খেলা ও ধুলা

আসুন, কোহলিকে আরও বেশি করে গালি দেই

বঙ্গদেশে ক’দিন আগেও যদি ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মধ্যে কার হেটার সবচেয়ে বেশি’- টাইপের কোন জরিপ চালানো হতো, সেখানে অবিসংবাদিতভাবে বিরাট কোহলির নামটাই উঠে আসতো। এখন সেই জায়গা আফগানিস্তানের রশিদ খান দখল করেছেন। কোহলিকে পছন্দ না করার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে বাঙালির, এক হচ্ছে তিনি ভারতীয়, দ্বিতীয়ত তিনি নিজের কাজটা খুব ভালো পারেন, তৃতীয়ত, ব্যাট হাতে দারুণ পারফর্ম করে তিনি অন্য দলের সমর্থকের পশ্চাৎদেশে আগুন ধরিয়ে দেন হররোজ। কাজেই কোহলিকে ঘৃণা করা জায়েজ। অ্যারোগেন্ট শব্দের মানে তো আমরা জানি না, আমাদের চোখে কোহলি মানেই বেয়াদপ!

তো সেই বেয়াদপ ক্রিকেটার কোহলি গতকাল কি করেছে জানেন? উন্মত্ত ভারতীয় সমর্থকদের রোষের হাত থেকে রক্ষা করেছেন স্টিভেন স্মিথকে। ওভালে গতকাল মুখোমুখি হয়েছিল ভারত-অস্ট্রেলিয়া। ভারতের ব্যাটিঙের সময় সীমানাদড়ির কাছেই ফিল্ডিং করছিলেন স্মিথ। গ্যালারিভর্তি ভারতীয় সমর্থকেরা তখন তার উদ্দেশ্যে একের পর এক গালাগাল ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। প্রতারক, চোর, এমন আরও নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হচ্ছিল স্মিথকে।

গতবছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে বল টেম্পারিঙের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ব্যানক্রাফট। স্মিথ তখন অধিনায়ক। অনুজকে বাঁচাতে তিনি নিজে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন, বলেছিলেন, অধিনায়ক হিসেবে সবটুকু দায় কাঁধে নিচ্ছেন তিনি। সহ অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারও একই কথা বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড দুজনকেই নিষিদ্ধ করেছিল একবছরের জন্যে। সেই ঘটনার রেশটাই গতকাল ওভালে টেনে এনেছিল ভারতীয় দর্শকেরা।

কোহলি তখন ব্যাটিং করছেন, এই ঘটনা তার কান এড়িয়ে যায়নি। একটা ওভার শেষ হতেই উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এলেন তিনি, গ্যালারির দিকে এগিয়ে গিয়ে ইঙ্গিত করলেন, এসব কি হচ্ছে? হাত দিয়েই বুঝিয়ে দিলেন, অন্যদের দুয়ো দেয়ার কোন দরকার নেই, আমাদের জন্যে তালি বাজাও। স্মিথ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখলেন পুরো ব্যাপারটা, তিনি এসে কোহলির পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেলেন হাসিমুখে।

সংবাদ সম্মেলনেও কোহলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই ঘটনা নিয়ে। কোহলি অকপট জবাব দিয়েছেন- ‘স্মিথ যেটা করেছে, সেটা আমার দৃষ্টিতে অপরাধ ছিল না, দলের জন্যেই সে নিজের কাঁধে সবটা দায় নিয়েছিল। ওর মতো একজন খেলোয়াড়কে দুয়ো দেয়াটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। একজন ভারতীয় হিসেবে দর্শকদের পক্ষ থেকে আমি ওর কাছে ক্ষমা চেয়েছি।’

বছরখানেক আগেও ক্রিকেটবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ছিল, কোহলি না স্মিথ, কে সেরা? নিষেধাজ্ঞা পাবার আগে ডন ব্র‍্যাডম্যান পরবর্তী যুগে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি রেটিং পয়েন্ট নিয়ে টেস্ট ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এক নম্বরে ছিলেন স্মিথ। আর কোহলি তো তিন ভার্সনেই নিজের জাত চিনিয়ে চলেছেন বছরের পর বছর ধরে। অলিখিত একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুজনের মধ্যে চলে আসছে অনেক আগে থেকেই। সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর পাশে দাঁড়ানোর জন্যে বিশাল একটা মনের দরকার হয়, কোহলি প্রমাণ করে দিয়েছেন, মনের সেই বিশালতা তার আছে।

কোহলি বলছিলেন, “অনেক বছর ধরেই আমরা প্রতিপক্ষ, হয়তো মাঠে বেশ কয়েকবার আমাদের টক্করও লেগেছে। কিন্ত এভাবে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসার পরেও যদি স্মিথের মতো ব্যাটসম্যানকে গ্যালারি থেকে গালাগালি করা হয়, সেটা খুব দুঃখজনক। গালি খাওয়ার মতো কোন অপরাধ সে করেনি। আজ ওর জায়গায় যদি আমি থাকতাম, এভাবে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসতাম, আমিও এমনটা মেনে নিতে পারতাম না। ও(স্মিথ) ফিরে এসেছে, দলের হয়ে ভালো খেলছে, এভাবে ওকে অপমান করার কোন মানে হয় না। একজন ভারতীয় হিসেবে আমি শুধু চেয়েছি, এখানে যেন বাজে কোন উদাহরণ তৈরি না হয়।”

এটাই স্পোর্টসম্যানশিপ, এটাই একজন খেলোয়াড়ের দায়িত্ব, প্রতিপক্ষের সাথে অন্যায় আচরণ করা হলে তার পাশে দাঁড়ানো, যেটা গতকাল কোহলি করেছেন। বিরাট কোহলিকে সময়ে সময়ে নানাবিধ গালাগালিতে ভূষিত করা, কুলি, কুলাঙ্গার বলে ডাকা বীরপুঙ্গবের দল এখন কি বলবেন, এটা জানতে খুব ইচ্ছে করছে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button