খেলা ও ধুলা

কোহলি বনাম পেইন, একজন আন্ডাররেটেড লায়ন ও রোমাঞ্চের প্রদর্শনী!

অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়ার দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচটায় এত কিছু ঘটে গেছে, সবকিছু একসাথে উল্লেখ করা প্রায় অসম্ভব। তবুও খুঁটিনাটি অনেক কিছু মনে পড়ছে।

প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার মেন্টালিটি খুব হাইক্লাস ছিল। প্রথম ম্যাচ হারার পরে ওরা চাইলে ফিন্সকে বাদ দেওয়া বা লোয়ার অর্ডারে নামিয়ে দিতে পারতো। দেয়নি। ইনফ্যাক্ট টিমে কোন চেঞ্জও আনেনি। একটা প্রসেস তারা শুরু করছিল সিরিজের আগে, তাতেই আস্থা রাখছে। আউটফিল্ডের মতন সবুজ পিচে, ইন্ডিয়ার ভাল পেস এটাকের সামনে প্রথম দিনের ওপেনিং ১১২ রানের জুটিই এই ম্যাচের নির্ধারক। ফিন্স, হ্যারিস প্রথম সেশন বিট হয়েছে অনেকবার, কিন্তু উইকেট থ্রো করে আসেনি। এই পিচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নেয়ার সিদ্ধান্তটাও ছিল সাহসী। ইন্ডিয়া ভুল করেছে স্পিনার ছাড়া খেলতে নেমে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে প্রথম দিন পিচ যেমনই দেখাক, স্পিনার লাগবেই। শুধু এসব জায়গায়ই না, পৃথিবীর সব প্রান্তেই টেস্ট ম্যাচের জন্যে স্পিনার রাখা উচিত। তারা উইকেট না নিক, পেসারদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ অন্তত করে দেয়।

বিরাট কোহলির ইনিংসটা খুব স্পেশাল ছিল ফার্স্ট ইনিংসে। অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। সেঞ্চুরি করে উদযাপনও করলো কোহলীয় স্টাইলে। পিচের বাউন্স, মাঝেমধ্যে পাওয়া টার্ন, আর ওর বলের উপরে নিয়ন্ত্রণ- সব কিছু মিলিয়ে পেসারদের উইকেটেও লায়ন নিলো ৫ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার সেকেন্ড ইনিংসেও ইন্ডিয়ান পেসাররা ভাল বোলিং করে গেল। ৩য় দিন বিকেলে বুমরা যে বোলিং করলো, ওর দুর্ভাগ্য যে সে ৫/৬টা উইকেট পায়নি ওই এক এক স্পেলেই! ব্যাটিং করা তখন আরো কঠিন হয়ে গেছে। পরদিন সকালেই দেখি পিচ নরমাল আচরণ করছে! কমেন্ট্রি শুনে যা বুঝলাম তাতে নিউজিল্যান্ডের সাথে আমাদের এক টেস্ট ম্যাচ মনে পড়ে গেল। আগেরদিন জয়ের স্বপ্নে বিভোর থাকার পরের দিনই দেখি পিচে আর স্পিন হয় না, ভেট্টোরি ম্যাচ বের করে নিয়ে গেল চোখের সামনে। রহস্য জানা গেল, ওরা সকালে প্রচুর রোল করেছে পিচে, পিচ তাতে কিছুটা জমাট বেঁধে যাওয়ায় ব্যাটিং করতে সুবিধে হয়েছে।

পেইন, খাজা রান কম তুলেও নির্বিঘ্নে সেশনটা পার করলো। কোহলি আগের বিকেলেই পেইনকে পেইন দিচ্ছিল, ‘খোঁচা দিচ্ছো ক্যান, তুমি আউট হইলেই কিন্তু সিরিজটা ২-০ হয়ে যাবে’। এতদিন মোটামুটি শান্তশিষ্ট বলে পরিচিত পেইনও জবাব দিল, ‘You have to bat first to do that, bighead.’ যদিও প্রায় কেউই বিশ্বাস করলো না শব্দটা বিগহেড ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এটা প্রচলিত শব্দ নয়, ‘D’ দিয়ে শুরু যে শব্দটা প্রচলিত সেটা শিশুসাহিত্যের সাথে যায় না। লিড নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে দেখে কোহলি স্লিপ থেকে মিডঅনে আসছে, পেইনের সাথে ‘গল্পটল্প’ করতে। আমি সেরা, তুমি জাস্ট স্ট্যান্ডিং ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে তুমি মেজাজ হারাচ্ছ কেন কোহলি, কোথায় গেল তোমার সেই কুলনেস ইত্যাদি অনেক কথাই বিনিময় হলো বলে বাতাসে গুজব। আম্পায়ার বেরসিকের মতন ‘You guys are the captains, play the game’ বলে দুইজনকে থামিয়ে দিল। কোহলি পেইনকে বডি কলিশনে প্রলুব্ধ করতে যাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে এক জায়গায়, এটাই শুধু ভাল লাগেনি। এছাড়া বেশ উপভোগ্য ছিল ব্যাপারটা।

