মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

সালমান মুক্তাদির ও লেজি বেবী সিনড্রোম!

ধরুন, একটা বাচ্চার সামনে আপনি দুটো বেলুন ধরলেন। লাল ও সাদা বেলুন। বাচ্চাটা হাত বাড়িয়ে লাল বেলুনটা ধরতে চাইবে। কারণ সাদা তার কাছে বর্ণহীন। লাল কালার তার চোখের অপটিক নার্ভ হয়ে ব্রেইনে প্রথম ধাক্কা দিয়েছে, সাদাটা দিতে পারেনি। একে ব্রাইটেস্ট লাইট ইফেক্ট বলে। এবার বাচ্চাটার সামনে একটা ছোট লাল বল এবং বড় লাল বল ধরুন। সে হাত বাড়াবে বড় বলটার দিকে। কারণ তার চোখে শুরুতে ছোটটা না পড়ে বড়টা পড়েছে। এটাকে বলে লারজেস্ট সাইজ ইফেক্ট। সাইজ ইফেক্টও ব্রাইট লাইট ইফেক্টের মতোই। এবার বাচ্চাটার সামনে দুটো সম আকারের লাল বল রাখুন। একটাতে হাত দিলে আলো জ্বলে এবং পিউপিউ করে সাইরেন বাজে, আরেকটা আলোহীন ও চুপচাপ। বাচ্চাটা আলো ও সাইরেনের বলটা তুলে নিবে। এটা হল লাউডেস্ট সাউন্ড ইফেক্ট। সাউন্ড তার ব্রেইনকে ধাক্কা দিয়েছে, সে সেদিকেই হাত বাড়িয়েছে।

খেয়াল করুন- তিনটা ক্ষেত্রেই বাচ্চাটাকে বল বাছাই করতে একবারো ভাবতে হয়নি, একবারো মস্তিষ্ককে ব্যবহার করতে হয়নি। আপনি আমি সবাই জানি- সে সেটাই নিবে যেটা তার চোখে আগে পড়বে, যার আলো চোখে প্রবেশ করে ব্রেইনে ধাক্কা দিবে, যে জিনিস কানে বেশি বাজবে, বাচ্চার হাত সেদিকেই যাবে। সে আদতে হাত বাড়ায়নি, বরং বস্তুগুলোই তাকে বাধ্য করেছে হাত বাড়াতে। কমন ব্যাপার হলো- তিনটা ক্ষেত্রেই তাকে মাথা খাটাতে হচ্ছে না। আমরা হলাম বাচ্চাদের মতো, অলস। এই ব্যাপারটাকে বলা হয়- লেজি বেবি সিনড্রোম (Lazy Baby Syndrome)। এটা বাচ্চাদের রোগ নয়, আমাদের রোগ। আমরা কোন জিনিসটা গ্রহণ করব, কোনটা করব না সেটা বাচ্চাদের মত চয়েস করি। আবার চয়েস করি মাথা না খাটিয়ে, ব্রেইনকে অলস রেখে ব্রাইটেস্ট-লাউডেস্ট-লারজেস্ট থিউরির উপর ভিত্তি করে।

শুনতে আপনার খারাপ লাগবে, আপনি চমকেও যেতে পারেন। তবে সত্যটা হল হোমো সেপিয়েন্স (মানুষ) হল পৃথিবীর সবচাইতে অলস প্রজাতি। আদিমকালে শুরুতে তারা শিকার করত, খেত, ঘুমুত, বাচ্চা জন্ম দিত; আবার শিকার করত, খেত, ঘুমুত! আর কাজ ছিল না তাদের। একদিন আবিষ্কার করল আগুনের। মানুষের মতো তখন অনেক প্রজাতিই ছিল পৃথিবীতে, যেমনঃ হোমো নিয়েন্থার্ডালস, হোমো ডেনিসোভান প্রভৃতি। এরা তখনো আগুন আবিষ্কার করতে পারেনি। ফলে আমরা হোমো সেপিয়েন্সরা শিকার ধরে মাংসটা পুড়িয়ে খাওয়া শুরু করলাম। পোড়া মাংস দ্রত হজম হয়। এক থেকে দুই ঘন্টায় আমরা পূর্ন শক্তি লাভ করতাম।

অন্যান্যরা তখন কী করত? তারা শিকার করত, মাংস খেত কাঁচাই। তাদের হজম হতে সময় লাগত পনের বিশ ঘন্টা। এই সময়টায় শরীর খুব ধীরে এনার্জি পেত। ফলে তারা পুরোটা সময় অলসভাবে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিত। বাঘের কথা, সিংহের কথা ভাবুন। রাতে শিকার করে। হজমের জন্য সারাদিন ঘুমায়। কারণ জাগলে বেশি শক্তি লাগবে। কাঁচা মাংস তাদের দ্রুত শক্তি দিতে অপরাগ। একইভাবে নেকড়ে, হায়েনা, শেয়াল সবাই। কুকুর আর বিড়াল দেখবেন সারা রাত ঘুমাচ্ছে না। আবার দিনেও খুব বেশি ঘুমাচ্ছে না। কারণ? এরা মানুষের কাছ থেকে সিদ্ধ খাবার খাওয়া শিখে ফেলেছে।

