সিনেমা হলের গলি

লাইভ ফ্রম ঢাকা: এই শহরের বুকে মঞ্চস্থ হওয়া এক দুর্বিষহ জীবনের গল্প!

‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নিয়ে মুক্তির সপ্তাহখানেক আগেও তেমন কিছুই জানতাম না। সাদাকালো ট্রেলারটা দেখে ভালো লেগেছিল, বিশেষ করে আইকনিক সেই সংলাপটা- ‘এই বালের শহরে সবকিছুই উল্টাপাল্টা! ১২ মিলিয়ন মানুষ সারাক্ষণ একজন আরেকজনের সাথে কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করে। এত মানুষের ঘাম, রক্ত আর গুয়ের গন্ধে আমার বমি আসে…’

কয়েকটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে সিনেমাটা, এটা জানা ছিল। সেই অল্পবিদ্যাকে সঙ্গী করেই দেখতে গেলাম, কারণ সিনেপ্লেক্সে শুক্র আর শনিবারে তিনটা করে মোট ছয়টা শো পেয়েছে সিনেমাটা, এটার ভাগ্যও অজ্ঞাতনামা বা মাটির প্রজার দেশে’র মতোই হতে যাচ্ছে। এদেশে ভালো কাজের তো ভাত নেই!

ভূমিকা শেষ, সিনেমায় ঢোকা যাক। দেড়ঘন্টার খানিকটা বেশি বোধহয় দৈর্ঘ্য, পুরো সিনেমাটাই সাদাকালো। সিনেপ্লেক্সে বসে সাদাকালো ফিল্ম দেখছি- এটা ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল। তবে সিনেমা শুরু হতেই ভাবাভাবির পালা শেষ, কারণ গল্পটা ততক্ষণে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করা শুরু করে দিয়েছে।

সাজ্জাদ নামের এক যুবকের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’। শেয়ার বাজার ধ্বসে অস্তিত্বের সংকটে পড়া সাজ্জাদকে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিজের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তার জীবনটাকেই এলোমেলো করে দিয়েছে, সেটা আঘাত হেনেছে তার মনস্তত্বেও। শারিরীক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি উপদ্রব হিসেবে জুটেছে মাদকাসক্ত ছোটভাই আর পাওনাদারেরা। সব মিলিয়ে, লাইভ ফ্রম ঢাকা আসলে এই শহরের বুকে মঞ্চস্থ হওয়া এক দুর্বিষহ জীবনের গল্প, যে গল্পটা আমার জীবনে আছে, আপনার জীবনে ঘটছে, ঘটছে আরও কোটি মানুষের জীবনে, প্রতিদিনই।

লাইভ ফ্রম ঢাকা, Live from Dhaka, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ

শেয়ার বাজারের অস্থিরতায় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত সাজ্জাদ বাকি শেয়ারটুকু নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়ে পাড়ি জমাতে চায় রাশিয়ায়, ট্যুরিস্ট ভিসায় সেখানে গিয়ে নিজের একটা ব্যবস্থা করে নিতে হবে- এটাই চুক্তি। সাজ্জাদের স্বপ্নে ভাসে রাশিয়ার তুষারপাত, সেই স্বপ্নটা ভাঙতেও দেরি হয় না খুব বেশি। অসহায় সাজ্জাদ সব হারিয়ে এবার যে কোন মূল্যে মালয়েশিয়ায় যেতে চায়, কিংবা চায় এই শহরটা ছাড়তে, যে শহরটা প্রতিনিয়ত শুধু শুষে নেয়, ফিরিয়ে দেয় না কিছুই! সাজ্জাদকে তাড়া করে ফেরে কিছু মুখ, কতগুলো স্মৃতি- সেসবকে পেছনে ফেলে কি সে পালাতে পারবে?

গল্পে বিশেষ কিছু নেই, নেই আহামরি কোন টুইস্টও। আপনার হাতে যদি শুধু চাল-ডাল-তেল-নুন থাকে, সেটা দিয়ে আপনি খিচুড়ি রান্না করার কথাই ভাববেন। এখন খিচুড়িটা খেতে কেমন হলো, সেটাই সবাই দেখবে, তাতে বিফ আছে নাকি চিকেন, সেটা পরের ব্যাপার। গরু-মুরগী সব হাতে নিয়েও যদি চাল-ডাল আর মশলার মিশ্রণে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেন, তাহলে আপনি একজন শামীম আহমেদ রনী(শাহেনশাহ)। তবে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ তার স্বল্প সামর্থ্য নিয়ে কোনকিছুই গুবলেট হতে দেননি, মাত্র ষোলো লাখ টাকা বাজেটের ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ যে দিনশেষে চমৎকার একটা উপাদেয় সুখাদ্য হয়ে রইলো, তার মূল কৃতিত্ব সাদই পাবেন।

আপনার মাথাভর্তি সিনেমা বানানোর পোকা, অথচ পকেটে কিচ্ছু নেই। ষোলো লাখ টাকা দিয়ে কি হয়? একটা মানুষ মধ্যবিত্ত স্ট্যান্ডার্ডে ঢাকা শহরে দুই বছরও টিকে থাকতে পারে না ষোলো লাখ টাকায়। অথচ এই টাকা দিয়ে আস্ত একটা সিনেমা বানিয়ে ফেললেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ! সেটা কি ভীষণ উপভোগ্যও হলো! সাজ্জাদ চরিত্রটার এতগুলো ডাইমেনশন, এত দারুণ ব্যাপ্তি- এক কথায় দুর্দান্ত!

