ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

কিশোরগঞ্জ- শহর ও হাওড়ে একদিন!

চিরচেনা ব্যস্ত শিডিউলে ঢুকে পড়েছি আবার আমরা সবাই৷ এই বর্ষায় নাগরিক জীবনে তেমন কোনো উপলক্ষ্য এই মুহুর্তে নেই। বর্ষা যাপন করা যেত হয়ত কিন্তু শহরে বৃষ্টি এলে এক হাঁটু পানি জমে যাওয়ার অবস্থায়, তীব্র জ্যামে বসে বৃষ্টিকে বিষেদাগার করা ছাড়া রোমান্টিকতা আসে খুব কমই। এই বর্ষা কি তাহলে এভাবেই চলে যাবে? ব্যস্ত শিডিউলে, যান্ত্রিকতায়?

না আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি৷ এক বুধবার রাতে হুট করে প্ল্যান করেছি পরদিন সকালে ঢাকার বাইরে যাব। বর্ষায় বাংলার সমুদ্র, নদী, হাওর দুরন্ত রুপ ধারণ করে। এই মুহুর্তে সমুদ্র দেখার খরচ নেই হাতে। তাই, অন্তত নদী বা হাওরের উপর একটা বেলা পার করে দেয়ার চিন্তা করেছি। ঠিক করেছি চাঁদপুর বা কিশোরগঞ্জ যাব। চাঁদপুর আমার বাড়ি, বহুদিন যাওয়া হয় না। এখন হাইমচরের দিকে নতুন একটা জায়গা বিখ্যাত হয়েছে মিনি কক্সবাজার নামে। গেলে সেখানে যেতে পারি। ঢাকা থেকে একদিনে লঞ্চে করে নদী ভ্রমণটাও হলো, নিজের জেলায় পা ফেলাও হলো৷

আরেকটা পছন্দ ছিল, কিশোরগঞ্জ, আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের এলাকা। বর্ষায় এখানকার হাওর জলে পূর্ণ হয়ে অপরুপা সুন্দরী হয়ে সেজে থাকে। ঢাকা থেকে যাতায়াতটাও সহজ, ট্রেনে যাওয়া যায়। একদিনে শহরের কিছু জায়গা, সাথে হাওর দেখা- দারুণ ব্যাপার। বন্ধুমহলের সিন্ডিকেট মিলে মোটামুটি ঠিক হলো, যেহেতু আগে কখনো কিশোরগঞ্জে আমরা যাইনি, এবার এই শহরের অতিথি হবো। কিন্তু, সমস্যা হলো, সকালের প্রথম ট্রেনটা ধরতে পারবে কিনা সবাই এটাই চিন্তার, সবাই খুব ঘুমকাতুরে।

কিন্তু আশঙ্কা নশ্যাত করে আমরা মোটামুটি ট্রেন ছাড়ার পনেরো মিনিট আগে কমলাপুরে রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে পোঁছে যেতে পারলাম। সকালের কিশোরগঞ্জগামী এগারোসিন্ধুর ট্রেনটি ছাড়ে সাধারণত সাড়ে সাতটায়।

ঢাকা ছাড়ার পথটা সবসময়ই আমি খুব কাছ থেকে দেখি। এই শহর, সাইনবোর্ড, মানুষ, রেললাইন ঘেঁষা জনপদ, নির্মানাধীন ভবন, সিগনালে অপেক্ষমান মানুষের মুখ– সবকিছুই লক্ষ্য করতে থাকি। শহরটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝার চেষ্টা করি৷ শহর পেরিয়ে গেলে যে সবুজ আমাদের স্বাগতম জানায়, দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, অচেনা কোনো স্টেশনের চায়ের দোকান, ভিন্ন জেলার মানুষ — সব কিছুকে আঁকড়ে ধরে কিছু না কিছু শিখতে চাই আমি ব্যাকুলভাবে। ঘুরতে যাওয়ার নির্দিষ্ট ডেস্টিনেশানের চেয়ে এই পথ আমাকে বেশি টানে, এই মানুষগুলোর মুখ থেকে গল্পগুলো আন্দাজ করতে থাকি আমি প্রতিনিয়ত। আমি দেখেছি, শহর বদলালেই কিছু গল্প বদলে যায়, কল্পনার দৃষ্টি প্রসারিত হয়, আবার মৌলিক অনুভূতির জায়গাতে সবারই কোথাও না কোথাও মিল খুঁজে পাই৷

