রিডিং রুমলেখালেখি

‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’

Syeda Islam:

গত বছর নিউ ইয়র্ক গিয়েছিলাম আমার ফুফাতো বোনের বিয়েতে। একদিন ম্যানহাটানে আমি আর মামাতো বোন উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করার পর সে কাজে চলে যায়। ঠিক কাজ না, একটা মিটিং এটেন্ড করতে হবে ঘণ্টাখানেকের জন্য; তারপর আবার ঘুরাঘুরি আর আড্ডা। সে যাওয়ার পর আমি ঢুকে পড়ি একটা লোকাল রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে। হাই হিল আর চকচকে জুতো ছাড়া ঢুকা যাবে না এইরকম রেস্টুরেন্ট আমি পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি। অনেক নখরামি করতে হয় খেতে গিয়ে। পিঠ সোজা রাখতে হবে, ফিসফিস করে কথা বলতে হবে, ন্যাপকিন দিয়ে আলতো করে ঠোঁট মুছতে হবে, ছুরি, কাঁটা চামচ এইভাবে না, ওইভাবে ধরতে হবে, মুখ বেশি হাঁ করা যাবেনা, টেবিলে হাত রাখা নিষেধ, দুনিয়ার ফ্যাঁকড়া।

তার উপর গলাকাটা দাম আর হাতের মুঠোয় ধরা যায় এমন সামান্য খাবার। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি দামি রেস্টুরেন্টে থেকে টং দোকান কিংবা ঘরোয়া টাইপ দোকানের খাবারগুলো বেশি মজার হয়। স্বাদ, গন্ধ থাকে অতুলনীয়, পরিমানে বেশি দেয় আর দামে অনেক সস্তা। তাছাড়াও পিঠ বাঁকা করে বসে, পা নাচিয়ে নাচিয়ে কথা বলে খাওয়ার মজাই আলাদা।

রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে দেখি মানুষ গিজগিজ করছে। লাঞ্চ আওয়ার বেশ কিছুক্ষন আগেই শেষ হয়েছে কিন্তু নিউ ইয়র্কে ফুটানি মার্কা রেস্টুরেন্ট ছাড়া প্রায় সব খাবারের দোকান সবসময় ব্যস্ত থাকে। সময় নষ্ট করে বসার জায়গার জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে ঠিক করলাম অন্য কোথাও যাব। বের হওয়ার জন্য ঘুরে দাড়াতেই আমার নাম শুনলাম। আবার ঘুরলাম, মারাত্মক সুদর্শন চেহারার ইটালিয়ান এক চেংড়া আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে। আমি বেশ অবাক হলাম। আমি ইটালিয়ান কাউকে চিনিনা। তাছাড়া আমি যাদেরকে চিনি, তাঁরা কেউই তেমন সুন্দর না আমার স্বামী প্রবরটি ছাড়া। একদম মিথ্যে বলছিনা। আমার স্বামীকে দেখলে এক বাক্যেই স্বীকার করবে সবাই। কিন্তু কথা হল আমাকে নাম ধরে, হাত নেড়ে ডাকছে কে। আমি এগিয়ে গেলাম।

“কি খবর?”
“ভালো” (আমি টাসকি খাইলাম। ইটালিয়ান দেখি বাংলা কয়)
“অনেকদিন পর তোকে দেখলাম। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস কেন?”
“না, মানে…।” (দ্বিতীয় টাসকি, চেংড়া দেখি আমারে “তুই” কইরা ডাকে)
“দাড়িয়ে আছিস কেন? বস”
“আপনাকে ঠিক…।”
“তুই কবে থেকে আমাকে আপনি করে বলিস? আমাকে ভুলে গেছিস?”
আমি আকাশ পাতাল খুঁজে মনে করতে পারলাম না কোন ইটালিয়ান কে আমি চিনি যে বাংলা বলতে পারে, তার উপর আমাকে “তুই” করে সম্বোধন করে।
“আমি এল আই সি’র হিমেল।”
তৃতীয় টাসকি খেয়ে আমি প্রায় মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলাম।

