ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

অথচ প্রকাশ্য কোরবানির প্রথা অধিকাংশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই নেই!

পড়ছিলাম তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদের লেখা “নেতা ও পিতা” গ্রন্থটি। একবার কোরবানির ঈদের কথা, তাজউদ্দীন জেল থেকে সদ্য ফিরেছেন, অনেকদিন পর পরিবারের সাথে ঈদ করতে পারবেন। তাজউদ্দীন আহমদের শ্বশুর কোরবানী ঈদ উপলক্ষ্যে একটা খাসি কিনে আনেন। জামাইয়ের জেল মুক্তির আনন্দে তিনি উৎফুল্ল। তাজউদ্দীনকে নিয়েই খাসীটি জবাই করাবেন বলে ঠিক করলেন। এই সংবাদ শোনার পর তাজউদ্দীন আহমদকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। কন্যা শারমিন আহমদ বাসার ছাদে পানির ট্যাংকের পেছনে তাজউদ্দীন আহমদকে আবিষ্কার করলেন। তিনি সেখানে লুকিয়ে ছিলেন। ধরা পড়ে তাজউদ্দীন আহমদ ব্যথিত স্বরে বললেন- “আমি ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির জবাই দেখতে পারি না।” যাই হোক শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমদকে সেদিন জবাই করতে হয়নি।

ঈদ গেল, কোরবানির ঈদ। নব্বুই কিংবা তারও বেশি শতাংশ মুসলমানের দেশ আমাদের বাংলাদেশে ঈদ তাৎপর্যপূর্ণ একটি উৎসব। এই দেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ। লক্ষ লক্ষ মানুষ এদেশে কোরবানি দেন। দুঃখজনক বিষয়, এখনো আমরা কোরবানি দেই রাস্তাঘাটে। এই দেশে শুধু নব্বুইভাগ মুসলমানই থাকে তা-ই শুধু নয়, এই দেশের অধিবাসীদের মাঝে বিভিন্ন বয়সের নারী, ২৫ ভাগ শিশু এবং কিছু মানুষ যাদের হৃদয় দুর্বল, প্রকাশ্যে পশু জবাই যারা সহ্য করতে পারেন না। ফেসবুকে অনেককেই পোস্ট করতে দেখা যায় রক্তাক্ত বিভৎস ছবি।

পাকিস্তান-বাংলাদেশ বাদে আর কোন দেশের শহরে প্রকাশ্যে পশু জবাই দেয়া হয় কি না আমার জানা নেই। ৯০% মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ রাজধানী কুয়ালালামপুর, জাকার্তা, সিঙ্গাপুর, দুবাই, কাতার, ইস্তাম্বুল কোথাও প্রকাশ্যে গরু তো দূরের কথা, একটি মুরগিও জবাই দেয়া হয় না, পৌর কতৃপক্ষের রেজিষ্টার্ড কশাইখানাতেই সব জবাই, কোরবানি হয়। সৌদি আরবেও তাই।

আমাদের দেশে সরকারও ২০১৬ থেকে চেষ্টা করছে রাস্তা থেকে পশু কোরবানি সরাতে, কিন্তু নগরে অপ্রতুল স্থানের কারণে সেই চেষ্টা প্রতিবার বিফল হয়েছিল, এবারও হয়েছে। সমস্যাটা হচ্ছে এই প্রকাশ্য কোরবানীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াকে অনেকে ধর্ম-বিদ্বেষ মনে করেন। আমার হিসেবে জবাইয়ের কাজটা প্রফেশনালদেরই করা উচিত, নির্দিষ্ট জায়গায় হওয়া উচিত। কোন মুহাদ্দিস কিংবা মুফতিকে কোরবানির প্রফেশনাল বলা অনুচিত, এতে ওনাদের সম্মান কমে বই বাড়ে না।

বেঙ্গল মিট নামের একটা প্রতিষ্ঠান সম্ভবত ২০১৫ সাল থেকে ছোট পরিসরে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কোরবানি ব্যবস্থাপনা শুরু করেছে। আপনি অনলাইনে গরু পছন্দ করে তাদের নিকটতম বুথে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করলে তারা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে গরু জবাই করিয়ে মাংস কেটে কুটে প্রয়োজনীয় প্যাকেজিং করে গ্রাহককে হস্তান্তর করবে। আপনি শুধু যে তাদের ওয়েবসাইট থেকে পশু পছন্দ করতে হবে এমনটা নয়। চাইলে নিজের কেনা পশুও তাদের হাতে দিয়ে আসতে পারেন, নির্ধারিত চার্জের বিনিময়ে তারা প্রসেসিং করে দেবে, যদিও চার্জটা অনেক বেশি।

একবার এই খাতের সম্ভাবনাটাও চিন্তা করুন। আমাদের রাস্তাঘাট যেমন পরিস্কার থাকবে, ড্রেইনেজ সিস্টেম ভালো থাকবে, শারীরিক কষ্ট কমে যাবে, আর প্রকাশ্যে পশু কোরবানি দৃশ্যও সবাইকে দেখতে হবে না। এরকম অন্তত ১০০টা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে গোটা দেশে। এতে করে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হবে। প্রতিযোগিতার কারণে খরচও কমে আসবে।

সব শেষে এই লেখা দেখে যারা তেড়েফুঁড়ে আসছেন তাদের উদ্দেশ্যে- ভাই রে, আমি কোনোভাবেই কোরবানির বিরুদ্ধে না। কোরবানী দেওয়া প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের হক। এটা নিয়ে আমার আপত্তি জানানোর কোনো কারণ নেই। আমার ব্রেইন টিউমার অপারেশন দেখতেও ভয় লাগে, তার মানে কিন্তু আমি এই অপারেশনের বিরুদ্ধে না। আমি বলতে চাই- ডাক্তারের কাজ ডাক্তার করুক, কসাইয়ের কাজ কসাই করুক, আমাদের কাজ আমরা করি। পৃথিবীটা আরও সুন্দর হয়ে উঠুক। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠুক সবাই। ঈদের শুভেচ্ছা সবাইকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button