লাইভ ফ্রম ঢাকা, Live from Dhaka, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ

মোস্তফা মনোয়ার নামের তরুণ অভিনেতাটি ফাটিয়ে অভিনয়ও করেছেন সিনেমায়, তাতেই পুরো ব্যাপারটা জমে ক্ষীর! ছবিয়াল রিইউনিয়নে মিস্টার জনি নাটকটা যারা দেখেছেন, তারা মোস্তফা মনোয়ারকে চিনবেন নিশ্চয়ই। রেহানা চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তিনিও মুগ্ধ করেছেন, দারুণ সাবলীল অভিনয় উপহার দিয়েছেন দুজনেই। পাওনাদারের চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটাকে আগে কখনও দেখিনি, তার অভিনয়ও ভালো লেগেছে।

মুগ্ধ হয়েছি ক্যামেরার কাজে, একটা পঞ্চাশ মিমি লেন্স আর একটামাত্র ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে পুরো সিনেমাটা শ্যুট করা হয়েছে- এটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম! পুরো ফিল্ম জুড়ে এক্সপেরিমেন্টের ছড়াছড়ি, কিন্ত সেসবের কোনটাতেই তেমন বিরক্তি আসে না, বরং মুগ্ধতা বাড়ে পাল্লা দিয়ে। সিনেমার জাম্পশটগুলোও দারুণ, যদিও এই ধরণের কাজ আগে হলিউডি সিনেমায় অনেক হয়েছে। তবুও বাংলাদেশী সিনেমায় এমন কিছু দেখা নতুন অভিজ্ঞতা অবশ্যই।

লাইভ ফ্রম ঢাকা, Live from Dhaka, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ

শেষটা আরেকটু ভালো হতে পারতো, যে সংলাপটার জন্যে সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেছিলাম, সেটাই কাটা পড়েছে সেন্সরবোর্ডের কাঁচিতে। কারণ বাংলা সিনেমার ইয়ে মেরে দেয়ার জন্যে তারা সদাসর্বদা তৎপর। এর মাঝেও এমন একটা দৃশ্য আছে, যেটা দেখে চমকে উঠেছি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই দৃশ্য কেন কাটা পড়েনি, এটা একটা রহস্য। সেন্সরবোর্ডের লোকজন বোধহয় সেই দৃশ্যের মানেই বোঝেননি ঠিকটাক! বেশ কয়েকটা মেটাফোর ব্যবহার করেছেন পরিচালক, এরমধ্যে একটা-দুটো মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছে। তবে ভয় পাবেন না, লাইভ ফ্রম ঢাকা ইন্টেলেকচুয়াল সিনেমা নয় মোটেও, এটা জনমানুষের সিনেমা, ষোলো থেকে ষাট, সব বয়েসী দর্শকের দেখার মতো সিনেমা।

এমন চমৎকার একটা সিনেমা বানানোর পরেও হয়তো পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পরবর্তী সিনেমার জন্যে আরও পাঁচ-ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এই ধরণের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষজন নেই সিনেমাপাড়ায়। এখানে আগাছা বানালে দাম আছে, আবর্জনা বানিয়ে ফেললেও পরের সিনেমার প্রযোজক মিলে যায়, তবে ভালো কাজের কদর করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।

সিনেপ্লেক্সে আগামীকাল তিনটা শো। সকাল ১১টা, বিকেল চারটা এবং ছয়টা। পরের পাঁচদিন দুটো করে শো। এরপরে লাইভ ফ্রম ঢাকা আবার কবে কোথায় দেখানো হবে, আদৌ প্রদর্শিত হবে কিনা আমরা কেউই জানি না। সিনেমাকে যারা ভালোবাসেন, বাংলা সিনেমার ভালো-মন্দ নিয়ে যারা ভাবেন, তারা দেখে আসতে পারেন সময় বের করে। ‘অজ্ঞাতনামা’ বা ‘মাটির প্রজার দেশে’ বড় পর্দায় দেখতে না পারার আক্ষেপটা অনেকেরই আছে, সেই তালিকায় ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’র নামটা যোগ করার দরকার কি বলুন?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button