খেলা ও ধুলা

সংখ্যার বিচারে স্টিভ ওয়াহ-রিকি পন্টিংদের চেয়েও এগিয়ে তিনি!

দশ বছর বয়সে যখন ক্রিকেট খেলাটা বুঝতে শিখেছিলেন, তার কিছুদিন বাদে ল্যুক গিলিয়ান আবিস্কার করলেন, ক্রিকেটের মধ্যেই তার সবটুকু ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। বয়স যখন পঁচিশ, ততদিনে গিলিয়ান বুঝে গিয়েছিলেন, খেলাটাকে ছেড়ে তিনি বেঁচে থাকতে পারবেন না, তাই এটাকেই জীবিকার উপায় বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। গিলিয়ানের বয়স এখন প্রায় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, এখনও তিনি প্রতিটা দিন বাঁচার রসদ পান ক্রিকেট থেকে, আরেকটু ভালোভাবে বললে, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে!

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পাঁড় সমর্থক গিলিয়ান। শুধু সমর্থকই নন, তার চেয়েও বেশিকিছু। সিডনি থেকে অ্যান্টিগা, বেঙ্গালুরু থেকে দুবাই, ঢাকা থেকে ক্রাইস্টচার্চ কিংবা জোহানেসবার্গ থেকে এজবাস্টন- অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ দেখতে কোথায় হাজির হননি তিনি? পরনে ফ্লানেলের বাহারী রঙের শার্ট, হাতে অস্ট্রেলিয়ার নীল পতাকা- এই রূপে তাকে দেখা গেছে অজস্রবার, গত তিন দশক ধরেই অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে গ্যালারী মাতিয়ে রাখার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। গ্যালারীতে লোকে তাকে ‘ল্যুক স্প্যারো’ নামে ডাকে, পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ানের ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো’র নামের সঙ্গে মিলিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ডটা যৌথভাবে স্টিভ ওয়াহ এবং রিকি পন্টিঙের দখলে, দুজনেই খেলেছেন ১৬৮টি টেস্ট। গিলিয়ান কিন্ত সংখ্যার বিচারে পন্টিং-ওয়াহ দুজনকেই ছাপিয়ে গেছেন অনেক আগে। গতকাল লর্ডসের লংরুমে বসে টিম পেইন এবং জো রুটকে যখন টস করতে দেখলেন, ততক্ষণে তার নামের পাশে ২০০ নম্বর টেস্ট ম্যাচটা যুক্ত হয়ে গেছে। দর্শক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ২০০টি ম্যাচে মাঠে হাজির ছিলেন তিনি। এই সংখ্যাটা যে আরও বাড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

একশো টেস্ট খেলা কোন ক্রিকেটারকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, কেউই বলবেন না যে জার্নিটা খুব আরামদায়ক ছিল। হোম-অ্যাওয়ে সিরিজ খেলতে আজ এখানে তো কাল সেখানে, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকা, একটা যাযাবর জীবন কাটানো- একজন ক্রিকেটারকে এসবে মানিয়ে নিতেই হয়। তবুও তো ক্রিকেটারেরা হাজারটা সুযোগ সুবিধা পান, কিন্ত গিলিয়ান? তাকে তো কেউ ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেয়নি, হাজারটা বাধা বিপত্তি আর প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেই ‘টেস্ট নম্বর ২০০’ ট্যাগটা তিনি নামের পাশে যোগ করতে পেরেছেন।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া গতকাল গিলিয়ানের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সেখানেই তিনি গল্পের ডালি খুলে বসেছিলেন, শুনিয়েছেন, গত পঁচিশ বছর ধরে ক্রিকেটকে ভালোবেসে কি অসম্ভব একটা যুদ্ধ তিনি করছেন, কত ত্যাগ তাকে স্বীকার করতে হয়েছে এজন্যে। ট্যুর অপারেটরের একটা ব্যবসা করতেন, সেটা মার খেয়ে গেছে। তৈরি পোষাকের ব্যবসা ছিল, ব্রেক্সিটের ঝামেলায় ভ্যাট বেড়ে গিয়ে সেটাতেও বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, দেনার দায়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দিতে হয়েছে একটা সময়ে।

তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তার ভ্রমণসঙ্গীকে হারিয়েছেন এই সময়ে। দেউলিয়া হবার বোঝা মাথায় চেপে যখন সময় পার করছেন, তখন তার বন্ধুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন মস্কোর এক হাসপাতালে। শেষ সময়ে বন্ধুর পাশে থাকার জন্যে যে বিমানের টিকেট কিনবেন, সেই টাকাটাও তখন ছিল না তার কাছে। এরইমধ্যে খবর এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে ট্যাক্স পরিশোধ না করায় লণ্ডনে তার বাড়িটা কবজা করে নিলামে তুলেছে সরকার, সেটাও আর ফিরে পাননি তিনি।

ক্রিকেটের প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ডেনিস লিলিকে দেখে। ১৯৮১, মেলবোর্ন। গিলিয়ান তখন ১১ বছরের কিশোর। সেই ম্যাচেই টেস্টে ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারীর মুকুট মাথায় তুলেছিলেন লিলি। তার আগ্রাসী বোলিংটাই অদ্ভুত এক উন্মাদনার জন্ম দিয়েছিল কিশোর গিলিয়ানের মনের ভেতরে। এরপর অ্যালান বোর্ডার থেকে স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং থেকে মাইকেল ক্লার্ক; অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে পালাবদল ঘটেছে বেশ কয়েকবার, বদলায়নি একটা দৃশ্য- রঙচঙে শার্ট পরে গ্যালারিতে অস্ট্রেলিয়ার পতাকা ওড়াচ্ছেন ল্যুক গিলিয়ান!

