খেলা ও ধুলা

ব্যাটল অফ ব্রেইন: কোহলি বনাম উইলিয়ামসন

সেমিফাইনালে এটাই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ নয়। দুইজনই তখন টিনএজার। খেলছেন আন্ডারনাইটিন দলে। ২০০৮ সাল। সেই বছর অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ হলো নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের সেই দলে ছিলেন কেন উইলিয়ামসন৷ আর ভারতের দলটায় কোহলি। দুইজনই যে পরের অর্ধ-যুগে আন্তজার্তিক ক্রিকেটে নিজ নিজ দলের সেরা খেলোয়াড় হবেন তা কি সেই মুহুর্তে তারা জানতেন? তবে অসাধারণ ক্রিকেটীয় মেধার এই দুই খেলোয়াড় দশ বছর আগে নিজেদের আগমণবার্তা জানান দিয়ে দুইজনই যে তখনকার অনুর্ধ্ব ১৯ দলের ক্যাপ্টেন!

আচরণে দুইজন বেশ ভিন্ন। কোহলি মাঠে প্রতিটা মুহুর্তে শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবেই খেলেন তা তো নয়৷ দেখে মনে হয় তিনি টিভি সেটের সামনে বসা একজন পাঁড় ভারতীয় দর্শক, যিনি প্রতিটা বলে রিয়েকশন দেন, উল্লাসে ফেটে পড়েন, কখনো ক্রোধ দেখান, কখনো ফ্রাস্ট্রেশন। ইমোশনের জায়গাটাতে নিজেকে লুকাতে চান না তিনি। এইজন্যে অবশ্য অনেকের চক্ষুশূলও কোহলি। তাকে লোকে অহংকারী বলে, তার পতন কামনা করে। কোহলির অবশ্য পতন হয় না। কারণ, শুধু ইমোশন কিংবা মুখের লড়াই তার একমাত্র অস্ত্র নয় বরং তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার ব্যাট।

উইলিয়ামসন, ভিরাট কোহলি

অন্যদিকে কেন উইলিয়ামসন এমনিতে যে দেশের ক্রিকেটার, ক্রিকেটীয় বিচারেই সেই নিউজিল্যান্ড দলটাকে অন্যতম ভদ্র মানসিকতার দল বলে বিবেচনা করা হয়। দেশ হিসেবেও নিউজিল্যান্ড শান্ত, সভ্য লোকের দেশ বলেই ব্র‍্যান্ডেড হয়েছে। কেন উইলিয়ামসন তার জাতিগত কথিত চরিত্রকে ভালই এডপ্ট করেছেন। আচরণে তিনি কোহলির বিপরীত। স্বভাবে শান্ত, নির্ভার; সবসময়ই স্থিরতা তার মধ্যে বিরাজমান।

বর্তমানে সেরা তিনজন নাম্বার থ্রি ব্যাটসম্যানের তালিকায় ভিরাট, উইলিয়ামসন দুইজনই থাকবেন। তাদের ইনিংস বিল্ডআপ করার কৌশলে অবশ্য কিছুটা মিল আছে। দুইজনই প্রচুর সিঙ্গেলস খেলেন। যেকোনো দেশে, যেকোনো পিচে তারা মানিয়ে নিতে পারেন সহসাই। সব দিনে বড় শট খেলে রান বের করা যায় না৷ কিন্তু, সিঙ্গেলস সবসময়ই রানের চাকা সচল রাখে। এই দুইজন সেভাবেই নিজেদের দলকে সচল রাখেন, ব্যাটিং লাইনআপের ভিত্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয় গোটা ইনিংসের গল্প।

দুইজনের আরো একটা মিল আছে। তার খুব অল্প হলেও দলের প্রয়োজনে হাত ঘোরাতে পারেন। কোহলিকে অবশ্য এখন বোলিংয়ে দেখা যায় না তেমন, উইলিয়ামসন অবশ্য দরকার পড়লে বোলিং করেন। এই বিশ্বকাপে বোলিং করে উইকেটও পেয়েছেন। তবে, ২০০৮ সালে যখন তাদের অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে দেখা হয়েছিল, সেবার কিন্তু কোহলি বোলিং করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, সেই সেমিফাইনালে কেন উইলিয়ামসনের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটা আর কেউ নন, কোহলি নিয়েছিলেন।

