খেলা ও ধুলা

আমার ২০ ইয়ার্স চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় ‘আই ওয়াজ দেয়ার’ মোমেন্ট!

ওকে। কণ্ঠে বেশ জোর নিয়েই বলছি…২০১৯ সালের ১৪ জুলাই, ইংল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ডের বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে আমি লর্ডসে ছিলাম। এখনও পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ‘আই ওয়াজ দেয়ার’ মোমেন্ট…

অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অভাবনীয়…এসব বিশেষণ আগেও আমরা অসংখ্যবার ব্যবহার করেছি। ক্রিকেট তার বিশালত্ব আর গভীরতা দিয়ে আমাদের সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ম্যাচের জন্য উপযুক্ত কোনো শব্দ আমার জানা নেই..

আমরা ১৯৯৯ বিশ্বকাপে এজবাস্টনের সেমিফাইনাল দেখেছি। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে মোহালির সেমিফাইনাল দেখেছি। ১৯৯৯ সালে শারজায় দেখেছি, ১০ ওভারে ৮ উইকেট হাতে নিয়ে শ্রীলঙ্কার ২৩ রান লাগে, ম্যাচ হয়েছে টাই। জোহানেসবার্গে ৪৩৪ টপকে জিততে দেখেছি। বেঙ্গালুরুতে তিন বলে দুই রানের সমীকরণে এক রানও নিতে না পারা দেখেছি। ইডেনে টানা চার ছক্কায় ম্যাচ জয় দেখেছি। কিছুদিন আগে ডারবানে শেষ জুটিতে ৭৮ রান তুলে শ্রীলঙ্কাকে টেস্ট জিততে দেখেছি…

আমাদের মনে হয়েছে, ক্রিকেটের সবকিছু আমরা দেখে ফেলেছি। ক্রিকেট প্রমাণ করে দেয়, আমাদের ভাবনার সীমানা ছাড়িয়েও তার সগর্ব উপস্থিতি।

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের পর জয়ী দল।
Image Source: evening standard

এই ম্যাচ নিয়ে চর্চা হবে যুগ যুগ ধরে। নতুন করে বলার আছে সামান্যই। আমি একটু যন্ত্রণার কথা বলি। পেশাদারীত্বের যন্ত্রণা..

ম্যাচের নাটকীয়তা যখন ওয়ানডে ইতিহাসের সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, রোমাঞ্চের চেয়ে তখন বেশি আমার বিরক্তি ও টেনশন। অনলাইনে কাজ করি, খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠাতে হবে ম্যাচ রিপোর্ট। কতবার যে ইন্ট্রো বদলাতে হলো! ১০-১১ বার লিখে আবার মুছতে হয়েছে। লেখা তো আর যন্ত্রের মতো বের হয় না, ১০-১১ বার লেখা মানে শতবার ভাবা, মাথায় গোছানোর চেষ্টা। খেলার মোড় বদলে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। ভাবনা গুছিয়ে না উঠতেই হয়ে যায় এলোমেলো। আমাদের পেশার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও চ্যালেঞ্জিং সময়। না যায় শান্তিতে খেলা দেখতে, না যায় শান্তিতে লিখতে।

তিন বছর আগের কথা বলি। বেঙ্গালুরুতে ৩ বলে ২ রানের সমীকরণে আমরা আত্মহত্যা করছি। প্রেসবক্সে এক শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক প্রচণ্ড অস্থির। তার খুব চাওয়া, বাংলাদেশ জিতুক। কিন্তু হচ্ছে উল্টো। অস্থির হয়ে সে আমাকে বলল, “রনি, হোয়াটস গোয়িং অন ম্যান? তোমরা এসব কী করছো!” আমি বললাম, ‘আমার একটার পর একটা ইন্ট্রো গোয়িং, ম্যান! মেজাজ খারাপ হচ্ছে…।”

এটিই আমাদের পেশার বাস্তবতা। যত ক্লোজ ম্যাচ, তত বেশি যন্ত্রণা। চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ গত কবছরে কাছে গিয়ে যত হেরেছে, তাতে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম এসবে। কালকে তবু এই যন্ত্রণা একটা অন্য লেভেলে পৌঁছে গিয়েছিল।

এটা হয় না। একটা ম্যাচে এরকম কিছু হতে পারে না। কিন্তু কালকে, লর্ডসে ফাইনালে এসব হয়েছে। আমরা ঘোরের মধ্যে থেকে যেমন দেখছি যে হয়েছে, ঘোর কাটলেও দেখব হয়েছে। দিস ম্যাচ অ্যাকচুয়ালি হ্যাপেনড…!

