খেলা ও ধুলা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোহলির সোনায় মোড়ানো দশ বছর!

২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। ডাম্বুলায় শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় বিরাট কোহলির, মাত্র ১৯ বছর বয়সে। গৌতম গম্ভীরের সাথে ভারতীয় ইনিংস ওপেন করেছিলেন তিনি। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ২২ বল খেলে মাত্র ১২ রান করেই আউট হয়ে গিয়েছিলেন। একই অবস্থা হয়েছিল গোটা ভারতীয় দলেরই। ১৪৬ রানেই গুটিয়ে গিয়েছিল তাদের ইনিংস। এই সামান্য রান তাড়া করে ম্যাচ জিতে নিতে শ্রীলংকাকে খরচ করতে হয়েছিল মাত্র দুইটি উইকেট। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার শুরুটা মোটেই স্মরণীয় ছিল না।

কিন্তু এরপর একে একে পেরিয়ে গেছে দশটি বছর। এবং নেহাতই সাদামাটাভাবে শুরু করা কোহলির জন্যই পরের দশটি বছর ছিল যেন একেবারে স্বপ্নের মত। অন্য আরও অনেকের মত তার ক্যারিয়ারেও দুঃসময় এসেছে ঠিকই। সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয়েছে তাকেও। কিন্তু দাঁড়িপাল্লার একদিকে সাফল্য আর অন্যদিকে ব্যর্থতাকে চাপানো হলে, সাফল্যের পাল্লা ভূমির খুব কাছাকাছিই অবস্থান করবে। 

নিঃসন্দেহে পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে কোহলি গত এক দশকে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। বাকি দুই ফরম্যাটে তার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, একদিনের ক্রিকেটে তার সমকক্ষ যে আর কেউই নেই এ কথা মানতে বাধ্য হবে তার সবচেয়ে বড় সমালোচকও। ইতিমধ্যেই নামের পাশে ৩৫টি ওয়ানডে শতক লিখিয়ে ফেলেছেন ২৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। তার সামনে এখন রয়েছেন আর কেবল একজন- শচীন টেন্ডুলকার (৪৯)।

বিরাট কোহলি, শচীন টেন্ডুলকার, ভারত ক্রিকেট দল, কোহলির রেকর্ড

তবে একদিক থেকে কোহলি ছাড়িয়ে গেছেন শচীনকেও! রান তাড়া করতে নেমে সবচেয়ে বেশি শতকের দেখা পাওয়া ব্যাটসম্যান যে তিনিই। ২৩২ বার রান তাড়া করতে নেমে ১৭টি শতক হাঁকিয়েছিলেন শচীন, এবং সেই রেকর্ড তিনি অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন বছরের পর বছর। কিন্তু তা ভেঙে দিতে খুব বেশি সময় নেননি কোহলি। মাত্র ১০২টি ইনিংস লেগেছে তার শচীনকে টপকে যেতে। এবং এই মুহূর্তে তিনি রান তাড়া করতে নেমে ১৯টি শতকের মালিক।

২১১টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ৫৮.২০ গড়ে কোহলির সংগ্রহ ৯,৭৭৯ রান। স্ট্রাইক রেটও রীতিমত ঈর্ষণীয়- ৯২.১২! অন্য দুই ফরম্যাটেও তার রেকর্ড সমান প্রশংসার দাবিদার। ৬৮ টেস্টে ৫৩.৬৪ গড়ে তার সংগ্রহ ৫,৭৯৪ রান (ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের আগ পর্যন্ত)। অপরদিকে ৬২টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে ১৩৬.২২ স্ট্রাইক রেট ও ৪৮.৮৮ গড় নিয়ে তার সংগ্রহ ২,১০২ রান। কিছু সময়ের জন্য তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই তার গড় ছিল পঞ্চাশোর্ধ্ব, যে রেকর্ডে এখন পর্যন্ত ভাগ বসাতে পারেননি বিশ্বের আর কোন ব্যাটসম্যানই। আরও একটি জায়গায় তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম- টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে ছয়টি দ্বিশতকের মালিক তিনি।

অধিনায়কত্বের কথা যখন এসেই গেল, তাহলে অধিনায়ক হিসেবেও কোহলির রেকর্ডের কথা বলেই দেয়া যাক। ২০১৪ সালে মহেন্দ্র সিং ধোনির আকস্মিক বিদায়ের পর ভারতের টেস্ট অধিনায়কত্বের দায়ভার চাপে সেই সময়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সী কোহলির কাঁধেই। সেই থেকে ৩৭টি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি, এবং জিতিয়েছেন তার মধ্যে ২১টিতেই। মাত্র সাতবার পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে, আর বাকি নয়টি ম্যাচ অমীমাংসিতভাবেই শেষ হয়েছে।

বিরাট কোহলি, শচীন টেন্ডুলকার, ভারত ক্রিকেট দল, কোহলির রেকর্ড

কোহলির অধিনায়কত্বে ভারত টানা নয়টি টেস্ট সিরিজে জয়লাভ করেছিল। যার মাধ্যমে কোহলি ভাগ বসিয়েছিলেন রিকি পন্টিংয়ের রেকর্ডে, অধিনায়ক হিসেবে টানা সর্বোচ্চ সংখ্যাক টেস্ট সিরিজ জেতার ক্ষেত্রে। তবে এই বছরই ভেঙে যায় কোহলির অবিশ্বাস্য জয়রথ, যখন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে ভারত।

