অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মেয়ের ধর্ষণকারীকে হত্যা করে যিনি এখন পরিচিত ‘সিংহ মা’ নামে!

মধ্যরাত। দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। ইস্টার্ন কেইপ প্রদেশের সেই গ্রাম থেকে মাঝরাতে হঠাত ফোন আসলো মায়ের কাছে। তার নাম নকুবঙ্গা কাম্পি। অজানা আশংকায় নকুবঙ্গা যখন ফোন ধরলেন, ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসলো মেয়ে সিফোকাজির কণ্ঠ। মেয়ে কাতর হয়ে জানালো তার সর্বনাশ হয়ে গেছে। তিনজন ধর্ষক মিলে তার জীবনে নামিয়েছে বিভীষিকার রাত্রি। মা খবরটা শুনে থ! এত রাত! যেখানে এই ঘটনা ঘটেছে তার মেয়ের সাথে, তিনি এখন সেই জায়গা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অবস্থান করছেন। এই অন্ধকার রাত্রিতে মা সাহায্য চাইলেন পুলিশ বাহিনীর। যদিও তিনি জানেন, ওই প্রত্যন্ত গ্রামে পুলিশের পৌঁছাতে ঢের দেরি হবে। তবুও চেষ্টা করলেন। কিন্তু সাড়া মিললো না পুলিশের।

নকুবঙ্গা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তার মনের মধ্যে আরো খারাপ কিছু ঘটবার পূর্বাভাস। মেয়েকে যে তিনি ধর্ষক নির্মমভাবে কষ্ট দিয়েছে, মেয়ে তাদের প্রত্যেককেই চিনে। দ্রুত কিছু করতে পারলে হয়ত সেই ধর্ষকের দলটিকে ধরা সম্ভব হবে৷ একই সাথে তার মনে হচ্ছে, মেয়েকে যদি জানেই মেরে ফেলে ওরা? মেয়ে যাতে কাউকে অভিযোগ না দিতে পারে এইজন্যে যদি ধর্ষকরা তার মুখ চিরতরে বন্ধ করে দিতে চায়! নকুবঙ্গা এই রাতের বেলা ঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, এখুনি যাবেন সেই গ্রামে। তিনি তো মা, তিনি তো নারী। তিনি জানেন কি কষ্টই না পেয়েছে মেয়েটা। তিনি জানেন, মেয়ের পাশে আর কেউ না দাঁড়ালেও এখন তাকেই দাঁড়াতে হবে। তিনি বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে।

image source- mirror.co.uk

পোটেনশিয়াল ধর্ষকদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, মেয়েটা এত রাতে কেন ওমন প্রত্যন্ত গ্রামে গেল! কেন সে একজায়গায়, মা আরেকজায়গায়। উত্তর হলো মেয়েটি সেদিন সেই গ্রামের একটি বাড়িতে বেড়াতে যায়। মেয়েটির সাথে তার কয়েকজন বন্ধুও ছিলেন। রাতে তারা সেই বাড়িতেই থাকেন। কিন্তু, রাত বাড়তে বন্ধুরা বাড়ির বাইরে যায়। মেয়েটি ঘুমাচ্ছিলো বলে সে রয়ে গেছে ঘরের মধ্যেই। গভীর রাতে পাশের এক বাড়ি থেকে তিনজন মাতাল এসে মেয়েটিকে আক্রমণ করে বসে। তারা জোরজবরদস্তি করতে থাকে। তিনজনের কুতসিত লালসার শিকার হয় মেয়েটি।

যাইহোক, মেয়ের ফোন পেয়ে নকুবঙ্গা যখন বেরুলেন, তিনি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে নিজের সাথে নিলেন একটা ছুরি। তার ধারণা হলো, এত রাতে হেঁটে যেহেতু যেতে হবে সেখানে তাই এটা বেয়াহ ঝুঁকির হয়ে যায়। এজন্যেই ছুরিটা সাথে নিয়েছিলেন তিনি। অন্ধকার পথে ফোনের টর্চ জ্বেলে নকুবঙ্গা যাচ্ছেন মেয়ের কাছে।