হাইস্কুলে আমরা সব মিলিয়ে মোট বারো-পনেরোজনের মতো ছিলাম। তখন নিউ ইয়র্কে এত বাঙালি ছিলনা। আমি যখন টুয়েলভে উঠি তখন হিমেল নাইনে ভর্তি হয়। আমার সাথে তেমন কথা হতোনা। আমি ব্যস্ত ছিলাম স্কুল গ্রেজুয়েশন আর কলেজ প্রিপারেশন নিয়ে। হিমেল তখন নতুন হাইস্কুল উঠেছে। লম্বা, লিকলিকে, ঢ্যাঙা গড়ন, গড়পড়তা বাঙালি ছেলেদের তুলনায় বেশ ফর্সা একটি কিশোর ছেলে। । তের, চৌদ্দ বছরের ছেলেদের যে শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনটা আসে তা তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। কিছুটা বিব্রত, কিছুটা ভয়ে, কিছুটা বিভ্রান্তে সে অস্থির। সবমিলিয়ে তাঁর চেহারার মধ্যে দিশেহারা ভাব থাকতো। তবে লেখাপড়ায় তুখোড় ছিল।

আমার সাথে তাঁর তেমন কথাবার্তা না হলেও তাঁর সারল্য আর ব্যাবহার আমাকে মুগ্ধ করতো। কয়েকমাস পর তাঁর পরিবার আমাদের এপার্টমেন্টের সামনের বাড়ীর এক তলা ভাড়া নেয়। তখন তাঁকে আরও ভালোভাবে চিনতে পারি। ভীষণ মার্জিত এবং অমায়িক একটি পরিবারের ছেলে। হিমেল একমাত্র ছেলে আর ফাইভে পরে এক বোন, হিমি। আঙ্কেলকে তেমন দেখতাম না তবে আন্টির সাথে বেশ ভাব ছিল। কঠিন পর্দা মেনে চলতেন তিনি।

প্রায় দুই-তিন বছর আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তারপর হিমেলরা আবার বাসা বদলায়। কীভাবে যেন আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমে যায়। তবে হিমেলকে দেখতাম মোটা হওয়ার জন্য কি চেষ্টাটাই না করতো। প্রত্যেকদিন পাঁচ-ছয়টা ডিম, দুই-তিন গ্লাস দুধ, দুই তিন স্লাইস পিৎজা, বিগ ম্যাক, বেশি করে বিস্কিট, কেক, হাই কার্ব, হাই ফ্যাট জাতীয় খাবার খেত মোটা হওয়ার জন্য। মাঝে মাঝে ওর খাওয়া দেখে আমার বমি চলে আসতো, কিন্তু হিমেল যেই লাউ সেই কদুই থাকতো। সেই টিংটিঙে হিমেল যদি এখন গ্রিক দেবতাদের মতো সুঠাম দেহের অধিকারী হয় তাহলে তো অবশ্যই আমার টাসকি খাওয়ার কথা।