কিশোরগঞ্জ জেলা

কিশোরগঞ্জ স্টেশনে আমরা নেমেছিলাম সকাল এগারোটার কিছু পরে। নেমেই আগে খাবার হোটেল খুঁজতে শুরু করলাম। কারণ, সকালে ঘুম ভেঙ্গে বাসি মুখে সবাই ট্রেনে উঠেছি, নাস্তা করার সময় হয়নি। তাই নাস্তা সারলাম ধীরে সুস্থে৷ এরপর শহরের মোড় যেখান থেকে সব জায়গায় অটো যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা ঠিক করলাম কোথায় যাব। অটোতে গুরুদয়াল কলেজের ভাড়া দশটাকা করে। অবশ্য গুরুদয়াল কলেজে ঘুরার সবচেয়ে ভাল সময় বিকেলের গোধুলি আলো পড়া সময়টা। তখন ওয়াচ-টাওয়ারে উঠে শহরটাকে নির্মল বাতাসে উপভোগ করতে পারবেন খানিকক্ষণ।

কিশোরগঞ্জে নেমে প্রথমে যে কথাটা প্রথম মনে হয়েছিল তা হলো, এখানে প্রচুর গরম। আমার একসময় মনে হচ্ছিলো, গরমটা বুঝি ঢাকা থেকেও বেশি। আমরা অবশ্য প্রচুর এনার্জেটিক। তার প্রমাণ দিয়েছি শোলাকিয়া ঈদগাঁ মাঠে। সেখানে গিয়ে বিশাল মাঠ দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, এখানেই সবচেয়ে বড় ঈদের জামায়াত হয়? মাঠটা বিশাল সন্দেহ নেই, কিন্তু জাতীয় ঈদগাহকে কেন যেন এই মাঠ থেকে বড় মনে হয়েছিল আমার। যাইহোক, মাঠে ভরদুপুরে কয়েকটা জায়গায় স্কুলের ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। আমরা এরকম একটা দলের সাথে খেলব বলে অপেক্ষা করলাম। তাদের রানিং ম্যাচ শেষ হওয়ার পর, নতুন বল কিনে আনলাম। এরপর ঠিক হলো, আমরা বন্ধুরা ঢাকার মানুষ এক দলে৷ আমাদের বিপক্ষে খেলবে ওরা। ছেলেগুলো ভাল খেলে সন্দেহ নাই, কিন্তু আমরা জিতে গেলাম। এক ম্যাচ হেরে ওরা খানিকটা বিভ্রান্ত। নিজেদের মাঠে বাইরের লোক এসে হারিয়ে যাবে, এটা মেনে নেয়া যায় না। তাই ওরা আবার একটা ম্যাচ খেলতে চাইলো। এই গরমে আমরা আরো একটা ম্যাচ খেললাম এবং ছেলেগুলোর আবারো মনখারাপ হলো হয়ত। এই ম্যাচটাও তারা হেরে গেল। মাঠে বিশাল একটা গাছ, নামটা কি জানি না নিশ্চিতভাবে, তার পাশে একটা পানির চাপকল আছে। সেখানকার পানি এত ঠান্ডা যে সারাদিন ওখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিলো। সেখান থেকে আমরা হাত মুখ ধুয়ে পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করলাম।

শোলাকিয়া ঈদগাঁ
শোলাকিয়া ঈদগাহ | কিশোরগঞ্জ

ক্রিকেট খেলতে খেলতে আমরা অনেকটা সময় খরচ করে ফেলেছি। যেহেতু হাওর দেখতে হবে তাই, শহরে বেশিক্ষণ থাকতে চাইছিলাম না। তবে শহরে দেখার মতো আরো বেশ কিছু দারুণ জায়গা আছে বলে জেনেছি। যেমন আপনি চাইলে শোলাকিয়ার সামনে থেকে অটো নিয়েও এই জায়গাগুলোতে যেতে পারেন। শোলাকিয়া থেকে ২০ টাকার ভাড়া দূরত্বে আছে ঈসা খাঁর জঙ্গল দূর্গ বাড়ি। বলা হয়ে থাকে, এখানেই ঈসা খাঁ দ্বিতীয় রাজধানী করেছিলেন।

আপনি চাইলে বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর বাড়িতে যেতে পারেন। এখানে একটি মন্দিরও আছে। ষোড়শ শতকে চন্দ্রাবতীর পিতা এখানে শিব মন্দিরটি নির্মাণ করেন। চন্দ্রাবতীর কৈশোরে প্রেম হয়েছিল এক যুবকের সাথে। তার সাথে মনের আদান প্রদান ঘটলেও বিয়েটা হয়নি। ফলে চন্দ্রাবতী চিরকুমারী থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তাই তার আবদারে পিতা নির্মাণ করেছিলেন সেই শিবমন্দিরটি!

