবে? যারা ওয়ানডে গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি তিনশো ছাড়ানো ইনিংস খেলেছে তাদের বিরুদ্ধে শুরুতে ব্যাট করলে বড় একটা স্কোর তো বোর্ডে যোগ করতেই হবে।

কিন্তু শ্রীলঙ্কা পারলো না। ইংল্যান্ডের পেস এটাকের কাছেই তারা ধরাশায়ী হলো। হালের পেস সেনসেশন জোফরা আর্চারের তিন উইকেট, মার্ক উডের তিন উইকেট শিকার শ্রীলঙ্কাকে আটকে রাখতে সমর্থ হলো মাত্র ২৩২ রানে।

জবাব দিতে নেমে ইংল্যান্ড যখন ব্যাটিংয়ে তখন জয়ের সম্ভাবনায় দেখাচ্ছে ইংল্যান্ড ৯৯% এগিয়ে, শ্রীলঙ্কার আশা আছে মাত্র ১%। শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক করুনারত্নে বল তুলে দিলেন মালিঙ্গার হাতে। শুরু থেকেই এদিন মালিঙ্গা এক অন্যরকম রুপ ধারণ করলেন। তার ভুড়ি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি কেন ওয়ানডে খেলছেন এসব নিয়ে আলোচনা, তার পারফর্মেন্স নিয়েও কানাঘুঁষা কম হচ্ছে না। কিন্তু, এদিন যেন তাকে দেখে মনে হলো, তিনি সেই পুরানো মালিঙ্গা, নিখুঁত লাইন, সুইং পাচ্ছেন কিছুটা, কখনো স্লোয়ার, কখনো বাউন্সার দিয়ে ব্যাটসম্যানদের দিশেহারা রাখছেন। জনি বেইরস্টো তো এলবিডব্লু হয়েই ডাক মেরে প্যাভিলিয়নে গেলেন। মালিঙ্গা ফেরত পাঠালেন আরেক ওপেনার জেমস ভিন্সকেও।

মালিঙ্গা
Image source – getty image

এরপর ইংল্যান্ড ছোট লক্ষ্যের এই ম্যাচে কিছুটা দেখেশুনে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছিল। জো রুট পথ দেখাচ্ছিলেন ইংল্যান্ডকে। কিন্তু, সেট ব্যাটসম্যান রুট যখন উইকেটে গেঁড়ে বসেছেন তখন আবারো মালিঙ্গার কাছেই গেলেন ক্যাপ্টেন। মালিঙ্গা তাকে ব্রেক থ্রু এনে দিলেন। রুটের ৬৭ রানের পরেও ইংল্যান্ড তাই হারের আশঙ্কা টের পেতে শুরু করলো তখন।

১৮৬ রানে ইংল্যান্ড নয় নাম্বার উইকেট হারিয়েছে। কিন্তু তখন ক্রিজে ছিলেন বেন স্টোকস। তিনি যতক্ষণ ক্রিজে ততক্ষণ ইংল্যান্ডের আশা জেগে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অপর প্রান্তে মার্ক উডকে স্ট্রাইক না দিয়ে তিনি নিজের কাছে স্ট্রাইক রাখলেন। ৪৬তম ওভারে উদানার বলে পরপর দুইটা ছয় মারলেন। তাতে শ্রীলঙ্কার আশার বেলুন কিছুটা চুপসে যেতে বসেছে যেন। প্রদীপের পরের ওভারে মারলেন পর পর দুইটা চার। মালিঙ্গার বদলে এই ম্যাচের হিরো হতে যাচ্ছেন বেন স্টোকস, অবস্থার প্রেক্ষিতে সেটাই মনে হচ্ছিলো।

ওভারের পঞ্চম বলে স্টোকস এক রান নিলেন। শেষ বলটা মার্ক উডকে মোকাবেলা করতে হবে। আর মাত্র ২০ রান লাগবে তারপর। ওভার সমস্যা না। স্টোকস স্ট্রাইক পেলেই চলবে। কিন্তু, মার্ক উড সেই বলটা সামলাতে পারলেন না। প্রদীপের বল উডের কাঠের ব্যাট ছুঁয়ে কিপারের হাতে জমে গেল। শ্রীলঙ্কা জয়ী হলো, ভাগ্যবিধাতা স্টোকসকে নন, এই ম্যাচে মালিঙ্গার প্রতিই সদয় থাকলেন। চারটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানের উইকেট নিয়ে মালিঙ্গা এই ম্যাচের হিরো হলেন, সাথে ম্যান অব দ্যা ম্যাচও।

৩৫ বছর বয়সী মানুষটা এদিন যে অসম্ভবের পাহাড় চড়েছেন, তাতে তিনি অনেক কিছুর যেন জবাব দিলেন। ক্রিকেট খেলাটাকে অনেকে অনর্থক সময় নষ্ট বলে ভেবে থাকে। কিন্তু, আপনি যদি শিখতে চান, অনুপ্রাণিত হতে চান কখনো কখনো ক্রিকেট আপনাকে যে শিক্ষাগুলো দিবে তা অন্য কোথাও পাওয়া যাবেনা। ব্যক্তিগতভাবে কখনো যদি আপনার মনে হয়, আপনি খাদের কিনারায় আছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, কেউ আপনার উপর আর আস্থা রাখছে না – মালিঙ্গার পারফর্মেন্সটা ভিজুয়ালাইজ করতে পারেন।

না, এখন কোনো সিক্স প্যাক নেই তার। ফিটনেস সত্যিই ভাল না। বোলিংয়ের ধারটা হয়ত নেই আগের মতো। গতিও কমে গেছে আগের তুলনায়। কিন্তু, মালিঙ্গার ক্লাস নিয়ে প্রশ্ন করবেন? সেই সংশয় দূর করলেন এমন বড় ম্যাচের পারফর্ম দিয়ে। শ্রীলঙ্কা তো বটেই, ফ্র‍্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও তিনি অসংখ্যবার ম্যাচ জেতানো বোলিং করেছেন। কিন্তু এই ম্যাচটা বিশেষ কিছুই হয়ে থাকবে, অন্তত এই বিশ্বকাপের জন্যে মালিঙ্গার এই পারফর্মেন্স বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক টার্নিং পয়েন্ট।

ট্রলের শিকার হয়েছিলেন যে ছবির কারনে

এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের হার শুধু শ্রীলঙ্কার জয় নয়, সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্টইন্ডিজ, পাকিস্থানের জন্যেও। এই চারটি দলের সেমিফাইনাল খেলার সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইংল্যান্ড হেরে যাওয়ায়। ইংল্যান্ডের বাকি তিনটি ম্যাচ টুর্নামেন্টের সেরা তিন দলের বিপক্ষে- ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড। তাদের এখন পয়েন্ট ৮। যদি তারা বাকি তিন ম্যাচের একটিতেও না জিতে সেক্ষেত্রে ৯/১০ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ সহ বাকি তিনটি দলের সুযোগ থাকছে সেমিফাইনাল খেলার। তবে, তার জন্যে ইংল্যান্ডের দিকে শুধু না তাকিয়ে নিজেদেরও জিততে হবে, মালিঙ্গার মতো খাদের কিনারা থেকে দলকে জিতিয়ে আনা অসাধারণ ক্রিকেট খেলতে হবে মাঠে। আর এতসব সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার জন্যেই শ্রীলঙ্কার জয়টা স্পেশাল, বিশ্বকাপের সেরা মুহুর্তগুলোর একটা হয়ে থাকবে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button