অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

যেভাবে জীবনকে এক ধাক্কায় বদলে দেয়ার মতো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম!

জীবনকে এক ধাক্কায় বদলে দেবার জন্য এক বাক্যে কী উপদেশ দেওয়া যায়? এমন একটি প্রশ্ন করেছিলাম একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ীকে। তিনি জবাব দিলেন, ‘সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ো।’ ব্যাপারটা শুরুতে আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছিল। আমি নিজেই নিশাচর। রাত বাড়লে বই খুলি। শেষরাতে হাবিজাবি লিখি। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দুইটা বেজে যায়। যেহেতু ভদ্রলোক বিখ্যাত এবং সফল, আমি তার কথাকে ভেতরে ভেতরে গুরুত্ব দিলাম। মধ্য জানুয়ারিকে বেছে নিলাম।

প্রথমদিন জাগলাম ভোর ছয়টায়। ঘুম থেকে উঠেই মনে হল- হাতে কাজ নেই। আবার ঘুমাই। কিন্তু ঘুমালেই জেগে উঠার ফায়দা বোঝা যাবে না। আমি টেবিলে বসে রইলাম। টেবিলে বসে বিরক্তি লাগছিল। একটা বই হাতে নিলাম। পড়তে শুরু করলাম। আটটা বাজার আগ পর্যন্ত পড়ে গেলাম। অথচ আমি গত পাঁচ বছর এমনভাবে পড়তে পারিনি। এরপর শুরু হল লেখা। আগে যা লিখতে ক্লান্তি লাগত, সেখানে ক্লান্তি লাগছে না। একটানা দুই ঘণ্টা লিখলাম। এরপর দশটা বাজল। এত বড় দিন, মনে হচ্ছিল প্রথমবার দেখছি। হাতে অফুরন্ত সময় কিন্তু করার মত কিছু নেই।

আমি নিকটজনদের ফোন দেওয়া শুরু করলাম। খোঁজখবর নিলাম। দীর্ঘ আট দশ বছর যাদের খোঁজ নিই না, তারা আমার ফোন পেয়ে কিছুটা ভড়কে গেল। খুশি হল। মানুষ সামান্যতে খুশি হতে পারে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। এগারোটায় আমার হাত শুণ্য। কী করা যায়? বাথরুম পরিষ্কার শুরু করলাম। করব করব বলে অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি। হাতে অনেক সময়। হ্যাঙার থেকে সব কাপড় এনে ধুতে শুরু করলাম।

বারোটা বাজল। হাতে অফুরন্ত সময়। কিছুই করার নেই। শর্টফিল্ম দেখা শুরু করলাম। গোটা দশেক শর্ট ফিল্ম দেখলাম এক বসায়। সময় লাগল দেড় ঘন্টা। দিন শেষ হচ্ছেই না। হাতে অফুরন্ত সময়। বায়োলজি নিয়ে লেখালেখি অনেকদিন বন্ধ। টানা চারটা কঠিন টপিক নিয়ে লিখে ফেললাম। দুই মাসেও চারটা লিখতে পারিনি অথচ একদিনেই চারটা লিখে ফেললাম।
বসলাম মুভি দেখতে। মুভি দেখি আর গুগলে সার্চ করি। দেখতে দেখতে দুটো গল্পের প্লট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেল।

এরপর? বাজে বিকেল চারটা। ঘুম ধরছে।
ঘুমানো যাবে না। ঘুমালেই রাতে ঘুম ধরবে না। ক্লান্তি নিয়েই টেবিলে গাট হয়ে বসে রইলাম। দুইজন তরুণ আসল। ফেসবুকে পরিচয়। তাদের নানাবিধ সমস্যা। আমরা আলোচনা করলাম। একটা সময় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা হল। কাউন্সেলিং পর্ব শেষে তারা আনন্দিত হয়ে চলে গেল। ছয়টা বাজে। হাতে এখনো ছয় ঘন্টা। কী করব?

পত্রিকা পড়া শুরু করলাম। এরপর? উইকি খুলে ফরেনসিক গ্রাফোলজি নিয়ে পড়া শুরু করলাম।ইউটিউবে গোটা দশকে গ্রাফোলজি রিলেটেড ভিডিও দেখলাম। গ্রাফোলজিতে আমার জ্ঞান শূন্যের কাছাকাছি ছিল। আমি আবিষ্কার করলাম, রাত আটটায় আমি গ্রাফোলজি নিয়ে মোটামুটি স্পেশালিস্ট পর্যায়ের জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছি। এরপর?

এক বসায় একটা গল্প লিখে ফেললাম। প্যারানরমাল গল্প। সাধারণত একটা ছোট প্যারানরমাল বা সাইকোলজিক্যাল মিস্ট্রি গল্প লিখতে আমার সময় লাগে দশদিন। এক বসায় একটা চমৎকার গল্প লেখার পর ধারণা হল- আমি অল্প সময়েও ভালো লিখতে পারব কিন্তু আমার হাতে সময় থেকেও ছিল না। রাত বাজে দশটা। ডিনার করলাম। এরপর বিছানায় শুয়ে বই খুললাম। নতুন বই। বারোটা পর্যন্ত পড়ব।
আমি ক্লান্ত। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে কিন্তু পড়তেই হবে।

রাত বারোটা বাজল। লাইট বন্ধ হল। আমি সত্যি সত্যিই দীর্ঘকাল পর রাত বারোটায় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের আনন্দ কী জিনিস আমি সেকেন্ডে সেকেন্ডে উপভোগ করলাম। অথচ আমিই… আগে দিনে সময় পেতাম না। দুইটায় ঘুম থেকে উঠে খেয়ে গোসল করতে করতেই চারটা বাজত। বাইরে যাব নাকি নিজের কাজ করব এই ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা নামত। রাত বাড়ত। ঘুম পেত না। কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন ক্লান্তি কাজ করত। কোন কিছুই ভালোভাবে হত না।

অথচ একদিন ভোর ছয়টা আমার পুরো ধারণাটায় বদলে দিল। সফল হবার উপায় কী?
নিজের হাতের পুরো সময়টাকে কাজে লাগানো। হোক সেটা ছোট কাজ কিংবা বড় কাজ। কাজ তো। হোক সেটা উদ্দেশ্যহীন, তবুও কাজ তো।
নিজেই জানবেন না, একদিন কোন না কোনভাবে সেই কাজটা আপনার কাজে লেগে গেছে। সেই অপ্রয়োজনীয় কাজের দক্ষতায় আপনি অন্য একটি কাজ করে ফেলছেন অসাধারণভাবে।
মেডিকেল সেক্টরে একটা কমন সমস্যা আছে। রোগীর ঘুম হয় না। যে মানুষ ভোরে ওঠে। সারাদিন কাজ করে তাকে কোনদিন ঘুমুতে সিডাটিভ খেতে হবে না। পরীক্ষিত সত্য।

আপনি সফল নন? আপনার আর্থিক ঋণ আছে?
আপনি হতাশাগ্রস্থ? নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত?
একটানে সবকিছু কমিয়ে ফেলতে চাইলে…ভোর ছয়টায় উঠে পড়ুন। দিন শুরু করুন। দেখবেন…আপনি এক অন্য মানুষ। এই অন্য মানুষটা একদিন হবে সফল মানুষ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button