“কি খাবি বল?আমি তোর একটু আগে এসেছি। চেয়ারে বসতেই তোকে দেখলাম। শোন, আমি আজ তোকে খাওয়াবো। এতদিন পর তোর সাথে দেখা।”
ওয়েটারকে আমরা খাবার আর ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিলাম। আমার এখনও অবাক ভাবটা কাটছেনা।
“তুই এমন বদলে গেলি কীভাবে? স্বাস্থ্য বেশ ভালো হয়েছে তোর। “
“মোটা হয়েছি?”
“আরে ধুর, কিন্তু এমন সুন্দর হইলি কেমনে?”
হিমেল হাসল। হাসিতে মুক্তো ঝরে টাইপের দাঁত।
“কলেজে উঠার পর এক বন্ধুর কথায় জিমে ভর্তি হই। ইন্সট্রাক্টরের কথা মতো খাওয়া, ব্যায়াম শুরু করি। আস্তে আস্তে স্বাস্থ্য ফিরে যায়। এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।”
“আমি কিন্তু আসলেই তোকে চিনতে পারিনি। তাছাড়া কত বছর পর তোর সাথে দেখা বলতো? প্রায় উনিশ বিশ বছর হবে, তাইনা?”
“হ্যাঁ, তাই হবে। তোকে কিন্তু আমি এক দেখাতেই চিনেছি। তুই খুব একটা চেঞ্জ হসনি।”
“কি বলিস……অনেক মোটা হয়েছি।”
“সেটা তো অনেকেরই বয়স হলে হয় কিন্তু তুই মোটা না। বিয়ে করেছিস নিশ্চয়? ছেলে মেয়ে কয়টা?”
“দুই মেয়ে, এক ছেলে। তোর কয়টা? বউ দেশি না বিদেশি?”

হিমেল আবার হাসল। ততোক্ষণে খাওয়া এসে গিয়েছে। আমরা খেতে শুরু করেছি।
“একা এসেছিস না ফ্যামিলি নিয়ে?”
“আমি এক মেয়েকে নিয়ে এসেছি। আঙ্কেল, আন্টি কেমন আছেন?”
“বাবা মা আছেন ভালোই। বয়স হয়েছে, বাড়িতেই থাকেন বেশির ভাগ সময়। হিমি বিয়ে করেছে ছয় বছর হবে। এক ছেলে আছে তার। তিন হল এই সেদিন।”
“বাহ, ভাবতেই পারছিনা, হিমিকে কত ছোট দেখেছিলাম। আর কারও সাথে যোগাযোগ আছে? আমি একবার শুনেছিলাম মারুফ নাকি ভার্জিনিয়া থাকে। “
“তাই নাকি? আপস্টেট থেকে কবে মুভ করলো সে? নিপা ব্রুকলিনে থাকে। মাঝে মাঝে দেখা হয়। দুইটা মেয়ে তার। আর রোমেল কলেজ গ্রেজুয়েশানের পরপরই সিয়াটলে চাকরি পেয়ে চলে যায়। আমেরিকান বিয়ে করেছে। টুইন বেবি হয়েছে।”
“কীভাবে দিন যায় !!! মনে আছে আমরা স্কুলের পাশেই ছোট দোকানে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতাম?”

“মনে আছে। দোকানটা এখনও আছে। মালিকের মেয়ে এখন চালায়। চল, এখান থেকে উঠি। সেন্ট্রাল পার্কে একটা কফি শপ আছে। খুব ভালো কফি বানায়।”
“ঠিক আছে চল। কিন্তু কফির দাম আমি দিবো।”

কফি হাতে দুইজন পার্কের ভিতর ঢুকলাম। হিমেলকে বেশ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। আমাদের ঠিক সামনেই দুই-তিন বছরের একটা ছেলে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যাথা পেয়েছে। মা কোলে নিয়ে কান্না থামাবার চেষ্টা করছে। বাবা হাঁটুতে ফুঁ দিচ্ছে। একটা পার্কে খুবই স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। আমার ধামরা বাচ্চারা প্রত্যেকবার বাইরে খেলতে গেলে এখনও হয় হাঁটু নইলে কনুই ছিলে আসে। হিমেলকে দেখলাম খুব আগ্রহ নিয়ে পরিবারটিকে দেখছে।

