অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

যে টাইটানিকে আছে জীবনের গল্প!

আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিকের বাসিন্দা ১৫ বছর বয়সী এক শিশু সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে আলোচনায় এসেছে। ব্রিনজার কার্ল বিগিসন নামক শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। তবে, অটিজমের কারণে ব্রিনজার আলোচনায় আসেনি, আলোচনায় এসেছে তার ১০ বছর বয়সের অসাধারণ এক কীর্তির কারণে।

মাত্র ১০ বছর বয়সে ব্রিনজার লেগো দিয়ে টাইটানিক জাহাজের একটি প্রতিরুপ বা রেপ্লিকা বানিয়েছিল। রেপ্লিকাটি বানাতে তার সময় লেগেছিল ৭০০ ঘন্টা বা ১১ মাস। এ পর্যন্ত লেগো দিয়ে বানানো টাইটানিকের সবচেয়ে বড় রেপ্লিকা ছিল সেটি, যা গত এপ্রিলে প্রথমবারের মত আমেরিকার টেনেসির টাইটানিক জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়। ব্রিনজার টাইটানিকের রেপ্লিকাটি তৈরি করেছিল ৫৬ হাজার লেগো ব্রিকস দিয়ে। প্রতিরুপটির উচ্চতা ৫ ফুট এবং চওড়ায় সেটি ২৬ ফুট।

এখন, এগিয়ে চলো’র যেসব পাঠকের লেগো সম্পর্কে ধারণা নেই, তাদের জন্য প্রথমে জানা যাক, লেগো কী!

লেগো কী?

সহজ কথায়, লেগো এক ধরণের খেলনা। এ খেলনায় ছোট ছোট লেগো ব্রিক বা ব্লক দিয়ে একটা বড় কাঠামো তৈরি করা হয়। লেগোর ইতিহাসের শুরু ১৯৩২ সালে ডেনমার্কের ওলে কার্ক ক্রিস্টিয়ানসেনের কাঠের কাজের ওয়ার্কশপ থেকে, যেখানে মূলত কাঠের আসবাব আর বাড়ি কাঠামো বানানোর কাজ করা হতো। কিন্তু ব্যবসা মন্দা দেখা দেওয়ায়, কার্ক, ফেলে দেওয়া বাড়তি কাঠের টুকরো দিয়ে ছোট ছোট খেলনা বানানো শুরু করেন বাড়তি রোজগারের জন্য। কার্কের খেলনাগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল এর ছোট ছোট টুকরোগুলো খুলে আবার জোড়া লাগানো যেত….

১৯৩৪ সালে কার্ক তার কর্মচারিদের মাঝে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তার প্রতিষ্ঠানের একটা নাম রাখার জন্য। দুটি নাম আলোচনায় উঠে আসে। ‘লেগিও’ আর ‘লেগো’। পরবর্তীতে ‘লেগো’ নাম হিসেবে নির্বাচিত হয়। লেগো নামটি আসলে দুটি ড্যানিস শব্দ ‘লেগ’ এবং ‘গোট’-এর সমন্বয়ে তৈরি, যার ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় ‘প্লে ওয়েল’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেনমার্কে যখন প্লাস্টিক সহজলভ্য হলো, তখন থেকে এই খেলনাগুলো প্লাস্টিকে বানানো শুরু হয়। যদিও প্রথমদিকে প্লাস্টিকের খেলনা তেমন জনপ্রিয় হয়নি, কিন্তু পরে লেগো ধীরে ধীরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। নিজের মত করে কোন কিছু নির্মাণের আনন্দই আলাদা। এটিই লেগোর জনপ্রিয়তার মূলমন্ত্র। লেগো ব্রিকস দিয়ে ইচ্ছেমত কোন কিছুর কাঠামো নির্মান করা যায়। বর্তমান দুনিয়ায় লেগো খেলনা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়।

আবার ফিরে আসা যাক ব্রিনজারের টাইটানিক রেপ্লিকার গল্পে…

ব্রিনজার পাঁচ বছর বয়স থেকেই লেগো নিয়ে খেলতে পছন্দ করত। মাঝে মাঝে সে পরিবারের অন্যদের সাহায্য নিত, তবে বেশিরভাগ সময়ই সে নিজের কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে লেগো দিয়ে বিভিন্ন রকম খেলনা তৈরি করত।