এতবছর পর এখন তাদের আবারো দেখা আরেক সেমিফাইনালে, এবার মঞ্চটা সবচেয়ে বড়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। দল এখন তাদের কাছে বোলিং চায় না, সবচেয়ে বেশি চায় ব্যাটিং পারফর্মেন্স আর ক্ষুরধার ক্যাপ্টেন্সি। এই বিশ্বকাপে সেই দাবি দুইজনই বেশ ভাল ভাবে পূরণ করেছেন এখন পর্যন্ত। কোহলির ক্যাপ্টেন্সির একটা বড় সাপোর্ট আসে ধোনীর কাছ থেকে, তবুও এই বিশ্বকাপে তিনি ধোনীর ছায়া থেকে বের হয়েও নিজেও ক্রিয়েটিভ ফিল্ডসেট, দুর্দান্ত বোলিং চেঞ্জ দিয়ে নিজের ম্যাচুরিটি প্রমাণ করছেন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড দলটা বলতে গেলে এই বিশ্বকাপে উইলিয়ামসন ম্যাজিকে ভর করেই সেমিতে এসেছে।

এই দুইজন যখন সেমিতে মুখোমুখি তখন লড়াইটা যতটা ভারত বনাম নিউজিল্যান্ডের তার চেয়ে বেশি উইলিয়ামসন বনাম কোহলির। কারণ, এই দুইজনের ব্যাট এবং ব্রেইন ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখে ভীষণভাবে। সেটাই হয়েছে এই ম্যাচে। ম্যানচেস্টারের মাটিকে ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি পিচ বলা হচ্ছিল ম্যাচের আগে। কিন্তু, বুমরার আঘাতে যখন গাপটিল আউট হয়ে ফিরে গেলেন, নিউজিল্যান্ডকেও ফিরতে হলো দলের ভরসা উইলিয়ামসনের কাছেই।

কোহলি, উইলিয়ামসন

কিন্তু এদিন কোহলি উইলিয়ামসনের জন্য রান পাওয়াটা বেশ কঠিন করে তুলেছিলেন তার ক্যাপ্টেন্সি এবং ফিল্ড-সেটআপ দিয়ে। উইলিয়ামসনের রানের একটা বড় অংশ আসে থার্ডম্যান এরিয়া থেকে। কোহলি থার্ডম্যানকে রেখেও আরেকজন শর্ট থার্ডম্যান এনে দাঁড় করালেন। উইলিয়ামসনের সহজে রান বের করার রাস্তা বন্ধ হলো। এরপর, তিনি কিছু বল পরে নিজে এসে দাঁড়ালেন শর্ট পয়েন্টে। উইলিয়ামসন এই দিকটায় কাট করে বহুবার চার বের করেছেন এর আগে।

কোহলি সেই রাস্তা বন্ধ করতে পারতেন পয়েন্টে দাঁড়িয়েই কিন্তু শর্ট পয়েন্টে ব্যাটসম্যানের কাছাকাছি এসে মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেললেন। ফলে উইলিয়ামসন রানের চাকা সচল রাখার চিরচেনা ক্রিকেট খেলতে পারলেন না। সেই অবস্থা স্কোরকার্ডেও প্রতিফলিত হয়েছে। প্রথম ১০ ওভারে নিউজিল্যান্ড মাত্র ২৭ রান যোগ করতে পেরেছে, আর প্রথম ছয় সাত ওভার পর্যন্ত রান ডাবল ডিজিটও অতিক্রম করেনি। কোহলির ক্যাপ্টেন্সি উইলিয়ামসনকে বেশ ভালই ভুগিয়েছে এদিন।

২০০৮ সালের তাদের ছোটবেলার সেমিফাইনালের দিন বৃষ্টি বাগড়া দিয়েছিল। এবারও তা-ই হলো। রিজার্ভ ডেতে খেলা গড়ালো। ভারতের সামনে লক্ষ্য ২৪০ রান। খুব কি বেশি? কিন্তু এই রান তাড়া করাটা যে এত কঠিন হয়ে উঠবে কে ভেবেছিল? ম্যাট হেনরির দুর্দান্ত এক বলে রোহিত বিভ্রান্ত হয়ে কট বিহাইন্ড হলেন। টুর্নামেন্টের ৫ সেঞ্চুরি করা রোহিতকে দোষ দেয়া যায় না৷ ম্যাট হেনরি নিজের সেরা বলটাই করেছেন, তার পুরষ্কার পেয়েছেন।