“হিমেল, তুই কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিস। বিয়ে করেছিস নাকি করিস নি? আজকাল তো আবার অনেকে বিয়ে করতে চায়না।”
“বিয়ে একটা করেছিলাম সাত বছর আগে। এখন সিঙ্গেল।”
“বিয়ে “একটা” করেছিলাম মানে কি? এভাবে বললি কেন?”
“একটা বিড়ি ধরালাম, মাইন্ড করিস না।”
“তুই কবে থেকে বিড়ি খাওয়া ধরলি?”
“কলেজে থাকতে বদভ্যাসটা হয়েছে। তবে সবসময় খাইনা, মাঝে মধ্যে মুড হলে খাই। তুই মানা করলে ধরাবো না।”
“তুই খা, সমস্যা নাই।”
হিমেল সিগারেট ধরানোর ফাঁকে আমি তাঁকে ভালোমতো দেখলাম। ব্যায়াম করে শরীরে, চেহারায় কাঠিন্য এনেছে। চওড়া কাঁধ, বাইসেপ্স, ট্রাইসেপ্স ফুলে আছে। না দেখলেও বুঝতে পারছি শার্টের নিচে ফোর প্যাক কি সিক্স প্যাক আছে। আশেপাশের মেয়েরা ঘুরে ঘুরে তাঁকে দেখছে। তবে যতোই ডাম্বেল আর বেঞ্চ প্রেসিং করে পেটানো শরীর বানাক না কেন, দুই চোখ ভরা সেই কৈশোরের সারল্য এখনও হারিয়ে যায়নি।
“হা করে কি দেখছিস?”
“তোকে দেখি। কি যে সুন্দর হয়েছিস। দেখছিস না, সবাই কেমন তোর দিকে বারবার তাকাচ্ছে।”
আবার সেই মুক্তঝরা হাসি। সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলল,

“আন্ডারগ্রেড করার পরপরই চাকরি পেয়ে যাই একটা পাবলিশিং কম্পানিতে। আমার ডিপারট্মেন্টে আমি ছাড়া কলকাতার একটা মেয়ে ছিল, অপর্ণা মিত্র। দেখতে আহামরি কিছু না তবে মাথা ভর্তি একঢাল কালো চুল আর দুটি বড় বড় চোখ ছিল। আমি শুধু তার চুল আর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। পুরো ডিপার্টমেন্টে আমরাই শুধু দুজন বাঙালি। প্রায়ই একসাথে লাঞ্চ করা, ব্রেক নেয়া, কাজের পর আড্ডা মারা হত। দুই বছর পর অন্য একটা চাকরি নেই। অপর্ণার সাথে আর তেমন দেখা হতোনা। একসময় কাজের চাপে তাকে ভুলে যাই। তিন চার বছর পর একদিন জানতে পারি শরীর নাকি খুব খারাপ তার। ব্লাড ক্যান্সার, লাস্ট স্টেজ। হাসপাতালে দুই মাস ধরে আছে। আমি আরও এক দেড় মাস পর তাঁকে দেখতে যাই। ক্যান্সার আসলে কি হতে পারে আমার জানা ছিলনা। গাল ভেঙ্গে গিয়েছে, চোখ কোটরে ঢুকে গিয়েছে, সাদা হাড্ডিসার শরীর আর সেই এক ঢাল চুলের জায়গায় এক মাথা টাক। আমি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারিনি।

তারপর প্রায়ই তাঁকে দেখতে যেতাম। টুকটাক কথা বলতাম, আড্ডা মারতাম, বই পড়ে শুনাতাম। কোন কোনোদিন গিয়ে দেখতাম সে ঘুমোচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ বসে চলে আসতাম। এর মাঝে হিমির বিয়ের কথাবার্তা শুরু হল। আমি অপর্ণাকে বিয়ের খুঁটিনাটি সব কিছু বলতাম, হাসতাম, ছোট বোন বিয়ে করে চলে যাবে তাই নিয়ে মন খারাপ করতাম। দিনে দিনে অপর্ণার শরীর আরও খারাপ হচ্ছিলো। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

