ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

কুয়েটের চার হবু প্রকৌশলীর অকালমৃত্যু: নিছক দূর্ঘটনা নাকি ‘পরিকল্পিত’ খুন?

ধরুন, সিগন্যালে লালবাতি জ্বলছে। তারমানে আপনার সামনে যাওয়া নিষেধ। এক্ষেত্রে যদি আপনি এই নিয়ম না মেনে বেশ গতিতে সামনে এগিয়ে যান এবং ‘নিয়ম মেনে রাস্তা অতিক্রমরত’ চারজন পথচারীকে আপনার পাজেরোর চাকায় পিষ্ট করে মেরে ফেলেন, তাহলে সেটা নিশ্চয়ই কোনো দূর্ঘটনা নয়? স্পষ্টত সেটা খুন। এমনই এক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে গেল গত ২৫ শে মার্চ। না, তারা রাস্তায় অনেক বেপরোয়া যানবাহনের সামনে ছিলেন তাও নয়। তারা চারজন ঘুমোচ্ছিলেন সারাদিনের পরিশ্রম শেষে। এবং তাঁদের তিনজনের ঘুম ভাঙ্গল অগ্নিদগ্ধ শরীর নিয়ে। আর বাকি একজনের ঘুম ভাঙ্গল না। পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে কোনক্রমে বেঁচে যাওয়া তিনজনও একে একে চলে গেল ‘না ফেরার দেশে’। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রের আগুনে দগ্ধ হয়ে এই করুণ মৃত্যুবরণ নিছক দূর্ঘটনা নয়, এটি ছিল পরিকল্পিত খুন।

ঘটনাপ্রবাহ

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি আবশ্যকীয় কোর্স হল ‘ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট’। চারবছর পড়াশোনার একদম শেষসময়ে গিয়ে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে একটি কারখানায় সংযুক্ত হতে হয়। একমাস কারখানায় গিয়ে সেখানে হাতে-কলতে কাজ শেখাই এই কোর্সের মূল উদ্দেশ্য। আবশ্যকীয় হওয়ায় এই কোর্স কেউ না করলে সে প্রকৌশলী হতে পারবে না। ডিপার্টমেন্টের সেই কোর্স সম্পন্ন করতেই টেক্সটাইল ২০১৩ ব্যাচের চারজনের একটি দলকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত স্কয়ার টেক্সটাইল মিলে। সেখানে শিক্ষকদের নির্দেশ মেনে ‘এটাচমেন্টে’র যাবতীয় কাজ করতে থাকেন তৌহিদুল ইসলাম, শাহীন মিয়া, দীপ্ত সরকার এবং হাফিজুর রহমান হাফিজ।

নিজেদের থাকার জায়গা নিজেরাই ঠিক করে নেয় চারবন্ধু। ভালুকার হরিরবাড়ি ইউনিয়নের মাস্টারবাড়ি এলাকায় ‘আরএস টাওয়ার’ নামের একটি নতুন ছয়তলা বাসার তিনতলার একটি ফ্ল্যাট তারা ভাড়া নেয়। এবং সেখান থেকেই কারখানায় যাওয়া-আসা শুরু করে। মার্চের ১৪ তারিখ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত তারা জানতো না কি এক গভীর পরিকল্পনা চলছে তাদের মেরে ফেলবার জন্য। রাত সাড়ে বারোটায় তারা আক্রান্ত হয় এবং সাথে সাথে মারা যায় তৌহিদুল ইসলাম। বাকি তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও ৩০ মার্চের সকালের আগেই সবাই মারা যায়। প্রথমে শাহীন মিয়া, তারপর হাফিজুর রহমান, তারপর দীপ্ত সরকার।

বিভিন্ন পত্রিকা মারফত সবাই খবরটি জানতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান–সাবেক ছাত্র-ছাত্রীসহ সর্বস্তরের হৃদয়বান মানুষ এমন ‘দূর্ঘটনা’র জন্য আফসোস করতে থাকে। যেহেতু এটিকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই ঘটনাটিকে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দূর্ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়, সবাই ভাবতে থাকে ‘দূর্ঘটনায় মানুষের আর কিইবা করার আছে!’

দূর্ঘটনা নাকি হত্যা?