বাইরে দেখে মনে হতে পারে, আমাদের এটি আসলে ‘মধুর যন্ত্রণা।’ বলতে পারেন, এসব আমাদের ‘ভাব।’ তাতে কিচ্ছু বদলাচ্ছে না। ওই সময়টায়, ওই মুহূর্তগুলোতে এই পেশাকে মনে হয় অসহ্য। জীবনটাই মনে হয় অসহ্য।

তার পরও এই পেশার সঙ্গে আড়ি দেওয়া যায় না, এই মুহূর্তগুলোর কারণেই। এই চাপের সময়টুক কেটে গেলে, কিংবা আরও পরে পেছন ফিরে তাকালে, এই পেশাকে মনে হয় আশীর্বাদ। জীবন মনে হয় সুন্দর।

এই যে ম্যাচ রিপোর্ট শেষ করে লর্ডসের সবুজ মখমলে হাঁটলাম, লর্ডসের বিখ্যাত ব্যালকনি দুটির ঠিক মাঝে দাঁড়াতে পারলাম, এক ব্যালকনিতে আকাশী-নীলের উচ্ছ্বাস যেন ছুঁতে চাইছে আকাশ, আরেক ব্যালকনি ডুবে আছে তাদের পোশাকের মতোই নিকষ কালোয়। ডব্লিউ জি গ্রেসের ভাষ্কর্যের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো, ক্রিকেটের অমর বুড়োও আজ স্বর্গে বসে খুব রোমাঞ্চিত। এমসিসি মেম্বারদের প্যাভিলিয়নের সিঁড়ির মুখে ভিভ রিচার্ডসের মুচকি হাসির বিশাল চিত্রকর্মটিকেও আজ মনে হলো একটু বেশি জীবন্ত। এইসব অনুভূতির দোলাচল টের পেলাম তো এই পেশার সৌজন্যেই!

কিংবা এমন একটি ম্যাচ শেষের প্রেস কনফারেন্স!

জীবনের সেরা একটি প্রেস কনফারেন্স অভিজ্ঞতাই হয়তো হলো কেন উইলিয়ামসনের সঙ্গে। কত যে হাসলেন উইলিয়ামসন! হাসলেন এবং হাসালেন। বারবার। অনেকবার…

নিজে হাসলেন, সবাইকে হাসালেন।
Image Source: the hindu

কিন্তু হাসিও যে কত বিষন্ন হতে পারে, হাসিতে কত বেদনা, কত অসহায়ত্ব থাকতে থাকতে পারে, মুখে হাসি কিন্তু চোখে শূন্যতা ও হাহাকার, উইলিয়ামসনের হাসি দেখিয়ে দিল জীবনের অনেক রঙ।

তার কণ্ঠ, তার কথা শুনতে যে কী ভালো লাগল! স্বপ্ন ভঙ্গের অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও তার ক্রিকেট বোধ, তার প্রজ্ঞা, প্রতিপক্ষ ও খেলাটার প্রতি সম্মান, উইলিয়ামসনের ব্যক্তিত্বের আরেকটি বড় বিজ্ঞাপন হয়ে থাকল যেন এই প্রেস কনফারেন্স।

চেহারায় এখন যেমন সৌম্যদর্শন, ঋষির মতো, ব্যাটিংয়ের মতোই তার কথা, তার হাঁটাচলা, চারপাশে ছড়িয়ে পড়া আভা বা আবহ, সবকিছুতেই কেমন মিশে থাকে প্রশান্তির পরশ!

একদম শেষ দিকে, একজন সিনিয়র জার্নালিস্ট দাঁড়িয়ে বললেন, “দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছি আপনার প্রতি সম্মান জানাতে। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার এই যুগেও যেভাবে আপনি নিজেকে পরিচালনা করেন, আপনার কি মনে হয় না যে সবারই আপনার মতো জেন্টেলম্যান হওয়া উচিত?”

