ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

তবুও নাকি সংগঠনের উপর দায় বর্তায় না!

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগ সংগঠন হিসেবে দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গেছে বার বার। তারা বলছে, ব্যক্তির অপরাধের দায় সংগঠনের উপর বর্তায় না। তারা পেটানোর রাজনীতি করে না। তারা ‘শিবির’ সন্দেহে কাউকে পেটানোর নির্দেশ দেয় না।

এর মধ্যেই একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা আমরা জানতে পারছি। আবরার খুন হবার ঘটনাটি তুমুল আলোচিত হওয়ায় এখন বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, ঘটনার অন্তরালে থাকা আরো বিভীষিকাময় কিছু চিত্র।

গতকাল বাংলা ট্রিবিউন নামক সংবাদমাধ্যমটি একটি ভয়ংকর খবর প্রকাশ করছে। খবরটা পড়ার পর থেকে স্তব্ধতার মাত্রা আরো বেড়ে গেছে যেন, মনে হচ্ছে আরে এ কেমন দেশ, এ কেমন মানুষ এরা!

আবরার হত্যা, বুয়েট ছাত্র হত্যা
আবরারের বাবার কান্না

বাংলা ট্রিবিউন থেকে জানা গেল, আবরারকে নৃশংসভাবে হত্যা করেই এরা ক্ষান্ত হয়নি, নিজেদের অপরাধ খুনি সত্ত্বাকে আড়াল করতে প্যারালাল একটা নাটক সাজাতে চেয়েছে। এই ঘটনায় ছাত্রলীগের জড়িত নেতাকর্মীরা চেয়েছিল, গণপিটুনির নাটক সাজাতে। তারা পরিকল্পনা করেছিল এভাবে, আবরারের রুমে মাদক রাখবে। আবরারকে মাদকাসক্ত প্রমাণ করে কিংবা মাদকের বদনাম দিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করাতে চেয়েছে তারা।

বলা হচ্ছে, আবরারকে ‘শিবির’ সন্দেহে পিটুনি দিয়ে মারা হয়েছে। কিন্তু, আবরারের মোবাইল ফোনে এবং ল্যাপটপে শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু না পাওয়ায় তার কক্ষে মাদক রেখে তাকে অন্যভাবে ব্লেম দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল ছাত্রলীগ৷

আবরার
নিহত আবরার

তবে, সোহরাওয়ার্দী হল শাখার এক ছাত্রলীগ কর্মী আবরারের সহপাঠীদের এই কথা বলে ফেলে। আবরারের সহপাঠীরা সতর্ক হয়ে ১০১১ নাম্বার রুমের দরজা জানালা আটকে দেয়। ফলে, মাদক দিয়ে নাটক সাজানোর অভিপ্রায়টা ছাত্রলীগ স্বার্থক কর‍তে পারেনি।

এর মধ্যে ছাত্রলীগ নিজেরাই পুলিশকে ফোন দিয়েছিল। শিবির ধরেছি নিয়ে যান বলে পুলিশকে ডেকেছিল তারা। কিন্তু পুলিশ আসলে তারাই আর হলে ঢুকতে দেয়নি পুলিশকে। সম্ভবত আবরারকে তারা তখন এতো বেশি মেরেছিল যে, পুলিশ আসলে তারাও বিপদে পড়ে যেতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে তারা পুলিশকে ঢুকতে দেয়নি।

রাত ৩টা

খাবার খাওয়ার জন্যে বেরিয়ে ফিরে আসতেই রাত ৩টায় হলের গেটে আবরারের নিথর দেহ স্ট্রেচারে দেখতে পান অন্তিম। আবরারের গোটা দেহে আঘাতের চিহ্ন। পরবর্তীতে আবরারের এক ব্যাচমেট আরটিভিতে বলেছিলেন, আপনারা আবরারের পোস্টমর্টেম ন্যাকেট ছবি দেখেন, গা শিউরে উঠবে। সাপের বিষে নীল হওয়ার মতো নাকি আবরারের শরীরের অবস্থা হয়েছিল। নাভী থেকে কোমর, পায়ে এমন নৃশংসভাবে পেটানো হয়েছে তাকে, যেন সাপের বিষে নীলকেও হার মানায়।

