খেলা ও ধুলা

কোথায় গিয়ে থামবেন কোহলি?

এ আর নতুন কি বলুন! তিনি ব্যাট হাতে মাঠে নামবেন, উইকেটে দাঁড়াবেন, বোলারদের তুলোধোনা করে গণ্ডায় গণ্ডায় রান করবেন, সেঞ্চুরি হাঁকাবেন… এই তো! মঞ্চ আলাদা, গল্পটা অভিন্ন। বিরাট কোহলির কথা বলছিলাম। ব্যাটিংটা যার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে সহজ কাজ, সেঞ্চুরী হাঁকানোটাকে যিনি ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলছেন ধীরে ধীরে। ছেলেখেলা নয়তো কি? চৌদ্দ দিন বাদে ত্রিশের ঘরে পা দেবে বয়স, এখনই কিনা ঝুলিতে ষাটটা সেঞ্চুরী তার! এরমধ্যে সবশেষটা হাঁকালেন গতকাল, ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ওয়ানডেতে এটা তার ছত্রিশতম শতক।

ক্রিকেটের রেকর্ডবুক জানাচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোহলির চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আছেন মাত্র চারজনের, তাদের কেউই এখন আর ক্রিকেট খেলেন না। বর্তমানে খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে কোহলির ধারেকাছে আছেন কেবল হাশিম আমলা। তার বয়স পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে ছত্রিশে পড়বে ক’মাস বাদে। বড়জোর বছর দুই-তিনেক হয়তো আমলাকে দেখা যাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলে বিদায় বলে দিতেও পারেন তিনি। কাজেই, বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে কেউ কোহলির ধারেকাছে থাকছেন না সেঞ্চুরীর সংখ্যার দিক থেকে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। 

যাকে দেখে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন, সেই শচীন টেন্ডুলকারের একশো সেঞ্চুরীর রেকর্ড থরথর করে কাঁপছে এখনই। ফর্মের তুঙ্গে থাকা বিরাট কোহলির জন্যে তিন ভার্সন মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে চল্লিশটা সেঞ্চুরী করাটা তো মোটামুটি ডালভাত টাইপের ব্যাপারই বলা চলে! সময়ের বিচারে তো পূর্বসূরীর চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে আছেন তিনি। ক্যারিয়ারের ষাটতম সেঞ্চুরী করতে গিয়ে টেন্ডুলকারকে খেলতে হয়েছিল ৪২৭ ইনিংস, পন্টিং খেলেছিলেন ৪৮৯ ইনিংস। জ্যাক ক্যালিসকে ব্যাট হাতে নামতে হয়েছিল ৫৮২ বার। আর কোহলি তার ৩৮৬তম ইনিংসেই পেয়ে গেলেন ষাট নম্বর সেঞ্চুরীর দেখা! উল্কার বেগে ছুটছেন তিনি, এমনটা বললে ভুল হবে না বোধহয়।

নাম তার বিরাট, কীর্তিগুলো বিরাট না হয়ে পারে? মাঠে তিনি দারুণ আগ্রাসী, প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে চান সেই আগ্রসন দিয়ে। কিন্ত ব্যাট হাতে তার রুদ্রমূর্তি হার মানায় সবকিছুকেই। রান তাড়ায় তিনি অনন্য, প্রতিপক্ষের রান চেজ করার বেলায় ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশী সেঞ্চুরীর রেকর্ডটা তার নামের পাশে, মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সেই। গতকালের সেঞ্চুরীটা ছিল রান তাড়া করতে নেমে কোহলির বাইশ নম্বর শতক। ক্রিকেট ইতিহাসেই রান চেজ করতে নেমে এত সেঞ্চুরী আর কারো নেই, ভাবা যায়?

এই উনত্রিশেই তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে পঁয়ত্রিশটা সেঞ্চুরী, প্রায় দশ হাজার রান(৯৯১৯), ইনিংসপ্রতি উনষাট গড়ে এই রান তিনি করেছেন মাত্র ২০৪ ইনিংসে! প্রতিপক্ষের জন্যে কোহলি মানেই মূর্তিমান আতঙ্ক, পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচে স্কোরবোর্ডে সাড়ে তিনশো রান জমিয়েও বিপক্ষ দলের অধিনায়ক স্বস্তিতে থাকতে পারেন না, বিরাট কোহলীর জন্যে এই রান টপকে যাওয়াটা তো বিরাট কিছু নয়! গতকাল যেমন ৩২২ রান করেও আট ওভার আগেই ম্যাচটা হেরে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রতিপক্ষ দলে বিরাট কোহলির মতো একজন থাকলে সাড়ে তিনশো রানের টার্গেট দিয়েও তো নিশ্চিন্তে থাকার কোন উপায় নেই! 

ডেডিকেশন, বিরাট কোহলি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নাসির হোসেন

ভারতকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে মহেন্দ্র সিং ধোনির উত্তরসূরী হিসেবে কোহলিকে প্রস্তুত করা হচ্ছিল বেশ কয়েক বছর ধরেই। কিন্ত সত্যি কথা বলতে, কোহলি অধিনায়ক হিসেবে কতটা ইফেক্টিভ হবেন, সেটা নিয়ে সংশয় ছিল বোর্ডের ভেতরেই। ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড কোহলি নয়, রোহিতকে দাও- এরকম ভাবনাও কাজ করেছিল কারো কারো মধ্যে। কারণ অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি তখনও। আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে আহামরি কিছু করেননি কোহলি। তার ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে সংশয় না থাকতে পারে, নেতৃত্বগুণ নিয়ে সংশয় অবশ্যই ছিল।