উইলিয়ামসন হাসলেন, “সবারই অধিকার আছে নিজের মতো থাকার। এই পৃথিবীর সৌন্দর্য্যই তো সেখানে। সবার একটু আলাদা হওয়াও উচিত। আমার জন্য এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। সম্ভবত সেরা উত্তর এটিই যে, নিজের মতো থাকো ও উপভোগ করার চেষ্টা করো।”

তার সঙ্গে আমার ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি অনেকবারই মনে পড়ে। আগেও লিখেছি। ২০১০ সালে নিউ জিল্যান্ড যখন এলো বাংলাদেশে, উইলিয়ামসন তখন তরুণ সম্ভাবনাময় একজন। দাড়িভরা মুখের এই সৌম্য দর্শন ছিল না, বরং অনেকটা ছিল ‘চকলেট বয়’ ইমেজ। তার চেহারা, তার খেলার ধরন মিলিয়ে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটে তখন বলাবলি হচ্ছিল, ভবিষ্যত মাইকেল ক্লার্ক।

তার একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ করেছিলাম শের-ই-বাংলায় হাঁটতে হাঁটতে। সম্ভবত দেশের বাইরে তার প্রথম কিংবা প্রথম কয়েকটি ইন্টারভিউয়ের একটি। ক্লার্কের সঙ্গে তুলনার প্রসঙ্গে সেই সময়ের তরুণ উইলিয়ামসন বলেছিলেন, “আমি আমার মতোই হতে চাই।” তিনি সত্যিই তার মতোই হয়েছেন। নিজের ছাপ রেখেছেন। লেগাসি তৈরি করে ফেলেছেন।

প্রেস কনফারেন্স শেষ করে যখন উঠলেন, তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হলো। তিনি বেরিয়ে গেলেন তুমুল করতালির মধ্যে। সম্ভবত এই বিশ্বকাপে আর কোনো ক্রিকেটার এই সম্মান পাননি। বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক আমার পাশ দিয়েই। ছোট্ট করে ‘ওয়েল ডান’ বলতে পারলাম। পেছন ফিরে হাসিমুখে ‘থ্যাংকস’ বলতে ভুললেন না। ভদ্রতা, কিংবা ভদ্রতা করার মতো আন্তরিক।

ওয়েন মর্গ্যানের কণ্ঠে বিজয়ের গল্পও শোনা হলো। একজন আইরিশম্যান, এক যুগ আগে যিনি বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলেছেনও, তার নেতৃত্বে ও একজন অস্ট্রেলিয়ানের কোচিংয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতল ক্রিকেটের জন্মভূমি, ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্ম দেওয়া দেশ। নিয়তি বুঝি একেই বলে!

বেন স্টোকস। মাত্র কিছুদিন আগেই একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, “আমি চাই, লোকে আমাকে মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে মনে রাখুক। রাস্তায় মারামারি করেছি, এমন একজন হিসেবে যেন মনে না রাখে। বিশ্বকাপ জিতলে সেটিই প্রথম প্যাারায় থাকবে, তাই তো?” স্টোকস দেখালেন, নিজের নিয়তি এভাবেও লেখা যায়!

অবিশ্বাস্য একটি দিনের স্বাক্ষী হয়ে সূর্য যখন বিদায় নিচ্ছিল এ দিনের মতো, তখনও চলছিল পরিবারের সঙ্গে ইংলিশ ক্রিকেটারদের উদযাপন, চারপাশে চলছিল বিশ্বকাপ শেষে গোছগাছ, আলো-আঁধারিতে লর্ডসকে মনে হচ্ছিল অদ্ভূত মায়াময় এক পৃথিবী। মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে বুঁদ হয়ে থাকা যায় অনন্তকাল!

১৯৯৯ সালের ১৭ জুন, এজবাস্টনের সেমিফাইনাল দেখেছিলাম বাসায়, ক্রিকেট খেলার সঙ্গীদের নিয়ে টিভিতে। কেউ যদি তখন বলত, ২০ বছর পর সেই ম্যাচের নাটকীয়তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া আরেকটি ম্যাচে আমি থাকব লর্ডসে, হয়তো তাকে পাগল ভাবতাম, নয়তো হেসে উড়িয়ে দিতাম।

এই টুয়েন্টি ইয়ার্স চ্যালেঞ্জ মন্দ নয়। জীবন কখনও কখনও সত্যিই রূপকথাময়!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button