অদ্ভুত কান্ড। নকুবঙ্গা যখন সেই বাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন, তিনি শুনতে পেলেন মেয়ের চিৎকার। মানে হলো, ধর্ষকের দল আবারো তার মেয়েকে আক্রমণ করছে। নকুবঙ্গা নিজের চোখে এমন দৃশ্য দেখবেন তা হয়ত এই জনমে আশা করেননি। তিনজন ধর্ষকের দল একটা ঘরে, সেখানে তার নিজের মেয়ের উপর তারা নির্যাতন করছে। একজন মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, বাকি দুইজন দাঁড়িয়ে আছে পাশে। নিজ চোখে নিজের মেয়েকে ধর্ষিত হতে দেখা পৃথিবীর যেকোনো মায়ের জন্য সবচেয়ে নির্মম একটি দৃশ্য। নকুবঙ্গা জিজ্ঞেস করলেন, কি হচ্ছে কি এখানে! ধর্ষকের দল একটু ভ্যাবাচ্যাকা হয়ত খেয়েছে কিন্তু পরক্ষণে তারা নকুবঙ্গাকে হামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছে। তখন নকুবঙ্গার মনে কি উথাল পাথাল ভয় মিশ্রিত অনুভূতির দোলাচল চলছিলো তা বুঝতেই পারছেন। মেয়ের ধর্ষকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা এবং ক্রোধে তার বুক ফেটে যাচ্ছিলো। সেই ধর্ষকের দল যখন তাকে আক্রমণ করতে এসেছে, তিনি জানেন এখান থেকে তার এবং তার মেয়ের কারোই বেঁচে ফেরার পথ নেই। আইন, সমাজ, মানবাধিকার, ধর্ম- কোনো কিছু কি সেই মুহুর্তে মাতাল ধর্ষকদের থামাতে পারত? তাদের থামাতে ব্যবহার করতে হয়েছে ছুরির। সর্বশক্তি দিয়ে নকুবঙ্গা ছুরি চালিয়ে থামিয়েছেন নৃশংসতার…

image source- bbc.com

নকুবঙ্গার ছুরির থাবা তিন ধর্ষকের গায়েই লাগে। তার মধ্যে একজন মারা যায়। যদিও, নকুবঙ্গা ধর্ষকদের পরিণতি কি হলো সেটার দেখার জন্যে বসে ছিলেন না ঘটনাস্থলে। কাছেই এক বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে চলে যান। পুলিশ অবশ্য খুব তৎপরতা দেখিয়ে নকুবঙ্গাকে সেখান থেকেই আটক করে। তাকে বন্দী করে রাখা হয় জেলে। মায়ের মন বলে কথা। নিজে জেলে আছেন এটার চেয়েও তাকে ভাবাচ্ছিলো মেয়ের কি অবস্থা সেটা। জেলে বসে মেয়ের কোনো খোঁজই পাচ্ছিলেন না তিনি।

আর এইদিকে মেয়ে সিফোকাজিকে ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। সে আবার তার নিজের অবস্থার চেয়ে মাকে নিয়েই বেশি উৎকন্ঠায় ছিলো। সে অস্থির হয়ে পড়েছিলো এই ভেবে মায়ের যদি কারাবাস হয়। সে ঠিক করেছে এমন কিছু হলে সেও জেল খাটবে। দুইদিন পর অবশ্য নকুবঙ্গাকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। মা মেয়ের দেখা হয় হাসপাতালে।

সিংহ মা, নকুবঙ্গা
image source- manorama.com

নকুবঙ্গার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনার খবরে অবশ্য চটে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার লোকজন। তারা নকুবঙ্গার সাহসী ভূমিকাতে কোনো দোষ দেখে না। নকুবঙ্গাকে মিডিয়া ‘লায়ন মামা’ বা সিংহ মা বলে অভিহিত করে। নকুবঙ্গা যেভাবে নিজের মেয়েকে বাঁচাতে এমন কাজ করলেন তার সাথে তারা তুলনা দিয়েছেন একজন সিংহের যে কিনা নিজের শাবককে বাঁচাতে যা ইচ্ছা করতে পারে। নকুবঙ্গা এবং তার মেয়ের এই ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকানদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই দেশটিতে এমনিতেই প্রচুর ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। দিনে গড়ে ১১০টির মতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এখানে। কিন্তু, নকুবঙ্গার মতো সাহসী ভূমিকা দেখা যায়না কালেভদ্রেও।

তাই, নকুবঙ্গার পক্ষে আইনি সহায়তা এবং তার পক্ষে লড়ার জন্য কিছু দক্ষিণ আফ্রিকান অর্থ সংগ্রহে নেমে পড়েন। এই ঘটনা আলোচিত হলে বাড়তে থাকে নকুবঙ্গার প্রতি সমর্থনও। যেদিন আদালতে যাওয়ার সময়, সেদিন নকুবঙ্গা ভয়ে ভয়ে ছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখলেন, সেখানে সারা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। সেদিন নকুবঙ্গার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ থেকেও তাকে রেহাই দেয়া হয়। মেয়ে সিফোকাজির মুখে সেদিন অনেকদিন পর হাসি ফুটেছিল। তার সিংহ মাকে জেলে যেতে হয়নি, এই আনন্দে অনেকদিন পর মুখে হাসি ফুটেছিল তার…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button