দ্রুত হজমের ফলে লাভটা কী হলো? দ্রুত হজমের ফলে পেশী ও ব্রেইন দ্রুত শক্তি পাচ্ছে। ফলে হোমো সেপিয়েন্সরা পেশী ও ব্রেইনের ব্যবহার অন্যদের থেকে বেশি করতে পারত। বেশি শিকার করত, বেশি খেত। পেশী শক্তির কারণে তারা প্রাণি থেকে শুরু করে মানুষের মত অন্য সব প্রজাতিকেও দ্রুত পৃথিবী থেকে উধাও করে দিল। বৃহত্তর গণহত্যা দিয়েই শুরু হল এই পৃথিবীতে হোমো সেপিয়েন্স বা মানুষের জয়যাত্রা। দ্রুত ও বেশি শক্তি পাবার কারণে তারা বেশি বেশি মাথাকে ব্যবহার করতে পারত। ফলে কী ঘটল? আবিষ্কার হল- পরচর্চা। গালগল্প (ফিকশন)। একদল হোমো সেপিয়েন্স ঘন্টার পর ঘন্টা পরচর্চা করেই কাটিয়ে দিতে পারত। বিজ্ঞান কিংবা যেকোন আবিষ্কারের আগে (৭৫০০০ বছর আগে) মানুষ আবিষ্কার করল পরচর্চা। ধর্মে যেটাকে বলা হয়- গীবত। পরচর্চা প্রকারন্তেই অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো, পা ঢুকিয়ে দেওয়া। অকারণেই হোমো সেপিয়েন্সরা গুরুত্বহীন ব্যাপারে মাথা ঘামাতে শুরু করল। যদিও এর দরকার ছিল। বৃহত্তর স্বার্থে। আজ মানুষ এই পর্যায়ে পৌছেছে- কারণ তারা নিজেদের মত অন্য প্রজাতিদের গণহত্যা করেছিল এবং মাথাকে খাটিয়েছিল পরচর্চা দিয়ে।

যুগ বদলেছে। সূর্য পূর্ব থেকে পৃথিবীর পশ্চিমে গিয়ে ডুবে গেছে শত-সহস্রবার। কিন্তু আমাদের ডিএনএ?

বদলায়নি। তাতে খোঁদাই করে রাখা হয়েছে পরচর্চা কিংবা গুরুত্বহীন বিষয়ে মাথা ঘামানো, গুরুত্বহীন বিষয়কে প্রায়োরিটি দেওয়া, মাথাকে অলসভাবে বসিয়ে রেখে ব্রাইটেস্ট-লারজেস্ট-লাউডেস্ট জিনিসের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। মানুষ পদ্মা সেতুকে নিয়ে ভাববে, গালগল্প করবে, গলির মাথার চায়ের দোকানে কয়েক হাজার কাপ চা খেয়ে ফেলবে। পদ্মা সেতু তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে যেতে যে ছোটছোট সেতু গুলো পার হতে হয়, পিঠ চিতিয়ে যে কালভার্টগুলো রড-সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকের চাকার ভার বহন করবে নিভৃতে, তাদের কথা কেউ ভাববে না। কারণ- সেগুলো ভাবতে হলে নতুন করে ভাবতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে, নতুন করে জানতে হবে, মাথা খাটাতে হবে। মানুষ সেটা করবে না, কারণ- মানুষ আদতে ভাবতে পছন্দ করে না। মাথাকে ব্যবহার না করবার স্বভাব তাদের পূর্বপুরুষের।

এটা কী তবে রোগ? না, এটা রোগ নয়। এটাই একমাত্র সিনড্রোম বা রোগের নাম হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে- যেটা আদতে কোন রোগ নয়। এটা খুব স্বাভাবিক। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ একরকম হবে, অধিকাংশ মানুষ অলস হবে, অধিকাংশ মানুষ লেজি বেবি সিনড্রোমে ভুগবে এটা লজিক্যাল, এটা পৃথিবীর দাবী। কারণ পৃথিবীটা গড়ে উঠেছেই তাদের জন্য। একটা জায়গা সবাই নোংরা না করলে কেউ একজন হাত বাড়িয়ে পরিষ্কার করা শুরু করতে পারবে না। পৃথিবীর পজিটিভ সবকিছুই শুরু হয়েছে লেজি বেবি সিনড্রোমের অসংখ্য মানুষের নেগেটিভ কাজের বাই প্রোডাক্ট হিসেবে।

কারা বাই প্রোডাক্ট? যারা ভাবে, যারা নেগেটিভ জিনিসে নেগেটিভ কমেন্ট করার আগে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, যারা সবার গালিগালাজের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় না। এজন্যই সালমান মুক্তাদির এত আলোচনায় থাকে। মাকসুদুল হকদের বাধ্য হয়ে পড়ে, মুখস্ত করে পরীক্ষা দিয়ে জব নিয়ে জ্ঞানের বই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এজন্যই গল্প-উপন্যাস মানুষ টাকা খরচ করে আগ্রহ করে কেনে, অথচ কারেন্ট এফেয়ার্সের মত জ্ঞানের বই জব পাবার পরদিন থেকে আর কেনা হয় না।

কেউ আলোচনায় আসলে আপনার খুব খারাপ লাগে? কেউ নিউজের কমেন্ট বক্সে গালিগালাজ করতে দেখলে আপনার মনে হয়- মানুষ এত খারাপ কেন? কেউ ৩৬ থেকে ৪৪ করলে আপনার মন চায় তাকে গালি দিতে? একদম রাগবেন না। এদের পাগলামিই কিংবা আমাদের লেজি বেবি সিনড্রোমের বাইপ্রোডাক্ট-ই আজকের সভ্য সমাজ। Take it…Feel it…ignore it… Everything is balanced. Nothing is Extra in This Extraordinary Universe. 

সূত্রঃ Large Number Bad=Small Number Good (But they make Balance somehow) 

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button