প্রথমদিকে ব্রিনজার ট্রেন বানাতে পছন্দ করত। কিন্তু তার দাদা তাকে একদিন নৌকায় করে মাছ ধরতে নিয়ে গেলে, জাহাজ বানানোর দিকে তার ঝোঁক সৃষ্টি হয়। দশ বছর বয়স হতে হতে টাইটানিকের প্রতিরুপ কি করে বানানো যাবে তা জেনে যায় ব্রিনজার। এ ব্যাপারে ব্রিনজারের ভাষ্য,

“যখন আমি আমার মায়ের সাথে ডেনমার্কের লেগোল্যান্ডে বেড়াতে যাই, প্রথমবারের মত লেগো দিয়ে নির্মিত চমৎকার ও বিখ্যাত সব ঘরবাড়ি, বিমান, জায়গা এবং জাহাজের মডেল দেখি, সম্ভবত তখনই আমি চিন্তা করতে শুরু করি আমিও একদিন আমার নিজের একটা লেগোর মডেল তৈরি করব। আমার বয়স যখন দশ বছর হলো, আমি লেগো দিয়ে একটি টাইটানিক বানানোর চিন্তা শুরূ করলাম সেটা হবে একটা মানুষের সাইজের।”

ব্রিনজারের এই লেগো টাইটানিক মডেলটিকে তার পারিবারিক প্রজেক্ট বলা চলে। পুরো পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব সবাইই ব্রিনজারকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা আর উৎসাহ দিয়েছে এ কাজে। পেশায় প্রকৌশলী দাদী ছিল ব্রিনজারের প্রধান সহকারী। তিনি সত্যিকারের টাইটানিকের প্রতিরুপ কি করে লেগোর আকারে বানানো যায় এবং তা বানাতে কতগুলো লেগো ব্রিকস দরকার হবে তা বুঝতে ব্রিনজারকে সহায়তা করেন। আর ব্রিনজারের মা ছিল তার চিয়ারলিডার। তিনি সবসময় ব্রিনজারকে উৎসাহ যুগিয়েছেন তার স্বপ্নপূরণে। পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ব্রিনজার পেয়েছে লেগোব্রিকস কেনার অর্থ।

ব্রিনজার বলে, টাইটানিকের রেপ্লিকাটি তাকে তার অটিস্টিক সত্ত্বা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। এ রেপ্লিকাটি বানানোর আগে সে মানুষের সাথে সহজভাবে কমিউনিকেট করতে পারত না, যা তাকে, অসুখী আর নিঃসঙ্গ করে রেখেছিল। অথচ এখন সে নিজের ব্যাপারে এতটাই আস্থাশীল যে, অনেকের কাছেই সে তার নিজের সৃষ্ট রেপ্লিকা নিয়ে সাক্ষাৎকার পর্যন্ত দিচ্ছে।

যখন আমি রেপ্লিকাটি বানানো শুরু করি, আমি এমন ছাত্র ছিলাম যে, স্কুলে সবক্ষেত্রে আমাকে অন্যের সাহায্য নিয়ে কাজ করতে হত। কিন্তু এখন আমি কারো সহায়তা ছাড়াই পড়াশুনা করতে পারি। আমার রেজাল্টও আগের তুলনায় ভালো এবং আমার সহপাঠীরাও এখন আমার সঙ্গে মিশে। আমি এখন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে পারি এবং অনেক চমৎকার মানুষদের সাথে মিশতে পারি”- সিএনএন নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিনজার নিজের মনের দুয়ার খুলে দেয়।

ব্রিনজার অটিস্টিক বলে তার মা তাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ভুগত। অথচ তিনি এখন তার সন্তানকে নিয়ে গর্বিত। তার সন্তান অটিজমের বাধাকে অতিক্রম করতে পেরেছে। অন্যান্য যেসব বাবা-মার সন্তানরা অটিজমের শিকার, ব্রিনজারের মা এখন তাদের উৎসাহ দেন। ঠিকমত পরিচর্যা করলে এবং সকল কাজে উৎসাহ যোগালে তাদের সন্তানও হয়তো একদিন অটিজমের বাধা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে, স্বভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে।

ব্রিনজারের এই অর্জন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। অটিজম কোন অভিশাপ নয়। একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী এবং জাতীয় নেতারাও অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য যেটা দরকার তা হলো, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ ,তাদের কথা যদি মনোযোগ দিয়ে শোনা যায় তবে তাদের কাছ থেকেও শেখা যাবে অনেক কিছু।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button