সিনেমা হলের গলি

চোখের সামনে কেমন বদলে গেল কলকাতার সিনেমা!

হিন্দি ভাষা তখন আমরা বুঝি না। বিটিভিতে শুক্রবার বিকেলে যেসব সিনেমা দেখায়, সেগুলো কয়েকবার করে রিভিশন দেয়া হয়ে গেছে। ভিসিডির সেই যুগে বাড়ি ভর্তি থাকতো কলকাতার বাংলা সিনেমাতে। বড় বউ, মেজ বউ, সেজো বউ, ছোট বউ- এই বউ সিরিজ নিয়ে কত হাসিঠাট্টা হতো! আমাদের মায়েরা এসব সিনেমা দেখতেন, করার মতো কিছু না পেলে সঙ্গ দিতাম আমরাও। 

কলকাতার সিনেমার অনেক পুরনো দর্শক আমি। জিতের সাথী নামের সিনেমাটা বোধহয় আমার দেখা প্রথম সিনেমা। সেটাই ভালো লাগলো। তারপর সঙ্গী, সেটাও পছন্দ হলো। জিত তখন আমাদের প্রিয় নায়ক, শাহরুখ খানকে আমরা চিনি না, চিনি জিতকে! কিছুদিন পরে আরেক নায়ককে চিনলাম, তার নাম প্রসেনজিত। আমরা ভাবতাম এরা দুজনে ভাই, নইলে নামে এত মিল হবে কেন! প্রসেনজিত আমাদের পছন্দের কেউ ছিলেন না তখনও।

আমরা বড় হতে থাকলাম, কলকাতার সিনেমার সংখ্যাও বাড়তে থাকলো। সেই একই রোমান্টিক-অ্যাকশন ঘরাণার চিরপরিচিত সিনেমাগুলোই আলাদা আলাদা মোড়কে আসতে লাগলো। ভিন্নধর্মী কিছু সিনেমাও হচ্ছিল হুটহাট, গুরুগম্ভীর টাইপের- সেসব আমরা বুঝতাম না, দেখতামও না। এরমধ্যে অগ্নিশপথ নামের একটা সিনেমা দিয়ে দেবের এন্ট্রি ঘটে গেল ইন্ডাস্ট্রিতে। শ্যামলা কালোমতোন একটা ছেলে, ডায়লগ দেয় চিবিয়ে চিবিয়ে, সে’ও নায়ক হয়ে যায়! তবুও আমি কলকাতার সিনেমা দেখি। সঙ্গীত বাংলা নামের একটা চ্যানেলে সিনেমা রিলিজের আগে কত রকমের প্রচারণা চালানো হতো, না চাইলেও সিনেমা নিয়ে আগ্রহটা জেগে উঠতো। 

আরও পড়ুন- তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন!

এখন, এই ২০১৮ সালে এসে পেছনের দিকে ফিরে তাকালে অবাক লাগে। কয়েকটা বছরের ব্যবধানে টালিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রিটা কেমন বদলে গেল! সিনেমার ধরণটাই বদলে গেছে সেখানে। দেব-প্রসেনজিতেরা এখনও আছেন, অভিনয় করছেন, মেইনস্ট্রিম সিনেমা বলতে আমরা যেটাকে বুঝি, সেই ঘরানাটা শুধু খানিকটা বদলে গেছে সেখানে। সবকিছু বদলে গেছে, স্থান, কাল, পাত্র-পাত্রী সবকিছুই। একটা সময়ে বাংলাদেশের সিনেমা রিমেক হতো কলকাতায়। এখন সেখানকার সিনেমাগুলো দেখলে আফসোস হয়, খানিকটা বোধহয় ঈর্ষাও হয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এরকম সিনেমার সংখ্যা যে খুবই কম!

টালিউড, ভারতীয় বাংলা সিনেমা, দেব, প্রসেনজিত, সৃজিত মূখার্জী

কলকাতায় এখন বেলাশেষে হচ্ছে, প্রাক্তন আসছে, বাইশে শ্রাবণ তো পুরনো হয়ে গেছে, আবেদনটা কমেনি তবু। অনেক আগে ঋতুপর্ণ ঘোষ বদলে দেয়ার মিছিলে নেমেছিলেন, সৃজিত মূখার্জী বা অরিন্দম শীলেরা ঋতুর দেখানো পথটায় হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের ইন্ডাস্ট্রিকে। কৌশিক গাঙ্গুলী বা শিবপ্রসাদ-নন্দিতারা বানাচ্ছেন একটার পর একটা গল্পনির্ভর সিনেমা। যে গল্পে ধুন্ধুমার মারামারি নেই, ইটিশ-পিটিশ প্রেম নেই, যেটা আছে সেটা কঠোর বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার ফ্রেমের ওপরেই দক্ষ হাতে দুর্দান্ত সব সিনেমা বানিয়ে ফেলছেন ওরা।

