মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

ল্যান্ডফোনের দিনগুলিতে প্রেম…

জুবাইদা পারভীন লিপি:

ছেলেটার সাথে আমার পরিচয় ল্যান্ডফোনে। আটাশ বছর আগের কথা বলছি। আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছি। বলে রাখা ভালো, আমি লেখাপড়ায় বেশ ভালোই ছিলাম। এসএসসি তে মানবিক বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে তিনটা লেটার নিয়ে পাশ করেছিলাম ১৯৮৮ সালে। আশা করছি এইচএসসি তে বোর্ডে প্লেস করবো। যাহোক, আমার এক বড় আপুর সাথে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। আমি লেখাপড়ায় ভালো বলে তাদের পুরো পরিবারই ভালোবাসেন আমাকে। আর হ্যাঁ, এ কারনেই আমার বাঁদরামিগুলো তাদের চোখেই পড়ে না। আমি দারুন চঞ্চল আর দুষ্টু টাইপ মেয়ে। ঐ যুগেই আমি রীতিমত ফোনিক্স সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।

একদিন বিকালে ঐ আপুদের বাসায় বেড়াতে গেলাম, আপু ঘুমাচ্ছিলো (ও তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে)। কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে আমি আপুদের টেলিফোনের পাশে গেলাম, দেখলাম সেখানে একটা ডায়েরি ফোনের পাশে। অসংখ্য ফোন নাম্বার সেখানে। একটা নাম্বার এত মজার যে, সেখানে আমার চোখ আটকে গেল! নাম্বারটা ৪৩২১! আর পাশে লেখা “রানা মামা”। আমার মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি ভর করলো। দিলাম ফোন রানা মামাদের বাসায়। ফোনটা রিসিভ করলো সেই রানা মামা। কি অপূর্ব কন্ঠস্বর! খুব সুন্দর করে কথা বললো রানা মামাটা! ফোন রিসিভ করেই বললো, “রানা বলতেসি”। জীবনেও ভুলবোনা সেই কন্ঠ। আমি যেন কেমন কেমন হয়ে গেলাম (একটু ভয়ও পেয়ে গেলাম, যদিও আমি ভয় পাবার মেয়ে নই)। তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আরে রানা কেমন আছো তুমি? আমাকে চিনতে পেরেছো? অতি দ্রুত আমার একটা মিথ্যা নাম বললাম, সাথে সাথে মিথ্যা করে এও বললাম আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। এদিকে এসবই ডাহা মিথ্যা কথা। কিন্তু বলতে ভালোই লাগছিলো। দুষ্টু মেয়ে যে আমি। আমার তখন বয়স ঊনিশ বছর। দেখতে শুনতে ভালোই। না মানে সবাই বলতো আর কি! কিন্তু ঐ রানা মামাটা যে আমার চেয়ে বেশি দুষ্টু তা কি আমি জানতাম? আবার আসি রানার সাথে ফোনালাপে। আমি মিথ্যা করে বানিয়ে বানিয়ে ঐ রানাকে বলছি, “তোমাকে আমি অনেক ভালবাসি”। প্রায় তো বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমাকে দেখি। এসব কিছুই আমি আন্দাজের ওপর বলেছি কারন ফোন নাম্বারতো আপার ডায়েরিতে পেয়েছি। আপারা চারজন বান্ধবী। যাহোক, রানা আবার আমাকেই বলছে, “ঠিক আছে, এতই যখন ভালবাসো তখন রাত একটায় ফোন দিও, কেমন? কথা হবে, এখন আমি অনেক ব্যস্ত।” আমি পড়লাম মহাবিপদে। তবুও মুখে বললাম ঠিক আছে রাতে কথা হবে। কত বড় সাহস আমার! ১৯৯০ সালে এমনটা করেছি আমি। ইতোমধ্যে আপু ঘুম থেকে উঠেছে। আমার মুখে সব কথা শুনে খুব হাসলো, আবার রেগেও গেলো। বললো, ”তুই কি বড় হবি না? কদিন পর ভার্সিটিতে যাবি, আর কত দুষ্টামি করবি তুই?”

