অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

লাইটার, একটি লিগ্যাসি ও শহীদ মিনারের গল্প

‘মেক আ উইশ’ ফাউন্ডেশনের নাম শুনে থাকবেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অলাভজনক সংগঠনটি ২ থেকে ১৭ বছরের শারীরিকভাবে অসুস্থ শিশুদের ইচ্ছাপূরণ নিয়ে কাজ করে থাকে। এই শিশুরা নিজেদের একটি স্বপ্ন কিংবা ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলে ‘মেক আ উইশ’ সংগঠনটি সেই স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করে। যেমন, একবার ত্রিশজন অসুস্থ শিশুর স্বপ্ন ছিল, তারা আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসির সাথে দেখা করবেন। পরে এই শিশুদের সবাই চোখের সামনে মেসিকে দেখবার, ছুঁয়ে দেখবার সুযোগ পায়৷ শিশুদের মুখে হাসি নির্মল হাসি ফুটে উঠে। তারা ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে দেখে ওই সময়ে যে মানসিক শান্তি এবং আনন্দটুকু পেয়েছে, তাতে ক্ষণিকের জন্যে হলেও তারা ভুলে গিয়েছিল শারীরিক অসুস্থতা।

পৃথিবীজুড়েই এমন অসংখ্য সংগঠনের নাম নিতে পারি। এই যুদ্ধ, ক্রোধ, হিংসা, হতাশা ছড়ানো দুনিয়ায় কিছু সংগঠন মানুষকে একটু শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে কাজ করে৷ এর মধ্যে কিছু কিছু সংগঠন একেবারেই ব্যতিক্রম, যারা বর্তমানের সাথে সংযোগ ঘটায় ইতিহাসের, ইতিহাসকে মনে রেখে, ঐতিহাসিক লিগ্যাসি ধরে রাখবার অভিপ্রায় নিয়ে তারা মানুষকে তথা সমাজকে নিয়েই এগিয়ে যেতে চায়। তেমনই একটি সংগঠন ‘লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন‘।

কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও সামনে আসে। ভিডিও দেখে দুইবার মন খারাপ হয়েছে আমার। প্রথমবার হলো ভিডিওর শুরুতেই। একটি ক্লাসরুম। শিক্ষক ক্লাস শেষে ছুটির ঘোষণা দিলেন। ছুটির ঘন্টায় ছাত্রদের খুশি হবার কথা। দুরন্তপনায় ক্লাস থেকে বিদায় নেওয়ার কথা। কিন্তু এই ছুটির ঘোষণায় ছাত্ররা একটু মন খারাপ করলো। স্যার বললেন, আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারি৷ তাই বিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। একজন ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে মন খারাপ লাগা নিয়ে বলেই ফেললো, স্যার একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবাই ফুল দেয়, শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়া। কিন্তু আমাদের স্কুলে তো কোনো শহীদ মিনার নেই। আমরা কি তাহলে শ্রদ্ধা জানাতে পারব না, ফুল দিতে পারব না? কথাটা শুনে বুকে হাহাকার লাগলো আমার। শ্রেণী শিক্ষকও এই কথায় মাথা নিচু করলেন, তার মন খারাপ হয়ে গেল।

মিশন একুশঃ তিনটি স্বপ্নের শহীদ মিনার

নিজেদের স্কুলে একটি শহীদ মিনার না থাকার কষ্ট আমরা বুঝি। তাই এই পর্যন্ত তিনটি শহীদ মিনার বানিয়েছি আমরা। এ বছরেও নির্মাণ করবো তিনটি শহীদ মিনার। রাজশাহী, সন্দ্বীপ এবং বান্দরবানে। আমাদের এই পথচলায় আপনাকে পাশে পাবো তো?আপনার সহযোগিতাতেই সম্পন্ন হোক মিশন একুশঃ তিনটি স্বপ্নের শহীদ মিনার#আলো_আসবেই ♥

Posted by Lighter Youth Foundation on Tuesday, February 12, 2019

আমার তখন একই সাথে মনে পড়লো মেক আ উইশ ফাউন্ডেশনের কথা এবং একুশে ফেব্রুয়ারির কথা। এই স্কুলের কিশোরদের এই একটা উইশ কি পূরণ হবে না? এদের চাওয়া তো খুব বিশাল কিছু নয়। এই যে স্কুলে বসে আজ তারা পড়ছে, বাংলায় কথা বলছে, একটা স্বাধীন দেশে তারা বাস করছে এইটুকু বোধ এদের আছে, এরা ইতিহাসকে লালন করতে চায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়, আজকের দিনে তাদের এই বাংলায় কথা বলবার অধিকার আদায়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতি। যারা স্বাধীন দেশের বীজ বুনে গিয়েছিলেন তাদের প্রতি। তাদের শখ অনেক মহৎ, অনেক বিশাল। কিন্তু তাদের এই ছোট্ট স্বপ্ন কে পূরণ করবে? কারা সুপারম্যান হয়ে আবির্ভূত হবে এই ধরণীতে যারা এই শিশু-কিশোরদের উইশগুলো পূরণ করবে? কে হবে তাদের ‘মেক আ উইশ’ ফাউন্ডেশন?