কিন্তু, মজাটা হলো কোহলি নামার পর৷ ট্রেন্ট বোল্ট বোলিংয়ে। উইলিয়ামসন যেন আগের দিন তার সাথে দেখানো ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার প্রতিশোধ নিলেন। কোহলির জন্য যে অসাধারণ লোভনীয় সেটআপ ঠিক করলেন, তাতে এরকম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রান চেজিংয়ের মাস্টারও ফাঁদে পড়লেন। কিভাবে? উইলিয়ামসন এটাক শুরু করেছিলেন তিনজন স্লিপ দাঁড় করিয়ে৷ কিন্তু, কোহলির বেলায় তিনি আরো আক্রমণাত্মক। ত্রিশ গজের বাইরে দাঁড়ানো থার্ডম্যানকে নিয়ে আসলেন বৃত্তের ভেতর৷ অফসাইডে ত্রিশ গজের বাইরে আর কেউ নেই। লেগ সাইডে স্কয়ার লেগে একজনকে রাখলেন, কোহলি ফ্লিকটা ভাল খেলেন এই চিন্তা করে। স্কয়ার লেগের সাথেই শর্ট মিড উইকেটের দিকে আরেকজন ফিল্ডার রাখলেন।

অফসাইডে মিড অফ, পয়েন্ট এর মাঝামাঝি কাভার এরিয়ায় বড় গ্যাপ। লেগ সাইডে মিড অন আর শর্ট মিড উইকেটের মাঝামাঝিও একটা বড় গ্যাপ। পরিষ্কার যে কোহলিকে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, রান বের করতে হলে কাভার না হয় লেগসাইডের গ্যাপটায় খেলো। কিন্তু, এই প্রলোভনের ফলাফল কি হতে পারে? কাভারে ড্রাইভ করতে গেলে এজড হয়ে স্লিপে ক্যাচ উঠে যেতে পারে, কিংবা লেগে খেলতে গেলে এলবিডব্লিউ হবারও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সেটাই হয়েছে। বোল্টের প্রথম দুইটা ডেলিভারি অফ স্ট্যাম্পের বাইরে, কোহলি কাভার খেলতে গেলেন। হলো না শট, বল উইকেটকিপারের কাছে। কোহলি বুঝলেন হয়ত এটা ট্র‍্যাপ। তাই স্ট্যান্স থেকে একটু অফের দিকে সরে এসে বল ফ্লিক করতে চাইলেন লেগের দিকে। এই শটটা এত ভাল খেলেন তিনি যে, নিজের উপর বাড়তি আত্মবিশ্বাস কাজ করে তার। বোল্ট দুইটা বল করলেন স্ট্যাম্প বরাবর লাইনে। একটু শর্ট লেংথের বলটা কোহলি লেগের দিকে খেলতে গেলেন, রান পেলেন না। পরের বলটাও একই লাইনে কিন্তু এবার বোল্ট পিচ আপ করালেন। লেগ সাইডের ভিরাট গ্যাপে কোহলি ফ্লিক করে বাউন্ডারি বের করবেন এই আশায় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সামনের পা আগে দিয়ে ফ্লিক করতে চাইলেন। কিন্তু বল লাগলো প্যাডে। জোরালো আবেদন এবং আম্পায়ার হাত উঠিয়ে জানিয়ে দিলেন, আউট!

এই উইকেটের যতটা কৃতিত্ব বোল্টের পরিকল্পনামাফিক বোলিংয়ের, ততটাই কৃতিত্ব পাবেন উইলিয়ামসনও। কোহলির মতো একজন ক্রিকেটারকে এভাবে ফাঁদে পেলে এরকম সূক্ষ্ম পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে তাকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠানো ম্যাচের গল্প ঘুরিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি। গতকাল ভিরাট কোহলির ক্যাপ্টেন্সি এবং বোলারদের চাপে প্রথম দশওভারে নিউজিল্যান্ডের যেই অবস্থা হয়েছিল, আজ একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটালেন উইলিয়ামসন এবং তার দুই বোলার।

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button