আপুর বকা খেয়েও বললাম, কে গো তোমার রানা মামা? কী করে সে ? কি যে সুন্দর কন্ঠ তার! আর কথাবার্তায় কত স্মার্ট! আপু বললো, রানা তার বান্ধবীর ভাগ্নে। পড়ে রাজশাহী বিআইটি তে (বর্তমানে যাকে RUET বলে)। রানা সিভিল ইন্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। দেখতে নাকি ভীষন হ্যান্ডসাম আর খুব মিষ্টি চেহারা, আপা বলছিলো। “ওমাগো তাই?” বললাম আমি। সে রাতে আপুদের বাসায় থাকলাম। কারন আমাদের বাসায় ল্যান্ডফোন আমার আব্বার রুমে। কোনভাবেই রাত একটায় রানার সাথে কথা বলতে পারবোনা নিজেদের বাড়ি থেকে। আবার আমাদের যৌথ পরিবারও। চাচাদের রুমেও ফোনের হ্যান্ডসেট আছে। কথা বললে ধরা পড়বোই পড়বো। যাহোক, আপুদের বাসা থেকে রাত একটা বাজতে দশ মিনিট বাকি থাকতেই ফোন করলাম রানার বাসায়। একবার রিং বাজতেই রানা ফোনটা রিসিভ করলো। আমি ফট করেই বলে ফেললাম, “দেখেছো তো! তোমাকে আমি কত্ত ভালবাসি!” রানা তো রীতিমত অবাক! ওর মনের মাঝে তখন নিশ্চয়ই এমন কথা হচ্ছে যে, মেয়েটা কেমন করে এত রাতে ফোনটা করতে পারলো? তো সে রাতে, আমরা রাত একটা থেকে ভোর পাঁচটা দশ পর্যন্ত কথা বলেছিলাম। বেশ কতগুলো গান আমি রানাকে শুনিয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা গান হলো এইটা, ‘দিল দিওয়ানা বিন সাজনা কে মানে না’! আবার গাইলাম ‘নাজার কে সামনে, জিগার কে পাস’! এদিকে রানা একটা কথা বার বার জানতে চাচ্ছিলো যে, ওর ফোন নাম্বারটা কোথায় পেলাম? ওদিকে ফজরের আজান শুরু হয়েছে। ফজরের আজানের সময় রানা আমাকে বলছে, ”সারা রাত যা বলসো বলসোই, এখন সত্যি কথা বলোতো কে তুমি? কী পড়ো? কন্ঠ শুনে মনে হয় পিচ্চি একটা মেয়ে। আজানের সময় মিথ্যা বলো না, আল্লাহ্ গুনাহ্ দিবেন । আমি ভয় পেয়ে সব সত্যি কথা রানাকে বললাম। আমার বাসা কোথায়, কী পড়ি, রেজাল্ট কেমন হতে পারে সবই হড়বড় করে বললাম। রানা শুনে খুশি হলো আর আমাকে আবারো বললো, ”পিচ্চি মেয়ে তো তুমি, কিন্তু দুষ্টুমিতে একশো তে একশো দশ।” এভাবে আমরা পরপর চারদিন কথা বলেছি ঐ আপুদের বাসা থেকেই। তারপর আসলো সেই মধুর ক্ষন।