এই আমরাই সারাক্ষণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কথা বলি। ভাষার মাসে বায়ান্ন নিয়ে কথা বলি৷ ভাষাকে রক্ষার কথা বলি৷ কিন্তু, আমরা কতটুকু টেকসই কিছু করে দিতে পারছি, গঠনমূলক কিছু করতে পারছি যার দ্বারা প্রমাণ হয় আমরা ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর, স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও সেই স্লোগান, মিছিল, রক্তঝরা দিনগুলোর মাহাত্ম্য বুকে লালন করছি? এই জায়গাতেই আমার আপনার থেকে একটু বেশিই ব্যতিক্রম ‘লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’। এই অলাভজনক সংগঠনটিই সেই শিশুদের স্বপ্ন পূরণ করতে মাঠে নেমেছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই বছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে একটি স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেবে। স্কুল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা রাজশাহীর এক প্রত্যন্ত অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে, যেখানে আশেপাশে কোথাও শহীদ মিনার নেই, কোনো স্মৃতিফলক নেই। 

লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের নামের মধ্যেই আলো জ্বালানোর একটা উদ্যম লক্ষ্য করা যায়। লাইটারের গোলাকার স্পার্ক জ্বালালে যেমন জ্বলে উঠে আলো, এই সংগঠনটির সদস্যরা বোধহয় তেমনই। একেকজন যেন লাইটারের একেকটা স্পার্ক। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর, এই দিবসটিতে শুরু হয়েছিল সংগঠনের যাত্রা। সমমনা কিছু মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন, তারা অনলাইনের মাধ্যমে একত্রিত হন। পরে বাস্তবে তাদের স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন। শহীদ মিনার নির্মাণ হলো এই সংগঠনটির ‘মিশন ২১’ প্রজেক্ট। এছাড়াও তারা ‘মিশন ৭১’ প্রজেক্টের মাধ্যমে অসাধারণ এক উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রিবিউট দেয়ার একটা ভিন্ন আইডিয়া বের করেন।

সেক্টর ধরে ধরে তারা সার্ভে করে খুঁজে বের করে এমন মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা দিনযাপন করছেন কষ্টের সাথে। অবশ্য তাঁদের চাওয়াও ভীষণ সীমিত। কেউ এওয়ার্ড চায় না, বিশাল কিছু চায় না, শুধু শেষ জীবনটা একটু দুশ্চিন্তাবিহীন হয়ে কাটাতে চায়। যেমন একজনের ইচ্ছে ছিল তার বাড়ির পাশে যদি একটা দোকান থাকত, তাহলে সংসারটা কোনোরকমে চলে যেত। যদিও অনেকেই এসেছিল সেই মুক্তিযোদ্ধার কাছে। সবাই ফুটেজ খুঁজেছে, কাজ করেনি কিছু। ফলে তিনি সন্দিহান ছিলেন, বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তার জীবনসায়াহ্নে কেউ এসে তাকে সম্মান জানাতে সত্যি সত্যি কিছু করে ফেলবে। লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন সেই মুক্তিযোদ্ধা নিমাই রায়ের বাড়ির পাশে দোকান করে দেয়। এরকম কাউকে দোকান করে দেওয়া, কাউকে ঘর বানিয়ে দেওয়া, কাউকে নৌকা কিনে দেওয়া- তাঁদের স্বপ্নপূরণ করেছে লাইটার। 

তারা ইতিহাসকে যেমন স্মরণে রেখে ট্রিবিউট দিচ্ছে মহানায়কদের, একই সাথে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণেও তাদের স্বপ্নালু দৃষ্টি। নীলফামারিতে একটি ‘মডেল ভিলেজ’ নিয়ে তারা কাজ করছে। এই জেলার একটি গ্রামে তারা সার্ভে করে কোন পরিবারের কি প্রয়োজন সেটা যাচাই করে। সবার প্রয়োজন তো আসলে সমান না। কারো একটা গরু হলেই চলে, কারো হয়তো সেলাই মেশিন কিংবা কারো মুদি দোকান। লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন জরিপ করে নীলফামারীর আলসিয়াপাড়ায় গড়ে তুলছে স্বপ্নের ‘মডেল ভিলেজ’। এবং মনিটরিংও করছে, তারা যেন সঠিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে না পড়ে। টেকসই উন্নয়ন যে সম্ভব সেই মডেলটাই লাইটার দেখিয়ে দিতে চায়। এর বাইরে বন্যাদুর্গত পরিবারদের আপদকালীন সময়ে ত্রাণ দেওয়া, বন্যাশেষে পুনর্বাসন করা, শীতার্তদের কম্বল দেওয়া- দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে লাইটার কাজ করে যাচ্ছে অসামান্য দক্ষতার সাথে।

