খেলা ও ধুলা

কিলিয়ান এমবাপ্পে: আগামীর পেলে, নাকি রোনালদো?

কিছু কিছু মানুষ থাকে না যে, জন্মের পর পরই তাদের ভবিতব্য লেখা হয়ে যায়। আমাদের বাংলাদেশে যেমন জন্মের সাথে সাথেই বাবা-মা শিশুর গায়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি পেশার সিল মেরে দেন! কিলিয়ান এমবাপের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রায় একই রকমই ছিল।

বন্ডি শহরের এক স্থানীয় ফুটবল ক্লাবে তার জন্ম। তার বাবা ছিলেন সেই সেই ক্লাবের খেলোয়াড় ও কোচ। তাই তার জন্মের পরমুহূর্তেই অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়ে যায় তিনিও বড় হয়ে ফুটবলারই হবেন। কারণ একেবারে ছোটবেলা থেকেই যে ফুটবলের সাথে বড় হয়েছেন তিনি। আশেপাশে সবাই ফুটবল খেলছে, ফুটবলই সবার ধ্যানজ্ঞান। তাই এমবাপেও হাঁটতে শেখার আগেই ফুটবল নিয়ে কারিকুরি শিখে গিয়েছিলেন।

সময়ের আগেই সব কিছু পেয়ে যাবেন, ঠিক এমনই চিত্রনাট্য তার মাত্র ১৯ বছরের জীবনের প্রায় পুরোটারও। ইন্টারনেটে এই মুহূর্তে একটি ট্রল বেশ ভাইরাল। সেখানে বলা হচ্ছে, আমাদের দেশে যেখানে ১৯ বছর বয়সে ছেলেরা মেয়েদের পিছনে ঘুরে ঘুরে সময় নষ্ট করে, এমবাপ্পে সেখানে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বজয় করে ফেলেছেন! কে কেমনভাবে ট্রলটিকে নেবেন তা যার যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করছে। তবে এ কথা একদমই সত্যি যে অন্য অধিকাংশ পেশাদার ফুটবলেরও যে বয়সে ক্যারিয়ারের মাত্র সূচনা ঘটে, সেই বয়সেই এমবাপ্পে বিশ্বজয় করে ফেলেছেন।

শুধু তাই’ই নয়। একই বিশ্বকাপে তিনি দুই-দুইবার ভাগ বসিয়েছেন সর্বকালের সেরা পেলের রেকর্ডেও। প্রথমে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে ফুটবল ইতিহাসে পেলের পর প্রথম টিনেজার হিসেবে এক ম্যাচে দুইবার জালে বল জড়ান তিনি। আর রবিবার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি গোল দিয়ে পেলের পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে টিনেজেই বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার অনন্য যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। এমন অভাবনীয় সাফল্যের পর স্বভাবতই নড়েচড়ে বসেছে গোটা বিশ্ব। এমনকি যার কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন এমবাপ্পে, সেই ব্রাজিলিয়ান গ্রেট পেলে তাকে আশীর্বাদ করে টুইটারে লিখেছেন, “মাত্রই দ্বিতীয় তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল! ক্লাবে স্বাগতম এমবাপ্পে, সঙ্গী পাওয়াটা দারুণ!”

শুধু ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করতেও প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে খেলা এই ফরওয়ার্ডের ছিল অনেক বড় অবদান। সবমিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ২১ ম্যাচে যে ৭টি গোলের দেখা তিনি পেয়েছেন, তার মধ্যে চারটিই এসেছে এবারের বিশ্বকাপে। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া আর রাউন্ড অফ সিক্সটিনে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোলের পাশাপাশি গ্রুপ পর্বে পেরুর বিপক্ষেও একটি গোল করেছিলেন তিনি। আর শুধু কি গোল করা! আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের একদম শুরুতেই দারুণ একটি পেনাল্টি আদায় করে নেয়া, এবং পরে আরও একটি গোলের অ্যাসিস্ট করা- আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স সম্ভবত গোটা আসরেরই সেরা। আর এমন কীর্তি তাকে এনে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের খেতাবও। ক্রোয়েশিয়া দলে একজন লুকা মড্রিচ না থাকলে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলটিও তার হাতে ওঠা অসম্ভব কিছু ছিল না।

দিদিয়ের দেশম, ফ্রান্স, বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০১৮ বিশ্বকাপ

সাফল্য অর্জনের পথে বয়স কোন বাঁধা নয়। যার মধ্যে পর্যাপ্ত সামর্থ্য ও গুণাগুণ রয়েছে, তার পক্ষে খুব অল্প বয়সেই দারুণ কিছু করে দেখানো সম্ভব। এমবাপ্পেও ঠিক তাই’ই করেছেন। তবু কেন তার মাঠের খেলার চেয়েও আলোচনায় বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে তার বয়স? তার কারণ ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতর সম্ভাবনা। খুব বড় কোন ইনজুরিতে যদি তার ক্যারিয়ারের অকাল সমাপ্তি না ঘটে, তাহলে মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় অন্তত আরও তিনটি বিশ্বকাপ তো খেলবেনই। আর ততদিনে তার অর্জনের তালিকা লম্বা হতে হতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটি ভাবতেই বড় অবাক লাগে।

প্রতি বিশ্বকাপেই এক ঝাঁক সম্ভাবনাময় তারকার জন্ম ঘটে। কিন্তু পরের বিশ্বকাপ আসার আগেই, মাত্র চার বছরের মধ্যে তাদের মধ্যে অনেকে হারিয়েও যান। এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছুই অপেক্ষা করছে? এমন সন্দেহও যদি কারও মনে উঁকি দিয়ে যায়, অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে এমবাপ্পে ইতিমধ্যেই তার খেলা দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, এত সহজে হারিয়ে যেতে আসেননি তিনি। একদিকে তিনি যেমন পেলের গড়া ৬০ বছরের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন, তেমনই তাকে তুলনা করা হচ্ছে আরেক কিংবদন্তী ব্রাজিলিয়ান রোনাল্ডোর সঙ্গেও।

 

১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জেতা পেলে পরে দলকে আরও দুইটি বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। রোনাল্ডোও তার ক্যারিয়ারে দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। আশা করতে দোষ নেই যে এমবাপ্পের অর্জনও হয়ত এমন কিছুই হবে। পেলেকে ছুঁতে না পারুন, রোনাল্ডোকে ছোঁয়া কি খুব কঠিন হবে? ইতিমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ জিতে ফেলা এমবাপ্পে কি আগামী তিনটি বিশ্বকাপের একটি জিততে পারবেন না?

ভুলে যাবেন না, এই বিশ্বজয়ী ফ্রান্স কিন্তু বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ দল, খেলোয়াড়দের গড় বয়স মাত্র ২৫। আপাতদৃষ্টিতে অনভিজ্ঞ এই দলের খেলোয়াড়রা চার বছর বাদে কাতার বিশ্বকাপের সময় হয়ে উঠবেন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। থাকবেন নিজেদের ক্যারিয়ারের তুঙ্গস্পর্শী সময়ে। তাই কে জানে, হয়ত কাতারেই রোনাল্ডোর সাথে এক কাতারে চলে আসবেন এমবাপ্পে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button