একদিন হিমির বিয়ের বাজারের কিছু ছবি দেখতে দেখতে বলল, “জান হিমেল, আমার খুব শখ ছিল আমার মায়ের বিয়ের শাড়ি পড়ে আমি বিয়ে করবো। আমি মাঝে মাঝে মার শাড়ি পড়ে, কপালে নিজে চন্দন দিয়ে সাজিয়ে পুরো বাড়ী ঘুরে বেড়াতাম। মানুষদের কত শখ থাকে, দেশ বিদেশ ঘুরবে, টাঁকা পয়সা কামাবে, বড় বড় ডিগ্রি নিবে আর আমার শখ শুধু মায়ের বিয়ের শাড়ি পড়ে বিয়ে করা। কি পাপ করেছিলাম এই জীবনে যে ভগবান এই সামান্য শখটুকু পূরণ করতে দিলো না।”

হিমেল একটু থামল। ফর্সা মুখটা কেমন যেন লাল হয়ে আছে।

“হিমেল, কোথাও বসবি? তোকে টায়ার্ড মনে হচ্ছে।”
“আরে নাহ, হাঁটতেই ভালো লাগছে। চল, লেকের দিকে যাই। সেদিন অপর্ণাকে দেখে বাসায় আসার পর আমার কি যেন হল, আমি মাকে গিয়ে বললাম, আমি অপর্ণাকে বিয়ে করতে চাই। সত্যিকারের বিয়ে না, শুধু এক মৃত্যু পথযাত্রীর এক আশা পূর্ণ করা। মা সব শুনে কিছুই বললো না, অন্যদিকে চলে গেলো। আমি কথাগুলো বলেই বুঝলাম কত বড় ভুল করেছি। বাবাকে মানানো গেলেও মাকে অসম্ভব। তুই তো আমার মাকে চিনিস।

যে মহিলা জীবনে বাবা আর আমি ছাড়া অন্য কোন পুরুষের সামনে যাননি, সেই মহিলা কীভাবে আমার বিয়ে একটা হিন্দু মেয়ের সাথে মেনে নিবেন? বিয়েটা সত্যি হোক আর মিথ্যে। তাছাড়া হিমির বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন শুনলে পাঁচরকম কথা উঠতে পারে। সেদিনের পর আমি মার থেকে লুকিয়ে থাকতাম। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা লজ্জায়।

পাঁচ ছয় দিন পর মা আমাকে জানতে চাইলো অপর্ণার সাথে কয়দিনের প্রেম। আমি বললাম প্রেম না। শুধু মেয়েটার শখ পূরণ করতে চাই। মা আর কিছু বললেন না কিন্তু অপর্ণার ফোন নাম্বার নিয়ে গেলেন। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর মা’র সাথে এক জায়গায় যেতে বললেন। মা, আমি, বাবা আর হিমি গেলাম। সেটা অপর্ণার বাড়ী ছিল। বেশ লোকজন বাড়ীতে। আমাকে ধুতি আর পাঞ্জাবী পরানো হল, কপালে চন্দন। ছোট্ট এক আগুনের কুণ্ডলীর সামনে চেয়ারে বসলাম। অপর্ণা এল বিয়ের সাজে হুইল চেয়ারে বসে। তারপর ঘোরের মাথায় কি সব মন্ত্র পড়লাম, নিয়ম নিতি পালন করলাম কিছুই বুঝলাম। আমার চোখ ছিল শুধু মায়ের দিকে। কালো বোরকা আর নেকাব পরা মাকে সিঁদুরশাঁখা পরা মহিলাদের মাঝে বড্ড বেমানান লাগছিলো। বিয়ে হওয়ার পর অপর্ণা মাকে প্রণাম করতেই মা তাকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। একজন হয়তো কাঁদছে এই ভেবে যে এ কেমন মিথ্যে বিয়ে হল আমার একমাত্র ছেলের। আরেকজন ভাবছে এ কেমন মিথ্যে বিয়ে হল আমার। আচ্ছা, আমরা কেন এত জাত ধর্ম নিয়ে মারামারি করি বলতো? বোরকা নেকাব পরা আর শাঁখা সিঁদুর পরা দুজন মানুষ জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, এর থেকে সুন্দর দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। আমার মিথ্যে বিয়ের ছবি দেখবি? এই দেখ”

