খেলা ও ধুলা

আজ রচিত হয়েছিল সাতশো আটাত্তর মিনিটের সেই অমর বীরত্বগাঁথা

ইনিংসের দুইশো দুইতম ওভার, গ্যারেথ ব্যাটির বলটা সুইপ করলেন, ফাইন লেগে গড়িয়ে গেলো বল। ব্রায়ান লারা নামের মানুষটা ক্লান্ত শরীর নিয়ে দৌড়ুলেন, এক রান। অ্যান্টিগার রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ড সেন্ট জোন্সে এতক্ষন উত্তেজনার ঢেউ হানা দিচ্ছিলো প্রতিমুহুর্তে, এবার সেটা আক্ষরিক অর্থেই জলোচ্ছ্বাসে রূপ নিলো। প্রায় আড়াই হাজার টেস্ট ম্যাচের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইনিংসে চারশো ছুঁলেন কোন ব্যাটসম্যান! মানুষটা ব্রায়ান চার্লস লারা- ক্রিকেটের বরপুত্র বলে সবাই যাকে চেনে।

উইজডেন ট্রফির আগের তিন টেস্টেই হেরে অ্যান্টিগায় ধবলধোলাই এড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নেমেছিলো ক্যারিবীয়রা। ভিভ রিচার্ডস-গ্যারি সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন অতীতের কঙ্কাল, সেই অযোধ্যা নেই, তবে রাম হয়ে ছিলেন একজন। ক্যারিবীয়দের শেষ কিংবদন্তী, ব্রায়ান লারা। প্রথম সেশনেই ড্যারেন গঙ্গা আউট হবার পর আরেক ওপেনার ক্রিস গেইলের সাথে জুটি বাঁধলেন। অ্যান্টিগায় পরের আড়াই দিনের গল্পটা শুধুই পাঁচ ফুট আঁট ইঞ্চি উচ্চতার এই কৃষ্ণাঙ্গের। অপরপ্রান্তে ব্যাটসম্যানরা এসেছেন, বিদায় নিয়েছেন, একপাশে থিতু হয়ে ধৈর্য্যের প্রতিমূর্তি হয়ে টিকেছিলেন লারা। এই অ্যান্টিগাতেই বছর দশেক আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ইনিংসটি খেলেছিলেন, একই মাঠ, একই প্রতিপক্ষ, মানুষটাও একই, ব্যাট নামের অস্ত্রটাতেও দশ বছরে মরচে পড়েনি এতোটুকু, বরং ধারালো হয়েছে আরো!

ম্যাথু হেইডেনের কাছে ছয় মাস আগে সাম্রাজ্য হারিয়েছিলেন। সেটা আবার নিজের করে নিতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন কিনা কে জানে! আড়াই দিন, দুইশোর বেশী ওভার ইংলিশ বোলারেরা শুধু হাত ঘুরিয়ে গেলেন। আগের তিন টেস্টে করেছিলেন মোতে একশো রান, দুবার আউট হয়েছেন রানের খাতা না খুলেই, দলও দুবার গুটিয়ে গেছে একশোর আগে; হেরেছে তিনটে ম্যাচেই। ব্যাটসম্যান হিসেবে বলুন, অধিনায়ক হিসেবেই বলুন- ব্রায়ান লারা এই ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন পাহাড়সম চাপের বোঝা মাথায় নিয়ে। ধবলধোলাই হলে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেয়া একরকম নিশ্চিতই ছিলো। সেই লারা কি দোর্দণ্ড প্রতাপেই না ইংরেজ বোলারদের ওপর ছড়ি ঘোরালেন অ্যান্টিগায়! সাতশো আটাত্তর মিনিট, পাঁচশো বিরাশিটি বল, দুইদিনের বেশী সময় ব্যাট হাতে বাইশ গজে কাটিয়ে গড়লেন ইতিহাস, চারশো রানের এভারেস্টে পা রাখা প্রথম মানব, যে কীর্তি আজ পর্যন্ত গড়তে পারেননি আর কেউই!

গ্যারেথ ব্যাটির বলেই পরপর ছক্কা-চার হাঁকিয়ে হেইডেনকে পেছনে ফেললেন, টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটা আবার হয়ে গেলো ব্রায়ান লারার সম্পত্তি; বাইশ গজে চুমু খেলেন, অন্যপ্রান্তে থাকা রিডলে জ্যাকবস এসে জড়িয়ে ধরলেন লারাকে। তারপর তো চারশো রানের প্রতীক্ষা! সেটাও হয়ে গেলো, ব্রায়ান লারা কি নির্লিপ্ত! মুখে একচিলতে হাসি, অধিনায়ক হিসেবে ইনিংস ঘোষনা করে দিলেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা এসে হাত মেলালেন, গত দুদিনে যাদের সাগরপাড়ের কড়া রোদে পুড়িয়েছেন। হার্মিসনকে কিছু একটা বলে সামান্য হাসলেনও, বোধহয় বলতে চাইলেন, আউট তো করতে পারোনি! আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে, অ্যান্টিগায় এক অবাক দুপুরে ব্রায়ান লারা গড়েছিলেন অবিশ্বাস্য এই কীর্তি। চাঁদের বুকে প্রথম মানব হিসেবে পা রেখেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং, এভারেস্টের চূড়ায় পদচিহ্ন একে দিয়েছিলেন তেনজিং নোরগে; ব্রায়ান লারা তো ক্রিকেটের আর্মস্ট্রং, কিংবা ক্রিকেটীয় সৌন্দর্য্যের শেরপা বনে যাওয়া তেনজিং নোরগে! ক্রিকেটটাতো ওঁদের কারনেই এতো সুন্দর!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button