পরের গল্পটা সবার জানা। শুরুতে টেস্ট, পরে ওয়ানডে আর টি-২০; ভারতের তিন ভার্সনের অধিনায়কত্বই পেয়েছেন তিনি। তার অধীনে টেস্ট র‍্যাঙ্কিঙের শীর্ষস্থান দখল করেছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে তাদের মাটিতে উড়িয়ে দিয়েছে, দেশের মাটিতে তো ভারত এখন অপ্রতিরোধ্য এক শক্তি, প্রতিপক্ষের জন্যে ভারতের মাটি আগেও দুর্বোধ্য ছিল, আর এখন তো বধ্যভূমি! দল সাফল্য পাচ্ছে, তারচেয়ে বড় কথা, পুরো দলকে এক সুতোয় গাঁথার কাজটা দারুণভাবে করছেন কোহলি, যেমনটা মহেন্দ্র সিং ধোনি করেছিলেন তার সময়ে। 

হার্দিক পাণ্ডিয়া থেকে শুরু করে দলে তার চেয়ে সিনিয়র রোহিত শর্মা, সবাই কোহলি বলতে অজ্ঞান। মিডিয়ার কত গসিপ, অথচ ধোনি ঠিকই ওয়ানডে খেলে চলেছেন কোহলির অধিনায়িকত্বে। ধোনির পারফরম্যান্স একটু খারাপ হলেই যখন মিডিয়া তাকে শূলে চড়ানোর চেষ্টা করছে, কোহলি তখন আগলে রাখছেন অগ্রজকে! কোহলি তো আজকের কোহলি হয়েছেন ধোনির ছায়াতলে থেকেই, অনেককিছুই শিখেছেন তিনি এই মানুষটার কাছে। সেই ঋণটা তিনি শোধ করতে চান, যতোটুকু সম্ভব।

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অধিনায়কত্বের চাপটা কোহলির ভেতর থেকে সেরা পারফরম্যান্সটাকে বের করে আনছে। ক্যাপ্টেন হবার পরে কোহলি এখন রানের জন্যে আরও বেশি ক্ষুধার্ত, জয়ের জন্যে অনেক বেশি মরিয়া। তারুণ্যের সেই আক্রমণাত্নক ঝাঁঝ এখন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, কোহলির অ্যাগ্রেশনটা এখন ব্যাটের মাঝখানটায় ফুটে ওঠে, জিভের ডগায় নয়। আগে কোহলির মুখ আর ব্যাট দুটোই সমানে চলতো, মোটামুটি ফিফটি-ফিফটি একটা অবস্থা ছিল। কোহলি এখন মুখের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন, ঝাঁঝ আর তেজ পুরোটাই ঢেলে দিচ্ছেন ব্যাট দিয়ে। তাতে পুড়ছে প্রতিপক্ষ, জ্বলছে তাবৎ বোলারেরা।

একটাই কমতি ছিল তার ক্যারিয়ারে। ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে নিজেকে প্রমাণ করা। নিন্দুকেরা এত বছর ধরে এই একটা অস্ত্র নিয়েই তোপ দাগাতেন, বলতেন, ইংল্যান্ডের মাটিতে তো কোহলির রান নেই! সেই কোহলি এবছর ইংল্যান্ড গেলেন দল নিয়ে। টেস্ট সিরিজ জেতা হলো না অবশ্য, তাতে কি? ৬৮ গড়ে চার ম্যাচের সিরিজে সর্বোচ্চ রান তার, ৫৪৪। দুই দলের অন্য কেউ তার অর্ধেক রানও করতে পারেননি সিরিজে! দুটো সেঞ্চুরী আর তিনটা হাফ-সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করেছেন তিনি। কোহলিকে কিছু বলতে হয়নি, তার ব্যাট, তার পারফরম্যান্সই কথা বলেছে তার হয়ে, সপাটে চড় কষিয়েছে সংশয়বাদীদের গালে। 

বিরাট কোহলি, অমরত্ব

তবুও পরিসংখ্যান সবকিছু নয়। এই যে এত এত রান, সেঞ্চুরী, অভিজাত গড়, এসবকিছুও আসলে শেষ কথা নয়। সৌরভ গাঙ্গুলি একবার বলেছিলেন “কোহলিকে কখনও পরিসংখ্যান দিয়ে মাপতে যাবেন না। সে কত রান করলো, ক’টা সেঞ্চুরি হাঁকালো, তার গড় কত, এসব দিয়ে তাকে বিচার করতে পারবেন না। ওকে জাজ করা হবে ওর অবসরের পরে, ভারতীয় ক্রিকেটটাকে ও কোথায় নিয়ে যেতে পারলো সেটা দেখে…”

আসলেও তাই। বিরাটের বিরাটত্ব মাপার জন্যে তো শুধু পরিসংখ্যানের পাতাগুলো যথেষ্ট নয়। কপিল দেবের হাত ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে একটা পালাবদল ঘটেছিল। টেন্ডুলকার এসে বদলে দিয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের স্ট্যান্ডার্ডটাকে। ধোনি বদলে দিয়েছিলেন মানসিকতা, সবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন অসম্ভবকে জয় করার সাহস। সেই লিগ্যাসিটাকে কোহলি কোথায় নিয়ে যান, সেটাই ঠিক করে দেবে তার অবস্থানটাকে। কোহলি কি অসাধারণ একজন ক্রিকেটার হয়ে থাকবেন? নাকি নিজের নামটা খোদাই করে যাবেন অমরত্বের আসনে? অবস্থাদৃষ্টে কিন্ত মনে হচ্ছে, কোহলি হাঁটছেন অমরত্বের পথেই!

আরও পড়ুন- 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button