আপনি গুরুদয়াল কলেজে গেলে সেখান থেকে খানিক সামনে পাবেন পাগলা মসজিদ। অটোতে পাঁচ টাকা নেবে হয়ত। এই মসজিদ নিয়ে জনশ্রুতি আছে, এখানে নফল নামাজ আদায় করলে ‘মানত’ পূর্ণ হয়! এখানে প্রচুর মানুষ দান সদকা করে থাকেন। নরসুন্দা নদীর পাশে এই মসজিদে চাইলে একটু ঘুরে যেতে পারেন কিশোরগঞ্জে আসলে।

এছাড়া আরো যেসব জায়গা আছে, আপনি অটোতেই যেতে পারবেন। নিজের পছন্দে বা অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেও তারাও নিয়ে যাবে। শহরে জমিদার বাড়ি আছে, মন্দির আছে, মসজিদ আছে। সবখানেই যেতে পারবেন হাতে সময় থাকলে। এই শহরে অটো মূলত প্রধান যোগাযোগমাধ্যম যা বুঝতে পারলাম।

আমরা গেলাম শোলাকিয়া থেকে চামড়া বন্দরে। এখান থেকেই আপনি কিশোরগঞ্জ হাওড়ে ঘুরার জন্য জলযান ভাড়া করতে পারবেন। এছাড়া অনেকে নিকলি দিয়েও হাওর ঘুরতে যায়। আমাদেরই আরেকটি গ্রুপ সেই একই দিনে বাইক দিয়ে কিশোরগঞ্জ নিকলি হাওরে ঘুরতে গিয়েছিল। তবে, আমরা চামড়াঘাট হয়েই হাওর ঘুরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনার কারণে।

কিশোরগঞ্জ হাওর

চামড়া ঘাট শহর থেকে ২০ কিলোর বেশি দূরত্বের হবে। এইপথে অটো, সিএনজি চলে। রাস্তা বেশ চমৎকার বলে যেতে কষ্ট হয়নি৷ চল্লিশ মিনিটের মতো লেগেছে। তখন প্রায় চারটা বাজে ঘড়িতে। আমরা ঘাটের কাছে একটা হোটেলে ঢুকলাম। রোদের তাপ তখনো কমেনি। মাথা বেয়ে চুঁই চুঁই করে ঘাম ঝরছে। হোটেলে হাওরের মাছ, গরুর মাংস, ফার্মের মুরগির মাংস এসব আছে। আমরা গরুর মাংস নিয়েছিলাম। ঢাকার বাইরে সেরা গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম মনে হলো সেখানে, কিংবা ক্ষিদা প্রচণ্ড ছিল বলেই অমৃত লেগেছে এও হতে পারে।

খাওয়ার পর ঘাটের সামনে এক নাওয়ের মাঝির সাথে কথা হলো। সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের হাওরে ঘুরাবেন এরকম কথা হলো। ভাড়া ঘন্টা প্রতি চাইলেন। আমরা কথা বলে ঠিক করে নিলাম। নৌকা ছাড়তেই রোদের উত্তাপের উপর প্রলেপ মাখা বিশুদ্ধ বাতাস গায়ে লাগলো। হাওরের এদিক ওদিক কোথাও কোথাও চর আছে। অনেক দূরে এমনই এক চরের কাছে এসে আমাদের নৌকা থামানো হলো। দলের সবাই ঝাপ দিলো জলের ওপর। সেখানে গোসল পর্ব সারতে সারতে পশ্চিম আকাশ লালচে হবার পথে।

ডি সাইফ, কিশোরগঞ্জ ট্যুর
লেখক, কিশোরগঞ্জ হাওরে।

দূরে ছোট নৌকা যায়। কখনো কখনো অনেক মানুষ সহ একটু বড় নৌকার দেখা মেলে। সম্ভবত যাত্রী নিয়ে তারা যাচ্ছে কোনো গন্তব্যে। নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে বাতাসগুলোকে পান করতে করতে মনে হলো, এরকম বিশুদ্ধ বাতাস শহরে নেই কোথাও। কি হালকা লাগছে নিজেকে।

ফেরার পথ ধরতে হলো, ফিরতে ফিরতে বেলা পড়ে গেছে। কিশোরগঞ্জের বর্ষার জলে পূর্ণ হাওর দেখে ফিরে আসছি। ফিরতে কখনোই ভাল লাগে না। যখন নৌকা চলছে, মনে হচ্ছে এভাবেই চলতে থাকুক না৷ থামার কি দরকার…কিন্তু আমাদের সবারই যে থামতে হয় কোথাও না কোথাও।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button