স্টিভ ওয়াহ’র সঙ্গে ভালো খাতির জমিয়ে ফেলেছিলেন, ১৯৯৭ সালে অ্যাশেজ জয়ের পরে তাকে ড্রেসিংরুমে ডেকে নিয়েছিলেন ওয়াহ। দলের বিজয়সঙ্গীতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গিলিয়ান। সেই অ্যাশেজে স্টিভ ওয়াহকে একটা ডাইরী উপহার দিয়েছিলেন গিলিয়ান, ওয়াহ সেটা রাখার জায়গা না পেয়ে নিজের প্যাডের ভেতরে গুঁজে রেখেছিলেন, পরে সেই অবস্থাতেই ব্যাটিঙে নেমে পড়েছিলেন। নিজের আত্মজীবনীতেও এই ঘটনাটা বেশ রসিয়ে লিখেছিলেন ওয়াহ।

অস্ট্রেলিয়ার অপরাজেয় দলটাকে চোখের সামনে দেখেছেন গিলিয়ান, দেখেছেন ভাঙাচোরা দলটাকেও। টানা বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন, আবার দেখেছেন ঘরের মাঠে সিরিজ হারতে, অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে। সমর্থন দেয়া বন্ধ করেননি তিনি, তার হাতে ধরা পতাকাটা উড়েছে পতপত করে। এবারের অ্যাশেজ দেখতে আসতে পারবেন কিনা, সেটা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। পকেটের অবস্থা খুবই খারাপ, নিজের বাড়িঘর কিছুই নেই এখন, এক বন্ধুর বাসায় তার জীবন কাটে। অস্ট্রেলিয়া দলের ম্যানেজারকে মেইল করে জানিয়েও দিয়েছিলেন, ‘আমি হয়তো এবারের অ্যাশেজে থাকতে পারবো না…’

অস্ট্রেলিয়ার সুসময়ে গিলিয়ান দলের সাথে ছিলেন, দুঃসময়েও সঙ্গ ছাড়েননি। অস্ট্রেলিয়াও তার দুঃসময়ে তাকে একা ছাড়লো না, গিলিয়ানকে জানানো হলো, তিনি যদি ইংল্যান্ডে আসতে পারেন, তার থাকা-খাওয়া এবং টিকেটের ব্যবস্থা দল করবে। জাস্টিন ল্যাঙ্গার এবং স্টিভ ওয়াহ বিমানের টিকেটের ব্যবস্থা করে দিলেন। ইংল্যান্ডের বিমানে চড়ে বসলেন গিলিয়ান, বিমান উড়ে চললো তার স্বপ্নের দিকে।

এজবাস্টনে প্রথম টেস্টে গ্যালারিতে ছিলেন গিলিয়ান, দলও জিতেছে। লর্ডস টেস্ট শুরুর আগে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সম্মানজনক ডিনারে, দলের খেলোয়াড়েরা অফিসিয়াল ফটোসেশনের সময় তাকে ডেকে নিয়েছে, ছবিতে জায়গা পেয়েছেন তিনিও। গিলিয়ানের ২০০ টেস্টের মাইলফলকের কথা ভোলেনি টিম অস্ট্রেলিয়া, কেক আনা হয়েছে, কেক কেটে শ্যাম্পেনের বোতল খুলে খুশির মূহুর্তটা উদযাপন করেছে সবাই মিলে। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সই করা একটা জার্সি তুলে দেয়া হয়েছে তার হাতে, দলের অনুশীলনেও আমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি।

সপ্তাহ দুয়েকের ব্যবধানে সিডনির ঘুঁপচি ফ্ল্যাট থেকে লর্ডসের লংরুমে- আনন্দে গিলিয়ানের চোখে পানি চলে এসেছে। আবেগে কাঁপতে থাকা গলায় তিনি ধন্যবান দিয়েছেন দলকে। এবারের অ্যাশেজটা হয়তো টিভির সামনে বসেই দেখতে হতো তাকে। অস্ট্রেলিয়া দল এবং তার বন্ধুরা মিলে তাকে মাঠে খেলা দেখার সুযোগটা করে দিয়েছে, সেজন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি গিলিয়ান।

টেস্ট ক্রিকেটটা বোরিং হয়ে যাচ্ছে বলে কত অভিযোগ, তাতে নতুনত্ব যোগ করার জন্যে আইসিসির কতো প্রচেষ্টা। দর্শক কমছে, টেস্ট ক্রিকেট খুব দ্রুতই হারিয়ে যাবে বলেও মত দিচ্ছেন কতজন! ল্যুক গিলিয়ানের মতো দর্শকেরা যখন টেস্ট ক্রিকেটকে ভালোবেসে এমন আবেগী গল্পের জন্ম দেন, তখন হাওয়ায় ভেসে যায় সংশয়বাদীদের এসব শঙ্কা। টেস্ট ক্রিকেটটা গিলিয়ানের মতো মানুষগুলোর জন্যেই আরও শত বছর বেঁচে থাকবে, এটা নিশ্চিত!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button