দুপুরের রোদ, আর এক সেশন খেলার পর, লাঞ্চের পরে পিচ ‘পরিচিত’ রূপে দেখা দিল। শামির স্পেলটা ছিল ‘হিট দ্যা ডেক এন্ড বাউন্স’ এর দারুণ এক দৃষ্টান্ত। খুবই এনজয়েবল ছিল। অসিদের মাটিতে বাইরের এক পেসারের এত আগ্রাসী বোলিং অনেকদিন পর দেখছি। স্লিপে পেইনের ক্যাচ নিয়ে অদ্ভুত কিছু সাউন্ড করলো কোহলি। কথা অবশ্য বিনিময় হলো না এবার। শেষ উইকেটে স্টার্ক, হ্যাজলউড করলো মহামূল্যবান এক জুটি।

ইন্ডিয়ার সামনে প্রায় ৩০০ রানের লক্ষ্য। ক্লার্ক বলেই দিল কোহলি যদি এই ইনিংসে সেঞ্চুরি করতে পারে, তা হবে টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ইনিংস। এই বছরে দেশের বাইরে ইন্ডিয়া ১৮৫+ চেজ করতে পারে নাই, টেস্টে চেজে কোহলির রেকর্ডও সীমিত ওভারসুলভ না। কোহলির জন্যে মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। পারলো না। লায়নের বলে স্লিপে আউট হয়ে গেল। লায়নকে দারুণ উচ্ছ্বসিত মনে হইলো, তা হওয়ারই কথা ওয়ার্ল্ড নাম্বার ওয়ান ব্যাটসন্যানকে আউট করে। পন্টিং এর কাছে জানা গেল, লায়ন নিজেই বলছিল, প্রথম ইনিংসে সে কোহলিকে বেশি স্ট্রেইট বোলিং করে ফেলছে। এই ইনিংসে সে চেষ্টা করবে তাকে বাইরে বা একটু সামনে টেনে আনার, আর ব্যাটে আউটসাইড এজ খোজার! কোহলিকেও প্ল্যান করে আউট করা যায়! হ্যাটস অফ টু লায়ন। সময়ের সবচে আন্ডাররেটেড স্পিনার। দিন দিন উন্নতি করেই যাচ্ছে। বলে ড্রিফট করায় এত সুন্দর!

কোহলির ডিসমিসালের সময়ও পেইন কিছু বলে নাই, বললো পরে, মুরালি বিজয়কে, ‘I know he is your captain, but you can’t seriously like him as a bloke?’ বিজয় এগ্রি, ডিজএগ্রি কিছুই করলোনা। মৌনতা তো সবসময়ই সম্মতির লক্ষণ না।

শেষের দিকে ইন্ডিয়ান টেইলকে করা স্টার্কের এক/দুই ওভার দেখে লিটারেলি মায়া লাগছে। উমেশ যাদবের কাধে লাগার পরে ও জাস্ট স্ট্যাম্প ছেড়ে পিচ থেকে বের হয়ে ফেস করছে স্টার্ককে। স্টার্ক তাও তাকে ফলো করে গেছে। বলে পেস ১৫০.৯ ও উঠলো। ইশান্ত, বুমরা ‘রিস্ক’ নেয় নাই স্টার্ককে ফেস করার। পরের ওভারে এক রকম জোর করেই একইরকম ওয়েতে কামিন্সকে উইকেট থ্রো করে দিয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়া শক্তিমত্তায় ইন্ডিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে, আগে কখনো হারেনি ইন্ডিয়ার সাথে নিজেদের মাটিতে। দুই মেইন ব্যাটসম্যানকে ছাড়া ওরা অহম রক্ষার যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। অসি লিজেন্ডরাও নানাভাবে ব্যাক করে যাচ্ছে মাঠের ১১ জনকে। ইন্ডিয়ান লিজেন্ডরাও তাই। ইন্ডিয়ার জন্যে এবারই সেরা সুযোগ সিরিজ জিতে আসার। তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও জেতার তাড়নাটা স্পষ্ট।

পরের টেস্ট ব্যাটিং প্যারাডাইস মেলবোর্নে। ৯০/৯৫ হাজার দর্শক আসবে মাঠে। মুখে, কথায়, কাজে যেভাবে জমে গেছে এই টেস্ট সিরিজ, তাতে বক্সিং ডে টেস্ট যে আরো অনেক রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হবে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। ব্যাটে, বলের সমান লড়াইয়ে চলুক এমন ক্রিকেট।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button