আগেই বলা হয়েছে যেখানে নিয়মভঙ্গ করা হবে সেখানে অপূরণীয় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। কেউ যদি এই ক্ষতিটা করে থাকে তাহলে সে অপরাধী। আরএস টাওয়ারের মালিকের নাম আব্দুর রাজ্জাক। আমরা জেনেছি তিনি বড় রকমের ব্যবসায়ী। সুতরাং তাঁর ছয়তলা অনেকগুলো বাসা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বাসায় চুরি করে গ্যাসের লাইন নিতে হবে সেটাও স্বাভাবিক কি? অনেকেই ভাবতে পারে, চুরি করে গ্যাসের লাইন নিলে সেটা চুরির অপরাধ হবে, সেখানে খুনের অপরাধ হয় কিভাবে? তাহলে সেই বিশ্লেষণে যাওয়া যাক।

সাধারণত গ্যাস লাইন নিতে হতে অবশ্যই খুব কঠোরভাবে কিছু নিয়মকানুন মেনে সংযোগ নিতে হয়। সেটা যখন বৈধ উপায়ে হয় সেখানে অনেকবার পরীক্ষা করা হয় সবকিছু ঠিক আছে কি না। প্রকৌশলী কিংবা অভিজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেন কোথাও কোনও ভুল হল কিনা! এইসব নিয়ম মেনে চললে সেখানে সংযোগে ত্রুটির শতকরা সম্ভাবনা একেবারে কম। কিন্তু যদি সেই সংযোগ চুরি করে, অবৈধভাবে সকলের অগোচরে নেয়া হয় সেখানে কি সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? অবশ্যই না। সুতরাং আমরা জেনেই গেলাম অবৈধ সংযোগের নিরাপত্তা নাই এবং বিপদ ঘটতে পারে যে কোন মুহূর্তে। এবং বিপদ ঘটলও, মারা গেল চারজন হবু প্রকৌশলী।

মার্চের ১৪ তারিখ সেই বাসায় ‘চুরি করে’ গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়। যেহেতু নির্মাণকৌশল অভিজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষা করে নেয়া হয়নি, গ্যাসের সংযোগে একটি মারাত্মক ভুল করা হয়। গ্যাসের লাইনে যে ভাল্বটি উন্মুক থাকা কথা সেটিও পিলারের ভেতর প্লাস্টার করে এঁটে দেওয়া হয়। এসংযোগে ‘লিকেজে’র জন্য সেই পিলারের ভেতর গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। সাধারণ সংযোগের ক্ষেত্রে এইরকম ক্ষেত্রে উন্মুক ভাল্বটি-ই মানুষকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু আরএস টাওয়ারের মালিক আব্দুর রাজ্জাক একজন চোর এবং সে অসদুপায় অবলম্বন করে দশদিন ধরে চারটা ছেলেকে মারার অস্ত্র তৈরি করে তাদেরই ধরের ভেতরে। দশদিন প্রচন্ড গ্যাসের চাপে বিস্ফোরণ ঘটে। এবং সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সেই বাড়ির প্রায় দুইশ মিটার দূরে বাড়ির কাঁচ, দরজা জানালার টুকরা ছড়িয়ে যায়। ছেলেগুলো ঘুমন্ত অবস্থায় ছিটকে পড়ে তিনতলা থেকে নিচে। এমন কোনও বিস্ফোরণই ঘটত না, কোনভাবেই ঘটত না, যদি সেই গ্যাসের সংযোগ ঠিকভাবে-নিয়ম মেনে-বৈধ উপায়ে নেয়া হত। সুতরাং বাড়ির মালিক অপরাধ করেছেন চুরির-সেই চুরি মেরে ফেলেছে চারটি তরুণ প্রাণকে।