সে রাতে স্ট্রেচারে আবরারের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, মুয়াজ,  মেকানিক্যাল ১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন।

হলগেটেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা নাকি পাহাড়া বসায় যেন হলের কেউ বেরিয়ে প্রতিবাদ করতে না পারে। বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক চেয়েছিলেন মরা লাশকে হাসপাতালে পাঠাতে। ডাক্তার জবাব দিয়েছিলেন, ও ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে মারা গেছে, হাসপাতালে পাঠিয়ে কি হবে?

ছাত্রলীগ এতোটা ভীতি তৈরি করতে সক্ষম যে, মৃত লাশের সামনে আসতেও হলের ছেলেরা ভীত ছিল। ওই হলে দুটি ব্লক। শতক ব্লক এবং হাজার ব্লক। হাজার ব্লকে যারা ছিলেন তারা আবরারকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান কিন্তু অন্যরা আসতে পারছিলেন না ভয় কিংবা আতঙ্কে।

এই আতঙ্ক ছাত্রলীগের অনেক দিনের অপরাজনীতির ফল। অনেকদিনের বর্বরোচিত আচরণের ফল। তারা এতোটা ভীতিকর পরিবেশ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে শিক্ষাঙ্গনে যে, প্রতিবাদ করতেও ভয় তো পায়ই, লাশ দেখতেও ভয়।

এখন বুয়েটের অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, এই হত্যার বীজ অনেকদিন ধরেই বোনা। ছাত্রলীগ প্রায়ই র‍্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন চালায়। এরকম ডেকে নিয়ে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন চালায়। সবাই সব জানে, শিক্ষকরাও জানে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। মুখ খুললেই ‘শিবির’ ট্যাগ বা অন্য কোনো নাটক সাজিয়ে যে তাকেও বিপদে ফেলা হবে না কে জানে।

শুধু বুয়েট নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ এ ধরণের নির্যাতন চালিয়ে আসছে বিভিন্ন সময়ে। হল দখলের রাজনীতি, সিট কেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে তাদের হাতে জিম্মি সাধারণ শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে বৈধভাবে হলে উঠার নিয়ম নেই, প্রশাসনের এই দূর্বলতাকে হাতিয়ার করে ছাত্রলীগ সিট বাণিজ্য করে বড় ভাইগিরি করে। গেস্টরুম করিয়ে সালাম দেয়ার ম্যানার শিখায়। জোর করে ছাত্রলীগ সালাম পর্যন্ত চাঁদাবাজি করে। আর প্রশাসন ‘অনুগত স্ত্রী’র মতো দূর্বলতাকে জিইয়ে রাখে।

বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডকে ব্যক্তির অপরাধ বলে সংগঠনের দায়কে তাই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক রাজনীতি ঐতিহ্য থেকে এখন বহু দূরে। সাংগঠনিকভাবেই তারা এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, ‘শিবির’ বা যে কোনো ট্যাগ দিয়ে তারা যাকে তাকে পিটিয়ে বার বার পার পেয়ে যায় বলেই আজকে এমন হত্যাকাণ্ড, বর্বরতা আমাদের সইতে হয়।

আল নাহিয়ান খান জয়
আল নাহিয়ান খান জয় বক্তব্যরত মুহুর্তে

ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় নিজেই তো ২০১৪’র জানুয়ারিতে ‘শিবির’ সন্দেহে চার শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর নেতৃত্বে ছিলেন। মানে হলো ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে প্রশ্রয় দেয় এ ধরণের নির্যাতন। তাহলে আবরারের হত্যাকাণ্ডের দায় সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ কেন নিবে না?

প্রচ্ছদ ছবি – সাইফ মোস্তাফিজ 

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button