সিনেমা হলের গলি

নারীরও যৌন স্বাধীনতা আছে…

গত বছর লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা নারীর যৌনতা নিয়ে থাকা মৌনতাকে মফস্বল বা গ্রাম পর্যায়ে দেখিয়েছিল আর লাস্ট স্টোরিজ তা দেখিয়েছে বলা যায় আরবান মুম্বাইয়ের প্রেক্ষাপটে। অনুরাগ কশ্যপ, জয়া আখতার, দিবাকর ব্যানার্জি আর করন জোহর এই ৪ জনের পূর্বতম কোলাবরেশন ছিল ‘বম্বে টকিজ’ যার মেইন থিম ছিল Cinema আর এবার তাদের কোলাবরেশন হল Lust থিম নিয়ে।

সিনেমা শুরু হয় অনুরাগ কশ্যপের গল্প দিয়ে। ভার্সিটির টিচার কালিন্দি আর স্টুডেন্ট তেজাসের অদ্ভুত সম্পর্কের গল্প। যার শুরুটা হয় শরীরী চাহিদায় আর গড়াতে থাকে হিংসা, ঈর্ষা, একাকীত্ব থেকে ইনসিকিউরড ভালোবাসায়। রাধিকা আপ্তের ওয়ান সাইডেড কনভারসেশনগুলো অনবদ্য ছিল। মনে হচ্ছিল পরিচালক অনুরাগের সাথেই বুঝি আলাপ করছেন তিনি তার জীবন, যৌনতা, ইনসিকিউরিটি আর ভালোবাসা নিয়ে।

জয়া আখতারের গল্প শুরু হয় সুধা আর অজিতের বাস্তবিক যৌন দৃশ্য দিয়ে। দুজনের কামনা মুহূর্তেই ব্যবধান টেনে দেয় যখন সুধা কাপড় পরে ঘর মোছা শুরু করে আর অজিত অফিসের জন্য রেডি হওয়া। অজিত সিঙ্গেল ওয়ার্কিং বয় থাকে মুম্বাই এর বেশি নামী এক এলাকায়। মা,বাবা বছরে একবার আসেন। তাই ছেলের বাসার কাজ করার জন্য সুধা নামে এক কাজের মেয়েকে ঠিক করে যান তারা। সেই সুধাই অজিতের লালসার শিকার হয় আর সুধা আশা করে অজিতের অর্ধাঙ্গিনী হবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে দিতে জয়া এক মিনিটও যেন সময় নেন নি। সে টুকরো হয়ে যাওয়া স্বপ্ন সামলে সুধা আবার নরমাল লাইফে যে ফিরে আসতে পারবে, সেটুকু শক্তি যে এই নিম্নবিত্ত কর্মজীবী মহিলাদের আছে সেটাও জয়া বুঝিয়ে দিয়েছেন যেন শেষ দৃশ্য দিয়ে। সুধা চরিত্রে ভূমি কী দারুণ অভিনয়ই না করেছেন!

দিবাকর ব্যানার্জির গল্পটা মধ্যবয়স্ক চাহিদা নিয়ে। যে সময়টায় ভালোবাসা-বিয়ে অর্থহীন হয়ে যায় দীর্ঘ দায়িত্বের চাপে সে সময়টা নিয়ে। যে শিকল (সন্তান, সংসার) পরিয়ে আটকে রাখতে চায় সমাজ অনিয়ন্ত্রিত চাহিদাগুলোকে, সে শিকল ভেঙে ফেলে আধুনিক মানুষ। তবুও কম্প্রোমাইজ আর স্যাক্রিফাইসের বুলি আওড়িয়ে ক্ষণকাল আরও টিকিয়ে রাখাই যেন স্বস্তি। মনীষা কৈরালাকে স্ক্রিনে দেখাই এখন খুব দারুণ একটা ব্যাপার। একসময়ের লাস্যময়ী নায়িকা মধ্যবয়সে বিশাল জীবনযুদ্ধ পাড়ি দিয়ে আবার ফিরছেন পর্দায়। অথচ এদিকে তার চেয়ে বয়সে বড় নায়কেরা এখনো হাঁটুর বয়সী নায়িকাদের সাথে অভিনয় করে যাচ্ছেন আর তিনি তার ঝুলে যাওয়া স্বাভাবিক চামড়া দেখাতে দ্বিধাবোধ করেন না। সঞ্জয় কাপুর আর জয়দীপ আওলাওয়াত কেবল সঙ্গ দিয়ে গেছেন মনীষাকে।