খুন পরিকল্পনার সহোদর: তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী

বাড়ির মালিক আব্দুর রাজ্জাক একজন চোর এবং খুনি-এটা নিয়ে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি যে গ্যাস সংযোগটি নিলেন সেটি তো তিনি নিজে নেননি। তিনি ঘুষ দিয়েছেন, যারা সংযোগ দেবার তারা টাকা খেয়ে দুইনম্বরি সংযোগ দিয়েছে। কে নিয়েছে ঘুষ, কে দিয়েছে সংযোগ? অবশ্যই গ্যাস সংযোগ কোম্পানীর প্রধান কর্মকর্তা এর সাথে জড়িত। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল সেই ঘটনার আমরা কাউকেই দেখলাম না তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রুবিউশন কোম্পানীর দিকে আঙুল তুলতে। অথচ চারজন নিরীহ ছাত্রের খুনের পরিকল্পনায় অস্ত্রের জোগানদাতা তারাই। বাংলাদেশের নাগরিকও হয়ে এটা অন্তত আমরা মানতে পারি না যে, কোথাও অবৈধ গ্যাস সংযোগ আছে এবং সেটা কর্তৃপক্ষ জানে না এবং তারা সেখান থাকে টু-পাইস কামিয়ে নেয়নি। এটা আমরা বিশ্বাস করতে পারিনা। দেশের সেবা সংস্থাগুলো এখনও আমাদের অতটা আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

মনজুর রহমান, ভালুকার তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন। ঘটনার পরদিন তাকে বদলি করে দেওয়া হল। তিতাস গ্যাস সন্তর্পণে ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে সরে গেল। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, এলাকার সবচেয়ে বড়লোকের বাসায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে, এবং সেটা মিস্টার মনজুর রহমান জানতেন না? এত বড় একটা ভবনে গ্যাসের সংযোগ দেয়া হল, তিনি ঐ ছোট্ট এলাকার ম্যানেজার হয়ে জানলেন না? নাকি তার কর্মচারীরাই অবৈধ সংযোগটা দিয়ে দিয়েছে এবং টাকার ভাগ তার কাছে চলে এসেছে, তাই তিনি আর মাথা ঘামাননি সে ব্যাপারে? যদি এরকম ঘটে থাকে তাহলে চোর এবং খুনি আব্দুর রাজ্জাকের দলে মনজুর রহমানের নামটাও জুড়ে দেওয়া আবশ্যকীয়। তাদের ‘খুনি’র দলে আর যারা আছে, তাদের চেলাচামুন্ডা-কর্মচারী, সেসব তাদের টুটি চিপে ধরলেই বেড়িয়ে আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়বদ্ধতা

মৃত চারজনের, তৌহিদ-শাহীন-হাফিফ-দীপ্ত, সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে তারা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-প্রশাসন মিলে যদি চেষ্টা করে অবশ্যই তারা ‘তাদের’ খুনের ন্যায়বিচার আদায় করে নিতে পারবে। বাড়ির মালিক অনেক ধনী-প্রভাবশালী, তিনি টাকা দিয়ে সব কিনে নিতে পারে। এদিকে তিতাস গ্যাস কোম্পানী দেশের সর্দারদের সারিতে, তাদেরও অনেক শক্তি। কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি মেরুদন্ড অবশিষ্ট থাকে, সেখানকার ছাত্ররা যদি সাহসী হয় তাহলে তাদের শক্তির কাছে কেউ টিকতে পারেনা। অতীতেও আমরা তাই দেখে এসেছি।

দেশে যদি চারজন ছাত্রকে কোথাও একসাথে মেরে ফেলে হত, গুলি করে কিংবা ছুরিকাঘাতে, তাহলে সেক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের মনোভাব কিন্তু এত নমনীয় হত না। সবাই প্রতিবাদ করত, খুনিকে ধরার তৎপরতা চলত, চারিদিকে ক্ষোভের আগুনের উত্তাপ পাওয়া যেত। কেবল একটি দূর্ঘটনার রঙ চড়িয়ে কুয়েটের চার শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানুষের মনে আফসোস-করুণা ছাড়া আর কিছুই তৈরী করতে পারল না। এখন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই পারে তাদের ছাত্রদের খুনিদের বিপক্ষে আইনিভাবে লড়তে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই পারে কঠোর প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে যতদিন তাদের বন্ধু-বড়ভাইদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হয়। কেবল আর্থিক সহযোগিতা (মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ শব্দটি পরিহার করা উচিত) আদায় করে, কিংবা পরের বছর মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃতদের স্মরণ করার মাধ্যমে ‘তৌহিদ-শাহীন-হাফিজ-দীপ্ত’দের ব্যথিত আত্মার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যাবে না।

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button