হুইল চেয়ারে বসা কঙ্কালসার, টাক মাথায় ওড়না, মুকুট পরা এক বউ। সিঁদুর আর কপালে আঁকা চন্দন কেমন যেন একসাথে ধেবড়ে আছে। ব্লাউজটা ঢলঢল করছে। ফুলের মালাটা তার শরীর থেকেও বড় মনে হচ্ছে। কিন্তু আর সব নতুন বউদের মতো অপর্ণার মুখেও লাজুক একটা আভা খেলা করছে। কত দামি মেকআপ দেয়া বউ দেখেছি কিন্তু অপর্ণার মতো এত সুন্দর কাউকে লাগেনি। আহা, বেচারির বউ সাজার কি শখ। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।

“বিয়ের পরপরই অপর্ণার শরীর খুব তাড়াতাড়ি খারাপ হয়ে যায়। আমি কাজ থেকে প্রত্যেকদিন অপর্ণাকে দেখতে যেতাম। শেষের দিকে অপর্ণা কোন কথা বলতে পারতোনা। শুধু আমার হাত ধরে থাকতো। বিয়ের দেড় সপ্তাহ পরেই অপর্ণা মারা যায়। মারা যাওয়ার সময়ও হাত ধরে ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম ও মারা যাচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে থাকা বড় বড় উজ্জ্বল দুটো চোখ আস্তে আস্তে নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।

অপর্ণা মারা যাওয়ার পর আমি কেন যেন গভীর ডিপ্রেশনে চলে যাই। কাজ ছেড়ে দিয়ে সারাদিন অন্ধকার রুমে বসে থাকতাম। নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া বের হতাম না। কি যেন একধরনের অপরাধবোধ, কেমন যেন একটা কষ্ট মনের মধ্যে কাজ করতো, বুঝে উঠে পারতাম না। দিনরাত শুয়ে থাকতাম, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম, সবার সাথে মেজাজ দেখতাম। মা, বাবা, হিমি, কেউ না কেউ সারাদিন বলতে গেলে আমাকে পাহারা দিত। বাবা আমার রুমের দরজার লক, সিলিঙের ফ্যান খুলে ফেলেন। অথচ অপর্ণার সাথে আমার কোন মানসিক বন্ধন ছিলো না, শারীরিক তো দুরের কথা।

কয়েকমাস পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠি। গা ঝাড়ার আরেকটা কারন হল হিমির বিয়েটা আমার জন্য পেছানো হয়েছিলো। এখন বিয়ের দিন প্রায় এগিয়ে এসেছে। আমি চাইনি আমার কারনে আমার বোনের জীবনে কোন অশান্তি আসুক। নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নেই। আবার ব্যায়াম শুরু করি, ওয়াল স্ট্রিটে ভালো পজিশনে চাকরি পাই, একই সাথে এমবিএ শুরু করি। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যায়। মা আমার জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করেন। সমস্যা তখন শুরু হয়। যখনই মেয়েপক্ষ শুনে অপর্ণা আর আমার ব্যাপারটা, তখনি তাঁরা পিছিয়ে যায়। অনেকে বলে আমার অতীত যেন না বলি কিন্তু আমি কোন মিথ্যে দিয়ে নতুন কোন জীবন শুরু করতে চাইনা। ডিভোর্সি একজন রাজি হয়েছিল কিন্তু হিন্দু বিয়ে করেছিলাম বলে তার পরিবার না করে দেয়। ভাবলাম নিজে থেকে মেয়ে দেখি। ডেটিং করতে শুরু করি কিন্তু অতীত জানলেই তাঁরা দূরে সরে যায়।