শহীদ মিনারের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন শহীদ মিনার নির্মাণের এই কাজ যে এবারই প্রথম করেছে তা নয়। এর আগেও তারা তিনটি স্কুলে শহীদ মিনার তৈরি করে দিয়েছে। এর মধ্যে আছে সরকারি স্কুলও। লোকে অবাক হয়ে দেখেছে একটা অলাভজনক, বেসরকারি সংগঠন কিভাবে সরকারি স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণ করলো, কথা দিয়ে কথা রাখলো৷ অনেকেই সন্দেহবাতিক ছিল, কিন্তু পরে তারাও আবেগপ্রবণ হয়েছে নিশ্চয়ই। একুশের প্রথম প্রহরে গলা মিলিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি..’ গাইতে গাইতে তাদের গলাও হয়ত কেঁপে উঠেছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে এই দেশের মহানায়কদের। শুধু তাই নয়, লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন শিক্ষার্থীদেরকে জাহানারা ইমামের বই উপহার দিয়েছে। তাদের সাথে ওয়ার্কশপ করেছে। তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ইতিহাসের লিগ্যাসি। একদিন এই শিশুরাই বায়ান্ন, একাত্তরের ইতিহাসকে বুকে নিয়ে বয়ে বেড়াবে, ছড়িয়ে পড়বে আলো হয়ে, সারা দেশ ছাড়িয়ে ভিনদেশেও।

এ বছর লাইটারের পরিকল্পনা ছিল তিনটি স্কুলে শহীদ মিনার বানিয়ে দেওয়া। তিনটি স্কুলই বেশ দূর্গম জায়গায়। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার উড়ির চর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের তারানগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বান্দরবনের লামা উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের রুপসীপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থ পুরোপুরি উঠে আসেনি। তাই শেষ পর্যন্ত শুধু রাজশাহীতেই হচ্ছে শহীদ মিনার। ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। সবাই স্রেফ মুখেই বলে, লাইটার কাজ করে দেখাতে চায়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহীদ মিনার নির্মাণের উপকরণ

সংগঠনটির অভ্যন্তরে আছে গণতান্ত্রিক চর্চাও। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর নতুন কমিটি নির্বাচিত হয় সংগঠনের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে। এবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন ফয়সাল ইবনে মামুন রাব্বি, জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হন মোস্তাইন সাকিব। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট রাব্বি বলেন, “আমরা একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমাদের পূর্ববর্তী কমিটির সাফল্যকে আরো বেশি বিস্তৃত করে সংগঠনটির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বায়ান্নর ইতিহাস। এই মুহুর্তে আমরা একটি স্কুলে শহীদ মিনার নিয়ে কাজ করছি। এর আগেও তিনটি শহীদ মিনার আমরা সফলভাবে নির্মাণ করেছিলাম। এবারও সেই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি।”

লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাইন সাকিব জানান, “আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিকড়কে ভুলে গিয়ে আমরা উন্নত হতে পারব না। সেই জায়গা থেকেই আমরা মিশন ২১, মিশন ৭১ এর মতো প্রজেক্টের মাধ্যমে সম্মান জানাতে চাই আমাদের বীরপুরুষদের, তাদের কথা যেন ভুলে না যাই, এই প্রজন্মও যেন সেই চেতনাকে লালন করতে পারে এই জন্যেই আমাদের প্রচেষ্টা। এই মুহুর্তে আমরা তিনটি শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ করছি। অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা পিছিয়ে যাইনি। তবে এই স্বপ্ন বিনির্মাণে সবার আরেকটু বেশি অংশগ্রহণ পেলে ভাল লাগত নিশ্চয়ই।” 

একদিন হয়তো সত্যিই মুখে নয় কাজেও সবাই এগিয়ে আসবে লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের মতো। এগিয়ে আসতেই হবে। আমাদের প্রজন্ম অনেক ভুল বিভ্রান্তির ইতিহাসের মধ্য বেড়ে উঠলেও আমাদেরই ইতিহাসের সত্যিকার সত্যের কথা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ হয়েছে। এই সুযোগ আমরা নষ্ট করলে, আমরা না জাগলে আগামীর সকালে আগামীর প্রজন্মের কাছে কী রেখে যাব? লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন যে কাজটি শুরু করেছে এই কাজগুলো এগিয়ে নিতে ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবে সবার অংশগ্রহণ কাম্য। কারণ, লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন যে ইতিহাসের প্রদীপ্ত বাতিতে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের। যে আলো নিভতে যাওয়া যাবে না, কোনোভাবেই না!

  • আপনিও চাইলে শামিল হতে পারেন লাইটারের এই উদ্যোগে। অংশগ্রহণ করতে ক্লিক করুন এই লিংকে
Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button