চতুর্থদিনেই রানা বললো সে আমাকে দেখতে চায়। আমি তাকে আপুদের বাসায় চলে আসতে বললাম। আপুদের বাসাটা হলো রানার খালার বান্ধবীর বাসা। তাই বহুবার রানা এ বাড়িতে এসেছে। সেই কারনেই ঐ বাড়ি তার ভালোই চেনা। মোটামোটি আধা ঘন্টা পর রানা মামা (আপুর রানা মামা) এলো ঐ বাসায়। কি সর্বনাশ! ঐ রানাটা সত্যি আমার মুখের সামনে সোফায় বসা। আর আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছি। আপুদের মেঝের কার্পেটে কয়টা ফুল সেসব হাবিজাবি গুনছি। আরে বাবা আমি না হয় দুষ্টুমি করি, দুষ্টুমি করার জন্যই তা করি! কিন্তু কেন জানি তখন মনে হচ্ছিলো এই রানাকে আমি অনেক অনেক ভালবাসি, সত্যি ভালবাসি! এখানে কোনই দুষ্টুমি নাই, আছে সত্যিকারের ভালবাসা। আমি মাথা নিচু করে বসে ছিলাম, আপু আর রানা গল্প করছিলো। গল্পের বিষয় স্বয়ং আমিই। এক পর্যায়ে আপু উঠে চলে গেলো অন্যরুমে। আমাদেরকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে।

আর রানা! আমার সামনে এসে কার্পেটের উপর বসে আমার মুখটা উপরে তুলে বললো, “আমি ঠিক যেমনটা কল্পনা করেছিলাম, তুমি তেমনই!”

এরপর আমরা দুজন সবার অগোচরে দেখা সাক্ষাত করতে লাগলাম। বাড়িতে বড়দের কাছে বহুবার ধরাও পড়েছি। ঐযে, ফোনে কথা বলার সময়। সে এক ইতিহাস বটে! বাড়ির বড়দের ভাব দেখে মনে হলো এ বাড়িতে আমিই প্রথম প্রেম করছি! কিন্তু তা নয়। পরে জেনেছি আমার চৌদ্দ গুষ্ঠির সবারই প্রেমের বিয়ে! ওদিকে, আমারও এইচএসসির রেজাল্ট হলো। আমি রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে চতুর্থ স্থান অধিকার করলাম। দেড় বছর ভাব ভালবাসা চললো আমার আর রানার। ইতোমধ্যে আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। এদিকে বোর্ড স্ট্যান্ড করার জন্য সেই যুগে ইত্তেফাক নিউজ পেপারে আমার ইন্টারভিউ নেওয়া হলো। নিউজ পেপারে আমার ছবি আসলো। সেই নিউজ পেপার রানা ওদের বাসায় দেখালো। মায়েরা প্রথমে মানতে চান না, রানার মা মানে যিনি পরবর্তীতে আমার শাশুড়ী, তিনিও মানতে চাননি। তবে সন্তানের আবদারের কাছে মা বাবা অসহায় হয়ে পড়েন। কারন তাঁরা যে বাবা-মা! সন্তানকে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। অল্প কিছুদিন পরেই আমাদের এনগেজমেন্ট হয়েছিলো। এনগেজমেন্টে এত হৈচৈ-আনন্দ হয়েছিলো, যা এখনো আত্মীয়-পরিজনদের মনে আছে। তারপরেই বিশাল ধুমধাম করে বিয়ে। যখন আমাদের বিয়ে হলো, তখন রানা বাংলাদেশ কনসালটেন্ট লিমিটেড (BCL) এ চাকুরী করছিলো।

আলহামদুলিল্লাহ্, বিয়ের ছাব্বিশ বছর আট মাস পার করলাম অনেক আনন্দের সাথে। সেই ইঞ্জিনিয়ার রানা এখন সরকারী বড় কর্মকর্তা। আমাদেরও একটি ছেলে। কি অদ্ভুত মিল বাবার সাথে ছেলের! ছেলেও এখন RUET এ পড়ে, যেখানে এক সময় তার বাবা লেখাপড়া করতেন। আবার আমাদের ছেলেও তার বাবার মতই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এই পড়ে। আমি এখন সেই শুভক্ষনের অপেক্ষায় আছি, ছেলে বলবে, “মা দেখো তো, মেয়েটা দেখতে কেমন! মেয়েটাকে খুব ভালোবাসি!”

*

এরকম অসাধারণ সব লেখা পড়তে যোগ দিন ক্যানভাস ফেসবুক গ্রুপে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button