জানিয়ে রাখা ভালো, ভারতের এই ‘স্ট্রিক’ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে শ্রীলংকার মাটিতেই শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজের মধ্য দিয়ে, যেবার প্রথমবারের মত একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজে ভারতকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কোহলি। এরপর ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩-০’তে হারিয়ে ভারত যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে, এবং সেখানেও পায় ২-০ ব্যবধানের জয়। পরবর্তীতে ঘরের মাঠে ভারতের অভূতপূর্ব জয়যাত্রা অব্যহত থাকে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও। ২০১৭ সালে ভারত তাদের পরবর্তী বিদেশ সফর করে শ্রীলংকাকেও, এবং সেখানেও কোহলির ৬১০ রানের সুবাদে তিন ম্যাচের সিরিজ ১-০’তে জিততে সমর্থ হয়েছিল তারা।

ওয়ানডেতেও অধিনায়ক হিসেবে কোহলি দারুণ সফল। ৫২টি ওয়ানডে ম্যাচে অধিনায়ক হিসেবে থেকে জয় পেয়েছেন ৩৯টিতে, হেরেছেন ১২টিতে, আর বাকি অন্যটি শেষ হয়েছে কোন ফলাফল ব্যতিরেকেই। অপরদিকে কোহলির নেতৃত্বে ১৭টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির মধ্যে ভারতের জয় ১১টিতে, হার ছয়টিতে।

বিরাট কোহলি, শচীন টেন্ডুলকার, ভারত ক্রিকেট দল, কোহলির রেকর্ড

আবার ফিরে আসা যাক কোহলির ব্যক্তিগত অর্জনে। ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর টানা তিন ইনিংসে শতক হাঁকিয়েছিলেন কোহলি। বিশ্ব ক্রিকেটে এমন নজির আর একটিও নেই। ২০১৭ সালে তিনি সব ফরম্যাট মিলিয়ে ১১টি শতক পূর্ণ করেছিলেন। এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি শতকের মালিক এখন তিনিই। এবং তার বিনিময়ে তিনি গত বছর নির্বাচিতও হয়েছেন আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার। এমনকি এই বছরের শুরুতেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ছয় ম্যাচের সিরিজে তিনি মোট রান তুলেছিলেন ৫৫৮। এর আগে কোন দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ৫০০ এর অধিক রান সংগ্রহ করতে পারেননি কোন ব্যাটসম্যান।

২০১১ সালে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন কোহলি। এমনকি তার নেতৃত্বে টেস্টেও শীর্ষস্থান দখল করেছিল ভারত। ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিও জিতেছিলেন তিনি। তাই এই মুহূর্তে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যদি অপূর্ণতা বলে কিছু থেকে থাকে, তা হলো দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়। ২০১৬ সালে সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল তার সামনে, ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা উঁচিয়ে ধরার। কিন্তু সে যাত্রায় বিফল হয়েছিলেন তিনি। তবে ক্যারিয়ারের ইতি টানার আগে এই অপূর্ণতার আক্ষেপও ঘোচাতে পারবেন তিনি, এমনই বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষের।

বিরাট কোহলি, শচীন টেন্ডুলকার, ভারত ক্রিকেট দল, কোহলির রেকর্ড

কোহলিকে নিয়ে গুণগান করার লোকের অভাব নেই। তিনি এমনই এক বিস্ময়কর প্রতিভা যে বিশ্বের তাবৎ ক্রিকেট কিংবদন্তীই বাধ্য হয়েছেন তার অসাধারণত্বের স্বীকৃতি প্রদানে। যেমন স্যার ভিভ রিচার্ডস তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি বিরাট কোহলিকে ব্যাট করতে দেখতে ভালোবাসি। তার মধ্যে যে আক্রমণাত্মক মনোভাব ও খেলাটির প্রতি তীব্র আবেগ রয়েছে, সেটি আমিও নিজের মধ্যে ধারণ করতাম। তাকে দেখলে আমার নিজের কথাই মনে পড়ে।’ এদিকে কোহলি তার যে ‘এটিচুড’ এর জন্য অনেকের কাছেই অপছন্দনীয়, তার সেই এটিচুডেরই প্রশংসায় পঞ্চমুখ সুনীল গাভাস্কার। তার ভাষ্যমতে, ‘আপনি যদি একজন ভালো খেলোয়াড় হতে চান, তবে আপনার মধ্যে মেধা থাকতে হবে। কিন্তু আপনি যদি একজন গ্রেট হতে চান, তবে আপনার মধ্যে অবশ্যই কোহলির মত এটিচুড থাকতে হবে।’

২১ বছর নিজের কাঁধে ভারতীয় দলকে বয়ে বেড়ানোর পর শচীন যখন বিদায় নিয়েছিলেন, অনেকেই ভেবেছিল শুধু ভারতীয় ক্রিকেটই কেন, গোটা বিশ্ব ক্রিকেটেও তার মত আরেকজনের দেখা অদূর ভবিষ্যতে মিলবে না। কিন্তু সেইসব ভবিষ্যদ্বাণীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছেন কোহলি। তার উপস্থিতিতে একটি দিনের জন্যও অনুভূত হয়নি শচীনের না থাকার শূন্যতা। অনেকেই হয়ত বলবেন যে, কোহলির পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয় শচীনের সমতুল্য হওয়া। কিন্তু সে সব হয়ত নিছকই আবেগের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দশ বছর পার করে ফেললেও, এখনও ত্রিশের কোঠাতেই পা রাখেননি কোহলি। ফিটনেসেও তার তুলনা কেবল তিনি নিজেই। তাই আরও অনেকগুলো বছর যে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করবেন, সে ব্যাপারে প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে কোহলি যদি শচীনকেও ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেকে নিয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে এক অনন্য উচ্চতায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button