বুঝলি, সবাই আমার চেহারা, শরীর দেখে আসে কিন্তু মনটা কেউ দেখেনা। জানিস, খুব ইচ্ছে করে একটা সংসার করতে, একটা সাধারন বউ থাকবে যে আমাকে বলবে “আমি বলেই তোমার সাথে সংসার করছি, অন্য কেউ হলে অনেক আগেই চলে যেত” তারপর আমার জন্য চা আর ঝাল্মুরি বানিয়ে আনবে। আমি ঈদে শাড়ি কিনে দিলে বলবে “এটা কোন শাড়ি হল? তোমাকে ভালোমানুষ পেয়ে দোকানদার থান কাপড় গছিয়ে দিয়েছে” তারপর ইদের দিন শাড়িটা পড়ে লাজুক মুখে বলবে “দেখতো কেমন লাগছে”। ভীষণ একা একা লাগেরে। আমার সমবয়সী আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই বিয়ে করে ফেলেছে। সবার একটা দুইটা করে ছেলে মেয়ে। এই তোকেই দেখ না, নাই নাই করে তিনটা পোলাপাইন তোর। আর আমি ব্যায়াম করে, বডি বানিয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি।”

আমি হা করে হিমেলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিয়ে করার জন্য পাগল এমন কাউকে এই প্রথম দেখলাম।

“তোকে একটা প্রশ্ন করি। ধর, তোর আর অপর্ণার বিয়ের পর দেখা গেলো অপর্ণা সুস্থ হয়ে গিয়েছে। অপর্ণা চাইছে যেহেতু বিয়ে হয়েই গিয়েছে তাহলে সংসার করি। তুই কি করতিস তখন? বিয়েটা কি মেনে নিতিস?”
“না হয়তো মেনে নিতাম না। এতোটা ভালমানুষ আমি নই। তখন বয়স কম ছিল তাই ইমোশন বেশি ছিল। ইমোশন কম থাকলে কি আর নিজের পায়ে কুড়াল মারি? আচ্ছা বলতো, অপর্ণা কে বিয়ে করে আমি কি কোন গুনাহ করেছি? হয়তো সেই গুনাহর শাস্তিটা পাচ্ছি এখন।”

হাহাকারের সুর হিমেলের গলায়। সেই হাহাকার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তাঁকে গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরি, “না রে, তুই কোন গুনাহ করিস নি। তোর মতো ছেলে যেন সবার ঘরে হয়। তুই জানিস না কত বড় মনের পরিচয় তুই দিয়েছিস। তোর জন্য সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয় কাউকে রেখেছেন। তোর ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন শুধু। দোয়া করি তোর যেন মনের মতো সাধারন একটা সংসার হয়।”

পুনশ্চ:

  • কয়েকদিন আগে হিমেলের এংগেজমেন্টর ছবি দেখলাম। ভারি মায়াবি চেহারার মেয়ে। ঘন কালো একঢাল চুল মাথায় নিয়ে বড় বড় টলটলে চোখে তাকিয়ে আছে। কোথায় যেন অপর্ণার সাথে কিছু একটা মিল আছে, ঠিক ধরতে পারছিনা। পাশে হিমেল টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মতো দাঁত বের করে বেহায়ার মতো হাসছে। হাসুক, মন ভরে বেহায়ার মতো হাসুক। তার জীবন যেন সব সময় এমন বেহায়া হাসিতে ভরে থাকে। ভাবছি বিয়ের উপহার হিসেবে তাঁকে অনেক প্যাকেট চা পাতা, মুড়ি আর চানাচুর দিবো।
  • হিমেলের অনুমতি নিয়েই তার মিথ্যে বিয়ের গল্প লিখেছি। শুধু নাম গুলো বদলে নিয়েছি।
  • শিরোনাম নেওয়া হয়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ থেকে।

*

এরকম অসাধারণ সব লেখা পড়তে যোগ দিন ক্যানভাস ফেসবুক গ্রুপে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button