করন জোহরের পার্টটুকু ছিল যৌনরসাত্মক। স্কুল টিচার মেঘা সবসময়ই একটু লাজুক প্রকৃতির। বাসা থেকে ঠিক হওয়া এরেঞ্জ মেরেজে তাই মানা করে নি সে। ওদিকে বিয়ে ঠিক হয়েছে যার সাথে সেই পারাস খুবই সাদামাটা, ছিমছাম, গোবেচারা টাইপের ছেলে। কোন খুঁত ধরার মতো নেই যেন তার মাঝে। মেঘা বিয়ে করে নেয় কিছুটা হুট করেই। পারাস মেঘাকে ভালোবেসে ফেলে, যত্ন নেয়ও খুব ভালো করে। কিন্তু দুজনের ইন্টারকোর্সের সময় মেঘার তৃপ্তি-অতৃপ্তি নিয়ে কোন পরোয়াই করে না। সে নিজে তৃপ্ত হলেই মনে করে মেঘা খুশি হয়েছে। অথচ মেঘার মুখের মলিনতা, অতৃপ্তি কিছুই তার চোখে পড়ে না। সেই মেঘাই নিজে নিজের তৃপ্তি খোঁজার পণ করে। কিয়ারা আদ্ভানি আর ভিকি কৌশল দুজনেই দারুণ ছিল। কাভি খুশী কাভি গামের টাইটেল ট্র্যাকের সাথে মেঘার অর্গাজমের দৃশ্য মিলিয়ে করন যেন নিজেকেই নিজে মক করলেন এবং এই কাজটা করার জন্য তিনি সাধুবাদও পাবেন।

লাস্ট স্টোরিজ লাস্টকে কখনো নেগেটিভভাবে দেখায় নি বা নারীদের লাস্টকে গ্লোরিফাই করতে গিয়ে পুরুষদের ছোট করে নি। মানুষমাত্রই যে লাস্ট মেটানোর প্রয়োজন আছে এবং সে প্রয়োজন কী পরিণাম আনতে পারে সেটির চারটি রূপ দেখিয়েছে মাত্র। নারী স্বাধীনতায়ই বিশ্বাসী না যে সমাজ তাকে নারীর যৌন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী করানোর ছোট্ট একটি প্রয়াস হিসেবে দারুণ ছিল এই লাস্ট স্টোরিজ।

অনেকেই হয়তো এই সিনেমা নিয়ে নেগেটিভ ধারণা পোষণ করছেন। যখন ভারুন ধাওয়ান সিনেমায় মেয়েদের নিতম্বে থাপ্পড় দেন, তখন কোন সমস্যা হয় না, যখন তিনি মেয়েদের মুখ সদৃশ কমোডে হিসু করেন তখন সমস্যা হয় না। সে সিনেমা হয় সে বছরের হাইয়েস্ট গ্রসিং সিনেমা। আর মেয়েদের মাস্টারবেশন বা সেক্স সিন দেখালেই মাথায় হাত, ছিঃ ছিঃ রব। যে বলিউড ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন রেইপ সিন দেখিয়ে হল ভর্তি করেছে, আইটেম গানে শরীর দেখিয়ে সিনেমা হিট করেছে সে ইন্ডাস্ট্রিতে নারী সেক্সে তৃপ্ত না এটা দেখালে এখন হায় হায় করে দর্শকরা। আবার কেউ কেউ হয়তো বলবেন চলচ্চিত্র উৎসবে এডাল্ট সিন দেখানো সিনেমাগুলো পুরস্কার পায়। তো সেই সিনেমাগুলো কি কন্টেন্টের দিক দিয়ে ভালো না? সিনেমা যতো রিয়েলিস্টিক হবে ততই সেগুলো ক্রিটিকরা পছন্দ করবে। এই সিনেমায় সেই বাস্তবতাই দেখানো হয়েছে। টিচার স্টুডেন্ট রিলেশনশিপ হরহামেশাই হচ্ছে, কাজের মেয়ের সাথে যৌনতা হরহামেশাই হচ্ছে, পরকীয়া হচ্ছে, স্ত্রীকে জোর করে বাচ্চা গছিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারী ও পুরুষের সমঅংশগ্রহণেই সেগুলো হচ্ছে, এই সিনেমায় যে-ই না সবগুলো ঘটনা নারীদের পারস্পেক্টিভ থেকে দেখানো হল ওমনি সবার পিত্তি জ্বলে গেল। যেন এই সমাজে এগুলো হয়ই না। স্ত্রী তৃপ্ত হবে, ছিঃ ছিঃ!

এই সমাজের, সমাজের মানুষদের চোখ খুলুক এই আশাই করি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button