একটা সময়ে প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনতেও বিরক্ত লাগতো। একঘেয়ে অভিনয়, একই টাইপের সিনেমা, বিরক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন ছিলেন এই মানুষটা। সেগুলো না করেও তখন উপায় ছিল না, ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি তখন ওয়ান ম্যান আর্মি, একাই টেনে নিচ্ছেন টালিগঞ্জের সিনেমাকে। উত্তম কুমার-সৌমিত্র‍্য চ্যাটার্জীর গড়ে দেয়া ইন্ডাস্ট্রিটাকে একটা সময়ে একা, একদম একা ধরে রেখেছেন প্রসেনজিত। প্রযোজকেরা বুম্বাদা’র ওপরে আস্থা রেখেছেন, তিনিও বাছাবাছি না করে কাজ করে গেছেন সমানে। মানের সঙ্গে আপোষ করেছেন, কারণ তিনি জানতেন, মান খুঁজতে গেলে সিনেমা হল থাকবে না, ইন্ডাস্ট্রির কঙ্কালটা বেরিয়ে যাবে।

সেই প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় এখন আমার সবচে প্রিয় অভিনেতাদের একজন! ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’ কিংবা ‘সব চরিত্র কাল্পনিকে’ই প্রমাণ দিয়েছিলেন, অভিনয়টা তিনি পারেন। তবে প্রসেনজিতের নবজন্মের কৃতিত্বটা অবশ্যই সৃজিত মূখার্জী নামের আনকোরা এক তরুণের। ইকোনমিক্স ছেড়ে ফিল্ম মেকিঙে নামা সৃজিতের সঙ্গে ‘অটোগ্রাফ’ থেকেই প্রসেনজিতের জুটিটা কিংবদন্তীতুল্য। সেটাকে অন্যরকম একটা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল ‘বাইশে শ্রাবণ’। তারপর ‘জাতিস্মর’! এই সিনেমাটার কথা মনে হলেও গায়ে কাঁটা দেয়। এরকম একটা সিনেমা কখনও আমরা বানাতে পারবো? আমাদের পরিচালকদের কেউ এই সাহসটা করবেন কোনদিন? আমি জানিনা। 

আরও পড়ুন- শুধু সিনেমা নয়, রজনীকান্ত বাস্তবেরও নায়ক!

কলকাতার ইন্ডাস্ট্রি খানিকটা ভাগ্যবান, একসঙ্গে খুব মেধাবী কয়েকজন ফিল্ম মেকার পেয়ে গেছে তারা। যারা কিনা অফবিট সিনেমাগুলোকেই মেইনস্ট্রিম বানিয়ে দিচ্ছে। তাদের সিনেমায় গল্প থাকছে, জীবন থাকছে, থাকছে দারুণ অভিনয়। সেগুলো আবার রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসাও করছে। আজ নন্দিতা-শিবু’র সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে তো দুই সপ্তাহ বাদে কৌশিকের সিনেমা আসছে। সেদিনই হয়তো আবার সৃজিত নিজের পরের সিনেমাটার ঘোষণা দিচ্ছে। আর তরুণ পরিচালকেরা তো আছেনই। গৌতম ঘোষ বা অপর্ণা সেনরাও হুটহাট সিনেমা বানাচ্ছেন। একটা সুস্থ প্রতিযোগীতা লেগে আছেই। আর সিনেমার গানে তো অনুপম রায় একাই বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছেন!

দারুণ একদল অভিনেতা আছে ওদের। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত বা আবির- এরা যেকোন চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যেতে সক্ষম। যীশু সেনগুপ্তের ক্যারিয়ারের এপিটাফ লেখা হয়ে গিয়েছিল একটা সময়ে, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেই তিনি বাকী জীবন কাটিয়ে দেবেন- এমনটা ভেবেছিল সবাই। সেই যীশু এখন সৃজিতের সিনেমার লীড আর্টিস্ট, ব্যোমকেশ হয়েও ফিরেছেন পর্দায়। সত্যজিত-শরদিন্দুদের উপন্যাস থেকে গোয়েন্দা গল্পের সিনেমা বানানো হচ্ছে অজস্র। ফেলুদারা ফিরছেন নতুন আঙ্গিকে, শবর-ব্যোমকেশরাও চালাচ্ছেন গোয়েন্দাগিরি। অরিন্দম শীল একাকাই তো ব্যোমকেশ-শবর দুটোই বানাচ্ছেন, যীশুকে ব্যোমকেশ বানিয়েছেন অঞ্জন দত্ত। সবগুলো কাজ ভালো হচ্ছে না হয়তো, কিন্ত দিনশেষে ভালো’র পরিমানটাই তো বেশী।

কলকাতার সিনেমা বলতেই একসময় বুঝতাম তামিল-তেলেগুর কপি। এখনও এই টাইপের ছবি হয় কলকাতায়, কিন্ত সেগুলো ব্যবসা করতে পারছে না সেভাবে। এজন্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা করে টিকে থাকতে হচ্ছে এই ধরনের সিনেমাগুলোকে। জিত এখনও সেসব করছেন, কিন্ত নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন দেব। কণ্ঠে জড়তা, অভিনয় রোবটিক- কতো না অভিযোগ ছিল দেব অধিকারীর বিরুদ্ধে। দেব এখনও নিঁখুত হয়ে যাননি, তিনি জানেন নিজের সীমাবদ্ধতার ব্যপারে। কিন্ত নিজেকে আর সিনেমাকে বদলে ফেলার একটা মিশনে নেমেছেন তিনি। সিনেমা প্রযোজনা করছেন, তাও সব গল্পপ্রধান সিনেমা, নায়ক যেখানে দ্বিতীয় মূখ্য বিষয়।

মৌলিক গল্প নিয়ে ‘চ্যাম্প’ করেছেন দেব, ‘ককপিট’ করলেন, ক’দিন আগে এলো ‘কবির’। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে সিনেমা বানাচ্ছেন আগে থেকেই, ‘চাঁদের পাহাড়’ আর ‘আমাজান অভিযান’ এসেছে। হয়তো খুব দারুণ কিছু হয়নি, প্রশংসা পাবার মতো কাজ হয়নি হয়তো, কিন্ত দেব ধন্যবাদটা ডিজার্ভ করেন, সাহস দেখানোর জন্যে। একদিন নিশ্চয়ই এই সিরিজের সিনেমাগুলো নিয়েও সমালোচকেরা প্রশংসা করবেন।

দেব জানেন, যে জায়গায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে আবার ‘পাগলু’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ওই ধরণের সিনেমায় তাকে আর দেখা যাবেও না। কিন্ত আমাদের শাকিব খান বা শীর্ষ নায়কেরা কি সেটা বোঝেন? তাহলে শিকারী বা সত্ত্বা’র পরে কেন ‘অহংকার’ বা ‘আমি নেতা হবো’র মতো সিনেমা আসে? শুভ কেন ঢাকা এটাক করার পরে ‘একটি সিনেমার গল্প’ করবেন? অনুরোধে ঢেঁকি গিললে নিজের পায়ে কুড়াল মারা ছাড়া যে আর কোন কাজ হয় না, সেটা আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কবে বুঝবেন?

এককালের হার্টথ্রব জুটি প্রসেনজিত-ঋতুপর্ণা এখনও পর্দা কাঁপাচ্ছেন। বয়সটা থেমে নেই, কিন্ত উপস্থাপনের ভঙ্গি ভিন্ন হলে পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সের দুটো মানুষের জুটিও দুর্দান্ত রসায়ন বের করতে পারে। কলকাতার পরিচালকেরা সেটা পারছেন। ঋতুপর্ণা ভালো অভিনেত্রী, তিনি তো ‘একটি সিনেমার গল্প’তেও কাজ করে গেলেন ক’দিন আগে। আলমগীর কি তাকে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন? কিংবা ধরুন জয়া আহসানের কথাই, তাকে কলকাতার পরিচালকেরা কি চমৎকারভাবে ব্যবহার করছে, আমরা সেটা পারছি কই? চুরাশি বছর বয়সের ‘বুড়ো’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখনও দাপিয়ে অভিনয় করছেন, বেলাশেষে, প্রাক্তন কিংবা ময়ূরাক্ষীতে। আমাদের সিনিয়র অভিনেতাদের কেউ এভাবে ব্যবহার করার কথা ভেবেছিল কখনও? নায়করাজ রাজ্জাককে তো আমরা ব্যবহারই করতে পারিনি একটা সময়ের পরে। বয়স হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার প্রবণতাটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখনও আছে, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। 

আরও পড়ুন- জয়া আহসান: একদিকে গর্ব, অন্যদিকে আক্ষেপ! 

একটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এক দিনে হুট করে বদলে যায় না। বদলানোটা একটা লম্বা প্রসেস। পেছনের মানুষগুলোর নিবেদন লাগে। পরিশ্রম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্ত তারচেয়ে বেশী প্রয়োজন মেধা, আর সবচেয়ে বেশী যেটা দরকারী, সেটা বোধহয় সিনেমা নিয়ে প্যাশনটা। আমাদের সিনেমাপাড়ার লোকজনের বেশীরভাগের মধ্যে এই প্যাশনটাই নেই। বদলে যাও বদলে দাও বলে শ্লোগান তুললেই হয় না, ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো কাউকে একাই এগিয়ে আসতে হয়। আজ ঋতুপর্ণ নেই। কিন্ত যে পরিবর্তনটা তার হাত ধরে খুব অল্প অল্প করে শুরু হয়েছিল, সেটাই পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে গ্রাস করে নিয়েছে, তার ভাবনাটা পুরো টালিগঞ্জে ছড়িয়ে গেছে। আর সেটাই তো বদলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার ধরণটাকেই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button